ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

“কোন এক পরীক্ষাগারে তামাকের ধোঁয়া কতোটুকু বিষাক্ত তা বোঝার জন্য দুইটা বোতলের একটিতে নেয়া হলো সুপেয় পানি আর অন্যটাতে নেয়া হলো সিগারেটের ধোয়া ফিল্টার করা পানি।এখন এই দুইটা বোতলে সমান সংখ্যক ব্যাক্টেরিয়া দেয়া হলো।কিছুক্ষন পর দেখা গেল,দ্বিতীয় বোতলের ব্যাক্টেরিয়াগুলো সব মারা গেছে কিন্তু সুপেয় পানিতে থাকা ব্যাক্টেরিয়াগুলো বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে -এই পরীক্ষা থেকে গবেষক সিদ্ধান্তে আসলো যে, ধুমপান করলে দেহের ভেতর কোন ব্যাক্টেরিয়া তথা কোন জীবানু বেঁচে থাকতে পারে না।”

উপরের গল্পটার গবেষক তামাক বাজারজাতকারী প্রতিষ্টানের কাছ থেকে কোন উৎকোচ নিয়েছিলেন কিনা জানিনা,তবে বিশ্বের সবচেয়ে নামী একটা সিগারেট বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের লেখাটা পড়ে মনে হলো তারা আমাদের সবাইকে “যাহা বুঝাইবেন তাহাই বুঝিবো, হুজুর” টাইপ মনে করে।সেখানে লেখা আছে-

“আমরা জানি যে ধুমপান বিপদজনক।কিন্তু আমাদের ব্যাবসার উদ্দেশ্য মানুষকে ধুমপানে উৎসাহি করা না,বরং প্রাপ্তবয়ষ্ক ধূমপায়ীদের হাতে উন্নতমানের পন্য পৌঁছে দেয়া।আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে ধুমপান শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়ষ্কদের জন্যই যারা এটার বিপদ সম্মন্ধে জ্ঞাত।”

এটা দ্বিধাহীনভাবে প্রমানিত যে,ধুমপান হলো পরিসংখ্যানের উপাত্ত সংগ্রহের একটা প্রতিনিধিত্বকারী উৎস,তবুও আমি বর্তমান অবস্থা বোঝানোর জন্য উপাত্ত হাজির করবো না। কারন সিগারেট বাজারজাতকারী প্রতিষ্টানের উদ্দেশ্যকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ক্লাস ৫,৬ এর ছেলেরা যখন ধুমপান করে,তখন দেখে মনে হয় না যে পরিসংখ্যানের প্রতি তাদের সামান্যতম মায়াটুকু আছে।তাছাড়া সিগারেট বাজারজাতকারী প্রতিষ্টানের উদ্দেশ্য যেহেতু প্রাপ্তবয়ষ্কদের ঘিরে,সেহেতু উপাত্ত সংগ্রহের ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ীদের একটা বড় অংশ বাদ পড়াই স্বাভাবিক।
ওই দিন কিছু বিলবোর্ডে দেখলাম,তারা দাবি করেছে- ১৯৮০ সাল থেকে তারা ৬ কোটি ৭৫ লাখ বৃক্ষ চারা রোপন করে পরিবেশের খুব বড় একটা উপকার করেছে।এখন প্রশ্ন হলো,পরিবেশটা মুলতঃ কাদের জন্য?সহজ উত্তর হবে-মানুষের জন্য।১৯৮০ সাল থেকে তারা কতগুলো মানুষ মারতে পেরেছে,এটা যদি বিলবোর্ডে পেতাম তবে মোট লাভ বা ক্ষতি হিসাব করা সহজ হতো।
শেয়ারবাজার নিয়ে প্রচলিত একটা কৌতুক আছে এরকম-এক লোক বিদেশ থেকে একটা এলাকায় এসে ঘোষনা দিল যে,সেখানে যত বাদর আছে প্রতিটা সে ৪০ টাকা দরে কিনবে।এলাকার লোকজন ঘোষনা শুনে খুব আগ্রহ নিয়ে বাদর ধরার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলো এবং যে যেমন পারলো,বাদর ধরে তার কাছে ৪০ টাকা দরে বিক্রি করল।আবার ঘোষনা দিল প্রতিটা বাদর ৫০ টাকায় কিনবে।সবাই অনেক খোঁজাখুজি করে যে বাদর পেল তা ৫০ টাকা করে বিক্রি করল।এরপর প্রতিটা বাদর ৮০ টাকা করে কিনবে,এই ঘোষনা দিয়ে সে তার দেশে কিছুদিনের জন্য চলে গেল।এরমধ্যে লোকটার সহকারী এলাকার মানুষের সাথে এই চুক্তি করল যে,তারা যদি বাদরগুলো তার কাছ থেকে ৭০ টাকা করে কিনতে পারে তবে সেগুলো তার মালিকের কাছে ৮০ টাকা করে বেঁচতে পারবে আর মালিক আসলে তাকে বলবে যে বাদরগুলো রাতের আধারে পালিয়ে গেছিলো।এলাকার মানুষ সবাই খুশি মনে সবগুলো বাদর কিনে ফেলল ৭০ টাকা দরে…………।পরের দিন থেকে ওই এলাকার কোন লোক আর কোন দিন সেই বিদেশি আর তার সহকারীকে দেখে নাই-এটাই নাকি শেয়ারবাজার।

আমাদের দেশের তামাক কোম্পানিগুলোও কম যায় না,তারা তামাক চাষের মৌসুম এলে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এলাকার কৃষকদের মাঝে ঘোষনা দিয়ে দেয় যে,তামাকের চারা কোম্পানি দিবে।তাদের কাজ শুধু সার আর পানি দিয়ে চাষ করা। তামাক বেচা নিয়েও তাদের চিন্তা করতে হবে না,কারন কোম্পানি নিজ দায়িত্বে লাভজনক মূল্যে সব তামাক কিনে নিবে,এইবার আর গতবারের মতো কম দামে বেচতে হবে না।ব্যাস,কৃষক স্বপ্ন দেখতে শুরু করলো,তামাক বেচে এটা করবে,ওটা করবে।অনেক আশা নিয়ে চাষ করলো,ফলনও ভাল হলো।এখন তামাক বেচার পালা,কোম্পানির প্রতিনিধি এসে এই সমস্যা,সেই সমস্যার কথা বলে ঠিকই অনেক কম মূল্যে তামাক কিনে চলে গেলো।কৃষকের হাতে রইলো শুধু পাতা ছাড়া তামাক গাছের শক্ত লাঠি।শেষে হাতে হারিকেন ধরলে ওই লাঠি কই যাবে কোন কুল-কিনারা খুজে পাই না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধিনে দক্ষিন-পূর্ব এশিয়া্র আঞ্চলিক অফিস থেকে ২০০৭ সালে গবেষনাধর্মী একটা বই প্রকাশ করেছিল।তাতে রিজিওনাল ডিরেক্টর-Samlee Plianbangchang এর উক্তিতে উল্লেখ করেছেন যে, “তামাকভিত্তিক অর্থনীতিই তামাক রোধের ক্ষেত্রে একটা জটিল নিয়ামক।তামাক কোম্পানিগুলোর দাবি অনুযায়ী তামাকজাত পণ্যের উপর ক্রমবর্ধমান কর বৃদ্ধি সরকারকে বড় একটা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্ছিত করবে,তামাক নিয়ে অবৈধ ব্যাবসা চালু হবে,বিশাল একটা জনগোষ্ঠি কর্মহীন হয়ে পড়বে।এই অমূলক একটা দাবি সরকারকে তামাকরোধী আইন বা পদক্ষেপ নিতে উদাসিন করে তোলে।বৈজ্ঞানিক গবেষনা থেকে দেখা গেছে যে তামাক রোধ করতে পারলে সাধারন জনগনের উল্লেখজনকভাবে স্বাস্থ্যের উপকার হবে কোন প্রকার জাতীয় অর্থনৈতিক ক্ষতি ছাড়াই।”

এটা আজ প্রমাণীত যে,যিনি ধুমপান করেন তার থেকে তার পাশের মানুষটার ক্ষতি হয় বেশি-এটাকে Passive Smoking বলে যা এই ব্যাপারটার মতো- হোটেলে খাবার খাবে একজন আর বিল দেয়া লাগবে আপনার।সুতরাং আপনি যদি ধুমপান না করেন তবুও আপনাকে বেশি ক্ষতির ভার বহন করতে হবে।এজন্যও অনেকে অবশ্য ধুমপান করার পরামর্শ দেয়।আমার এক বন্ধুকে বলেছিলাম,সিগারেট তো ভাল জিনিস না,তবে কেন খাস?সে তার উত্তরে বলেছিল সিগারেট ভাল জিনিস না,তাই তো পুড়িয়ে ফেলি।

ধুমপায়ীরা একটা ভাল(!!!) কাজ প্রায়ই করে আর তা হলো,তারা মাঝেমধ্যেই ধুমপান ছেড়ে দেবার কথা ভাবে।কিন্তু আমরা যতই ধুমপানের ক্ষতির কথা বলি না কেন,তারা কখোনই ওটা ছেড়ে ভাল(!!!) কাজটা করা থেকে বিরত থাকবে বলে মনে হয় না। ধুমপায়ীদের দেখলে রবীন্দ্রনাথের ওই গানের প্রথম কলিটা মনে পড়ে-আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান।

যাহোক,অনেক বকবক করলাম,আসল কথায় আসি।ইদানিং অপ্রাপ্তবয়ষ্ক ধুমপায়ীর সংখ্যা যে হারে বাড়ছে,তাতে ভবিষ্যতে বৈষ্ণিক উষ্ণতা বৃদ্ধির একটা বড় কারন ধুমপান,এটা শুনলে আশ্চর্য হবো না।তাই সবচেয়ে ভাল হতো তামাক কোম্পনিগুলো বন্ধ করে দিতে পারলে।সরকারকে বলে ওগুলো বন্ধ করা-সে অনেক উপর মহলের সুক্ষ হিসাব-নিকাশের কাজ।তাই আসুন না,আমাদের সন্তানদেরকে পারিবারিক ভাবে ধুমপানের কুফল সম্মন্ধে সচেতন করে তুলি আর তারা যেন ধুমপানে আকৃষ্ট না হয় তার দিকে খেয়াল রাখি।তবে যে বাবা নিজেই ধূমপান করেন তার জন্য কাজটা একটু কঠিনই হবে।আপনার সন্তানের কথা ভেবে আপনি কি পারেন না ধুমপান ছেড়ে দিতে? কোন বাবা কি চাই তার নিজের বোকামির জন্য সন্তানের দেহের মধ্যে ক্যান্সার বাসা বাধুক?একটা প্রচলিত প্রবাদ দিয়ে শেষ করবো-

সিগারেট হলো কাগজে মোড়ানো কিছু তামাক যার একপাশে থাকে আগুন আর অন্য পাশে থাকে একটা গাধা।
ভাল থাকবেন সবাই।