ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

“আজিকার;শেষ মুহুর্তের
আমরা এক-সকলের পায়ের শব্দের
সুর গেছে অন্ধকারে থেমে;
তারপর আসিয়াছি নেমে
আমরা ৪০তম;
আমাদের পায়ের শব্দ শোনো-
নতুন এ, আর সব হারানো-পুরনো।
উৎসবের কথা আমি কহি নাকো,
গাই নাকো দুর্দশার গান”। ( ধুসর পান্ডুলিপি, জীবনানন্দ দাশ)

এতো সুন্দর কবিতা যে কবি লিখতে পারে,তারা নিশ্চয় কল্পনায় ৪০তম ব্যাচের কথা কল্পনায় ভেবেই লেখে। তাই অত্যন্ত সুকৌশলে “৪০তম” কথাটি কবিতার মাঝে ঢুকিয়ে দিয়েছি। কবি সাহেব মাইন্ড করতে পারে। দুঃখিত দাশ বাবু। কি আর করা! জানেনি তো, কবি মরে গেলে কবিতা বিকৃত হয়, কারনে অকারনে, বিকৃত হয়। রাত বিরাতে বিকৃত হয়।আর বিকৃত হয়, ৪০তমের বর্ষ পুর্তিতে। এইরে! এবার “রক্তাক্ত প্রান্তর” এর আময়িক ডায়ালগটাকে আরো রক্তাক্ত করে ফেললাম। না আর সাহিত্যের মাঝে আর থাকা যাবে না।

ওই দেখ! রবিবাবু আবার হাসছে। সাবধান ঠাকুরদা! আজ কিন্তু ৪০তম ব্যাচের দ্বি-বর্ষ পুর্তি। হাসলে কিন্তু এবার আপনার “গীতাঞ্জলী”তে হাত দিব। গঙ্গার জলে যদি অঞ্জলী হতে না চাও, তবে মানে মানে কেটে পড়। আমাকে আরো আনেক কথা লিখতে হবে। বলা তো যায় না, কখন আবার রবীন্দ্র-নজরুলে হাত দিয়ে বসি।

হ্যা, প্রিয় পাঠক আজকে আমাদের দ্বি-বর্ষ পুর্তি। অনেক ঝড়-ঝাঞ্ঝা পেরিয়ে আমরা নতুন বছরে পা দিলাম। ভাবতেও পারবেন না, আজকে কি কি অবাক কান্ড ঘটছে। সবে মাত্র কার্ডিওলজী ওয়ার্ড করে কলেজ গেটে পা দিয়েছি। ৩৯তম ব্যাচের একজন ভাইয়ের সাথে দেখা। ইনি অনেক ভালো মানুষ। কিন্তু কি এক অবাক কাণ্ড। ৪০তমকে সহ্য করতে পারেন না। আমি তার কাছে আমাদের ব্যাচের কথা বললেই গোখরো সাঁপের মতো ফোঁসফাঁস করেন। আজকের এইদিনে,সব বেদনা ভুলে আমিই তার কাছে গেলাম। বললাম,
-বলুনতো দেখিনি দাদা বাবু, কি ভয়ানক কর্মকান্ডখানা সাধন করিয়াছি!
এই ভাইটি অনেক রসিক। কথা বললেই সাধু ভাষা ব্যবহার করে।আমিও সুযোগটা হাতছাড়া করিনা।
-কি সাধন করিয়াছ রে হতচ্ছাড়ার দল।মূর্খের টিমমেট,তেলাপোকার ডিম উত্তসূরী?
-কি আর কহিব দাদা, সে এক ভয়ানক ব্যাপার-স্যাপার!
-নিশ্চয় টার্মে ফেল মারিয়াছিস, নয়তো এক মাসের অটো ছুটি নিয়াছিস?
-না না দাদা, আরও ভয়ানক। একেবারে রক্তা-রক্তি কান্ড!
-কেনরে, পরীক্ষায় বসতে দেয়নি বলিয়া স্যারদের সহিত হাতাহাতি করিয়াছিস নাকি? রক্তা-রক্তির কথা বলিলি যে?
-আমরা কি এহেন কর্ম সাধিন করিতে পারি দাদা? তুমিই বৃত্তান্ত করো।
-ও তাহাই বল। তোরা এতো ক্ষুদ্র কর্ম কেমন করিয়া সম্পাদন করিবি? তাহা হইলে নিশ্চয়ই, প্রিন্সিপাল স্যারের বাসায় ঢিল ছুড়িয়াছিস অথবা জাকির স্যারের মাথা ফাটাইয়া দিয়াছিস।
-একি বলিলে দাদা? ঘটনা তো আরও গভীরের।

এবার পরিচিত ভাইটি মুখটি আমার কানের কাছে এনে গম্ভীর ভাবে ফিসফিস করে বলল,
-বুঝিয়াছি, বুঝিয়াছি, নারী ঘটিত ব্যাপার-স্যাপার ঘটাইয়াছিস তোরা। এইবার মিলিয়াছে। যেমন ব্যাচ, তেমন কাণ্ড। ভুনা খিচূড়ীর সহিত, গোমাংস আর কি।
ফিসফিস করে কথা বলা মারাত্মক ছোঁয়াচে টাইপের। ঘটনার গুরুত্ব বোঝানোর জন্য আমিও ৩৯তম ব্যাচের সর্বজান্তা ভাইটির কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললাম,
-আজকের এই বিশেষ দিনেও আমরা সবগুলো ক্লাশ করিতেছি। ওয়ার্ড করিয়া আসিলাম, এখন লেকচার গ্যালারীতে যাইতেছি। কমিউনিটি মেডিসিন ক্লাশ করিতে হইবে। মেডিকেলে আসিয়াছি।পড়াশুনা করিব না, ক্লাশ ফাকি মারিব, তাহা কিভাবে সম্ভব। আমরা এটা স্বপ্নেও ভাবিতে পারি না।

এবার তার চোখ উল্টে গেল। চড়ক গাছ টাইপ আকার ধারন করল। ভালোই হল।আশা পুর্ন হল। এতোদিন শাল, সেগুন গাছ দেখেছি। আজ চড়ক গাছ দেখলাম। তিনি হয়তোবা আমাদের নিয়ে মজা করেই বললেন,
-হে আল্লাহ, তুমি আমাকে এ-কী কথা শ্রবন করাইলা।এ কথা শোনার আগে কেন আমার মরন হলোনা। ধরনী দ্বিধা হও,আমি তন্মধ্যে প্রবেশ করি।

বুঝলাম।মজা করে বললেও অনেক হয়ে গেছে। আল্লাহ যদি এই কথা কবুল করেন,তাহলে তার কি অবস্থা হতে পারে, ভেবে শিহরিত হলাম। শেষবারের জন্য আরেকটা দিতে ভুললাম না। বললাম,
-আজ আসিতেছি দাদা। ক্লাশ আরম্ভ হইয়া যাইবে। সম্মুখ বেঞ্চে বসিতে হইবে।স্যারের আই কন্ট্যাক্টে থাকিতে হইবে। বলা তো যায় না, দু একটা প্লেসও মারিয়া দিতে পারি।

কথা না বাড়িয়ে,ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া ভাইটিকে পেছনে রেখে ছুটলাম লাইব্রেরীর উদ্দেশ্যে।আড্ডা মারতে হবে তো।
কিন্তু এ-কী কান্ড। ৪০তম ছাত্র-ছাত্রী দ্বারা লাইব্রেরী কানায় কানায় পূর্ণ। সবাই পড়ালেখায় নিমগ্ন। জানালার কাছে গিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম। নাহ! সূর্যতো যথারীতি পুর্বদিকেই উঠেছে। তাহলে?
গতকাল নাহিদ আমাকে বলল,
-জানিস রাজীব, পড়ালেখাও এখন আনকালচার হয়ে গেছে।
আমি বললাম,
-হুঁ।

হায়! হায়!! এ-কী পরিবর্তন। যে ৪০ কে আমি সংস্কৃতির ধারক-বাহক বলে ভাবতাম,তারাই আজ অপসংস্কৃতিতে মত্ত হয়েছে? আজকের এইদিনেই তারা আনকালচার কর্মটি সাধন করছে। বুকের মাঝে মোচড় দিয়ে উঠল।কি আর করা?
আমিও ডেভিডসন সাহেব-রচিত কমিউনিটি মেডিসিন(!!!) বইটি এনে পড়তে শুরু করলাম। কিভাবে মোঘল সম্রাট বাবর তার রাজ্যের প্রজাদের কৃমির আক্রমন থেকে ঠেকিয়েছিল, তার চমৎকার বর্ননা। কাহিনী এগিয়ে চলছে বিদ্যুৎ বেগে। আমিও চমৎকৃত হচ্ছি ।
বলুনতো পাকিস্থান ক্রিকেট টিম আর ৪০ তম ব্যাচের মধ্যে মিলটা কি?
-দুইটায় আনপ্রেডিক্টেবল।

নিশ্চিত হারা ম্যাচ যেমন করে, তারা বের করে এনে বারবার ক্রিকেট বিশ্বকে চমকে দেয়। আমরাও তেমন।
ময়দান হাতছাড়া হয়ে যায়, বাজী প্রায় হেরেই যায়। কিন্তু আমরা ফিরে আসি। বারবার ফিরে আসি। যেমন করে, পুড়ে যাওয়া ছাই-ভষ্ম থেকেও জীবন্ত হয়ে উড়ে আসে ফিনিক্স পাখি।
আজকের এই দ্বি-বর্ষ পুর্তিতে, বাংলাদেরশের সর্বাধিক প্রচারিত প্রথম আলোর সাপ্তহিক “ছুটির দিনে”র মাধ্যমে, ৪০তম ব্যাচ ও আমাদের সম-সাময়িক প্রত্যেক মেডিকেলের তৃতীয় বর্ষের ফিনিক্স সদস্যদের জানাই, প্রাণ ঢালা অভিনন্দন।