ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

আমার চেনা একজন মধ্যবিত্ত চাকুরীজীবির স্বপ্ন ভংগের গল্প বলি , সামান্য বেতনে অসামান্য সাহস বুকে একখানি বিয়ে করে গোনা টাকায় সংসার চালাচ্ছিল সে, বাসা ভুঁইয়াপাড়া , নগরীর অভিজাত আবাসিক এলাকা বনশ্রী , তারই পিছনে অপেক্ষাকৃত কম উন্নত মহল্লা ভুঁইয়াপাড়ায় ভালোই কাটছিল তার , যেমন বাসাভাড়া, খাওয়া, ঠিক তেমনই মানানসই তার বেতন, ঘরে ফুটফুটে কন্যা সন্তান , চেনা চেনা আসবাবে হাটিহাটি পা-পা করে বড় হচ্ছিল সে । মায়ের আদরে , বাবার যত্নে ।

আর তখনই সেই চাকুরীজীবির জীবনে নেমে আসলো এক অন্য রকম বিপর্যয়। পাল্টে গেল তার হিসেব নিকেশ , অতি সাচ্ছন্দের আশায় রঙ্গীন স্বপ্ন চোখে যখন সে দারুন মগ্ন ঠিক তখনই খপ্পরে পড়লো ‘ক্রেডিট কার্ড’ আতংকের । কার্ড দিয়ে সে কিনলো ৩৫০০০/- টাকা দামের একটি বিদেশী খাবার টেবিল । শুরু হলো সুদের চক্র , তারপর টিভি , ফ্রিজ , মাইক্রো ওভেন এমনকি মোবাইল ফোন ।এসব ‘ক্রেডিড কার্ড’ অতিশয় সহজলভ্য বিধায় সেই হ তে আধুনিক জীবন যাপনের হাতছানি তাকে তাড়া করে ফিরতে লাগলো ।

ক্রেডিট কার্ড নিতে তেমন কোন গ্যারান্টরের দরকার পড়েনা, এতে নেই কোন ‘সিআইবি’ ( ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো ) জটিলতা । আবার ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ‘সিআরজি’ ( ক্রেডিট রিস্ক গ্রেডিং ) অথবা ‘ডিবিআর’ ( ডেবথ বার্ডেন রেশিও ) এর বিষয়টি বিবেচনায় না রেখেই নিশ্চিন্তে ঝুলিয়ে দিতে পারে ক্রেডিট কার্ডের মত ‘মরণ শিকল’ তাদের গলায় যারা কোমলমতি সদ্য চাকুরে , বা পুঁজি সঙ্কটে হাফসে ওঠা অর্বাচিন ব্যবসায়ী । ক্রেডিট কার্ডের কুফল সম্পর্কে যাদের বিস্তারিত ধারনা নেই , অথবা দিন দিন যারা জড়িয়ে পড়ছে চক্রবৃদ্ধির সূদের জালে আর এমন রকম চোরাবালির অন্তরালে হারিয়ে যাচ্ছে তারা যার সম্পর্কে তাদের কোন পূর্বঅভিজ্ঞতা তো নেই-ই বরং সমাজ ও সরকারের কেউ তাদের সতর্ক করবেন বা নিরাপত্তা দিবেন তার কোন ব্যবস্থা আছে কি নেই তাও জানা নেই তাদের । উল্লেখ্য যে , এই ক্রেডিট কার্ডের সূদের হার অনেক ক্ষেত্রে ৩০% এর ও বেশি । আর ক্রেডিট কার্ড দিয়ে পন্য কেনার অন্যতম চমক ( ফাঁকিবাজি ) হচ্ছে পন্য কিনলে প্রথম ৪৫ দিন সূদ মওকুফ । অথচ এই নিয়মে ( আনুমানিক) শতকরা ৯০ জন কার্ড গ্রহিতা পূর্ণ বিল প্রদান করে ঝুঁকিপূর্ন ঋণচক্র প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয় । এরা সুযোগ গ্রহন করে সূদ সহ স্থিতির শতকরা ৮ হ’তে ১০ ভাগ ন্যুনতম ( মিনিমাম বিল ) প্রদান করে কার্ড সচল রাখা ও অভিযোগ মূক্ত থাকার সহজ পদ্ধতিতে ।আর এভাবে যুগ যুগ ধরে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে অবশেষে ‘ঋণ খেলাপি’ র উপাধি নিয়ে কেউ কেউ হন সর্বশান্ত ।

লক্ষ্য করা গেছে যে, যেহেতু উচ্চ হারে সূদ, বিধায় ঋণ আদায়ের হার সর্বক্ষেত্রে একশত ভাগ নিশ্চিত করা একেবারেই অসম্ভব তাই ব্যাংক / আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ সন্তোষজনক ঋণআদায়ের গানিতিক হার পুশিয়ে নিতে গন হারে চাপিয়ে দিয়েছে ‘ক্রেডিট শিল্ড প্রিমিয়াম নামে’ এক প্রকার অফেরতযোগ্য চার্জ, সেই সাথে বার্ষিক ফি, মাসিক সূদ ও ভ্যাট এবং অন্যান্ন ফি যেমন বিলম্ব ফি , ( যথার্থ সময়ে মাসিক মিনিমাম জমা দিতে ব্যর্থ হলে ),সীমা অতিক্রম ফি /ওভার লিমিট ফি ( যদি বরাদ্দ কৃত ঋণ সু্বিধার পরিমান সূদসহ অতিক্রম হয় ) ইত্যাদি নানা রকম ফি তো আছেই ।

এভাবেই ক্রেডিট কার্ড দিয়ে চাকুরীজীবির সাত বছর আগের কেনা ডাইনিং টেবিলের দাম এবং ব্যবসায়ীর কেনা রঙ্গীন টিভির দাম এখন সূদে আসলে কত হয়েছে ? তার হিসেব রাখা যে কত দুঃসাধ্য আর কত হৃদয় বিদারক সেই হিসেব কি কর্তৃপক্ষ রাখেন ? যে হিসাব রাখতে সর্বদা হিমসিম খায় সহজলভ্য ‘ক্রেডিট কার্ড’ গ্রহিতা, আর সর্বদা যাদের রাতের ঘুম হারাম হয় ‘ক্রেডিট কার্ড’ আতংকে ।তাই তাদের মনে পড়ে প্রথম দিন যে ব্যাংক প্রতিনিধি বিনম্র গলায় অনুরোধ করে তাদেরকে গছিয়ে দিয়েছিল ‘ক্রেডিট কার্ড’ আবার একটা কার্ড আছে জেনেও অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান / ব্যাংক দিলেন আর একটা কার্ড , এভাবে আর একটা..। আর এখন বিল অনাদায়ে কিংবা অনিয়মিত বিল প্রদানের কারনে ক্ষিপ্ত হয়ে সেই প্রতিনিধিরাই বা অন্য কেউ প্রতিদিন টেলিফোনে মামলার হুমকি দিচ্ছে , অশ্রাব্যভাষায় গালি দিচ্ছে, উকিল নোটিশ দিয়ে , কোন কোন ক্ষেত্রে ‘থার্ডপার্টি’ নামে কোন আদায়কারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বেইজ্জতি করছে ।