ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

যথারীতি কাজ শেষে ঘরে ফিরেছিল তারা । যে রাত্রিই ছিল তাদের শেষ রাত্রি , আকাশের মেঘ হয়ে অপেক্ষা করছিল ‘মেঘ’ , মেহেরুন রুনী আর সাগর সরওয়ারের একমাত্র সন্তান । এই সেদিনই প্রবাস হতে ফিরেছে সে মা-বাবার হাত ধরে ।

নানা রকম গল্পের ফুলঝুড়ি , আঁকা আঁকি , উঁকি-ঝুকি আর ব্যস্ত লোকালয়ের কোলাহল ছেড়ে এই মাত্র চোখে যার ঘুম ভর করেছিল । সারা দিনের ক্লান্তি আর কর্মব্যস্ত সাংবাদিকতা ছেড়ে মেঘের মা-বাবাও আয়েশ করে ঘুমিয়ে পড়েছিল হয়তো । ঠিক সেই মুহুর্তে মেঘের চোখের সামনে ঘটে গেল সেই মর্মান্তিক ঘটনা , যা আর কক্ষনো দেখেনি মেঘ , রক্ত আর রক্ত , চিৎকার চেঁচামেচি শেষে তার মা-বাবা যেন হয়ে গেল রক্তাক্ত অসাড় পুতুল । কারা মারলো মেঘের মা-বাবাকে? কেন মারলো? কিসের জন্য মারলো? তার বাবা-মা কি আবারও ফিরে আসবে মেঘের চোখের সামনে? নাকি চির বিদায় নিয়ে, চির দিনের লেনা দেনা ফেলে চলে গেল তাঁরা, তার সঠিক কোন কারন জানা নেই মেঘের, এমনি আরও কত হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে মেঘের স্বপ্নহীন, নিদ্রাহীন চোখে ।

মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষনা করেছেন ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ধরা হবে দুষ্কৃতিকারীদের । শুনে খুশী হয়েছি আমি , তবে সন্তষ্ট হইনি মোটেও , কারন হয়তো পুলিশ তার সর্বোচ্চ তদন্ত কৌশল দিয়ে এবং ব্যাপক তল্লাশী ও সর্বাত্মক প্রচেষ্টার মাধ্যমে খুনীদের সনাক্ত করে মেহেরুন রুনী দম্পতির খুনের রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হবে , তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের পাশবিক হত্যা যজ্ঞ চালানোর সব গুলো রাস্তা বন্ধ করতে আমাদের যে ধরনের উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োজন, আর যে রকম নিরাপত্তা মুলক ব্যবস্তা নেয়া অতীব জরুরী তার ধারে কাছে আমরা পৌঁছুতে পারবো কিনা তাতে যথেষ্ট সন্দেহ থাকতোনা যদি শিকারি বিড়ালের মত আমাদের গোঁফ দেখে কিছুটা অনুমান করা না যেত ।

প্রথম কথা নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা কতটা শিথিল হলে গভীর রাতে অপরাধীরা গ্রিল কাটবার মেশিন নিয়ে অবাধে কোন মিশনে যাবার সাহস পায় ? আর পাড়া মহল্লার নিরাপত্তার দায়ীত্বরত যে সব বেসরকারী সিকিউরিটি গার্ড পাহারা দেয় তাদের কত বেতন ? ডিউটি কতক্ষন ? তাদের লেখাপড়া কদ্দুর ? এসব খবরাখবর কারা রাখেন ? আর কতটা জায়গা জুড়ে কতজন টহল পুলিশ বরাদ্দ আছে ? আর কি আছে তাদের নিরাপত্তা দেবার সত্যিকারের কৌশলগত ও যান্ত্রিক সক্ষমতা । নাকি সবাই আমাদের মত অথর্বরা তাদের স্বর্গ-রাজ্যে গা ভাসিয়ে পরগাছার মত দায়সারা ভাবে নিজ নিজ দায়ীত্ব পালণ করে যাচ্ছি ।
তাই মাঝে মাঝে অবহেলা আর গাফিলতির এ রকমের দু’একটা ঘটনা নিয়ে যখন ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয় তখন শাক দিয়ে মাছ ঢাকাবার মত আমরা তড়িঘড়ি করে ৪৮ ঘন্টা সময় চেয়ে নিই , যেন সব কিছু আমাদের নখদর্পনে , ভাবখানা এমন যেন আমরা কি-না পারি ? দুর্ধষ খুনী আসামীদেরকেও ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ধরতে পারি , অবশ্য এজন্য আমি মান্যবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাই । তবে এরপরে কিন্তু মাত্র ৪৮ ঘন্টা নয় , ৪৮ মাস সময় দেয়া যেতে পারে যেন মানুষ তার জীবনের নিরাপত্তা পায় । পুলিশে লোকবল কম , পর্যাপ্ত সরঞ্জমাদি বা অস্ত্র নেই , গাড়ি নেই , কিংবা উপযুক্ত প্রশিক্ষন নেই । এ সব খোঁড়া যুক্তি আর মোটেও শুনতে চায়না বাংলাদেশের মানুষ । বয়স তো আর কম হলোনা , স্বাধীনতার বয়স এখন ৪২ বছর । আসুন আমরা সবাই এক সাথে কাজ করি , সরকারী, বেসরকারী, সেচ্ছাসেবী, দল মত নির্বিশেষে সবাই মিলে যদি হাতে হাত রাখি তাহলে আর মেঘের কোলে যে সূর্য হাসছিল তা আর কান্নার সাগরে গিয়ে মিশে যাবেনা ।তখন প্রতিটি ঘরে ঘরে প্রতিটি দম্পতিরা তাদের সম্ভবনাময় মেঘ নিয়ে এক পশলা সুখের বৃষ্টির অপেক্ষায় নির্বিঘ্নে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবে ।