ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

আমি মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর কাজের ভক্ত। তার কাজ অন্যদের থেকে আলাদা। নিঃসন্দেহে ডুবও তার ব্যতিক্রম না। তাই ছবি নিয়ে কোন কথা হবে না। কথা হবে ছবির বিষয় নির্বাচন নিয়ে। ফারুকী বলেছেন, ডুব হুমায়ুন আহমেদের জীবনী না, জীবন থেকে অনুপ্রাণিত মাত্র। অনেকেই বলছেন হুমায়ূন আহমেদকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে ডুবে ডুব দিতে, তবেই ডুবের মজাটা পাওয়া যাবে।

বিখ্যাত দুটি পত্রিকা হলিউড রিপোর্টার (২৬ জুন) ও ভ্যারাইটি (২৮ জুলাই) ডুব নিয়ে লিখেছে- বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় লেখক ও সিনেমা পরিচালকের জীবন নিয়ে ডুব নির্মিত হয়েছে। পরিচালকের সাথে তার মেয়ের বান্ধবীর সম্পর্ক হয়। এক সময় পরিচালক তার সংসার, স্ত্রী ও সন্তানদের ছেড়ে মেয়ের সেই বান্ধবীকে বিয়ে করেন। লেখকের পরিবারের এই সংকটটি মুনশিয়ানার সাথে ছবিতে ফুটিয়ে তুলা হয়েছে। আমাদের হুমায়ুন আহমেদ সম্পর্কে এই ম্যাসেজটাই ফারুকী তার ডুব ছবির মাধ্যমে সারা বিশ্বকে জানিয়েছেন।

8.Mostofa+Sarwar+Farooki

হুমায়ূন আহমেদ আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। কিন্তু বলতে দ্বিধা নেই, তার বিতর্কিত অসম দ্বিতীয় বিয়ে তার জীবনের এক কালো অধ্যায়। তার এই বিতর্কিত অসম বিয়ে আমরা মেনে নিয়েছি ঠিক কিন্তু মনে নিতে পারিনি। কারণ এটা আমাদের অহংকারের বুকে একটি কালো দাগ। তাই বলে এই দাগ আমরা দশজনকে বলে বেড়াতেও চাই না, বলতে ভালও লাগে না।

ফারুকী বলেছেন, হুমায়ুন আহমেদের আমেরিকায় চিকিৎসাকালীন ঘটনাবলি এবং তাকে সমাহিত করা নিয়ে পরিবারের টানাপোড়ন তকে দারুণ ভাবে নাড়া দিয়েছে, পুড়িয়েছে। আর এ দহন থেকেই ডুবের সৃষ্টি। কিন্ত প্রশ্ন হলো, ফারুকীর আশেপাশের নাড়া দেয়ার মত আর কোন ঘটনা কি ছিল না যে হুমায়ূন আহমেদের জীবনের কালো অধ্যায়টা নিয়েই ছবি বানাতে হবে? মহাত্মা গান্ধী কৌমার্যব্রত চর্চার জন্য নিজের ভাতিজার কন্যা, মৃদুলার সাথে রাতের পর রাত এক বিছানায় ঘুমিয়েছেন! একবার ভাবুনতো ভারতের কোন পরিচালক এই বিষয়টা নিয়ে ছবি বানাবে কি না? অথবা রবীন্দ্রনাথের জীবনের প্রেম নিয়ে কলকাতার কোন পরিচালক ছবি বানাবে কি না?

ছাড়ুন এ সব! ছবি নিয়ে কথা তা্ই ছবি দিয়েই বলি। পাল হার্বার নিয়ে আমেরিকান ও জাপানি দুই দেশের পরিচালকরাই ছবি বানিয়েছে। হলিউডের ছবিতে জ্বলন্ত ডুবন্ত জাহাজের ডেকে একটা রাইফেল নিয়ে একজন আমেরিকান সোলজারকে জাপানি যুদ্ধ বিমানের বিরুদ্ধে একাই লড়তে দেখি। অন্যদিকে জাপানি ছবিতে দেখি একজন জাপানি পাইলট বোমা ফুরিয়ে গেলে তার যুদ্ধ বিমানটা নিয়ে কিভাবে আমেরিকার যুদ্ধ জাহাজের ডেকে আছড়ে পড়ে! এর উল্টোটা কখনও দেখিনি। কখনও হলিউডের ছবিতে জাপানি সোলজারের বীরত্ব বা জাপানি ছবিতে আমেরিকান সোলজারের বীরত্ব দেখিনি। এখানেই একজন পরিচালকের দায়বদ্ধতা – তার সমাজের প্রতি, তার ভাষার প্রতি, তার সংস্কৃতির প্রতি। আর এখানেই ফারুকী ব্যর্থ।

ঘটনা মনকে যতই নাড়া দিক, সব ঘটনা নিয়ে ছবি বানানো যায় না, বানাতেও নেই। ফারুকী কি বিষয়টা জানেন না? জানেন। উনি জেনে বুঝেই তরুণদের জন্য ডুব বানিয়েছেন, তরুণদেরই প্রিয় মানুষটার জীবনের একমাত্র মন্দ দিকটা নিয়ে। বর্তমানের বাংলা সাহিত্যের সব চেয়ে জনপ্রিয় ও শক্তিশালী লেখকের সাহিত্যকর্মকে যেখানে আমাদের বিশ্ব দরবারে তুলে ধরবার কথা, সেখানে তা না করে আমরা উনার কন্যার বান্ধবীকে বিয়ে করার খবরটা সবার কাছে তুলে ধরলাম? জয়তু ফারুকী!

আরেকটি কথা। ডুব ছবিটি পিতা ও কন্যার মনোবেদনার ছবি। কিন্তু আমার কেবলই মনে হয়, আজ যদি ফারুকীর স্ত্রী, তিশার বয়স পঞ্চাশের কম-বেশি হতো, তা হলে ছবিটা হয়ত একজন স্বামী ও তার স্ত্রীর হতো, যে স্ত্রী তার কন্যার বান্ধবীর কাছে নিজের রাজা ও রাজ্য দুই হারিয়েছেন।

 

দ্র: লেখাটি অন্য একটি ব্লগেও প্রকাশিত হয়েছে।