ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

“উদোম শরীরে নেমে আসে রাজপথে, বুকে-পিঠে
রৌদ্রের অক্ষরে লেখা অনন্য শ্লোগান,
বীরের মুদ্রায় হাঁটে মিছিলের পুরোভাগে এবং হঠাৎ
শহরে টহলদার ঝাঁক ঝাঁক বন্দুকের সীসা
নূর হোসেনের বুক নয়, যেন বাংলাদেশের হৃদয়
ফুটো করে দেয়; বাংলাদেশ
বনপোড়া হরিণীর মতো আর্তনাদ করে, তার
বুক থেকে অবিরল রক্ত ঝরতে থাকে, ঝরতে থাকে।”-শামসুর রাহমান

১০ নভেম্বরের সেই পিচঢালা রাজপথের রক্ত আজ শুকিয়ে গেছে ঠিকই কিন্তু কোটি মানুষের বাংলার যে ক্ষত ক্ষতবিক্ষত করেছিল বাংলার মানুষের হ্রদয় তা কি আজ পর্যন্ত আমরা শুকাতে পেরেছি? না, পারিনি। আজও মানুষ অধিকার থেকে বঞ্চিত, আজও মানুষ শকুনের ভয়ে থরথর করে, আজও মানুষ দুমুঠো ভাতের জন্য নিজের সন্তান বিক্রি করে, আজও মানুষ গণতন্ত্রের জন্য রাজপথে মিছিল করে। কি পেরেছি আমরা? আমরা পেরেছি লাখো শহীদের রক্তে পাওয়া স্বাধীনতাকে ভূলে যেতে , পেরেছি শহীদের রক্তের সাথে বেইমানি করতে,ইতিহাস বিকৃত করতে, পেরেছি শহীদ নূর হোসেন যে চেতনায় নিজের জীবন বিলিয়ে দিলেন তাকে ভুলে যেতে; অবমূল্যায়ন করতে, পেরেছি সেই জিরো স্কোয়ারের একটা নাম দিতে। হ্যাঁ, বলতে পারেন আমরা তো গণতান্ত্রিক,এদেশে এখনো কিছু মানুষ আছে যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালন করে,গণতান্ত্রিক রাজনীতি করে আবার বেশ কয়েক বার সরকার বদলও করেছি আমরা গণতান্ত্রিকভাবে। হয়তো দেশে বিদেশে ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছে গণতন্ত্রের জন্য। কিন্তু যে তন্ত্র সাধারণের কথা বলে তাদের সাথে কথা বলে দেখুন তাদের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন কতটুকু। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সাথে কথা বলছিলাম, তিনি তার মনের কথা এভাবেই বুঝাতে চেষ্টা করছিলেন আমাকে। আমি তখনই সবচেয়ে বেশি ব্যথিত হয়েছি যখন তিনি একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বললেন আমাদের জাতীয় নেতা বঙ্গবন্ধুকে আমরা আজও জাতীয় করতে পারিনি। তিনি এখন দলীয় এবং দলীয় পুঁজি। তাকে ঘিরে চলছে জমজমাট ব্যবসা। আর গণতন্ত্র সেতো এখন ধারালো, ভয়ঙ্কর অস্ত্র বিশেষ। জনগনের অধিকার হরণের এক মোক্ষম হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে গণতন্ত্র। আগে কোন স্বৈরাচার শাসক হলে তার অপকর্মের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। আমরা দেখতে পেতাম । প্রতিবাদের স্পষ্ট ভাষা ছিল। যেমন ৯০ এর অভ্যুত্থান আমরা দেখেছি। কিন্তু আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করি যেখানে কে শাসক, কে শোষক তা অতি অস্পষ্ট ও বিৎঘুটে। এ সমাজে মালিক শ্রমিক সম্পর্কের দিকে খেয়াল রাখলেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। আজ শ্রমিককে দেখবেন অক্লান্ত কিন্তু তার অধিকার আদায়ে অপারগ। কারণ সে যে কম্পানিতে শ্রমিক হয়তো সে নিজেও তার শেয়ার কিনেছে। জটিল করে ফেললাম হয়তো হিসাব কিতাব। কিন্তু এটাই বাস্তবতা । আর এই জটিলতাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে এক শ্রেণির লোলুপ হিংস্র পাষণ্ডরা। তারা শুধু রাজনৈতিক জীব তা কিন্তু নয়। তাদের বেশিভাগ ব্যবসায়িক জীব। আমরা যারা সাধারণ মানুষ তারা আজ নিরুপায়। না পারি রাজপথে আন্দোলন করতে না পারি সইতে। এ জটিল দুর্দশা আমাদের আর কত দিন থাকবে আল্লাহই ভাল জানেন। তবে আমাদের অবশ্যই সোচ্চার হতে হবে । মুক্তমনা হতে হবে। চিন্তাকে কোন নির্দিষ্ট দর্শনে আকড়ে ধরে থাকার সময় এটা নয়। এ সময় যে কতটা কণ্টকাকীর্ণ সবাই অনুধাবন করতে পারেন কিনা জানিনা। আমাদের এই যুগের যারাই হীনমনা থাকবে তাদের ভবিষ্যৎ আমার এই ক্ষুদ্র চোখে ধরা পরে না।

আজ সেই ঐতিহাসিক শহীদ নূর হোসেন দিবস। এ দিবসের চেতনা সকলের অন্তরে লালিত হোক এ আমার আকাঙ্ক্ষা। এ জন্য সেই সাহসী বীর যুবকের সম্পর্কে কিছু তথ্য সকলের কাছে শেয়ার করছি।

শহীদ নূর হোসেনের জন্ম ১৯৬১ সালে ঢাকার নারিন্দায়।পৈত্রিক নিবাস পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার ঝটিবুনিয়া গ্রামে। স্বাধীনতার পর থেকে তাদের পরিবার ঢাকার বনগ্রামে রোডের ৭৯/১ নং বাড়িতে থাকতেন।প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন বনগ্রামের রাধাসুন্দরী প্রাইমেরী স্কুল থেকে। ঢাকার গ্রাজুয়েট হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করেন। পরে মোটর ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে কর্মজীবনে পদার্পণ করেণ। তিনি বনগ্রাম শাখার আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ছিলেন বলে জানা যায়। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর জোটবদ্ধ বিরোধী রাজনৈতিক দল সমুহ ‘ঢাকা অবরোধ কর্মসূচী’ গ্রহণ করে। এই কর্মসূচীর লক্ষ ছিল স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পদত্যাগ এবং তত্তাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি আদায়। সেদিন শহীদ নূর হোসেন প্রতিবাদ জানানোর ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছিলেন । তিনি গায়ের জামা খুলে বুকে ও পিঠে সাদা রং দিয়ে লিখেছিলেন ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক : গণতন্ত্র মুক্তি পাক ‘। গণতন্ত্রের এই নির্ভীক সৈনিককে স্বৈরশাসকের পুলিশ বাহিনীকে চিনতে একটুকুও বিলম্ব হয়নি। নির্মম পুলিশের গুলিতে জিপিও-র সামনে জিরো পয়েন্টে গুলিবদ্ধ হয়ে নিহত হন এই জাতীয় বীর।