ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

বর্তমান পৃথিবীতে মায়ানমার একটি ভয়ংকর অধ্যায়। পৃথিবীর ইতিহাসে বিগত সময়ে বিভিন্ন দেশে সংগঠিত সব গণহত্যার ভয়াবহতাকে পেরিয়ে গিয়ে নাম্বার ওয়ান অবস্থানে আছে মায়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে চলমান গণহত্যা ও সহিংসতা।

এরই প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার ইন্দোনেশিয়ার নতুন রাষ্ট্রদূত রিনা প্রিথিয়াসমিয়ারসি সোয়েমারনো হঠাৎই বাংলাদেশে আসেন। তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশে থাকা মিয়ানমারের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।

ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিবেশী মিয়ানমারের এই নাগরিকদের মানবিক কারণে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের বাড়তি দায়িত্ব বাংলাদেশের জন্য একটি বড় বোঝা বলেও উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। মানবিক কারণে মিয়ানমারের বিপুল সংখ্যক নাগরিককে কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে স্থান দেওয়ার প্রশংসা করে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘বাংলাদেশ সঠিক কাজই করেছে।’

হ্যাঁ, বাংলাদেশ মানবতাবাদে নোবেল পেতে পারে। একটি দেশ নোবেল পেলে তা হবে ইতিহাসের বিবর্তন। নতুন ইতিহাস।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদকে টেলিফোন করে তুরস্ক ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান বন্ধুপ্রতীম সম্পর্ক বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনি বর্তমান মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বিরাজমান পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর চলমান নিপীড়ন ও মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এরদোয়ান এ যাবতকালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সহায়তায় এবং চলমান সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপসমূহের প্রশংসা করেন এবং বাংলাদেশের প্রতি তুরস্কের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।

তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুরস্ক কর্তৃক এতদ্বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ সম্পর্কে অবহিত করেন। রোহিঙ্গাবিষয়ক সমস্যাটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামের আলোচনায় উপস্থাপনে তুরস্কের প্রয়াস অব্যাহত থাকবে বলেও আশ্বাস দেন।

এছাড়াও টেলিফোনে তুরস্কের  প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির জন্য তুরস্কের জনগণের পক্ষ থেকে আন্তরিক সমবেদনাও জ্ঞাপন করেন। যা বাংলাদেশের জন্য বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ এর আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় বাংলাদেশের সাথে তুরষ্কের আচরন সন্তোষজনক ছিল না। এই প্রেক্ষাপট রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিরাট এক সাপোর্ট বলে মনে হচ্ছে।

কারণ এই দূর্যোগময় পরিস্থিতিতে সারাবিশ্বে ইন্দোনেশিয়া এবং তুরষ্ক নিজেরা রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করে গেছেন। বাংলাদেশ যে রোহিঙ্গাদের ভালো চায় এবং তাদের জন্য যে একাত্মপ্রাণ তা বুঝতে হবে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যত দেখা যাচ্ছে।

রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে মুখ খুলেছেন নোবেল বিজয়ী পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই। একই সঙ্গে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর অমানবিক নিপীড়নের ঘটনায় শান্তিতে নোবেল জয়ী মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি কে নিন্দা জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন মালালা। সাম্প্রতিক সহিংসতায় সূচির নিন্দা জানানোর অপেক্ষায় আছেন বলেও জানান তিনি।

কিন্তু সুচি মায়ানমারে কোন সহিংসতা হচ্ছে না বলে দাবী করছেন। যার সাহায্যে তিনি এই প্রমাণ করছেন যে তিনিই আসলে গণহত্যাকে সমর্থন করছেন। যা পৃথিবীর কোন মানুষ কামনা করে না।

আমাদের বরপুত্র ড. মুহাম্মদ ইউনূসও বিবৃতি দিয়েছেন।

সারাবিশ্বের মানুষ নিন্দা জানাচ্ছে বিক্ষোভ সমাবেশ করছে। শুধু তাই নয় বাংলাদেশে বেসরকারী লোকজনও মানববন্ধন করে যাচ্ছে। মায়ানমার সেনাবাহিনীর এই হেন কর্মে সারা বিশ্বে কমবেশী সবাই সরব। তাতে শুধু লাশের সংখ্যা বাড়ছে, সংখ্যা বাড়ছে ধর্ষিতা নারীরও। বাড়ছে দুঃখ কষ্ট যাতনা দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা।

বাংলাদেশের সাথে এই রোহিঙ্গা সমস্যা ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। যতো বারই জাতিগত দাঙ্গা চরমে কাজে ওকাজে ছলচাতুরি করে মায়ানমার সরকার প্রতিবার মায়ানমার থেকে নির্যাতন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে। আর বেঁচে থাকার তাগিদে এরা বিভিন্ন রকমের অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে।

সারাবিশ্বে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে বাংলাদেশের প্রশংসাতে পঞ্চমুখ। আর তার ফাঁকে এবারের বিপর্যয়েও ১২-১৩ দিনে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের সংখ্যা তিনলাখ পেরিয়ে গেছে।

আরো দু’লাখের মতো অপেক্ষায় আছে। সকলে কেবল বাংলাদেশে আবাসন দেয়ার কথা ভাবছে। আসলে এটি কি সমস্যার সমাধান কি না? বাংলাদেশে যদি আরো দশলক্ষ রহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে তাহলেও এই সমস্যার সমাধান হবার নয়। এর জন্য পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের জোরালো ভূমিকার অবশ্যই প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিন্তু পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র চায় না। চলছে ভারত-চীন-আর যুক্তরাষ্ট্রে ত্রিমুখী কূটনীতি। যার যাতাকলে পড়ে বাংলাদেশ আজ নিষ্পেষিত হতে যাচ্ছে। সে তুলনায় ভারতে মাত্র চল্লিশ হাজার রোহিঙ্গা। তারা তা-ও বের করে দেবার চিন্তা ভাবনায় আছে। চীন নিচ্ছে না। কোন পাশ্ববর্তী দেশ এই বোঝা নিতে চাচ্ছে না। কেবল বাংলাদেশকে নিতে বলা হচ্ছে। যা উদ্ভেগজনক।

—-এই সকল চিন্তা আমাদের ভাবনায় ফেলে দেয় অবশ্যই।

কিন্তু ভারত নিরব ও রহস্যময় ভূমিকা পালন করছে আর সেখানকার নেতৃবৃন্দ মায়ানমারকেই সাপোর্ট করে যাচ্ছে। আবার সবচেয়ে বড় এই মানবিক বিপর্যয়ে ভারতের ও বাংলাদেশের সুশীল সমাজের বড়  অংশটাই নিশ্চুপ আছে । তেমন কাউকে দেখা যাচ্ছে না রোহিঙ্গাদের উপর চরম নির্যাতন তথা গণহত্যা ও গণধর্ষণ নিয়ে কথা বলতে।

রোহিঙ্গা বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানা জরুরী। বাংলাদেশে প্রতিটি রোহিঙ্গাকে গুনেগুনে প্রবেশ করাতে হবে। যাতে করে একটা নিয়ন্ত্রণ থাকে তা না হলে সমস্যা বাড়বে বৈ কমবে না।

রোহিঙ্গাদের উপর যে অমানবিক নির্যাতন চলছে, এমতাবস্থায় দ্রুত আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘসহ প্রভাবশালী দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মায়ানমার সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা জরুরী।

রাখাইনের লাখ লাখ অসহায় মানুষকে বাঁচাতে এবং তাদের অধিকার রক্ষায় এটিই এখন একমাত্র পথ। আবার বাংলাদেশেকে ভবিষ্যত বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতেও চাই আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ।

এই রাখাইন অঞ্চলে লুকিয়ে থাকা তেল-গ্যাস তথা প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের কোন বিষয় থাকলে তার জন্য যদি এই অপকান্ড ঘটে থাকে তবে তিনশক্তি ভারত চীন যুক্তরাষ্ট্রের নির্মমতাই দায়ী হবে। কারণ চীনের লক্ষ হবে মায়ানমারকে সাপোর্ট দিয়ে বলে কয়ে সব হস্তগত করা। ভারত বলবে, আমাকে না দিয়ে কোথায় যাও? যুক্তরাষ্ট্র বলবে- আমি বিশ্বমোড়ল আমাকে বকরা না দিয়াই কাজ হবে না। সমস্যা জিইয়ে রাখতে হবে।

ফলে তারা কখনো সমঝতায় আসতে পারবে না। মায়ানমারের ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নিতে তারা ব্যর্থ হবে। ফলে সাধারণ মানুষের অবস্থা করুন হয়ে যাবে।

এই হতাহত বিপুলসংখ্যককে দেখে যদি মন গলে পাষাণের। কিন্তু সাথে যেনো এদের মনও গলে। রাখাইনদের আদি বসতভূমি ফিরিয়ে দিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশ বাঁচবে।

মনে রাখতে হবে এই ইস্যু সর্বজনীন। দলমত নির্বিশেষে এই ইস্যুর জন্যই কাজ করতে হবে। রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু জনবল, যার চাপ কমলে বাংলাদেশ বাঁচবে। অতিদ্রুত এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাক বাংলাদেশ।

লেখকঃ কবি ও প্রাবন্ধিক