ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

মাত্রই অফিসে গিয়ে বসেছি- আমার এক সিনিয়র কলিগ আমাকে আদর করে নানা বলে ডাকেন। তিনি বললেন- নানা ফুলের দৌড় চলতাছে দেখছইন? তাই নাকি নানা আচ্ছা ঠিক আছে। দেখছি। পরে দেখলাম ব্যাপার আসলে ওখানে নয়- অন্যখানে। দু’মিনিট পরেই একজন এলো, আরে ভাই নজরুল ভার্সিটিতে ভিসি স্যার জয়েন করছেন আমরা ফুল দিয়ে আসলাম আপনি যাননি? আমি থতমত খেয়ে গেলাম। আমি তার কোন জবাব দিলাম না। আমি জানি ফুল দিয়ে আসে মৃত মানুষদের কবরে। আর  ফুল দিয়ে বরণ করে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বা জনপ্রতিনিধি বা গুনিজনদের। নবনিযুক্ত মাননীয় ভিসি সাহেব জনাব এ এইচ এম মোস্তাফিজুর রহমান নিঃসন্দেহে একজন গুনীমানুষ তাতে কোন সন্দেহ নেই।

mustafizur

অধ্যাপক এ এইচ এম মোস্তাফিজুর রহমান; ফেইসবুক থেকে নেওয়া ছবি

তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। কিন্তু তাতে তো তিনি তার ছাত্রদের দ্বারা কেবল ফুলেল বরিত হবার কথা। ভার্সিটি স্টাফ বা কর্মচারীগণ কর্তৃক বরিত হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দেখা গেলো তিনি শুধু তাদের দ্বারাই নন একটি বিশেষ শ্রেণিদ্বারাও ফুলেলাচ্ছাদিত হয়েছেন ও গর্বে গর্বিত  হয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন তা হবে এবং তিনিই বা কেন তা গ্রহণ করবেন- যেখানে তিনি জানেন আগের দু’জন ভিসির কথা।

আর এ নিয়েই আমার সামন্য কথা। আর এই বিশেষ শ্রেণিটি হলো বিগত দুই ভিসি একজন মোহিত উল আলম, অন্যজন ভারপ্রাপ্ত ভিসি কোষাধ্যক্ষ এ এম এম শামসুর রহমান সাহেবের সময়কালে যারা স্তাবক উপাধি পেয়েছিলেন। আজ তারাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিছু পাবার আশায় একশ টাকার ফুল খরচ করে ভিসি সাহেবের সাথে পরিচিত হয়ে আনন্দে আর উৎফুল্লে গদ্গদ হয়েছেন। মাননীয় ভিসি সাহেবও চরমানন্দে হেসে কুটি কুটি হয়েছেন, কুটুমদের সামান্য এই আপ্যায়নে। হতে পারে এটি তার বদান্যতা। তা হলেই মঙ্গল। মনে পড়ে বিগত দুর্নীতি সফল ভিসি জনাব মোহিত উল আলমও প্রথমদিন জনপ্রতিনিধিদের মতন তিনিও খুব করে বরিত হয়েছিলেন।

যাক মূল কথায় আসি। বিশ্ববিদ্যালয়খানি বর্তমানে ত্রিশালের জন্য গোল্ডেন প্লেজ। কোটিকোটি টাকার কাজ হচ্ছে- নিয়োগ বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য আছে। আর বিগত বছরগুলোতে এ কাজগুলোর বাণিজ্যই হয়েছে। ভর্তির ব্যাপারে স্বচ্ছ ছিলেননা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ভর্তি বাণিজ্যকে সামনে রেখে ছাত্র বয়সেই অনেক নেতা আজ কোটিপতি হয়েগেছেন। যা একজন সাধারণ ছাত্র দ্বারা কোনদিন  সম্ভব ছিলো না। আর সেই এতদ গোল্ডের কারণেই সকলে এত আহ্লাদিত অপেক্ষায়িত লালায়িত। আর সে কারণেই প্রধানকে এত ফুলেল বরণ। সুদুর ঢাকা থেকে আগত একটি গ্রুপও যেভাবে উনাকে বরণ করে নিলেন আর উনার কাছ থেকে যেভাবে ফের আপ্যায়িত হলেন তা অকল্পনীয়। আর উনি দু ’একজনের ব্যাপারে যে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন তা ইতিহাস হয়ে থাকবে।

মোহিত উল আলমও বেশ মানুষ ছিলেন, প্রথমে কেউ ভাবতেই পারেননি তিনি এমন হবেন। একজন সুসাহিত্যিক এত নিচে নামবেন তা কল্পনারও বাইরে ছিলো। নিয়োগ বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে অংশ বাণিজ্য- কি তিনি করেননি?  বিভিন্ন পত্রপত্রিকা তথা বিশেষকরে ত্রিশাল বার্তা পড়লেই তা বুঝা যায়। উনার এহেন সুন্দর চেহারার সাথে তার কাজও যে সুন্দর ছিলো তা কিন্তু নয়। সুন্দর হলেই  মানুষের মন পবিত্র হয় না। টাকা এমন এক জিনিস যার জন্য সকলেই নতজানু। পা টেপা থেকে ঘৃন্যকর কাজ থেকে খুন পর্যন্ত করতে পারে।

বিগত ভিসিদ্বয় সে নৈতিক বিপর্যয়েরই স্বীকার হয়েছিলেন। জন্মলগ্নে সবাই ভেবেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়টি হবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তা কিন্ত হয়নি। ত্রিশালবার্তা পত্রিকার মাধ্যমে ‘ত্রিশালে নজরুলের নামে বিশ্ববিদ্যালয় চাই দাবী” উত্থাপিত হলে ৯৪ -৯৫ সনের দিকে প্রতিষ্ঠালগ্নে  দেখেছি সুসাহিত্যিক কবি গবেষক প্রিয় ড. আশরাফ সিদ্দিকী সাহেবের প্রাণপ্রতিম পরিশ্রম-আমি তখন ক্লাস এইটের ছাত্র। উনি এসেছেন শুনলেই প্রিয় লেখককে দৌড়ে স্কুল পালিয়ে দেখতে যেতাম। কারণ আমিও লিখতাম। তখন এই মফস্বলে ঢাকা থেকে বড় লেখকদের মধ্যে তিনিই কেবল আসতেন যাকে দেখার জন্য আমি উদগ্রীব থাকতাম। সে অনেক কথা। পরে বলবো একদিন। সিদ্দিকী স্যার যে পরিশ্রম করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তা অকল্পনীয়। অথচ আরেকজন সুসাহিত্যিক মোহিত উল আলম, উনি তার মান রাখতে পারেননি। যেহেতু  তার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠেছে তিনি তা সামান্য হলেও করেছেন। তা না হলে এই রব উঠতো না। যা রটে তা কিছু হলেও ঘটে। সাহসের সহিত তিনিও রুখে  দাঁড়াতেন তার বিরুদ্ধে এইসব রটনার বিরুদ্ধে। থাক সেসব নাই বললাম। ত্রিশালবার্তা ১২ নভেম্বর ২০১৭ তারিখের পত্রিকা পড়লেই তা বোঝা যাবে আশা করছি।

মোহিত উল আলম যখন ভিসি ছিলেন সারা ময়মনসিংহ জুড়ে জন্মদিনের অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে সকল অনুষ্ঠানে তাকে অতিথি করা হতো। তিনি ছিলেন নয়নের মনি। বর্তমান ভিসি সাহেবের উদ্দ্যেশ্য করে এই এলিজি যে চেয়ে দেখুন বিপদে কেউ কারও পাশে থাকে না। উনার বিরুদ্ধে দুনীতির অভিযোগ অথচ উনার পাশে উনার পক্ষ নিয়ে লেখার কেউ নেই। একসময় উনাকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন করেছিলেন ত্রিশালের একজন বড় সাংবাদিক, অথচ এখন তাকেও পাশে দেখছি না, যা দুঃখজনক। সুদূর ঢাকা থেকে আগত বিশেষ গ্রুপের সদস্যরাও একসময় উনার প্রিয় ছিলেন কেউ এখন তার পাশে নেই। ময়মনসিংহের কথিত সেই বরেণ্য কবিসাহিত্যিকবৃন্দও উনার পাশে নাই-যারা উনার জন্মদিনে তেলের ডিপো বসিয়ে দিতেন-গুণকীর্তন করতে করতে মুখে ফেনা উঠিয়ে ফেলতেন। অবশ্য আমিও কয়েকবার মোহিত উল আলম সাহেবের  জন্মদিনে আমন্ত্রিত কবিদের সাথে ময়মনসিংহ থেকে এসেছিলাম। যা ছিলো রীতিমতো হাস্যকর।

শোনা গেছে ভারপ্রাপ্ত ভিসি জনাব এ এম এম  শামসুর রহমানকেও উনার  পক্ষে  অস্থিরতার সুযোগে পক্ষপাতিত্ব করে সুযোগে কিছু ছিনিয়েছেন সেই গ্রুপ-চেয়ারম্যান। এখন তার  পাশে নেই।  অবশ্য চোর-বাটপার-চিটারের মুখের রসে সহজেই গা ভেজানো যায় তবে শুকানো কঠিন হয়।  ভিসি সাহেবও বিদেয় হয়েছেন। বিতর্কিত লোক ভিসি না হওয়ায় সকলেই স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। যদিও কারো কারো মুখে জৈষ্ঠ্যের খড় রোদের মতো কাঠফাটা জমিনে চিড় ধরেছে।

সুসময়ে অনেক বন্ধু হয়। আপনি বেশি নয় দুমাস সুযোগ দিলে উনারা আপনাকে মাথায় তুলে নাচবেন। আর যদি দুমাস পরে তাদের সাথে  মোহাব্বত উঠিয়ে নেন দেখবেন তারা আপনাকে মাথা থেকে নামিয়ে আছাড় দিতে কার্পন্য করবে না।

মহাশয়, আপনি বাংলাদেশের একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের অধ্যাপক থেকে একটা পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাই বেশি পানিতে পড়ে যাওয়া কম পানির  মাছের মতো অবস্থা আপনার হতেই পারে। মানুষ বলে কথা। শুরুতেই আপনাকে সাবধান হতে হবে। নিয়োগ বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, নৈতিকতা বাণিজ্য, উন্নয়নে অংশীদার বাণিজ্য- সব প্রভাব মুক্ত হতে হবে। আপনার কাছে এই-ই সুযোগ এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি মডেল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার। হয়তো আপনি তাদের মত হবেন না। আপনার প্রতি ত্রিশালবাসীসহ সারা দেশবাসী তাই কামনা করে। আপনি সকল বিতর্কের উর্ধ্বে থাকবেন এই প্রত্যাশা। কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় অমর হোক। তাতে যারা এর পেছনে শ্রম দিয়েছেন, জমি দিয়েছেন যারা এর শুভাকাংখী  তারা সকলেই শান্তি পাবেন।

অবশেষে নবনিযুক্ত নতুন ভিসি সাহেব জনাব এ এইচ এম মোস্তাফিজুর রহমানকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি ও আপনার মঙ্গল কামনা করছি। যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য মঙ্গলজনক কাজ করে আপনি আপনার সময়টুকুর সবটুকু শেষ করতে পারেন। মাননীয় সরকার মহোদয় যে আশা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আপনাকে নিয়োগ দিয়ে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন আপনি সে মান  রাখতে সচেষ্ট হবেন। আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর বাহিরে যে জঞ্জাল আছে তা পরিষ্কারে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে সোনার ছাত্রদের সোনালী ভবিষ্যত নিরুপনে আপনার কৃতিত্ব দেখাতে সচেষ্ট হোন সে কামনাই করছি। মঙ্গলময় হোক আপনার জীবন।

(কবি ও প্রাবন্ধিক)