ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

প্রিয় জাফর ইকবাল স্যারের উপর হামলা আসলে আমাদের জানান দিয়ে যায়- ওঁরা এখনো আছে, তবে ওঁৎ পেতে আছে, মরেনি। দেশের গোটা কতক মেধা যখন সাহিত্য-সংষ্কৃতি ও মেধা-মননের কাজে ব্যস্ত তখন তাকে ধ্বংস করাটা নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করেন যারা, সেই দেশবিরোধী চক্র এদেশের ক্ষতি বিনে কখনো উপকার করেছে কিনা তা ভাবনার বিষয়।

 

 

মুহম্মদ জাফর ইকবাল নিজের যোগ্যতায় মানুষের মনে যে স্থান করে নিয়েছেন তা মুছে ফেলা যাবে না। দেশের সামগ্রিক মানুষ যখন তৈল মর্দনের কাজে ব্যস্ত, তখন একমাত্র তিনিই মাঝে মাঝে সঠিক কথাটি বলে নীতি ও নৈতিকতার বিষয়ে আপোসহীন থেকে যান।জাফর ইকবাল, হুমায়ূন আজাদ এরা সব সময়ে আসে না। আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত মেধারই কিছু অংশ এদের মধ্যে আছে। ইনারাও জ্ঞান বিতরণ করেন। তবে সে জ্ঞান জীবন জ্ঞান, যা আপমর সকলের জন্য প্রযোজ্য। তার লেখা পড়ে হাজার হাজার ছেলে-মেয়ে উপকৃত হচ্ছে- এটাই কি অন্যায়? এ কারণেই কি তার উপর বারবার হামলা হয়। কেন এই অপচেষ্টা? আমাদের রুখে দিতে হবে সেসব অপচেষ্টা। আর হামলা কেনই বা হবে না? যে দেশে এক বর্গ কিলোমিটারে কয়েটি করে মাদ্রাসা থাকে, সেখানে যেটা হয়েছে সেটা তো বেশিকিছু না। এখানে মৌলবাদ বার বার উস্কে উঠবে এটাই তো স্বাভাবিক।

যেকোন দেশের শিক্ষা পদ্ধতির লাগাম ধরা প্রয়োজন। সম্ভবত এবতেদায়ী শিক্ষার পরে অন্যান্য সকল মাদ্রাসার শিক্ষা লাগামহীন। এখানে যেসব শিক্ষা দেয়া হয়- তা মানের আওতায় আনা জরুরি। প্রতি বছরে যে হারে মাদ্রাসা বাড়ছে তারও হিসেব রাখা প্রয়োজন।আমি মনে করি এভাবে বিক্ষিপ্ত পার্সোনাল মাদ্রাসা নয়, হোক অনেকগুলো মাদ্রাসা মিলে একটি মাদ্রাসা। তাতে করে সংখ্যা যেমন কমবে তেমনি শিক্ষার মানও বাড়বে। ফলে মাদ্রাসাকে কেউ আর জঙ্গি আস্তানা বা ট্রেনিং ক্যাম্প বলতে পারবে না।

এক বাড়িতে একজন মাওলানা হলে যে তাকেই একটা মাদ্রাসা করতে হবে এমনটা কিন্তু না, কিন্তু তা-ই হচ্ছে। মাদ্রাসাতে পড়ে স্রেফ কিঞ্চিৎ অংশই মনে হয় দেশের কাজে আসছে। কারণ তারা ঐ আররি পড়া ছাড়া অন্য কোন পড়া পড়ে না। ফলে ভিন্ন চিন্তা ও অপচিন্তা মস্তিষ্কে বিরাজ করে। তারা যা বুঝছে তা আর কারও সাথে মিলছে না। কারণ তারা ঐ নির্দিষ্ট শ্রেণি ছাড়া অন্য কারো সাথে মেলামেশা করে না। মাথায় টুপি পরিহিত মানুষ ছাড়াও যে আরো মানুষ আছে তা তারা ভুলেই যান।

তাদের মতে, মুসলমান ছাড়া কেউ এদেশে থাকতে পারবে না। যেমন ভারতে হিন্দুরা মনে করেন তাদের দেশে কেবল হিন্দুরা থাকবে, মুসলমান নয়। যে কারণে বারবার এই হানাহানি খুনোখুনির ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। ব্রেন ওয়াসকৃত মানুষগুলো লেজ উঁচিয়ে মেধা ধ্বংসের কাজে নেমে পড়ছে। তারা কেবল ভাবছে, তারাই সঠিক, অন্যেরা ভুল। আসলে উনারা সঠিক নাকি অন্যেরা ভুল, নাকি উনারা ভুল অন্যেরা সঠিক- তা তাদের ভাবতে হবে। যারা প্রকৃতই আলেম সাহেব বা আল্লাহ্ওয়ালা তারা কখনোই হানাহানির পক্ষে নয়। তারা কখনোই হানাহানি খুনোখুনিকে সাপোর্ট করেন না। আসলে হানাহানি খুনোখুনি কেউই পছন্দ করেন না।

জাফর স্যার একজন শিশুসাহিত্যিক ও বৈজ্ঞানিক লেখক। তিনি একজন নির্ভরযোগ্য লোক, যার বই অনায়াসে আপনার আমার সন্তানকে পড়তে দিতে পারি। আচ্ছা তাকে যে নাস্তিক বলা হয়- কেউ কি দেখাতে পারবেন যে তার শিশুতোষ কোন বইয়ে কোন প্রকার নাস্তিকতা আছে? না, আমি অন্তত পাইনি। অহেতুক তাকে নিয়ে উল্টো বলে পরিবেশ ঘোলা করতে চাইছে কেউ কেউ।

তিনি সেই একজন, যাকে আঘাত করে কোটি শিশুর আনন্দকে মাটিতে মিশিয়ে দেয়া হয়েছ। তাকে আঘাত করে আঘাত করা হয়েছে মূলত বাংলাদেশকে। তিনি অপঘাতে মারা গেলে এমন লেখক আর কোথায় পাবো আমরা? উনার মতো এমন সহজ স্বভাবের মানুষ খুব কমই আছে। এত সহজে তিনি মানুষের সাথে মিশে যেতে পারেন, যা সবার দ্বারা সম্ভব না। এমন জ্ঞানীগুনী মানুষকে যারা আঘাত করেছে তাদের শুভবুদ্ধি উদয় হওয়া উচিত। তাদের উচিত দেশকে মেধাশূন্য করার এজেন্ডা থেকে বেরিয়ে আসা।

এদেশে যারা ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি জানেন, তাদের দমিয়ে রাখা যাবে না। এদেশে প্রয়োজনে হাজার মানুষ রক্ত দেবে, তবু এদেশকে মৌলবাদীদের হাতে যেতে দেবে না। আমরা মুসলমান। আল্লাহ ও রাসূলকে ভালোবাসি। ইসলামী শিক্ষা গ্রহণ করবো, কিন্তু কট্টরপন্থী হবো না। কোন অরাজকতা চাই না। ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষাতেও জ্ঞানার্জন করে দেশ ও দশের মঙ্গল সাধনায় ব্রতী হবো সবাই। আর সে ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে, যার সময় এখনই।

আসুন আমরাও সমস্বরে গেয়ে উঠি- ‘দেশকে আমি ভালোবাসি, তার তুলনা নাই; দেশের মাটি খাঁটি জেনে সুখেরই গান গাই।’