ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন, ভ্রমণ

 

দশ মাস যাবৎ আইভরি কোষ্টে অবস্হান করছি,শুব্রে জলপ্রপাতের কথা শুরু থেকেই বিভিন্ন জনের কাছে শুনে আ্সছি,ওয়াটার ফল এত বিশাল,ব্যপক সুবিস্তিৃত হতে পারে এবং প্রকৃতির সৃষ্টির্ রহস্য এত নান্দনিকতায় ভরপুর থাকতে পারে তা না দেখলে জানা হতনা এবং জীবনে অনেক কিছুই অপূর্ণঃই থেকে যেত।আইভরিকোষ্টে এসে তাই শত বাধা বিপত্তি সত্বেও অন্তত শুব্রে (নাওয়া) জলপ্রপাত টা সবাই দেখার আপ্রাণ চেষ্টা করে।

আইভরিকোষ্টে জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যঃন্ত বর্ষাকাল।এর পর থেকেই শুষ্ক মৌসুম শুরু,শুকনোর সময়ে জলপ্রপাত দেখতে যাওয়ার কোন মানে হয়না। বর্ষাকাল শেষ হওয়ার আগেই তাই সেখানে যাওয়ার তীব্র এক আকাঙ্খা ও বাসনা নিয়ে দিনানিপাত করতেছিলাম।অবশেষে সেই সুয়োগ হাতের নাগায় ধরা দিল। ২৪-২৬ নভেম্বর রাজধানী ইয়ামুসুক্রু থেকে সানপেদ্রো তিন দিনের দুই হাজার কিমি এর অফিসিয়াল টুর আর সাথে সেই মন প্রান আকুল করা বহুল আকাঙ্খিত জলপ্রপাতের শহর নাওয়ার শহর শুব্রেতে কিছুক্ষন থাকার অফিসিয়াল অনুমোদন।

আমাদের যাত্রার আগের দিন সারা রাত বৃষ্টি হয়েছে,পুরো বৃষ্টির সময় জলপ্রপাতের আসল স্বরুপ ফিরে আসে।ভাবলাম এই বুঝি উত্তম ক্ষন,তাই দেরী না করে বেরিয়ে পড়লাম মিশন শুব্রে জলপ্রপাত দর্শঃন, সাথে দশ জন সদস্য আর দুটো গাড়ী একটা পাজেরো অন্যটি মাইক্রোবাস। যাওয়ারসময় তখনো গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল ,ইয়ামুসুক্রু থেকে সিনফ্রা হয়ে ইসিয়া শহর অতিক্রম করে একশত কিমি দক্ষিনে সানপেদ্রোর দিকে সেই শুব্রে শহরের অবস্হান, এটা আইভরিকোষ্টের দক্ষিনের দিকের শহর।

এখানে আসার পথে দুধারে সারি সারি কফি আর কোকার বাগান দেখে যার পরনাই মুগ্ধ হচ্ছিলাম,এত সুন্দর ভাবে প্রকৃতি সাজতে পারে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।আমাদের গাড়ী যাচ্ছে গতিবেগ একশ কিমি এর উপরে এত বড়দেশ রাস্তাঘাট এককথায় দারুন,কমস্পীডে গাড়ী চালানোর উপায় নেই।এই দিকটায় প্রচুর রাবার বাগান ,পাহাড় গুলো দেখতে খুব মনোরম মনে হচিছল।আমরা বেলা সাড়ে এগারোটায় শুব্রে শহরে পৌছলাম। শহরে গিয়ে একজন আইভরিয়ান গাইডকে সাথে নিলাম,কিন্ত সে ইংরেজী কিচ্ছু জানেনা ,জলপ্রপাতের অবস্হান,রাস্তা ইত্যাদি বিষয়ে আমরা আগে থেকেই ফ্রেঞ্চ কিছু বাক্য লিখে নিয়ে এসেছিলাম তা দিয়ে তাকে বুঝিয়ে গাড়ীতে তুলে সুব্রে শহর থেকে জলপ্রপাতের দিকে যেতে থাকলাম।

গাইডের দেখানো মতে আমাদের গাড়ী পাকা রাস্তা ছেড়ে সরু মাটির কাচা রাস্তায় চলতে থাকল,তখন আর বৃষ্টি নেই, বৃষ্টি থাকলে গাড়ী নিয়ে ভিতরে যাওয়া অনেকটা রিস্কি হতো।দুই কিমি এর মত যেয়ে একটা কফি বাগানের পাশে গাড়ী টা কে গাইড থামাতে বলল,ওর কথা মত বুজলাম গাড়ী নিয়ে আর ভিতরে যাওয়া যাবেনা,সামনে ছোট একটা কালভার্টঃ নীচ দিয়ে পানি গড়িয়ে যাচ্ছে,জলপ্রপাত টা্য় যেতে হলে এখান থেকে হেটে যেতে হবে।ওর ইশারায় যা বুজতে পারলাম আরও তিন থেকে সাড়ে তিন কিমি যেতে হবে।

আমাদের পুরো গ্রুপকে দুই ভাগে ভাগ করে একটা গ্রুপকে নিয়ে সরু পথ ধরে যেতে থাকলাম,দুই পাশে দারুন ভাবে সাজানো্ গোছানো কফি বাগান দেখতে পেয়ে মনটা জুড়িয়ে যাচ্ছে,অনেক আগেই এই কফি বাগানের কথা শুনেছি আজ বাস্তবে বোনাস হিসাবে এটাও করে দেখা হয়ে গেল।ছোট্ট ছোট্ট গাছগুলো দেখতে অনেকট চা গাছের মত, প্রায় সবগুলো গাছেই কফি ফল ধরে আছে,দেখতে লম্বা বাঙি ফলের মত,ভিতরের বীজ শুকিয়ে কফি আর চকলেটের কাচামাল বানায় তারা, আর এ কফিই এদেশের প্রধান শস্য।

কিছুদুর যাওয়ার পর ভুট্টার বাগান,কাসাবা ক্ষেত,কলার বাগান দেখতে পেলাম,কিন্ত রাস্তা আইলের মত একেবারে সরু,লোকজন নেই গা ছম ছম করার মত,একটু ভয় ভয়ও লাগতেছিল যদিও আমাদের কাছে এসএমজি পিস্তল ছিল তারপরও অজানা নির্জঃন একটা জায়গা, এটা নাকি পরাজিত প্রেসিডেন্ট বাগবোর এলাকা,পর্যঃটক একেবারেই নেই, ইউ এন এর অফিসার ও অন্যান্য লোকজনই মূলত এখানে আসে ,বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংস গ্রুপের টার্গেট হয়ে এমবুসে পরা বা ইনসিডেন্ট ঘটানো কোন ব্যপারই না। এ সব ভাবনা, দুঃশ্চিন্তা মাথায় ভর করছে আর ভাবছি গাইড আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে বিপদে ফেলবেনা তো ইত্যাদি ইত্যাদি।

আর ঠিক তখন ই পানি পড়ার সো সো শব্দ পেতে থাকলাম।মুহুর্তেই মনের সকল অজানা ভয় দূরীভুত হয়ে আনন্দে নেচে উঠলাম আর উদ্বেলিত হতে থাকলাম। আমাদের দেশে মাধবকুন্ড,হিমছড়ি বা শুভলং জলপ্রপাত অনেকে দেখতে গিয়ে প্রত্যাশিত মাত্রায় না পেয়ে হতাশ হ্রদয়ে ফিরে আসে কিন্ত এখানকার এই জলপ্রপাতের পানি পড়ার শব্দ অনেক দূর থেকে শুনার পর মনে হচ্ছিল তার ব্যপকতা আর বিশালতা, যতই আমরা ভিতরে যাচ্ছিলাম শব্দটা আর তীব্র থেকে তীব্রতর শুনতেছিলাম।

যাই হউক আমরা একেবারে পানি র কাছাকাছি নদীর মত জায়গায় চলে এলাম,কিন্ত সেই পানি পড়ার শব্দ আরও ভিতরে মনে হচ্ছে,শুধু পানির প্রবাহ দেখতে পেয়ে হতাশ হলাম,আর গাইডকে বুঝাতে চাচ্ছিলাম এই নদীটা যেখান থেকে তৈরী হয়েছে ,ব্রহ্মপূত্র যেমন মানস সরোবর থেকে উৎপত্তি হয়েছিল ,সেখানটাই যেতে চাই ও তো বুজতেছিলনা বলল এই সেই জায়গা যেখানটাই আমরা যেতে চাই,মনে মনে রাগ হচ্ছিলাম এত দুর এসে মূল জলপ্রপাত না দেখে চলে যাব কি করে হয়।

হঠাৎ মীরাকেলের মত রোমারিকের দেখা পেলাম,সে এখানকার স্হানীয়, তৌরা জাল ফেলে মাছ ধরতেছিল,আবিদজান কোকোদি ভার্সিটিতে মাস্টার্সঃ পড়ে,ইংরেজী মুটামোটি পারে, যাক তাহলে শেষ রক্ষা ও সহজেই বুঝতে পেলো আমারা গঙা নদী দেখতে আসিনাই ,আমরা হিমালায়ের গঙ্গোত্রী দেখতে এসেছি,এর পর আমাদের দ্বিতীয় মিশন শুরু হলো,সেই ভংঙ্কর কোথাও উচু আবার কোথাও গর্তঃ আকাবাকা, পাথর,আফ্রিকার জঙ্গল না জানি কোন হিংশ্র প্রাণী আক্রমন করে , আরিফ ভাই বলতেছিল অনেকটা বগা লেকের যাওয়ার পর্বঃতারোহীর মত হয়ে গেল আবার ফয়েজ বলতেছিল,মুসা ইব্রাহিমের এভারেস্ট জয়ের মত,কোথাও ভ্রমণে গেলে এর পিছেনে অনেক ঝামেলা ঝন্ত্রনা রিস্কি থাকে যার বহরটা একেবারে ছোট হয়না ।

যাই হউক আমরা সাবধানে পা ফেলতেছিলাম,ডঃ আরিফ তো একটা লাঠিই নিয়ে নিল,হয়তা ভাবী একটু আগে ফোনে বলেছে বোধ হয়,এখানে আবার ক্লিয়ার নেটওয়ার্কঃ আছে তাই আনন্দের মুহুর্তঃ পরিবারের সবাই নিয়ে উপভোগ করার মত ভাল জিনিষ বোধ হয় আর কিছুই নেই এখানে যেহেতু পরিবারের লোকজনকে আনা সম্ভব না তাই দুধের সাধ গুলে মিটিয়ে ফোনে সময় সময় রিপোর্টঃ করা এই আমরা চলে এসেছি ঝর্নার কাছে, শব্দ শুনতে পাচ্ছ? তুমি বিশ্বাস করতে পারবে না এত বড় ঝর্না থাকতে পারে ইত্যাদি ,আমরা এবার সেই ঝরনার শব্দ একদম ক্লিয়ার শুনতে পাচ্ছিলাম ,যতই কাছে যাচ্ছিলাম পানি স্রোতের প্রবাহ ব্যপক ভাবে বাড়তেছিল,আর শব্দ ভয়াভহ রকমভাবে কানে বাজতেছিল ,অবশেষে সেই আকাঙ্খিত শুব্রে জলপ্রপাতের দেখা পেলাম যেখান থেকে এই নদীর উৎপত্তি হযেছে ।

আমরা খুব সাবধানে উচু নিচু পাথর গুলোয় পা ফেলে ফেলে মূল জলপ্রপাতের একেবারে কাছে এসে পৌছলামে।রোমারিক বার বার সাবধান করে দিচ্ছিল পাথর কিন্ত খুব পিচ্ছিল তোমরা সবাই সাবধানে পা ফেলো।উপর থেকে এত সুন্দর পানির প্রবাহ দেখে আনন্দে আর বিস্ময়ে হতবাক হযে গেলাম, অনেক উপর থেকে বিশাল এলাকা জুড়ে আছড়ে পড়ছে পানির স্বচ্ছ ঝর্ণা ধারা,এবং তা পাহাড়ী পাথরের গা বেয়ে নিচে নেমে গিযে বিশাল এক নদী তৈরী করেছে।আশে পাশে কোন পর্যঃটক নেই ,তবে একটু অদূরে বেশ কিছু মাঝি মাছ ধরার কাজে ব্যস্ত।কেউ জাল ফেলে আবার কেউ শীপ ছাড়া বরশী দিয়ে।

আমাদের লোকজন প্রান ভরে প্রকৃতির অবাক বিস্ময় জলপ্রপাতের দৃশ্য উপভোগ করতেছিল,আর বলতেছিল ,জীবন সার্থঃক এত সুন্দর একটা মুহুর্তঃ এভাবে ধরা দিবে ভাবতেই পারিনি।জলপ্রপাত এত প্রশস্ত আর এত ব্যপক হতে পারে তা ধারনাও করতে পারিনি।পানি যখন উপর থেকে পড়তেছিল তখন মনে হচ্ছিল আশে পাশের বেশ কিছু জায়গা নিয়ে যেন বৃষ্টি হচ্ছে।নাযাগ্রা জলপ্রপাত এর কথা শুনেছি আমার মন বলছে আইভরি কোস্টের এই জলপ্রপাত যারা দেখেছে কানাডার সেই জলপ্রপাত বাদে অন্য সবকিছুই তাদের কাছে কোন মূল্যই পাবেনা।বিশুদ্ব এই স্বচ্ছ পানির প্রবাহ দেখে দেহ টাকে ডুবাতে ইচ্ছা করবে যে কারুরই,কিন্ত প্রস্ততি নিয়ে যাওয়া হয়নি আর পানির প্রবাহ এতটাই ব্যপক যে ইংলিশ এনিমেশন মুভির মত ভয়ংকর নীচে পড়ে গেলে অক্কা পাওয়া্ ছাড়া আর গতি নেই।

সুন্দর মুহুর্তঃগুলো শেয়ার করার জন্য বিভিন্ন পোজে ছবি উঠানোই ব্যস্ত সবাই,মাঝে মাঝে সতর্কঃ সংকেত সবাই সাবধান ,পাথর কিণ্ত পিচ্ছিল,আনন্দ যেন বিষাদে পরিণত না হয়।এর পর একে একে উপভো্গ করতে থাকলাম প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্যঃ শুব্রে নাওয় জলপ্রপাত।আইভরিয়ান লোকজন সাধারণত নিজেদের ছবি কাউকে তুলতে দেয়না,কিন্ত এখানে যাদের পেলাম সবাইকে নিয়ে বিভিন্ন পোজে ছবি উঠাতে থাকলাম

এত সুন্দর একটা মনোরম ,দৃষ্টিনন্দন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের আধার কে ছেড়ে যেতে সহজেই কারও মন চাচ্ছেনা,কিন্ত সময় তো দুপুর গড়িয়ে যায়,ক্ষুধায় পেট চো চো,তার উপর সাড়ে তিনশ কিমি পাড়ি দিয়ে সন্ধের পূর্বেই রাজধানী ইয়ামুসুক্রু পৌছার তাড়া । তাই আবার সেই পথ ধরেই আমাদের গাড়ীর কাছটায় কফি বাগানে এসে আগে থেকে রান্না্ করা দুপুরের খাবার পিকনিক মুডে খেয়ে বিকাল তিনটার মধ্যেই রওয়ানা হলাম নীড়ের উদ্দেশ্যে পিছনে রয়ে গেলো শুব্রে নাওয়া জলপ্রপাতের আনন্দময় উপভোগ্য কিছু সুখময় স্মৃতি।

(মুহাম্মদ রেজাউল মাসুদ)