ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

দেশটির নাম আইভরি কোষ্ট, যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে বহু বছর যাবৎ,বছর দশেকের মত হল জাতি সংঘ দেশটির শান্তি রক্ষার দায়িত্ব নেয়। বাংলাদেশের পুলিশ আর্মি বিমান ও নেভি সহ সব মিলে তিন হাজারের মত শান্তিরক্ষী দেশটির স্থিতাবস্থা ও শান্তিরক্ষায় সদা তৎপর রয়েছে।

দিনটি ছিল শনিবার জুনের নয় তারিখ।সকালে ঘুম ভাঙল এএসপি মানসের ডাকাডাকিতে, তখনও পূব আকাশ ফর্সা হয়ে উঠেনি তার চোখ মুখে ভয় আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা স্যার গতকাল আইভরি কোষ্টের
তাই এলাকার পারা নামক জায়গায় নিজার ব্যাটের (নিজার দেশের আর্মি) সাতজন জাতিসংঘের সৈন্য নাকি এমবুসে পড়ে নিহত হয়েছে,সাথে আরও অনেক সিভিলিয়ান হতাহত হয়েছে।এ খবর বাংলাদেশের মিডিয়ায় ফলাও করে প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে স্বজনরা উদ্বিগ্ন আর উৎকণ্ঠায় পরে যায়। যে যার সাথে পারছে যোগাযোগ করছে। আশ্চর্য আমরা কিছুই শুনলাম না এখান থেকে, আর আমাদের স্বজনরা আগেই শুনে টেনশনে পড়ে গেল,আসলে যুদ্ধের মাঠে থাকলে যুদ্ধের ভয়টা তখন আর কাজ করেনা। আমরা ভীত সন্ত্রস্ত না হয়ে পরিবার পরিজনদের আশ্বস্ত করলাম ঘটনাটা আমাদের কর্মস্থল থেকে চারশ কিমি দূরের একটা রিমোট জায়গায় হয়েছে,ওখানে নাইজার নামক দেশের জাতিসংঘের সৈন্যরা প্যাট্রল করার সময় বিচ্ছিন্নতা বাদী সশস্ত্র গ্রুপের হামলায় সাতজন নিহত হন।বাংলাদেশের সৈন্যদের কারও কোন সমস্যা হয়নি তাই আমাদের কোন ভয় নেই ।কিন্ত পরমুহূর্তেই আমাদের উপর যে অপারেশন অর্ডারটা আসল তাতে ভীত সন্ত্রস্ত না হযে পারলাম না।আমাদেরকে বেজ ক্যাম্প ইয়ামুসুক্রু থেকে চারশ কিমি দূরের ঘটনা স্হল আতঙ্ক আর গুজবের শহর “তাই তে” আইনশৃঙ্খলা ও স্থিতাবস্থা রক্ষার জন্য দুই প্লাটুন ফোর্সঃ মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হল এবং তা করতে হবে কালকের মধ্যেই। তোড়জোড় শুরু হল লোক মনোনয়নে,তাবু গাড়ী অস্ত্র গোলাবারুদ ও যাবতীয় লজিস্টিকের সাপোর্টঃ নিয়ে ষাট জনের এক বিশাল বহর নিয়ে বাংলাদেশ যাত্রা করল অজানা ,ভয়, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার শহর তাই ই তে।

তাই তে ঘটানো হলো লাল সবুজের বিপ্লব, যুদ্ধেই যেহেতু চলে এসেছি তখন আর পিছপা হওয়ার তো আর অবকাশ নেই,বাংলাদেশে যদিও আমরা দেশের অভ্যন্তরীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব নিয়োজিত কিন্ত এখানে সেনা নৌ আর পুলিশের কাজ একই আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা্ করা আর যুদ্ধের মাঠে তা মোকাবিলা করা।এখানে আসার পূর্বে জাতিসংঘের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের ব্যপারে এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি সহ আমাদের ট্রেইন আপ করানো হয়েছে।

পরবর্তীতে বাংলাদেশ আর্মির ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের এক প্লাটুন ফোর্সঃ মোতায়েন হল,আসল পাক আর্মির একটা কন্টিনজেন্ট।তাই তে আগে থেকেই মোতায়েন ছিল মরক্কো আর্মির একটা কন্টিনজেন্ট,সা্থে আরও ছিল আফ্রিকান বিভিন্ন দেশের পুলিশ, আর্মি, সিভিলিয়ান ।কিন্ত লাল সবুজের বাংলাদেশের সৈন্যদের ত্যাগ তিতীক্ষা সংগ্রাম ,এবং যাবতীয় কার্যক্রম আর অবদান সবাইকে ছুঁয়ে যায়,স্থানীয় আইভরিয়ানদের মনে রেখাপাত করে।

আসার পর থেকে সাতদিনের মত কিযে দুর্বিসহ দিনগুলি ছিল তা ভাবলেই গা শিউরে উঠে।না ছিল বিদ্যুৎ পানি গ্যাস না ছিল এডমিনিস্ট্রিভ বা মানসিক কোন সহায়তা বা সহযোগিতা, আর জায়গাটা হলো আইভরিয়ান ন্যাশনাল পার্কঃ একেবারে মাঝখানে। ঠিক আফ্রিকান জঙ্গল যাকে বলা হয়।নানা রকম হিংস্র জন্ত জানোয়ারের ভয় বাদ দিলেও মশার ভয় টা ছিল প্রচন্ড রকমের ,কামড় দিলেই নাকি সেরিব্রাল ম্যালেরিয়া।এখানে আসার সাথে সাথে মরক্কো সৈন্যদের প্রস্তুতি দেখে যা বুঝলাম তাতে মনে হল চারদিকে সসস্ত্র সংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে আর আমরা ঠিক যুদ্ধের মাঠে অবস্হান করছি, পরদিন রাতে সিকিউরিটি অফিসার এসে বলে গেল আজ রাত্রে ক্যাম্প আক্রমন হওয়ার কথা আছে,সবাই বুলেট প্রুফ আর অস্ত্র নিযে পজিশনে থাকেন ,এপিসি নিয়ে অনগার্ডঃ থাকতে বলেন আপনাদের সৈন্যদের
হাবিলদার এনামুল বলল স্যার আমরা তো পুলিশের লোক যুদ্ধ করতে তো আসিনি ,সেনাবাহিনী আসুক আমরা কেন মরতে যাব।

এক এনসিও হাউমাউ করে কেদেঁ উঠল আমার সাড়ে চার বছরের মেয়েটাকে বোধহয় আর দেখা হলো না।যাই হউক কোন রকমে সেই দিনের বিনিদ্র রজনী কাটালাম,পরদিন একই মেসেজ চারদিকে একই গুজব সন্ত্রা্সী গ্রুপের বিশাল এক অস্ত্রধারী বহর আমাদের ক্যাম্পের একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছে আজ রাত্রেই নাকি তাই ক্যাম্পে আক্রমণ হবে,মিল অপসের লেঃকঃ বলে গেল এই জায়গাটা যেহেতু উচু তাই ওরা মর্টার শেল দিয়ে আক্রমণ করতে পারে, আপনাদের এপিসি(আরমোরা পার্সোনাল ক্যারিয়ার)নিয়ে প্রথমেই মুভ করবেন,আর ভয়ে কেউ দৌড়াদৌড়ি করবেননা,করলেই আগে মারা যাবেন,এর পর এসএমজি এলএমজি ,রাইফেল তারপর পিস্তল বাহীদের রাখবেন।এরকম ভযে আতঙ্কে একেকটি বিনিদ্র রাত পার করেছি,এরপর পুরো আইভরি কোষ্টে জাতিসংঘের কনসেনট্রেশন তাই কে কেন্দ্র করে মুভ করতে থাকল,পুলিশ কমিশনার ,ফোর্সঃ কমান্ডার, এসআরএসজি থেকে শুরু করে নিউইয়র্কঃ বানকি মুনের প্রতিনিধি সহ বহু ভিআইপি পরিদর্শনে তাই হয়ে উঠল ব্যস্ত নগরী তাই এর পরিস্থিতি আস্তে আস্তে উন্নতি করতে থাকল,বাংলাদেশ পুলিশের উপস্থিতি ভিজিল্যান্স বাড়তে থাকলো,প্যাট্রোলের সংখ্যা দুই থেকে বাড়িয়ে চার পাঁচে উন্নিত করা হলো,আশে পাশের পুরো এলাকায় প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে মিটিং করা হল বার বার,আর গ্রাম বাসিদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা চলতে থাকল আমাদের সাথে যাচ্ছে আনপোলের লোক লোকাল পুলিশ ,জান্দারমারীর লোক,সিকিউরিটি সহ মানবাধিকার ডেস্কের অফিসার বৃন্দ।

আমরা গ্রামবাসীদেরকে বলে আসছি তোমাদের কোন ভয় নেই, তোমাদের জন্যই আমরা এখানে এসেছি,তোমাদের জরুরী যে কোন মুহুর্তে আমাদের কে পাবে,আমরা গ্রাম প্রধানের কাছে মোবা নঃ দিয়ে আসতাম,ঔষধ, ডঃ সুবিধা, বা কোন ড্রাই ফুড সহ অন্যান্য কোন সাহায়্য যেমন আম্বুলেন্স,কোন দুর্ঘঃটনায় সাড়া দেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি যদি কারো লাগে আ্মাদের ক্যাম্পে যেন তারা নির্ভয়ে আসে বা ফোনে জানায়।এই সব বিষয়গুলো স্থানীয় লোকজনের মধ্যে ব্যপক সাড়া পড়ে গেলো।তারাও পরম নির্ভঃরতা্য় আমাদের বন্ধু ভাবতে থাকল এবং পুরো এলাকায় একটা আস্থার পরিবেশ তৈরী হলা।প্রশাসনিক লোকজনের মাঝেও আমাদের সুনাম পৌছে গেল ,বাংলাদেশ পুলিশ কন্টিনজেন্টের ইয়ামুসুক্রুর গ্রুপটি দারুন তৎপর, সাহসী এবং বন্ধুবৎসল।তাই তে ঘটতে থাকল লাল সবুজের বিপ্লব,এই ক্যাম্পে যত আইভরিয়ান কাজ করে সবাই দুপুর বা রাত্রের কেউ না কেউ খাবার খায়,আমরাও না করিনা,কেননা আমরা তো অতিথিপরায়ণ জাতি,পরিবারের লোকজনকে না খাইয়ে আমরা অতিথিদের জন্য ব্যপক আয়োজন করি, রাস্তায় আমাদের গাড়ী বা আমাদের কাউকে দেখলেই ওদের অকৃত্রিম হাসিমাখা মুখ বা হাত দিয়ে সম্ভাষণ জানানো কিংবা ওদের বাংলায় বলতে থাকা বাংলা পুলিশ গুড,কেমন আছো ,বিগ বস,আরামে দ্রা ইত্যাদি ইত্যাদি,কি যে ভাল লাগে আফ্রিকান দের মুখে বাংলা শুনতে, তাদের মুখে হাসি দেখে তখন মনে হয় আমাদের শ্রমটা বোধ হয় স্বার্থক পরিবারের সুখশান্তি বিসর্জন দিয়ে আন্তজার্তিক শান্তি রক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পেরে হয়ত বা কিছুটা সফল মনে হয় নিজেকে তখন।

(মুহাম্মদ রেজাউল মাসুদ)