ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

জেনুলা শহরের কাছাকাছি চেকপোষ্টের নিকটে আমাদের গাড়ীটার গতি একটু কমাতেই আমরা শুনতে পেলাম কে যেন বাংলাদেশ বাংলাদেশ বলে জোরে চিৎকার করছে,চমকে উঠলাম ছোট্ট এক বাচ্চার মুখে তা শুনে,ডিসেম্বর মাস বিজয়ের মাস এমনিতেই সবসময় একটা আবেগ কাজ করে তারপর বিদেশে বিভুইয়ে হলে তো কথাই নেই।জেনুলা শহরটি ইয়ামুসুক্রু থেকে দেড়শ কিমি উত্তর পশ্চিম দিকে আইভরিকোষ্টের একেবারে মাঝখানে অবস্হিত অনেকটা বাংলাদেশে ঢাকা শহরের অবস্হানের মত।এখানে বাংলাদেশ আর্মির একটা ফুল ব্যাটেলিয়ান ২০০১ সাল থেকে মোতায়েন হয়ে শান্তিরক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। আমরা এই শহর আর বাংলাদেশ আর্মির কার্যঃক্রম দেখতেই আট সদস্যের এক টিম নিয়ে সকাল আটটার দিকে ইয়ামুসুক্রু থেকে যাত্রা করে বেলা এগারটার দিকে জেনুলায় পৌঁছে যাই।
দেখতে পেলাম এক আইভরিয়ান মহিলা মাথায় কিছু একটা বোঝা চাপানো, পিঠে কাপড় দিয়ে গভীর মমতায় বেঁধে ছয় সাত মাসের এক বাচ্চাকে বহন করে নিচ্ছে,তার এক হাত দিয়ে বাচ্চাটাকে আদরের মত কিছু করছে আর অন্য হাত দিয়ে তিন সাড়ে তিন বছরের আরেকটা ছেলেকে ধরে তারা দ্রুত হেটে যাচ্ছে। হয়তবা কোথাও ছুটে চলছে জীবিকার অন্বেষনে,অথবা বন থেকে কিছু ফল সংগ্রহ বা কাঠ কেটে তা বিক্রির উদ্দেশ্যে। চার পাচ কিমি পায়ে হেটে দূর কোন শহরের লোকালয়ে চলছে তারা।পুরো আইভরি কোষ্টেই এ চিত্র দেখা যাবে।একশহর থেকে আরেক শহর যাওয়ার পথে দুধারে বিশাল ঘন সবুজ বন,কোথাও কফি, কোকো বাগান ,আবার কোথাও কাজু বাদামের বিশাল এলাকা,কোথাও ভুট্টা বা আম বাগানের সারি সারি আম গাছ।জনবসতি খুবই কম, প্রধান রাস্তা থেকে সরু আকা বাকা মাটির পথ ধরে কোন এক গ্রাম থেকে শুধুমাত্র একদিনের রিজিক অন্বেষনেই এরকম বহু সংগ্রামী আইভরিয়ান মহিলাদের ক্লান্তিহীন পথচলা দেখা যাবে সর্বঃত্রই।আমরা দেখতে পেলাম সেই ছোট্ট ছেলেটিই যে কিনা গভীর মমতায় তার মার হাত ধরে পথ চলছে,হাতটা সরিয়ে নিয়ে আমাদের গাড়ী আর ইউনিফর্মঃ পরা পুলিশ সদস্যদের দেখেই ইশারায় সম্ভাষন জানিয়ে বলছে বাংলাদেশ বাংলাদেশ।এতটুকুন ছোট বাচ্চার মুখে বাংলাদেশ কথাটা শুনে আবেগে আপ্লুত হয়ে চোখে পানি ধরে রাখতে পারলামনা।আমরাও তাকে হাতের ইসারায় প্রতিউত্তর দিলাম বললাম বুজো সাবা বিয়ে।ওর চোখে মুখে দেখলাম আনন্দের ঝিলিক,সাথে ওর মা ও আমাদের সম্ভাষন আর আহ্বান জানাচ্ছে। বিজয়ের মাসে মা সন্তানের বিজয় মাখা হাসিমুখ দেখে আমাদের মনটা আনন্দে ভরে গেলো।
আমরা জেনুলায় ব্যানবাট -১ এ কিছুক্ষনের মধ্যেই পৌছলাম,ঢুকার পথেই দেখলাম ব্যারিকেডের মত দুটো অংশ তার একটায় লাল সবুজের বাংলাদেশের প্রতিকৃতি আর অন্যটায় আইভরি কোষ্টের,বিশাল করে লেখা বিয়াবেনু বাংলাদেশ, অর্থাৎ আপনাকে বাংলাদেশে স্বাগতম। বিশাল এক গেট পেরিয়ে যা কিনা বাংলাদেশের মত করে অবিকল বানানো আমরা হেডকোয়ার্টারে পৌছলাম।আমাদেরকে স্বাগত জানাল ব্যাটেলিয়ানের অপারেশন অফিসার মেজর শাহাদাত আর ডঃ মেজর নজরুল।ভিতরে ঢুকেই মনটা প্রশান্তিতে ভরে গেলো, মনে হল এ যেন আইভরিকোষ্টের আরেক বাংলাদেশ।আমাদের দেশের পুলিশ বা আর্মির কোন ইউনিট ভিজিটে এসেছি,দেখলাম চারদিকে উৎসব আমেজ, পুরো ইউনিট জুড়েই নানান জায়গায় শুধু সবুজ আর লালের সমারোহ। জানতে পারলাম পরদিন মেডেল প্যারেড হবে তাই চারদিকে বাংলাদেশ উৎসব। মেডেল প্যারেড হল মিশন সমাপ্তির কুচকাওয়াজ।,এই ব্যাটেলিয়ান আর আমাদের পুলিশ কন্টিনজেন্টগুলো একই রোটেশান ফ্লাইটে এসেছি।আমাদের ডিপারচারও একই সাথে হবে। অর্থ্যাৎ সবকিছু ঠিক থাকলে ফেব্রুয়ারীর দিকে একত্রে আমাদের বাংলাদেশে ফেরৎ যাওযার পরিকল্পনা নিচ্ছে মিশন কর্তৃপক্ষ। আমাদের পুলিশের দুটি কন্টিনজেন্টেরই মেডেল প্যারেড জানুয়ারীর মাঝামাঝি হওয়ার প্লান আছে, ইউ এন পুলিশ কমিশনার প্রধান অতিথি হিসাবে অভিবাদন গ্রহন করবেন্।

হাল্কা নাস্তা সেরে আমাদের কে পুরো ব্যাটেলিয়ান ঘুরে দেখাতে ব্যতিব্যস্ত হলেন, মেজর শাহাদাৎ আর নজরুল ভাই ,পুরো ব্যাটালিয়ানের চারদিকে ব্যাংকার করে দুই সারিতে কাটাতার দিয়ে ঘের দেওয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যা করলেন,জরুরী মুহুর্তে বা ওয়ার সিচুয়েশনে কিভাবে ফোর্সঃ মুভমেন্ট হবে,কার কি পজিশান থাকবে ইত্যাদি,আমাদেরকে গার্ডঃ সৈনিকরা সালাম দিযে সম্ভাষন জানালেন। তিনি আরও বললেন নয়টি পোস্টে এলএমজি এসএমজির মত ভারী অস্ত্র নিযে সর্বঃক্ষন চৌকিতে কিভাবে গার্ডঃ মোতায়েন থাকে। জেনুলার দিকটায় যদিও পরিস্হিতি একেবারে শান্ত তারপরও বলা যায়না আফ্রিকান রা একবার ক্ষেপে গেলে জংলী ,নির্মঃম আর হিংস্র হযে উঠে।তাই তাদেরকে অস্ত্র তাক করে সারাক্ষন সদা প্রস্তত থাকতে হয়।সাপ আর মশার উৎপাতটাই সবচেয়ে বেশী এখানে । কাঠের জন্য আইভরিকোষ্ট বিশ্বে দারুন সমাদৃত। তার কিছু নমুনা দেখলাম ব্যাটেলিয়ানের বাউন্ডারী সীমানায় বেশ কিছু আইভরির গাছ দেখে, এত মোটা এত বড় গাছ থাকতে পারে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবেনা।তারপর আমরা কাঠাল বাগানে গিয়ে বিস্মিত হলাম শত শত গাছ দেখে,এতো দেখছি সত্যি বাংলাদেশের গফরগাওয়ের যেন কাঠাল বাগান,মেজর সাহাদাত ভাই জানাল ২০০১ সালের দিকে যখন ব্যাটেলিয়ানের কার্যঃক্রম শুরু করে তখন এই গাছগুলি লাগানো হযেছিল,প্রচুর কাঠাল ধরে আছে সবগুলি গাছেই ,বারো মাসই এরকম ধরে।তার পাশেই আম বাগানে নিয়ে যাওয়া হল,ওখানেও দেখলাম অনেক আম ধরে আছে,বড়, ছোট আবার মুকুল ও দেখা যাচ্ছে একই গাছে,অর্থ্যাৎ সারা বছরই এরকম আম ধরে প্রতিটি গাছেই।

বাটালিয়ানের মাঠে মঞ্চ সজ্জার কাজ চলছে, তদারকি করছে ব্যাটালিয়ান ডেপুটি কমান্ডার লেঃকর্ণেল রফিক স্যার ,অন্য সব অফিসারদের সাথে আমাদের পারিচয় করিয়ে দেয়া হলো। কাপড় দিয়ে চমৎকার করে ডামি স্মৃতিসৌধ বানানো হয়েছে,মাঠের একপাশে পতপত করে উড়ছে লাল সবুজের পতাকা, বাংলাদেশের দুই পাশে ইউ এন এবং আইভরিকোষ্টের পতাকা,দেখলেই মন জুড়িয়ে ভাল লাগার অনুভুতিতে ছেয়ে যাবে এরকম দৃশ্য সর্বঃত্রই। চতুর্দিকে ফেস্টুন মাঝে লেখা প্রাউড টু বি এ পীস কীপার, উই প্রমটেড পীস ইত্যাদি।পাসিং আউট প্যারেডের মত সাজ সাজ রব,মাইকে গান বাজছে সালমার কন্ঠে “আমি চাইলাম যারে ভবে পাইলামনা তারে সে এখন বাস করে অন্যের ঘরে”দারুন এক অনুভুতি কাজ করছিল আমাদের ভিতর,বার বার মনে হচ্ছিল এ যেন আইভরিকোষ্টের লাল সবুজের আরেক বাংলাদেশ।
মেজর শাহাদাৎ ভাই এর কাছে এক ফাকে জানতে চাইলাম ওই ছোট ছেলেটার বাংলাদেশ বাংলাদেশ বলার ব্যাপারটা,ওনি বললেন সেই ছেলেটাই শুধু নয় জেনুলাতে যাদের জন্ম দশ বছরের মধ্যে তারা মনে করে এই বাংলাদেশ ব্যাটেলিয়ান তাদেরই তাদের আর পরিবারের সবার সাথে এই বাংলাদেশ জড়িযে গেছে অঙ্গাঅঙ্গী ভাবে আর জেনুলা শহরে যত স্হাপনা আছে তারমধ্যে সবচেয়ে সুন্দরতম হল এই বাংলাদেশ আর তার বাংলাদেশ ব্যাটেলিয়ান।
আপনি শহরের যেখানেই যাবেন দুই তিন বছর বয়সী বাচ্চা থেকে শুরু করে সবাই সাদর সম্ভাষন জানিয়ে বাংলাদেশ বলে আহ্বান করবে।দুপুরের খাবার সেরে যখন বাইরে গেলাম তখন উনার কথার সত্যতা পেলাম,ছেলে বুড়ো যুবা মহিলারা সবাই আমাদের গাড়ী আর ইউনিফর্মঃ দেখেই বাংলাদেশ বাংলাদেশ বলতেছিল। ইয়ামুসুক্রু তে বাংলাদেশ পুলিশের কন্টিনজেন্ট ছাড়াও পাকিস্তান, মিশর, সেনেগাল আর্মির ব্যাটালিয়ান কাজ করছে, তাই সেখানে এত এভাবে বাংলাদেশ প্রকট ভাবে ফুটে উঠেনা,কিন্ত জেনুলাতে,শুধুমাত্র বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোন ব্যাটালিয়ান নেই। আর সেই জন্যই স্হানীয় অধিবাসীরা বাংলাদেশ বলে অন্তপ্রাণ। অপারেশনাল, ভিজিল্যান্স, প্যাট্রল কার্যঃক্রম ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের মানবিক কাযঃক্রম যেমন –ডাক্তার ও মেডিসিন প্রদান , সময় সময় খাবার বা পানি সরবরাহ,ইমার্জেন্সি বা কোন দুর্ঘঃটনায় চাহিত সবধরনের সহযেগিতা প্রদানে বাংলাদেশ অতুলনীয,আর বাংলাদেশের আন্তরিকতা আতিথিয়তা হাসিমাখা মুখ সবচেয়ে আইভরিয়ানদের আকৃষ্ট করে এসব কারনেই এখানে আরেক বাংলাদেশ জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
এই শহরটির সব অধিবাসীই বর্তঃমান প্রেসিডেন্ট আলাসান উতারার এবং ইউ এন সমর্থঃক গোষ্ঠির ।এখানে মুসলমানদের সংখ্যাও অনেক।তাই বাংলাদেশের প্রতি তাদের আলাদা টান ও সমর্থঃন কাজ করে। আশে পাশের অনেক লোক নাকি বাংলায কথা বলতে পারে,বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ানে কয়েকজন স্হানীয় আইভরিয়ান কাজ করে,তাদেরকে কথা বলার সময় বুঝাই যাবেনা যে তারা বাঙালি নন। আমরা পুরো শহর ঘুরে দেখলাম ছোট্ট একটা শহর বেশ সাজানো গোছানো তবে লোকজন একেবারেই কম,তারপর আমরা কাজু বাদামের বাগানে গেলাম, দেখে বিস্মিত হলাম,পুরো জেনুলা টা যেন আইভরিকোষ্টের অন্য এলাকার সাথে কোনক্রমেই মিলেনা,সর্বঃত্র সমতল কোথাও ধান চাষ করা হয়েছে,আবার কোথাও করা হয়েছে হুবহু বাংলাদেশের মত সবজি চাষ,আমরা দেখলাম কিভাবে আইভরিয়ানরা কাজ করছে ,ক্ষেতের পাশেই কুপ থেকে পানি উঠিয়ে পাতাকফি ফুল কফির গাছ গুলোতে কিভাবে পানি দিচ্ছে, যেন ক্লান্তিহীন ওরা,আমাদের দেখা্র সময় নেই তাদের।দেখতে পেলাম মরিচ গাছ, বেগুন ক্ষেত মিষ্টি আলুর চাষ, পেয়াজ ক্ষেত আরও নাম না জানা বিভিন্ন ধরনের সব্জির বাগান, একটু দুরে দেখলাম অনেক এলাকা জুড়ে ধান ক্ষেত, মহিলারা, দু‘একজন পুরুষ কেউ কেউ ধান কাটছে আবার কেউ আটি বাধছে ।তার পাশেই একটা বিলের মত দেখলাম ,ওখানে বেশ কিছু আইভরিয়ান ছেলে আর মেয়েরা বড়শী আর জাল দিয়ে মাছ ধরছে। অদুরে ছেলেরা ফুটবল খেলছে অনেকটা আমাদের দেশে ক্ষেতে বা মাঠে খেলার মত।
এ যেন শীতকালের হুবহু গ্রামের বাংলাদেশ ।মনে হচ্ছে অগ্রাহায়ণ কি পৌষ মাস স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ,দুরের ধান ক্ষেত থেকে ধান কেটে সারি সারি আটি বেধে নিয়ে আসছে বর্গাদাররা, আমরা পলান পলান খেলা খেলছি অথবা চাঁদা তুলে ৪ নঃ ফুটবল কিনে কোন ক্ষেতে বা মাঠে খেলছি,মা খালারা এ বুঝি পিঠা বানাবে হয়তাবা সরিসা ক্ষেত থেকে ফুল বা খুইট্টা শাক তুলে বড়া বানিয়ে মা ডাকবে, কিংবা সকালের কুয়াশা ঘেরা হিমশীতে চাদর গায় দিয়ে খোলা উঠানে রোদে পিড়িতে বসে গোটা পিঠা ভাফা পিঠা খাচ্ছি অথবা চুলার পাশে বসে উত্তাপ নিচ্ছি।

অনেকদিন যাবৎ আইভরিকোষ্টে আছি আজকের মত এরকম কখনো মনে হয়নি, জেনুলাতে এসে পুরো ধারনাটাই পাল্টে গেল,এ যেন আইভরিকোষ্টের মাঝে আরেক বাংলাদেশ।প্রকৃতি,পরিবেশ, অধিবাসী সব যেন বাংলাদেশের হুবহু কপি, এদিকটায় না আসলে অজানা রয়ে যেত একটা দেশের ভিতর আরেকটা দেশের কাহিনী।আমরা ফিরে যাচ্ছি আমাদের লোকেশান ইয়ামুসুক্রুতে কিন্ত সেই ছোট্ট ছেলেটার কথাই বার বার মনে দোলা দিচ্ছিলো যে কিনা আমাদের দেখেই বলেছিল বাংলাদেশ।কালো মানুষ যে এত সুন্দর হতে পারে এই প্রথম খেয়াল করলাম। পরনে ছেঁড়া জামা, আধাপেটা খাওয়া, কোঁকড়ানো চুল, চোখে চরম দারিদ্রতার ছাপ কিন্ত মুখে আনন্দের অপার হাসি । আমাদেরকে দেখাই ওর জন্য হয়তবা বিশাল প্রাপ্তি,বিরাট বিজয়।বিজয়ের মাসে স্যালুইট তোমাদের প্রতি, আমরা শান্তিরক্ষায় অতন্দ্র প্রহরী বুকে বাংলাদেশ, তোমাদের দেশে বিজয় আনবই কেননা আমরা বীরের জাতি।
(মুহাম্মদ রেজাউল মাসুদ)
২২ ডিসেম্বর ২০১২
আইভরিকোষ্ট থেকে