ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

মায়ের মুখে শেখা ভাষাই মাতৃভাষা বা মায়ের ভাষা। মা ডাকার জন্য ভাষা। মা’র সাথে কথা বলার জন্য ভাষা। পরিবারের সমাজের অন্যান্যদের সাথে ভাব প্রকাশের / বিনিময়ের / আদান প্রদানের জন্য ভাষা।

ভাষায় আছে বিশাল শব্দমালা। আছে শব্দগুলোর ব্যাবহার প্রণালী। আছে শব্দগুলোর উচ্চারণরীতি। আছে কথা বলার বাচনভঙ্গি, অঙ্গভঙ্গি। আছে কথা বলার সুর, তাল, লয়। আছে কথা বলার গতি। আছে জিব চালনা, চোখে থাকানো, হাত / আঙ্গুল উঠানামা, শ্বাস নেয়া থেকে কাঁদ ঝাঁকানো, মাথা নাড়ানোর মতো বিষয় পর্যন্ত।

একটা জনগোষ্ঠী ভাব বিনিময়ের জন্য ওই জনপদে তারা তাঁদের মায়ের ভাষাকে যেভাবে ব্যাবহার করে সেটা তাঁদের পরিবেশ, পরিমণ্ডল, জিবনাচার, বিশ্বাস, মূল্যবোধ কে ধারন করে, বহন করে, প্রতিনিধিত্ব করে। সেটা ওই জনপদের সম্পদ যা তারা পুরুষানুক্রমিক ভাবে অর্জন করে। সে ভাষা প্রকৃত অর্থে তার সমাজের নিজস্ব সংস্কৃতির আত্মপরিচয় নির্ণয় করে।

এভাবে একই ভাষাবাসীরা “আমরা” অন্য ভাষাবাসীরা “ওরা”। একটি জাতি-গোষ্ঠি নিজের অবয়বটা এখানে খুঁজে পায়। বুঝে নেয় অন্যদের থেকে তারা আলাদা, তারা একটা অনন্য জাতি।

কিন্তু ওই জনগোষ্ঠীর সাহিত্যের ভাষার আলাদা আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ আছে, সুনিদিষ্ট কাঠামো আছে, দৃশ্যমান চেহারা আছে যেটা বর্ণমালা, ব্যাকরন, আভিধানিক শব্দভাণ্ডারের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। যদিও সে রূপ ব্যাবহারিক দিক থেকে আলাদা তবুও সেটা ওই জনগোষ্ঠীর জাত্যাভিমান, গোষ্ঠী-সম্মান ও আত্মগৌরব কে ধারন করে, লালন করে। এখানে ভাষার একটি দ্বিমাত্রিক অবয়বের অস্তিত্ব অনুভব করা যায়।

আমরা সমস্যায় পড়ে যাই যখন সাহিত্যে নিজেই তার জনগোষ্ঠীর আচার প্রণালী অগ্রাহ্য করে ভাষার সবখানি একাই ব্যাখ্যা করতে চায়। কোনো ভাষাবাসী জনপদের সমাজতত্ত্ব আর নৃতত্ত্ব কে বিবেচনায় না নিয়ে আনুষ্ঠানিক সাহিত্য কখনো দাঁড়ানোর জন্য কোনো পাঠাতন খুঁজে পায়না। ভাষার বেচে থাকার জন্য, টিকে থাকার জন্য ওই পাটাতন প্রয়োজন। তাই কথ্য ভাষা এবং লিখিত সাহিত্যকে যতটুকু কাছাকাছি রাখা যায় ততই মঙ্গলকর। গতিশীল, বৈরী ভাষাগুলো তার রক্ষনশীল সাহিত্যকে পিছনে ফেলে যখন এগিয়ে যায় তখন তার সাহিত্য পুথির মধ্যেই বসবাস করার জায়গা খোজে। সেটা আমরা ইতিহাসে অনেক দেখেছি।

সাহিত্যের আনুষ্ঠানিক ভাষা এবং মুখের কথ্য ভাষাকে যথাযত ভাবে পরখ করতে এবং স্থান করে দিতে না পারলে; উভয়ের মধ্যে লেনাদেনার সম্পর্ককে জায়গা করে দিতে না পারলে আমরা মান ভাষা, প্রমিত ভাষা, কথ্য ভাষা, চলিত ভাষা, গ্রাম্য ভাষা, আঞ্চলিক ভাষা; এই বিতর্ক করতে করতে আমাদের ভাষার আসল রূপ রস হারিয়ে ফেলব। ভাষার, সাহিত্যের কোনটার উৎকর্ষতা আর মর্যাদা প্রকৃত অর্থে বাড়াতে সমর্থ হবো না।