ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

10881572_893460547364994_2015909056942430834_n-660x315

আমি যদি ভুল না করে থাকি তাহলে ঢাকাই চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয় ‘মুখ ও মুখোশ’ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে ৷ যেটি নির্মিত হয়েছিলো ১৯৫৬ সালে ৷ যদিও ঢাকায় নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্রের নাম ‘দ্য লাস্ট কিস’৷ ১৯৩১ সালে নির্মান করা চলচ্চিত্রটির কোন প্রিন্ট বর্তমানে সংরক্ষিত নেই ৷

১৯৫৬ সাল থেকে ঢাকাই চলচ্চিত্রের যে যাত্রা শুরু হয়েছিলো তা বিভিন্ন চড়াই উতরাই পার হয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে এসে পৌছেছে ৷ বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার আগে শুরুর দিকটা নিয়ে আরেকটু আলোচনা করা যাক ।

১৯৫৬-১৯৭১ সাল র্পযন্ত ঢাকায় যেসব চলচ্চিত্র নির্মিত হতো সেই চলচ্চিত্রগুলো সব শ্রেণীর দর্শকদের রুচিবোধকে প্রাধান্য দিয়ে নির্মিত হতো ৷ তখন ঢাকাই চলচ্চিত্রকে পাকিস্তানি উর্দু ভাষায় নির্মিত চলচ্চিত্রের সাথে রীতিমতো প্রতিযোগীতা করতে হতো৷ এর প্রধান কারন ছিলো পাকিস্তানিদের অবহেলা ৷ পাকিস্তানি গোষ্ঠী মনে করতো ঢাকায় ভালো চলচ্চিত্র নির্মান করা আদৌ সম্ভব না৷ এটা জেগে জেগে স্বপ্ন দেখার মতো ৷ সেই জেদ থেকেই ঢাকার কিছু পরিচালক সমাজ,সামাজিকতা,আন্দোলন নির্ভর চলচ্চিত্র নির্মান করতে লাগলেন ৷ এমন সময় ঢাকার কতিপয় কিছু প্রযোজক অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশায় যৌনতায় ভরপুর চলচ্চিত্র নির্মান করতে লাগলেন ৷ যার ফলশ্রুতিতে ঢাকার চলচ্চিত্র কোনঠাসা হয়ে পড়ে ৷ তারপর ‘৭১ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকার চলচ্চিত্র নিজস্বতা পেলো ৷ পরিচালকরা একের পর এক ভালো মানের চলচ্চিত্র নির্মাণ করে গেলেও কিছু প্রযোজকরা মারদাঙ্গা নির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণ করে গেছেন ৷ যা পরবর্তীতে স্থায়ী রুপ নেয়৷ সেই স্থায়িত্বের উপর আস্থা রেখে কাকরাইলে বেশ কিছু প্রযোজনা সংস্থা গড়ে ওঠে ৷ সেই থেকে আজ পর্যন্ত কাকরাইল হয়ে রয়েছে ঢাকাই তথা বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের তীর্থ স্থান ৷ এফডিসিতে চলচ্চিত্র নির্মাণের পর কাকরাইল থেকেই সারাদেশে চলচ্চিত্র নিয়ন্ত্রিত হয় ৷ এখানে বলে রাখা ভালো ‘মুখ ও মুখোশ’ নির্মানের পরের বছরই যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ ফিম্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন,বিএফডিসি’র­৷ কিন্তু পরবর্তীতে ‘বাংলাদেশ’ নামটি বাদ দেয়ার পর সেটি ‘এফডিসি’ নামে পরিচিতি লাভ করে ৷

11

এফডিসি প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ভালো-মন্দ মিলিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে ৷ এর ভেতর কোনোটি ব্যবসা করছে,কোনোটি ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ হচ্ছে ৷ এদিকে বর্তমানে এই এফডিসি ঘরানার বাইরে কিছু পরিচালক আছেন যারা বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মান করছেন ৷ এফডিসি তথা বাণিজ্যিক ধারার পরিচালকরা যেখানে প্রেম,যৌনতা,ধুম-ধাম­ মারপিট,ধর্ষণ কাহিনী র্নিভর চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন সেখানে বিকল্প ধারার পরিচালকরা চারপাশের সমাজ,মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনধারা নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন ৷ যার ফলে বাণিজ্যিক ধারার একঘেয়েমী চলচ্চিত্রের কাহিনী দেখে বিরক্ত এক শ্রেনীর দর্শক আলাদা হয়ে বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রের দিকে মনোনিবেশ করেন ৷ আর এদের বেশীর ভাগই ড্রয়িং রুম নির্ভর মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্ত শ্রেণীর র্দশক ৷ অন্যদিকে মধ্যবিত্ত আর উচ্চশ্রেণীর র্দশক হারিয়ে এফডিসি ঘরানার নির্মাতারা নিম্ন শ্রেণীর দর্শকদের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে আরম্ভ করলেন ৷ যেখানে লুতুপুতু প্রেম,আন্ডারওয়ার্ল্ড­,শরীর দেখানো আইটেম গান কাহিনীর মেরুদন্ড৷

এখন চলচ্চিত্রের এই দুই ধারার পরিচালকরা একে অন্যকে ঢাকাই চলচ্চিত্রের জন্য ক্ষতিকর মনে করছেন ৷ দুই পক্ষই মনে করছেন তারাই ঢাকাই চলচ্চিত্রকে এগিয়ে নিতে পারবেন ৷ তবে এটা ঠিক এফডিসির গতানুগতিক ধারার নির্মাতারা নিজেদের ভুলেই বিরাট অংশের দর্শক হারিয়েছেন ৷ যেসব দর্শক হলবিমুখ হয়ে ড্রয়িং রুমে থিতু হয়েছিলো তারাই পরবর্তীতে বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রে নিজেদের জীবনধারাকে খুঁজে পেয়ে তার র্দশক বনে যায় ৷

যেখানে বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতারা সমাজের চারপাশ থেকে কাহিনী সংগ্রহ করে বিশ্বাসের একটা জায়গা তৈরী করছেন সেখানে বাণিজ্যিক ধারার নির্মাতারা বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র থেকে কাহিনী সংগ্রহ করে জোড়া তালি দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন ৷ আবার কখনো কখনো ফ্রেম টু ফ্রেম নকল করছেন ৷ অপ্রিয় হলেও সত্য এ পর্যন্ত বাংলাদেশে যতোটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে তার বেশীর ভাগই নকলের দায়ে অভিযুক্ত ৷ যেকারনে দর্শক পকেটের টাকা খরচ করে তাদের চলচ্চিত্র দেখছে না ৷ আর দর্শক হলে গিয়ে চলচ্চিত্র না দেখলে হল বন্ধ হবে এটাই স্বাভাবিক৷

এটা ঠিক বিকল্প ধারার নির্মাতারা দেশের চলচ্চিত্র এফডিসি ঘরানা থেকে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছেন ৷ দর্শকদের ভিন্ন স্বাদ দিতে পেরেছেন ৷ আবার এটাও ঠিক যারা বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন তারা সিনেপ্লেক্স নামক বদ্ধ ঘরে আবদ্ধ হয়ে পড়েছেন ৷ চলচ্চিত্র সার্বজনীন না হলে সেটি দেশের চলচ্চিত্রের উন্নয়নে বড় ভূমিকা পালন করতে পারবে না ৷ শুধু পুরস্কারের জন্য চলচ্চিত্র নির্মান করলে এটা স্বার্থপরের মতো কাজ হয়ে গেলো ৷ পুরস্কারের সাথে সাথে তাদের সব শ্রেণীর দর্শক সৃষ্টি করার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে ৷ আবার বাণিজ্যিক ধারার নির্মাতার যদি শুধু নিম্নবিত্তদের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তাহলে সেটাও দেশের চলচ্চিত্রকে কখনোই এগিয়ে নিবে না বা নিতে পারবে না৷

এখন বানিজ্যিক ধারা এবং বিকল্প ধারার মধ্যে আসল পার্থক্যটা কোথায় সেটা দেখা যাক ৷ বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্র যে একদম বাস্তবতা বর্জিত তা কিন্তু নয় ৷ তবে সেখানে বাস্তবতাকে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপনা করা হয় ৷ অভিনয় শিল্পীদের সংলাপ যাত্রার মতো মনে হয় ৷ সেই সাথে কাহিনীর উপস্থাপনার ধরন,অভিনয় শিল্পীদের পোষাকেও পার্থক্য রয়েছে ৷ খেয়াল করলে দেখা যাবে বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রে অতিমাত্রায় নাচ গান জুড়ে দেয়া হয় না ৷ সেখানে প্রেম,ভালোবাসা,গান থাকে ৷ কিন্তু সেটাকে শালীনতার সাথে উপস্থাপন করা হয় ৷ এক কথায় বলতে গেলে সেখানে চরিত্রের স্বাভাবিক প্রকাশ থাকে ৷ অতিমাত্রায় কোনকিছু থাকে না ৷ অনেককে অভিযোগ করতে দেখা যায় বিকল্প ধারার নির্মাতাদের চলচ্চিত্রের দৈর্ঘ্য কম ৷ একটু পিছন ফিরলে দেখা যাবে এক সময় বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রের দৈর্ঘ্য তিন ঘন্টা ছিলো ৷ এখন কিন্তু সেটা কমে দুই ঘন্টা পনেরো মিনিটে চলে এসেছে ৷ অর্থ্যাৎ ৪৫ মিনিটের মতো চলচ্চিত্রের দৈর্ঘ্য কমেছে৷ মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে ৷ আর এই ব্যস্ততায় এতো সময় ধরে চলচ্চিত্র দেখা মানে এক বেলার আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া৷ অতএব চলচ্চিত্রের দৈর্ঘ্য কমে যাওয়াকে ইতিবাচক বললে ভুল বলা হবে না৷

তবে এতোকিছুর পরও উভয় চলচ্চিত্রের মোড়ক কিন্তু এক ৷ অর্থ্যাৎ দুটোই চলচ্চিত্র। সুতরাং ধারা ভিন্ন হলেও ধরণ যেহেতু এক সেহেতু এটা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করার কোন অবকাশ নেই ৷ মানুষের রুচির পার্থক্য থাকতেই পারে ৷ থাকতে পারে চাহিদার ভিন্নতা। তাদের চাহিদা এবং রুচি মোতাবেক চলচ্চিত্র নির্মান করতে পারাটাই নির্মাতাদের সফলতা ৷ তবে সবক্ষেত্রে দর্শকদের রুচির প্রাধান্য দিতে হবে এটা ঠিক না। দর্শক তো ‘পর্ণ ছবি’ দেখতে চায়,তাই বলে সেগুলো দেখানো তো সম্ভব নয়।

যাহোক,একে অন্যকে দোষারোপ করা চলচ্চিত্রের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এখন উভয় ধারা একজন অন্যজনকে স্বীকৃতি দিয়ে দর্শকদের হলমুখী করার চেষ্টা করতে হবে ৷ চলচ্চিত্রকে সব শ্রেণীর দর্শকের কাছে পৌছে দিতে হবে ৷ দর্শকদের হলমুখী করতে না পারলে পথ হারাবে দেশের চলচ্চিত্র ৷ আর পথ হারালে এর দায়ভার এই দুই ধারার নির্মাতাদের উপর বর্তাবে৷ নিজেদের ভেতর একতা না থাকলে তৃতীয় কোন অপশক্তি সেখানে কতৃত্ব বিস্তারের চেষ্টা করে। বিষয়টি সকলে মনে রাখা দরকার।