ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 
রক্তের আল্পনায় আঁকা বাংলাদেশ

১৯৭১ এর ১৬ ই ডিসেম্বর । আর সব দিনের মতই প্রথম প্রহরে সূর্য উঠেছিল পুব আকাশে শীতের কুয়াশার চাদর ভেদ করে । কিন্তু অতি পুরাতন সেই সূর্য সেদিন ছিল একেবারেই নতুন । একটি নতুন জাতিসত্বার জন্মলগ্নে কোন সূর্য কি পারে পুরোনো হয়ে থাকতে ? পারে না, আর তাই সে দিন সূর্য উঠল চেনারুপেই কিন্তু নতুন হয়ে। উদয় হল পৃথিবীর মানচিত্রে উর্বরতার পলিমাটিতে বেড়ে ওঠা, ক্ষুদ্র অথচ জনবহুল বাংলাদেশের । আমাদের সবার ত্যাগ তিতিক্ষার ফসল, দু লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রম হানিতে, ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের সাগরে, পাহাড় সমান দু:খ শোকের ভিত্তিপ্রস্তরে ভর করে জন্ম নেয় বাংলাদেশ, স্বাধীন হয় বাংলাদেশ ।

আমাদের বাংলাদেশ, এই পলি মাটি বিধৌত উর্বরতার পবিত্র জমিনে হাজার বছর ধরেই লালসার দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছে ভিনদেশী বর্গিরা । কখনো আর্যরা, কখনো তুর্কি, কখণো মোঘলেরা, কখনো পর্তুগীজ দস্যুরা, কখনো ইউরোপীয় বনিক গোষ্ঠী ব্যবসার নামে এসে শোষণ করে গেছে, কখনো বিট্রিশরা শোষণ করেছে বাংলা ও বাঙালীকে । ১৯৪৭ এ ব্রিটিশরা এই ভারত বর্ষ ছেড়ে চলে যাবার পরে শুরু হয় বর্বর পাকিস্থানীদের শাষন ও শোষণ । নির্মম অত্যাচার, শোষণের সব কলাকৌশন রপ্ত করা পাকিস্থানী নরপশুদের বিরুদ্ধে শুরু হল প্রতিরোধের যুদ্ধ । সশস্ত্র সংগ্রাম, সমগ্র বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের (কিছু কুলাঙ্গার জারজ ব্যাতীত) হৃদয়ের যুদ্ধের প্রাবল্যে ভেসে যায় পাক বাহিনী । এ দেশ থেকে লেজ গুটোবার আগে তারা ধর্ষণ করে যায় বারেবার আমার মা এবং মাটিকে । উপুর্যপুরি ধর্ষণের স্বীকার, বাংলা মায়ের প্রতিটি দেহ কোষে, এক টুকরো খোলা জমিনে রক্তের আল্পনায় লেখা আছে নরপিশাচদের নির্মমতার কথা ।

একাত্তরের গনহত্যা]

এরপরে কেটে গেছে অনেকটা সময় । ১৯৭১ থেকে ২০১১ । চল্লিশ বছর পূর্তি হল স্বাধীনতার ।একটি দেশের সত্যিকারের বিকাশের জন্য চল্লিশ বছর তেমন কোন সময় না হলেও শিশু অবস্থা থেকে যৌবন কালে উন্নীত হবার মত সময় পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই । তাই মনে প্রশ্ন জাগে, যে আশা এবং স্বপ্ন নিয়ে নিজের জীবন তুচ্ছ করে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন আমাদের প্রাণপ্রিয় মুক্তিসেনারা, তাদের সে প্রত্যাশাকে আমরা এখন কোথায় রেখেছি, কেমন আছে আমাদের দেশ ?

দেশ স্বাধীন হল সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর চোখের জলে, হারানোর মোড়কে মোড়ানো প্রাপ্তি নিয়ে । দেশের স্বাধীনতার রূপকার ফিরে এলেন, গঠিত হল সরকার । শুরু হল দেশ গড়ার সংগ্রাম । ধ্বংসস্তুপে পরিনত দেশ । কোথাও ছিল না নিরাপদ খাবার পানির সংস্থান, অন্ন, বস্ত্রের নিশ্চয়তা, যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতিতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংসপ্রায় । বিশাল প্রত্যাশা নিয়ে যাত্রা শুরু স্বাধীন বাংলাদেশের ।

বাঙালীর সংগ্রাম

কিন্তু দু:খের বিষয় নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রমামের ফলে স্বাধীনতা অর্জনের যে কৃতিত্ব ছিল, তা ফিকে হতে শুরু করল বছর কয়েকের মাঝেই । ৭৪ এ দুর্ভিক্ষ, সামরিক বাহিনীতে অস্থিরতা, মধ্যসত্ব ভোগী মুনাফালোভী নব্য ধনীক শ্রেনীর উথ্থান সমাজকে নিয়ে যেতে শুরু করে অস্থিরতার দিকে । অত:পর আরেকটি কাল রাত, পচাত্তরের পনেরই আগস্ট । সপরিবারে নিহত হলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি । বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থায় সামরিকায়ন । একটানা ১৫ বছর অব্যাহত থাকে সামরিক শাসন / সামরিক গনতন্ত্র । এর পরে আসে গনতন্ত্র, যাকে বলা চলে গনতান্ত্রিক পরিবারতন্ত্র ।

হিসেবের খেরোখাতাটা যখন আমরা খুলি তখন আমরা দেখতে পাই, চল্লিশটি বছর কেটে গেছে । দেশের জনসংখ্যা দ্বিগুন হয়েছে । অনেক প্রত্যাশা ছিল আমাদের সত্যি, তবে তা অলীক ছিল না । সরকারের কাছে, রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্নধারদের কাছে বারবার আমরা প্রতারিত হয়েছি ।এনালগ আর ডিজিটাল দুটো সিস্টেমে চলা সরকারই আমরা দেখছি । আমরা এও দেখছি মানুষের যাবার কোন পথ নেই বলে গত বিশটা বছর তারা একবার এপারে ভোট দিচ্ছেন পরের বারে ওপারে ভোট দিচ্ছেন । তাদের আশা আকাঙ্খার মিলন ঘটানোর কেউ নেই । শহীদের রক্ত আর তাদের ত্যাগের ভিত্তিপ্রস্তরে দাড়িয়ে তারা ইচ্ছেমত খেলছেন ছিনিমিনি খেলা ।

আমরা কি তবে এই হতাশা নিয়েই বেচে থাকবো ? না আমাদের হতাশ হবার কিছু নেই । আজকের পৃথিবীতে আমরা কোন দেশের মানুষই আর বিচ্ছিন্ন নই । অর্ন্তজাল আমাদেরকে তার সুতোর বাধনে বেধেছে শক্ত করে । আর তাই আমাদের শাসক গোষ্ঠীর লাগামহীন ব্যর্থতার রাশ টেনে ধরবার সময় এখন আমাদের অর্থাৎ ব্লগ, ফেসবুক ব্যবহার কারী অনলাইন কমিউনিটি । এই অনলাইন কমিউনিটির বেশির ভাগ ব্যবহার কারী হচ্ছেন দেশের তরুন এবং নবীনতম নাগরিকেরা । সমাজকে বদলে দিতে, তথ্যের অবাধ প্রবাহের নিশ্চিত করার মাধ্যমেই এরাই একদিন বদলে দিতে পারে এই দেশটা । যেভাবে আরব বসন্ত এল, চল্লিশ বছরের রাজতন্ত্রের নাগপাশ থেকে একে একে মুক্ত হল আরব রাস্ট্রগুলো তার সংগঠনের মূলে এই তারুণ্য আর অর্ন্তজাল । তাই আমাদের এগিয়ে আসতে হবে সকলকেই ।

একটা কথা আমরা মনে রাখলেই ভাল যে, সবাইকেই খুব বড় কিছু করে দেখাতে হবে এমন কিছু নয় । আমাদের মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা, সেখানে আমরা দেখি বালক শিশুরাও অস্ত্র এগিয়ে দিয়ে সাহায্য করেছিল যোদ্ধাদের । ছাত্র, শিক্ষক, পেশাজীবি, কৃষক, শ্রমিক, কুলি, মজুর, গৃহস্থ, গৃহবধু সবাই তাদের নিজ নিজ সামর্থ্যের মধ্যে অবদান রেখেছিল বলেই এই স্বাধীনতা এসেছিল । তাই দেশ গড়ার কাজে, সমাজকে বদলে দেবার কাজে যে গাফিলতি হয়েছে তাকে আমরাই পারি দূর করতে । আমাদের শক্তি, আমাদের একতাকে কাজে লাগিয়ে ।

আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর শহীদেরা স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি শোষণ মুক্ত, সম অধিকারের, সার্বজনীন কল্যান রাস্ট্রের । এই কল্যান রাস্ট্রে থাকবে না কোন ভেদাভেদ । প্রতিটি শিশু পাবে অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা । কিন্তু খুব দু:খ নিয়ে দেখতে হয় পথের ধারে পরে থাকা নিরন্ন শিশুদের । পথের কুকুরের যে জীবন, সে জীবন কখনো কখনো হয়ে যায় মানব সন্তানের ।

পথ শিশু

এই সব পথ শিশুদের নিয়ে কাজ করে এরকম একটি সংগঠনের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিতে চাই আজ । রাজধানী ঢাকার প্রায় ৪০ % বাসিন্দা নিম্নবিত্ত । যাদের বেশির ভাগেরই সন্তানকে স্কুলে পাঠাবার সামর্থ্য নেই । আর অনেক পিতামাতা আছেন যারা তাদের সন্তানের লালন পালনে অক্ষম হয়ে ফেলে রেখে যান পথের ধারে । তো এই সব পথ শিশূদের নিয়ে কাজ করা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক এবং অলাভজনক প্রতিষ্ঠাণ প্রথম সূর্যের সাথে আপনাদের পরিচিত করাতে চাই ।

প্রথম সূর্য

প্রথম সূর্য

প্রথম সূর্য সংগঠনটি যার একক প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে তিনি হলেন নুরুল উদ্দিন রুবেল । বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া কালীন সময় থেকেই তিনি এই সব পথশিশুদের জন্য কিছু করতে চাইছেন । আর তাই পড়াশোনা শেষ করবার পড়েই তিনি পথের পাশেই ছোট্ট পরিসরে শুরু করেছেন পথ শিশুদের জন্য স্কুলিং । পথের ধারে এই স্কুলে প্রথম পর্যায়ে মাত্র ছয়টি শিশু ছিল । আস্তে আস্তে তার প্রানান্ত পরিশ্রম ফল দিতে শুরু করে । পথশিশুরা এই স্কুলে পড়তে আগ্রহী হয় এবং আরো অনেক সমাজ সচেতন তরুণ কর্মী যোগদান করেন প্রথম সূর্যের কার্যক্রমে ।

প্রথম সূর্যের পাঠশালা

২০১০ সালের আটই এপ্রিল এই সংগঠনের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হয় । শুরুতে এই কার্যক্রমে যে সকল পথশিশুকে শিক্ষাসেবা দেয়া হত তা পরিবাগ এলাকার (প্রতিষ্ঠাতা রুবেল ভাই এর নিজের এলাকা) মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল । কিন্তু আসতে আসতে ছড়িয়ে পড়ছে পুরো ঢাকা শহরেই । মাত্র ছয় জন পথকলিকে নিয়ে যে সংগঠন যাত্রা করে আজ তাতে প্রায় শতাধিক শিশুকে প্রত্যক্ষ সেবা দেয়া হচ্ছে ।

প্রথম সূর্য প্রধানত এই সব পথশিশুদের প্রি স্কুলিং এর ব্যবস্থা করে থাকে । এর পাশাপাশি যাদেরকে উপযুক্ত মনে করা হয় তাদের সরকারী বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেয়া হয় । তাদের পড়াশোনার সম্পূর্ণ খরচ প্রথম সূর্য বহন করে । ইতিমধ্যে প্রায় অর্ধশতাধিক পথশিশুকে মূল ধারার শিক্ষাব্যবস্থায় আনা হয়েছে । এটি মাত্র দু বছরের একটি নবীন সংগঠনের জন্য অনেক বড় সাফল্য ।

চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা

এই সংগঠনের অধীনে যে সকল পথ শিশু আছে, তাদের সুকুমার বৃত্তির বিকাশেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে সংগঠনটি । তারই একটি উদাহরণ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ।

পহেলা বৈশাখ, বর্ষবরণ

পহেলা বৈশাখ, বর্ষবরণ

এছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠাণে এদেরকে নিয়ে বিভিন্ন আয়োজন করে থাকে সংগঠনটি । বেশির ভাগ পথ শিশু নিতান্তই দুস্থ পরিবারের । অনেকের আবার পরিবার নেই । তাই এই সব শিশুর মুখে হাসি ফোটানোর জন্য এ সব আয়োজন নিয়মিতই করে চলেছে সংগঠনটি । ঈদ, পহেলা বৈশাখ, বিজয় দিবস সব ধরণের সামাজিক পার্বনেই এমন আয়োজন করা হয়ে থাকে ।

ঈদের আনন্দ, খানাপিনায়

ঈদে শিশুদের মধ্যে খাবার বিতরন ।

ঈদ পূর্ণমিলনী

ঈদ পূর্ণমিলনী আয়োজন, শিশুদের আনন্দ দান ।

এই সংগঠনটি যে সকল পথ শিশুদেরকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে, তাদের বেশির ভাগই ছিল বখে যাওয়া শিশু । কিছু মেয়ে শিশু ছিল যারা আন্ধকারের গহ্বরে ঢুকে গিয়েছিল তাদেরই পরিচিত কারো দ্বারা প্রতারিত হয়ে । এদেরকে আশার আলো দেখিয়েছে প্রথম সূর্য ।

আজ এই সংগঠনে সেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছে বিভিন্ন সরকারী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে মেয়েরা । তারা বিনামূল্যে পাঠদান করছে শিশুদের । কারিগরি শিক্ষাও দেয়া হচ্ছে এদের । সংগঠনটিতে বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন সম্মানিত শিক্ষক উপদেষ্টা হিসেবে আছেন ।

সংগঠনটিকে আরো এগিয়ে নেবার প্রত্যাশায় ইতিমধ্যে সরকার বরাবর আবেদন করা হয়েছে এটিকে এন জি ও হিসেবে ঘোষণা লাভের জন্য । আশা করা যায় এটি এন জি ও ঘোষিত হলে এটি ঢাকা শহর থেকে ছড়িয়ে পড়বে সারা দেশে যত গুলি বড় বড় শহর আছে সবখানে ।

সংগঠনটিকে যে কোন রকম সাহায্য, পরামর্শ যদি কেউ দিতে চান তবে যোগাযোগের ঠিকানা নিচে দেয়া হল –

সংগঠনটির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ প্রথম সূর্য

ঠিকানা : ফ্রি স্কুল স্ট্রীট রোড, পুকুরপাড়, হাতিরপুল, ঢাকা ।
ইমেইল : nurubel@hotmail.com

সংগঠনটির প্রতি শুভকামনা জানাতে সবাইকে অনুরোধ করছি ।

প্রথম সূর্য পরিবার

আজ বিজয় দিবস । ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত এখনো শুকায় নি । এখনো বাংলার মাটিতে শেয়াল শকুনের কাড়াকাড়ির চিহ্ন । এই চিহ্ন আমরা কোনদিন ভুলে যাব না, আজ বিজয়ের মন্ত্রে দীপ্ত হই আসুন আরেক বার । আবার গলা ছেড়ে বলি, জয় বাংলা । আসুন আমরা তরুণেরাই শুরু করি আবারো আরেকটি একাত্তর, যে যুদ্ধ হবে দেশ গড়বার জন্য । যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, পথ শিশুদের প্রতি আমাদের সহমর্মিতার হাত, এক সুরে গর্জে উঠুক । আমাদের যা কিছু আছে তাই দিয়ে আমরা লড়ব আবার । হোক সে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী, তবু জয় আমাদেরই । সবাইকে বিজয়ের মাসের রক্তিম শুভেচ্ছা ।

বিজয়ের গল্প লেখি, প্রথম সূর্যের বুকে !
রক্তের লাল, শোকের কালো
প্রোথিত অন্তরে আমাদের ;
সোনার বাংলা গড়ব
আমরা সবাই মিলে, তরুণেরা
এসো হাত মেলাই
আবার নতুন করে ।

সবাই ভাল থাকুন । বিজয়ের আনন্দ, আমাদের মনে করিয়ে দিক আমাদের দায়িত্বের কথা । সবাইকে শুভেচ্ছা