ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

images-1
“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর”। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এ কবিতাটি শুনলে মনে শান্তি পাই ঠিকই; কিন্তু বাস্তবতার দিকে তাকালে খুবই কষ্ট হয় আমার। বলছিলাম নারীর অধিকারের কথা। আমরা বাঙালিরা আজো পারিনি নারীকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে। আমাদের পরিবার আজো নারীর ইচ্ছার মূল্যয়ণ করতে পারেনি। আমাদের পরিবার আজো শুনতে চায়নি নারীদেরও ব্যক্তিগত মতামত আছে। সে নারী যদি হয় কোন দরিদ্র পরিবারের তাইলে তো কথাই নেই। তার মত মূল্যহীন বোঝা বোধহয় সংসারে আর একটিও নেই। তাকে কোন রকমে ঘর থেকে বিদায় জানাতে পারলেই বেঁচে যায় তার পরিবার। তার উপর যদি সে নারী হয় ‘সুন্দরী’ তবে তো আরো সমস্যা; তার উপর যে কত নরের চোখ পড়ে তার হিসাব কে রাখে? আর পরিবার ভাবে কোন রকমে মেয়েকে ঘর থেকে বিদায় করতে পারলে বুঝি ‘আপদ’ দূর হয়।

আমার ব্যক্তিগত মতামত। আমি অনেক মেয়েকে দেখেছি বিয়ের বয়স হয়নি কিন্তু পরিবার দিচ্ছে তাই ইচ্ছা-অনিচ্ছায় বিয়ের পিড়িতে বসছে তারা। অনেকটা এমন যেন মেয়েদের কোন মূল্য নেই পরিবারে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে বেড়ে ওঠা মেয়েদের দুর্দশার চিত্র আমি দেখেছি। অনেকেই আমার সাথে শেয়ার করেছে তাদের জীবনের গল্প। শেষ পরিণতিটা এমন যে, কোন উপায় থাকে না তাঁদের। পরিবার যে ছেলে পছন্দ করে, তার সাথে ঘর বাঁধতে হয়। এখানে থাকে না কোন বয়সের ফারাক, থাকেনা মনের মিল, সবই যেনো জোর করে করা হয়।

ক’দিন আগে এক পরিসংখ্যানে জানতে পারলাম আমাদের দেশের প্রায় ষাট ভাগ নারী কোন না কোন ভাবে বাল্য বিবাহের শিকার। ইচ্ছা-অনিচ্ছায় বিয়েতে তাদের মত করানো হয়। অনেক সময় এমন হয় যে মেয়ের বয়স ১৮ বছর না হতেই বিয়েতে জোর করে রাজি করানো হয়। লুকিয়ে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়। বিষয়টি খুবই হতাশার যে, মেয়ের মতামত না নিয়ে অনেক সময় ঘটনা ঘটে যায়।

আমার দেখা বেশীর ভাগ মেয়ের বিয়ে হয়েছে সপ্তম থেকে দশম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায়। আমি অনেক মেয়েকে দেখেছি বাল্য বিবাহের শিকার হতে। অনেকটা এমন যে, মেয়ে মানুষের এত পড়ে কী হবে? তার চেয়ে ভাল ‘ধনী’ ছেলে দেখে বিয়ে দিতে পারলেই যেন পরিবার বেঁচে যায়।

images-3
ঘটনাগুলো এমন যে অনেক সময় প্রতিবাদের ভাষা থাকে না। এইতো কিছুদিন আগে আমার খণ্ডকালীন কর্মস্থলে একটি মেয়ে দৌড়ে এসে জানাল, স্যর আমাগো বাড়ির অমুকের (নাম ব্যবহার করলাম না) বিয়া হইয়া গেছে কাইল রাইত। আপনার নাম্বার খুঁজছি অনেক, তয় পাই নাই। মেয়েটা আমার ছাত্রী ছিল। সে খুব আফসোস নিয়ে কথাটা বলল। আমি বললাম আমাকে বলে কী হতো? বিয়ে কী ঠেকানো যেতো? আমি তো অফিসার নই! নই কোন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। যাদের কাছে বললে কাজ হতো তাদের জানাওনি কেন? মেয়েটা বলল, স্যর কাকে জানাবো? আমরা তো কাউকে চিনি না!

অবশ্য আমি তাদের বলেছিলাম, যেহেতু গ্রামাঞ্চল সেহেতু এমন ঘটনা হলে তৎক্ষণাৎ নিকটস্ত থানায় কিংবা ইউএনও সাহেবের কাছে তথ্য দিতে। দুর্ভাগ্য ওনাদের নাম্বারগুলো দিতে ভুলে গিয়েছিলাম। যেসব নাম্বারে তারা তাদের অভিযোগ দাখিল করতে পারতো।

অবশ্য নারীদের নির্যাতন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ১০০ তে কল করলে সমস্যার কথা বললে উপকার পাওয়া যায়। কিন্তু কটা নারী এমনটা করতে সাহস করে?

আমাদের কতটা সচেতনতার অভাব। এই দুদিন আগে একজন জানালো তার কোন এক আত্মীয় এবার দশম শ্রেণিতে পড়ছে। পরিবার চাইছে তাকে বিয়ে দিয়ে দিতে। কিন্তু সে এখন বিয়ের জন্য প্রস্তুত নয়। এদিকে পরিবার উঠে-পড়ে লেগেছে বিয়ে দিবেই দিবে।

আমি ১০০ তে ফোন করে অভিযোগ জানাতে বললাম। ওরা জানে না যে এই নাম্বারে ফোন করে অভিযোগ করা যায়। স্থানীয় পর্যায়, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে তো ধারণাই নেই যে নারীকে কোন প্রকার নির্যাতন, বাল্যবিবাহ কিংবা নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজ করলে সে কোথায় কিংবা কিভাবে অভিযোগ দায়ের করবে।

এই যে এমন অবস্থা সমাজের। এ থেকে উত্তোরণের কোন উপায় আছে কী? সমাজে এখনো অনেক পরিবারেই ছেলে-মেয়েকে আলাদা চোখে দেখে। হয়তো কিছু বিত্তবান পরিবার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে থাকলে ও মধ্যবিত্ত, নিম্ম-মধ্যবিত্ত পরিবার গুলোতে নারীদের ইচ্ছা-মতামতের কোন মূল্যই থাকে না।

এক সময় আমরা বইয়ে পড়েছিলাম, তৎকালীন নারীদের কতটা অসহায়ত্ব আর কষ্টের জীবন ছিল। আর বর্তমানে এখন সে দিক থেকে অনেকটা পথ আমরা এগুলেও কিছু অমানুষের দরুণ আমরা আমাদের সচেতনতা নামক শব্দটিকে হারাতে বসেছি। নারীকে তার মতামত প্রদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছি। সেও তো মানুষ। পুরুষ  বলে আমি আমার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেবো আর নারী বলে সে নীরবে সব সহ্য করবে, এ কেমন কথা।

images-2
আসুন নারীকে তার অধিকার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করি। নারী ঘরের বোঝা নয়, নারী ঘরের অহঙ্কার। দেশে বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হলে প্রতিটি পরিবারকে জেগে উঠতে হবে, জেগে উঠাতে হবে আমাদের মনের ঘুমন্ত মানসিকতাকে।

শুধু আইন দিয়ে রুখে দেয়া যাবে না বাল্যবিবাহ, প্রচারণাও চাই। চাই সমাজে কিছু ভাল মানুষ। যারা নারীর মতামত প্রতিষ্ঠায় অঙ্গিকার বদ্ধ থাকবে। বিজয়ের ৪৬ বছর পর আমরা নতুন একটি বিজয় দেখতে চাই। সে বিজয়টি হল নারীকে সত্যিকারে তার মত প্রকাশের অধিকার দেয়া। জয় হোক বিশ্বের সকল অবহেলিত নারীর।

লেখকঃ রিফাত কান্তি সেন
খন্ডকালীন শিক্ষক, কড়ৈতলী উচ্চ বিদ্যালয়।