ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

received_1369145963197754

তখন ৭১ সাল। আমার জন্ম হয়নি ঠিকই, কিন্তু ইতিহাস থেকে অনেক কিছুই জেনেছি, জানার চেষ্টা করেছি। ইতিহাস কথা কয়। ২৩ বছরের করুণ ইতিহাস বাঙালির নর-নারীর ইতিহাস। কী পেলাম আমরা? হ্যাঁ আমরা পেয়েছি মহান স্বাধীনতা। আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র। আমরা বীরের জাতি। নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পেয়েছি ‘স্বাধীনতা’। পেয়েছি একটি লাল-সবুজ পতাকা। পেয়েছি নতুন একটি ভূখণ্ড, যার নাম প্রিয় ‘বাংলাদেশ’।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস খুব একটা সুখকর নয়। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রায় ৩০ লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতহানি হয়েছিল। অতঃপর মহান নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে আসে প্রিয় স্বাধীনতা, আসে বিজয়।

ইতিহাস ঘাটলে দেখবেন আমরা বীরের জাতি। আবার আমরা শত শোষণ-শাসন আর প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে চলেছি দুর্বার গতিতে। ইতিহাসে রয়েছে শত শত বছর আমাদের বহু দোসররা শোষণ করে এসেছিলো। ইংরেজরা তো প্রায় দু’শ বছর শাসন করেছে আমাদের ভূখণ্ডকে। নীল চাষ করে আমাদের কৃষকদের, আমাদের ভূমি, আমাদের মাতৃভূমিকে নিঃস্ব করে দিতে চেয়েছিল।

একটা জিনিস কী, আমরা কিন্তু কোন যায়গায়ই পরাজয় বরণ করিনি। ৪৭’ শে দেশ ভাগের পর আমাদের ভাষা নিয়ে শুরু হয়েছিলো নতুন কাণ্ড। পশ্চিম পাকিস্তান চেয়েছিল পূর্ব পাকিস্থানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। বাঙালি সেটাও মানেনি। ৫২ ঠিকই আন্দোলন করে ছিনিয়ে এনেছে ভাষা। এরপর ৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট, ৬৬ ছয় দফা, ৭০ এর নির্বাচন, সবিশেষ ৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধ। সব খানেই সফল হয়েছে বাঙালি।

১৯৭১ সালে ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দান, বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, বাঙালির অহংকার, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেষ মুজিব চমৎকার এক ভাষণ দেন। প্রিয় মুজিবের ভাষণে গোটা জাতি এক ছাদের নিচে চলে আসে। কিছু বিষফোঁড়া তখন দেশ বিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকলেও মুজিব সেনাদের নিকট ঠিকই পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল।

received_823611347810284

এ প্রকৃত ইতিহাস তরুণ প্রজন্মের জানা উচিত, পড়া উচিত। আমি নিজেও মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। জন্ম না হলে দেখবো কী করে। তবে ইতিহাস থেকে জেনেছি। পিতা-মাতার মুখ থেকে শুনেছি। তখনকার বীর যোদ্ধাদের মুখ থেকে শুনেছি।

সত্যি অনেক ভাল লাগে তখন, যখন দেখি আমাদের প্রজন্ম সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে লালন করে বেড়ে উঠছে।

বিজয় দিবস এলেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোমলমতী শিক্ষার্থীরা বিজয় উল্লাসে ফেটে পড়ে। অবশ্য তারা বিজয় বলতে বুঝে জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। এর পেছনের গল্পটা যে তাদের জানা নেই। অনেক দাম দিয়ে কেনা আমাদের বাংলা, কারো দানে পাওয়া নয়। আমরা দাম দিছি প্রাণ লক্ষ কোটি জানে জগৎময়।

আমি একটি বিদ্যালয়ের সবচেয়ে ছোট পোস্ট (কর্তৃপক্ষ মনে করেন) গেস্ট টিচার হিসাবে কর্মরত আছি। খুবই অল্প বেতনে চাকরিটা করলেও তৃপ্তিটা তখন পাই যখন কয়েক’শ বাচ্চার মাঝে ইতিহাস বলে বেড়াতে পারি। যখন কোন দিবসে অনুষ্ঠানের আয়োজন হয় ঠিক তখন প্রকৃত ইতিহাস, ত্যাগ, বঞ্চনা আর আমাদের নিপীড়নের গল্প তাদের শোনাই।

এইতো অর্ধশত বছর পূর্বে হেনরী কিসিঞ্জার বলেছিলেন, বাংলাদেশ নাকি তলাবিহীন ঝুঁড়ির দেশ। কিসিঞ্জার জানেই না আমরা বীরের জাতি, আমরা সাফল্যের জাতি, আমরা অহঙ্কারের জাতি।

received_1369145933197757
বিজয় দিবস উপলক্ষে সারাদেশে আয়োজন হয় মনোজ্ঞ ডিসপ্লে। সেখানে শিক্ষার্থীরা ফুটিয়ে তোলে মুক্তিযুদ্ধের নানা ইতিহাস। অবশ্য সেই ইতিহাসটা তাদের জানানোর কারণেই আজ তারা অভিনয়ের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মকে জানান দিচ্ছে।

জয় হোক বাংলার, জয় হোক ১৬ কোটি মানুষের। নতুন প্রজন্ম বেড়ে উঠুক ভাল মানুষের তরে।

রিফাত কান্তি সেন
শিক্ষক, লেখক।