ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

অফিসে ঢুকেই যে ব্যক্তি প্রথমে বলতেন, আমার ক্লাসটা নিয়ে আয়; দুপুরে খাবারের সময় বলতেন, চল থেতে চল; ভুল করলে সেটা সংশোধনের জন্য অবিরাম উৎসাহ দিয়ে যেতেন; তিনি আমার প্রিয় শিক্ষক আনোয়ার স্যার। গত ১৪ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার কড়ৈতলী উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক ছিলেন তিনি। ইংরেজিতে দক্ষতা ছিল খুবই। স্কুল জীবনে স্যারের আদর, স্নেহ আর ভালবাসা পেয়ে বড় হয়েছি। দুরন্তপনা করলেও স্যারের পড়া ঠিক-ঠাক শিখে আসতাম।

ভাগ্য আমাকে স্যারের সহকর্মী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। প্রায় তিন বছরের মত স্যারের সাথে কড়ৈতলী উচ্চ বিদ্যালয়ে চাকরি করার সৌভাগ্য হয়েছিল। স্যার সব সময় আমাকে সুযোগ করে দিতেন। নিজেকে উজাড় করে দিতেন স্যার ক্লাসে। সকল শিক্ষার্থীদের কাছে তাই জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন। প্রায় ২৫ বছরের কর্মজীবনে স্যার অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। আমাদের ভাগ্য আসলেই খারাপ। গত দু-বছরে আমরা তিনজন সিনিয়র শিক্ষককে চিরতরে হারিয়েছি। প্রথমজন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে, দ্বিতীয়জন এবং তৃতীয় জন স্ট্রোক করে ওপারে পাড়ি জমান।

স্যারের প্রতি ভালোবাসাটা একটু বেশি ছিল। কর্মজীবনে এসেও স্যার আমায় খুব আদর করতেন। ভালোবাসার কমতি ছিল না কিছুতেই। এর সাথে ঠাট্টা-মশকরা আর শাসন সবই ছিল মিশে। স্কুল জীবন থেকেই স্যারকে দেখেছি সর্বদা শিক্ষার্থীদের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে। স্যার ক্লাসে নিজের সবটুকু উজার করে দিতেন বলে শিক্ষার্থীদের আলাদা প্রাইভেটও পড়তে হতো না।

সব সময় বলতেন, যা শিখাবি তা যেন শিক্ষার্থীরা মনযোগ দিয়ে শেখে। খেয়াল রাখবি, আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত। শিক্ষক হিসেবে আনোয়ার স্যার ছিলেন একজন প্রকৃত মানুষ গড়ার কারিগর। সেই সুদূর চাঁদপুর থেকে অজো পাড়াগাঁয়ে এসে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন তিনি। সব সময় আমাকে আলাদা চোখে দেখতেন। ভালোবাসেন বলেই হয়তো এভাবে আমাদের কাঁদিয়ে পরপারে চলে গেলেন। স্যারকে নিয়ে ইদানিং কিছু লোক কটুক্তি ছড়ালেও আমি ছিলাম সোচ্চার। একজন শিক্ষকের অমর্যাদা কখনই আমি থাকতে বিনষ্ট হতে দিবনা বলেও স্যারকে বলেছিলাম। স্যারের এ চিরবিদায়ে আমরা কড়ৈতলী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা হারালাম একজন গুণী ব্যক্তিকে। আমরা হারালাম প্রকৃত একজন মানুষ গড়ার কারিগরকে। আমাদের হৃদয়ে আজ বইছে রক্তক্ষরণ। আমরা মেনে নিতে পারছি না আনোয়ার স্যার আর নেই।

স্যারের মৃত্যুর খবর শুনে অনেকেই আমাকে ফোন দিয়েছেন। স্যারের জন্য অনেকে দোয়া করেছেন। একজন শিক্ষার্থী নামাজ পড়ে স্যারের জন্য দোয়া করেছেন। অসংখ্য লোক স্যারের জানাজায় অংশ নিয়েছেন। পরিশেষে তাই স্যারের পক্ষ হয়ে সকলের কাছে কৃতজ্ঞতা পোষণ করছি। ভালো মানুষেরা মৃত্যুর পরও অমর হয়ে থাকেন। কেননা ‘কীর্তিমানের মৃত্যু নেই’।