ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

নুখ্যাং নিংচ ইখিংমা

হ্নাকসে প্যাইংরে অগংখামা

খ্যাসু গা যামা হিরেলে (একলা বসে থাকি যখন, তোমায় মনে পড়ে তখন)

কি মনে পড়ে? মনে পড়ে এক অভিযানের কথা, এক স্বপ্নের মত বাস্তবের কথা আর এক ভয়ংকর সুন্দর অভিযাত্রার কথা। গতবছর বান্দরবনের নাফাখুম জলপ্রাপাত ঘুরে এসেছিলাম, তাই এবছর পুজার ছুটিতে ভাবলাম আবারো নাফাখুম হয়ে আমিয়াখুম আর তাজিংডং ও ঘুরে আসি। অনেক শুনেছি এই প্রাকৃতিক বিস্ময়গুলোর কথা। কিন্তু বান্দরবনের থানচীতে পা রাখতেই আমাদের ট্যুর প্ল্যান পুরোটাই পালটে গেল! প্রতিদিন আসছে শত শত মানুষ! সবাই নাকি নাফাখুম আর তাজিংডং যাবে। সুতরাং প্ল্যান বাদ দেয়া হল। থানচীতে আমাদের গাইড পাতং ব্যোম তখন আমাদের জানালেন আরো ৩টি নতুন জায়গার কথা যার ২টি তে আগে কখনো কোন ট্যুরিষ্ট যায় নি এবং গাইড নিজেই যায়নি। স্থানীয় জুম চাষীদের কাছ থেকে পথের খোজ জেনে যেতে হবে। চলুন তবে ঘুরে আসি ম্রোং খুম আর খোয়াং এর দেশ থেকে!

রেমাক্রিখুম আর নাফাখুমঃ
মারমা ভাষায় খুম মানে হল জলপ্রপাত। পাহাড়ী নদী সাঙ্গু তার বয়ে চলার পথে অজস্রে স্থানে ছোট ছোট জলপ্রাপাতের সৃষ্টি করেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রেমাক্রিখুম এবং নাফাখুম। এই দুটি স্থান সম্পর্কে আগেই লিখেছিলাম বিধায় এখন আর বিস্তারিত লিখছি না। কিভাবে যেতে হয় তার বর্ননা একটু পরে দেয়া হবে।


নাফাখুম
লেইক্ষ্যাং ম্রোং :
ম্রোং শব্দের অর্থ হচ্ছে ঝর্না, আর লেইক্ষ্যাং মানে হল কচ্ছপ ঝিরি। পুরো অর্থ দাঁড়ায় কচ্ছপ ঝিরির ঝর্না।

লাংলক খোয়াং:
খোয়াং অর্থ গুহা, লাংলেক মানে বাদুর। এই বাদুর গুহায় হাজার হাজার বাদুর ছাড়াও হাজার হাজার বিচ্ছু ও দেখতে পাবেন! বাঘাই পাথরঃ এই যায়গাটির নির্দিষ্ট কোন নাম নেই। আমরাই এর নামকরন করেছি বাঘাই পাথর হিসেবে কারন প্রাকৃতিকভাবে এই জায়গার প্রায় সব পাথরই দেখতে বাঘের মত! স্থানীয়রা এই পাথরগুলোকে পুজা করে।

কিভাবে যাবেনঃ
ঢাকা থেকে এই স্পটগুলো ঘুরে আবার ঢাকায় ফিরে আসতে আপনার সর্বনিম্ন ৪ দিন সময় লাগবে। আপনি যদি সময় বাচাতে চান তবে রাতে রওনা দিন। ঢাকা থেকে সরাসরি বান্দরবনের বাস সার্ভিস আছে। এস.আলম , সৌদিয়া , ইউনিক, ডলফিন, শ্যামলী এই ৫টি বাস আপনাকে বান্দরবন পৌছে দেবে, ভাড়া ৪০০-৫০০টাকা। রাত ১১টায় রওনা দিলে বান্দরবন পৌছাবেন সকাল ৬-৭টার মধ্যে। ট্রেনে গেলে আপনাকে প্রথমে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে হবে অতঃপর চট্টগ্রাম থেকে পূর্বানী অথবা পূবালী বাসে আপনি বান্দরবন আসতে পারবেন (ভাড়া ৬০-৯০ টাকা)। এক্ষেত্রে সময় একটু বেশী লাগবে। বান্দরবনে সকালের নাস্তা করে নিন কারন পরে সময় পাবেন না। খাওয়া শেষ? এবার আলহামদুলিল্লাহ বলে থানচি যাওয়ার বাসস্ট্যান্ডে চলে যান। প্রথম বাস সকাল ৮:৩০ মিনিটে। থানচী পর্যন্ত ভাড়া ১৯০ টাকা। সরাসরি জীপ রিজার্ভ করেও যেতে পারেন সেক্ষেত্রে থানচী পর্যন্ত ভাড়া হবে ৪০০০ টাকা। এক জীপে ১২জন অনায়াসে বসতে পারবেন। তবে সমস্যা হচ্ছে থানচী পর্যন্ত এখন সরাসরি বাস বা জীপ যাবে না কারন থানচীর ঠিক ৫ কিমি আগে বলিপাড়ায় রাস্তার এক অংশ ধ্বসে পড়েছে। জরুরী যাতায়াতের জন্য অস্থায়ী রাস্তা বানানো হয়েছে তবে বিজিবি বা সেনাবাহিনীর অনুমতি ছাড়া গাড়ি এর উপর দিয়ে যেতে পারবে না। তাই এ পারে নেমে হেটে অই পারে যেতে হবে এবং ওপার থেকে আবার বাস বা জীপে উঠতে হবে। বাস ভাড়া নতুন করে লাগবে না, জীপ ভাড়া লাগবে। যারা আবার নীলগিরি তে সময় কাটাতে চান তারা বাসে গেলে থানচী যাবার পথে নীলগিরিতে নেমে যেতে পারেন। ১ঘন্টা সময় কাটিয়ে পরবর্তী বাসে চলে আসবে পারবেন আগের টিকিট দেখিয়েই।


মেঘের ভেতর হেটে যাওয়া

রোদ আর মেঘের খেলায় নীলগিরি
থানচি তে আপনি পৌছাবেন বিকাল ৩টায় (যদি প্রথম বাসে যান এবং নীলগিরিতে অপেক্ষা না করেন তাহলে আরো অনেক আগেই পৌছাবেন)।

থানচি যাবার পথের কথাটা না বললেই নয়। এই রাস্তা তৈরির জন্য বাংলাদেশের আর্মি আর বিজিবি জওয়ানদের ধন্যবাদ জানাই। আপনি পার হবেন পাহাড়ের কিনার ঘেষে এক অসাধারন রোমাঞ্চকর, ভয়ঙ্ককর পাহাড়ি রাস্তা যার একটি অংশের নাম “পিক ৬৯”।

এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে উচুতে অবস্থিত রাস্তা। যারা আগে যান নি তাদের বলে রাখি ভয় পাবেন না, এই এলাকার ড্রাইভাররা চোখ বন্ধ করেও গাড়ি চালাতে পারে!


নীলগিরি থেকে থানচি যাবার পথে
বলিপাড়ায় এসে সবাইকে নেমে যেতে হবে, আর যদি রাস্তা ঠিক হয়ে থাকে তাহলে একবারে থানচি চলে যেতে পারবেন।


বলিপাড়া বাজারে আমাদের এক বন্ধু।
থাঞ্চি পৌছে দেখবেন একটি অর্ধসমাপ্ত ব্রীজ। সুতরাং আপনাকে নৌকায় সাঙ্গু নদী পার হয়ে (৫টাকা) অপর পাড়ে থানচি বাজারে যেতে হবে। যারা সাতার জানেন না তাদের ভয়ের কিছু নেই কারন নৌকার মাঝিদের অনেকেই সাতার জানে না!!!!! শীতকালে নদীতে সর্বোচ্চ বুক পর্যন্ত পানি পেতে পারেন তাই ডুবে যাওয়ার ভয় নেই তবে বর্ষাকালে পানি একটু বেশী থাকলেও নৌকায় চুপচাপ বসে থাকলে ২মিনিটেই নদী পার হয়ে যাবেন। যারা ধীরা সুস্থে সময় নিয়ে ট্যুর করতে চান তারা থানচীতে রাতে থাকতে পারেন। থানচী বাজারে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই সে আপনাকে সরকারি গেস্ট হাউজের পথ চিনিয়ে দেবে (ভাড়া জনপ্রতি ৬০ টাকা)। আগে থেকে বুকিং দেওয়া থাকলে ভাল। আর যদি রেস্ট হাউজে যায়গা না পান তবে বাজারে কাঠের চৌকিতে রাত পার করতে পারবেন। যদি কারিতাস বা আশা এই এন.জি.ও গুলোর সাথে পরিচয় থাকে তবে তারা আপনাকে আরো চমৎকারভাবে থাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারে। বিকালে থানচী বাজারে ঝুলন্ত সেতুতে ঘুরে আসতে পারেন আর চাইলে রাতে রাববিকিউ এর আয়োজন ও করতে পারবেন।


থানচী ঝুলন্ত সেতু
নীলগিরি পর্যন্ত মোটামুটি সব অপারেটররের নেটওয়ার্ক পেলেও থানচি তে শুধু একটেল এবং টেলিটক চলবে। আর মোবাইল ক্যামেরা এগুলো থানচী বাজারে যেকোন হোটেলে বসে চার্জ দিতে পারবেন। যারা থানচীতে সময় নষ্ট করতে চান না তারা থানচী পারে নেমেই কিছু খাওয়া দাওয়া করে নৌকা ঘাটে চলে যান। গাইড সমিতি থেকে গাইড ঠিক করে ফেলুন (দিনপ্রতি ৬০০ টাকা দিতে হবে), বিজিবি ক্যাম্পে নিজেদের নাম ঠিকানা এন্ট্রী করুন আর রেমাক্রী যাবার নৌকা ঠিক করে ফেলুন। থানচী থেকে এখন প্রচুর ইঞ্জিন নৌকা পাওয়া যায় যা মাত্র ২ ঘন্টায় আপনাকে রেমাক্রীতে পৌছে দেবে। রেমাক্রী পর্যন্ত যাওয়ার ভাড়া ২৫০০টাকা এবং যাওয়া আসার ভাড়া ৪৫০০টাকা। ভাড়া সমিতি থেকে নির্ধারিত সুতরাং কমানোর সুযোগ নেই। থানচীতে থাকলে খুব ভোরে ৬টা ৭টার মধ্যে রেমাক্রী চলে যান। আর বিকালে ৪টায় রওনা দিলে ৬টা-৬-৩০ এর মধ্যে রেমাক্রী পৌছে যাবেন। মাঝখানে বেশ কয়েকবার নামতে হবে। হাটু পানি কোমর পানি, কাদা, বালি, পাথর হেটে পার হতে হবে খরস্রোতা নদীর মধ্য দিয়ে অথবা পাড় ঘেসে। নৌকা থানচি থেকে চলা শুরু করে তিন্দু গিয়ে থামবে। পথে পানি পিপাসা মেটাতে পারেন ঝরনার পানি খেয়ে। ঝরনা ধারার পানি খেতে পারেন তবে জমে থাকা পানি না খাওয়াই ভাল।


নৌকা থেকে নেমে এমন পথ হেটে যেতে হবে বেশ কয়েকবার
যাবার পথে আরেকটি বাজার পড়বে যার নাম তিন্দু। তিন্দুর একটু সামনেই আছে বিখ্যাত রাজা পাথর। সারাপথ হয়ত ভেবেছেন কি কষ্টটাই না করলাম, হেহে কষ্টের আর দেখছেন কি, সামনে আরো আছে। আসছে “রাজাপাথর”! তিন্দু থেকে রেমাক্রী যাওয়ার শুরুটাই ভয়ংকর, তীব্র স্রোত, আশে পাশে ছড়িয়ে থাকা বিরাট বিরাট পাথর, বাড়ি লাগলে নৌকা ফেটে যাবে। সামনে পাবেন নদীর মাঝখানে প্রায় একটি ট্রেনের বগির সমান এবং আরো উচু কয়েকটি পাথর। দেখে মনে হবে যেন স্বপ্নের কোন জগতে চলে এসেছেন অথবা প্রাগৌতিহাসিক কোন যুগে এসে পড়েছেন। মাঝি আপনাদের এখানে নামিয়ে দেবে, এই উচু নিচু পাথর আর পাহাড়ের সংকীর্ন ধার ঘেষে হাটতে হবে প্রায় ৪০ মিনিট। নৌকায় ২-১জন বসে থাকতে পারেন তবে নেমে যাওয়াটাই ভাল।


রাজাপাথর এলাকা শুরু হল এখান থেকে

স্থানীয়রা এই পাথরটিকে বলে রাজার মাথা

রাজাপাথর এলাকায় এখানেই নেমে হাটতে হবে ৪০ মিনিট

রাজা পাথরের একাংশ
রেমাক্রী বাজারে পৌছার ঠিক আগেই দেখবে রেমাক্রী খুম


রেমাক্রী খুম
রেমাক্রীতে পৌছে বিজিবি ক্যাম্পে আবার নাম লেখাতে হবে অথবা রেমাক্রী বাজারের সর্দার লাল পিয়ম ব্যোমের কাছে বললেই হবে। আমরা লাল পিয়মের নৌকাতেই গিয়েছিলাম বলে নতুন করে নাম লেখাতে হয় নি। রেমাক্রীতে একটি রেস্ট হাউজ আছে। জনপ্রতি ৬০টাকা ভাড়ায় থাকতে পারবেন, তবে একমাত্র রুমটি খালি না পেলে আপনাকে স্থানীয় কারো ঘরেই থাকতে হবে। রেমাক্রি থেকে অন্য কোথাও যেতে হলে আবার আরেকজন গাইড নিতে হবে। গাইড এর জন্য দিনপ্রতি ৬০০টাকা দিতে হবে। সুতরাং গাইড হল ২জন, একজন যে থানচী থেকে এসেছে আরেকজন রেমাক্রি থেকে। যারা নাফাখুম যেতে চান তারা ভোরে রেমাক্রি খাল ধরে হাটা পথে রওনা হয়ে যান। ৩-৪ঘন্টা হাটার পর গন্তব্যে পৌছে দেখতে পাবেন বাংলাদেশের নায়াগ্রা। আর যারা লেইক্ষ্যং ম্রোং যেতে চান তারা এবার চলুন আমার সাথে! ভোরে যত তাড়াতাড়ি পারেন রওনা দিন। নৌকায় রেমাক্রী থেকে ছোট মোদক পর্যন্ত ৩০মিনিটের পথ যেতে হবে। নৌকা থামবে এক ঝিরিমুখে। এই ঝিরির নামই লেইক্ষ্যং বা কচ্ছপ ঝিরি। ঝিরি ধরে প্রায় ৪ঘন্টা হাটা পথের শেষে পাবেন সম্ভবত বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ঝরনা লেইক্ষ্যং ম্রোং!


লেইক্ষ্যং ম্রোং যাবার পথ

লেইক্ষ্যং ম্রোং যাবার পথ

লেইক্ষ্যং ম্রোং যাবার পথ

৪ঘন্টার অমানুষিক পরিশ্রম শেষে যখন ঝর্ণার সামনে এসে পৌছালাম আর হীমশীতল পানির ফোটা যখন প্রায় ৩৫০ ফুট উপর থেকে গায়ে পড়ছিল তখন নিমেশেই দূর হয়ে গেল শরীরের সব ক্লান্তি!


এই সেই লেইক্ষ্যং ঝর্না। শুভলং মাধবকুন্ড দুটোই দেখেছি, নিঃসন্দেহে এটি বাকিগুলোর চেয়ে উচূ।

লেইক্ষ্যং বিজয়ের পর আনন্দিত আমাদের সুখবর টীমের ওয়েব ডেভলপার নাহিদ

এবার শুনুন অ্যাডভেঞ্চারের গল্প। এই যায়গাটিতে আমাদের একজন গাইড আগে কখনো যান নি। আরেকজন গাইড একবার গিয়েছিল ৩ বছর আগে। সে বলল ২ ঘন্টা হাটা পথ। আমরা তাই দুপুরে ১টার দিকে রওনা দিলাম। নৌকা আমাদের ঝিরিমুখে নামিয়ে বলল তারা অপেক্ষা করবে। ১:৩০ থেকে হাটা শুরু করলাম। লেইক্ষ্যং ম্রোং এ যখন পৌছেছি তখন বিকাল ৫টা বাজে প্রায়। এবার ফিরতি হাটা শুরু। সবার মনেই চিন্তা রাত হয়ে যাবে এবং বলতে না বলতেই রাত নেমে গেল ৬টা তেই। মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে শুরু হল বৃষ্টি। ভাগ্যিস আমাদের কাছে ৩টি টর্চ ছিল। এর মাঝে আবার আমাদের এক সংগী ভয়ে হাত পা ছেড়ে শুয়ে পড়ল। তাকে আমরা প্রায় ঘাড়ে করেই হাটা শুরু করলাম। প্রচন্ড ভয়ে সবার মুখ শুকিয়ে আছে। গাইডের কাছে শুনলাম এই জঙ্গলে হরিন তো আছেই সেই সাথে চিতা বাঘ আর বন্য শূকর ও আছে। অন্ধকারে পাথর আর স্রোতের মাঝে হেটে যাচ্ছি লাঠিতে ভর করে। হঠাত ঝুপ করে পাশের পাহাড় থেকে মাটির খন্ড খসে পড়ল। গাইড জানালেন বৃষ্টিতে পাহাড় ধ্বস হয় প্রায়ই! বোঝেন অবস্থা। দ্রুত পা চালালাম। একসময় ক্লান্তিতে হাত পা অবশ হয়ে গেল। কিন্তু মাথায় চিন্তা থাবা গেড়ে বসেছে হাটতেই হবে তাই হেটেই চললাম। নদীর ঘাটে এসে যখন সব শক্তি শেষ করে পৌছালাম তখন বাজে রাত ৯ টা! জুম চাষীদের একটা ঘর ছিল সেখানে। তাদের কাছে আমরা জানতে পারলাম আমাদের নৌকা গত ১ ঘন্টা আগে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে! একজন এই খবর শুনে মাটিতেই শুয়ে পড়ে ঘুমিয়ে গেল। আমরা তখন জুমচাষীদের অনুরোধ করলাম আমাদের রাতে থাকার ব্যাবস্থা আর শুকনো কাপড় দিতে পারবে কিনা। পাহাড়ী এসব সহজ সরল মানুষগুলোর উদারতা দেখতে পেলাম। তারা আমাদের কয়েকটি লুঙ্গীর ব্যাবস্থা করে দিল। আর তাদের ছোট্ট বাশের ঘরটিতে কম্বল বিছিয়ে আমাদের শোবার ব্যাবস্থা করল। রাতে খাবারের আয়োজন হিসেবে দেখলাম স্থানীয় একটি সব্জী মারফা এবং ঝিরি থেকে ধরে আনা কাকড়া রান্না হচ্ছে। মসলা কিছুই নেই, শুধু মরিচ লবন দিয়েই রান্না। প্রচন্ড ক্ষুধার্থ থাকায় সেই খাবারই মনে হল অমৃত। স্থানীয়দের সাথেই আমরা শুয়ে পড়লাম, দুঃস্বপ্নের মত রাত টা কেটে গেল হঠাত করেই।


জুমঘরে বিধ্বস্ত আমরা

জুমঘরে দেব শিশু, ছবি- হাসিবুজ্জামান

পরদিন সকালে জুম ঘরের সামনে
পরদিন সকালে নৌকার মাঝি আমাদের নিতে এসে জানালো বিজিবি তাদের সারা রাত শাসিয়েছে! আমরা যেয়ে যেন তাদের শান্ত করি। নৌকায় করে আবার রেমাক্রী ফিরে এসে বিজিবি সদস্যদের বললাম আমাদের ফিরতে দেরী হয়ে গিয়েছিল এবং আমরা আরো ছবি তোলার জন্য সকাল পর্যন্ত থেকে গেছি। এই অভিজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়।

এবার গন্তব্য ২: এত কষ্টের পরেও ভ্রমের ইচ্ছা কিন্তু বিন্দুমাত্র কমেনি। সকালে নাস্তা করে তাই আবার রওনা দিলাম নতুন গন্তব্যে। যায়গার নাম লাংলক খোয়াং। নামটির অর্থ হল বাদুর গুহা। জায়গাটি খুব বেশী পরিচিত না। ট্যুরিষ্ট কেউ যায় না। বহুদিন আগে এয়ারফোর্সের কিছু সদস্য নাকি এখানে এসেছিলেন ঘুরতে।

রেমাক্রী থেকে নৌকায় ১০ মিনিটের পথে যেতে হয় অংহ্লা খুমী পাড়ায়। নৌকা থেকে নেমে খাড়া পাহাড় বেয়ে খুমী পাড়ায় যেতে হয়। এরপর আরো দুটি দুটি পাহাড়, পাহাড়ের কিনার ঘেসে সরু রাস্তা ধরে প্রায় হাজার ফুট উঠে গেলাম। এবার আবার নামার পালা। কিছুক্ষন নামার পরেই পাওয়া গেল এক ঝিরি আর ঝিরির সামনেই অং ছং খুমী পাড়া। পাহাড় বেয়ে নামার সময় আমরা পাহাড়ী হরিনের ডাক শুনছিলাম। গাইড জানালো এই হরিনগুলোর ওজন নাকি ৫-৬মনের ও বেশী হবে! খুমী পাড়ায় অনেক ফলের গাছ দেখলাম। গাছ থেকে জাম্বুরা আর পেয়ারা পেড়ে খেতে খেতে আবার হাটা শুরু করলাম। খুমী পাড়া থেকে স্থানীয় আরো ৩জন আমাদের সাথে চলল, তারা যাবে বাদুড় শিকার করতে। ২০মিনিট হাটার পর গুহার কাছাকাছি আসতেই বাদুড়ের গন্ধ পাওয়া গেল। এবার ঝিরি পথে একটু গভীর আর অন্ধকার হওয়া শুরু হয়েছে। পাহাড় দুপাশ থেকে চেপে এসে ক্রমশ গুহা তৈরী করেছে। একপর্যায়ে গাইড বলল যারা সাতার জানে না তারা আর সামনে যেতে পারবে না। আমাদের ২জন সঙ্গী বসে গেল। বাকিরা সাতরে রওনা হল ভিতরে। ভিতরে প্রচন্ড অন্ধকার তাই ছবি তোলা যায় নি তেমন। কিছুদূর যেতেই বাদুর দেখা গেল। গুহার শুরুতেই হাজার হাজার বাদুর উলটো হয়ে ঝুলে আছে আর বাদুড়ের সাথে স্বাভাবিকভাবেই আছে বাদুড়ের বিষ্ঠা! পাহাড়ের খাজগুলোতে দেখা গেল বিচ্ছু! গুলতী দিয়ে ৪টি বাদুর শিকারের পর আবার খুমী পাড়ায় ফিরে আসলাম আমরা।


গুহার প্রবেশ পথ

গুহার একটি অংশ

শিকার করা বাদুড়!
এবার ফেরার পালা এবং অবধারিত ভাবেই ফেরার সময় নামল বৃষ্টি। বৃষ্টিতে ভেজা পথে পাহাড় বেয়ে ওঠা যে কি কষ্টের সেটা না উঠলে বোঝানো যাবে না। যাবার পথে গাছের পেয়ারা, সাতকড়া, কলা ইত্যাদি ফল খেতে খেতে গেলাম। যাওয়া আসার মোট সময় ব্যায় হল ২ঘন্টা। রাতে আবার আমরা গাইড পাতং আর পিয়ম ভাইকে নিয়ে গান আর নাচের আসরে যোগ দিলাম!

গন্তব্য ৩: জায়গাটির নির্দিষ্ট নাম নেই। ছোট মোদকের নীচে বাঘের মত পাথর বললে গাইড আর মাঝি আপনাকে নিয়ে যাবে গন্তব্যে। রেমাক্রী থেকে কাছেই যায়গাটা। সময়ের অভাবে আমরা যেতে পারি নি তবে গাইডের কাছে শুনলাম প্রাকৃতিকভাবেই এখানের পাথরগুলো দেখতে বাঘের মত, স্থানীয়রা এই পাথরগুলো কে পূজা করে।

এবার ফেরার পালা। রেমাক্রী থেকে সকাল ৬টায় রওনা দিলে ৮টায় থানচি বাজারে পৌছাবেন। সেখান থেকে বান্দরবনের বাস পাবেন ৮:৩০ থেকে এক ঘন্টা পর পর, দুপুর ২:৩০ পর্যন্ত। বান্দরবন পৌছে হাতে সময় থাকলে স্বর্ন মন্দির ঘুরে আসতে পারেন। ঢাকার ফিরতি বাস পাবেন রাত ৯টা পর্যন্ত। ফিরে এসে আমাদের জানান কেমন লাগল!

সময়ঃ ঢাকা থেকে থানচি হয়ে রেমাক্রী ১দিন, রেমাক্রিতে থাকা এবং ভ্রমন ২দিন বা ৩দিন, পরদিন রেমাক্রী থেকে থানচী হয়ে থেকে ঢাকা এক দিন। মোট ৪-৫ দিন যদি টানা দোউড়ের উপর থাকেন। অথবা আরো একদিন সময় নিয়ে থানচির ঝুলন্ত ব্রীজ, লাল পাথর ইত্যাদি দেখতে পারেন।

দলঃ ৬ জনের দল, বা ১২ বা ১৮ জন ( ৬ এর গুনীতক), কারন এক নৌকায় ৬জন এর বেশী বসা যায় না।

উপযুক্ত সময়ঃ বর্ষায় পানি বেশি থাকে সাঙ্গু তে আবার শীতকালে পানি শুকিয়ে গেলে পথ অনেক বেশি কষ্টকর হয়ে পড়ে। তাই উপযুক্ত সময় হচ্ছে বর্ষার শেষ এবং শীতের শুরুতে। অর্থাৎ অক্টবর থেকে নভেম্বর মাসে।

যা যা নেবেন ঃ কিছু না নিলেই ভাল! এক সেট সর্বোচ্চ ২সেট অতিরিক্ত জামা কাপড় নিতে পারেন, এর বেশি নিলে নিজেই আফসোস করবেন। প্লাস্টিক স্যান্ডেল, মশারোধী odomos cream (ম্যালেরিয়া!!!), খাবার স্যালাইন, প্যারাসিটামল, মেট্রোনিডাজল আর তাতক্ষনিক ডায়রিয়া রোধের জন্য টি-মোটর নিতে পারেন। ক্যামেরা নিলে তা পানির হাত থেকে রক্ষার জন্য পলিথিন ব্যাগ ব্যাবহার করুন।

যা যা নেবেন নাঃ জুতা পরার বিলাসিতা ত্যাগ করুন, অতিরিক্ত জামাকাপড় অবশ্যই নয়, ব্যাগ ভারী হবে এমন কিছুই নেবেন না।

খরচঃ ৫-৬জন এর দল গেলে এবং মোটামুটি কষ্টসহিষ্ণু ভাবে থাকলে জনপ্রতি ৪০০০-৫০০০টাকা খরচ হবে।

রাস্তার যে বর্ণনা দিলাম তার পুরোটাই সময়ভেদে পরিবর্তনশীল সুতরাং কেউ আমার কথা শুনে ঘুরে এসে আমাকে গালি দেবেন না! আগেই বলে দিলাম।

ভিডিও এবং মূল আর্টিকেল

সব ছবি