ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

বঙ্গোপসাগর এবং সুন্দরবন সংলগ্ন কিছু এলাকায় ডলফিন এবং তিমির বিচরন দেখা যায়। সুন্দরবন সংলগ্ন এই এলাকায় তিমি এবং ডলফিনদের উপর গবেষনা চালিয়েছেন দেশীয় গবেষক রুবাইয়াত মনসুর, প্রানী বৈচিত্র্য রক্ষায় সচেতন করেছেন জেলেদের। চলুন তার মুখ থেকেই শুনি তার অভিজ্ঞতার গল্প।

“চোখ রীতিমতো ছানাবড়া হওয়ার উপক্রম। ডলফিনের ঝাঁক যে এত বড়ো হতে পারে, কে জানত! তাও আবার ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের পর্দায় নয়,

রীতিমতো বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায়। এতটাই উত্তেজিত হয়ে পড়লাম যে গবেষণার সব কাজ বাদ দিয়ে ছবি তোলায় ব্যাস্ত হয়ে উঠলাম আমরা সবাই। আমরা মানে ১৪ জনের একটা দল। দলের নেতা ব্রায়ান। আমার সঙ্গে আমার সুইস-আমেরিকান স্ত্রী এলিজাবেথও আছে। বাকীদের বেশিরভাগই শ্রীলঙ্কা, ভারত, মায়ানমার এবং বাংলাদেশের গবেষক। কক্সবাজারের সাগর উপকূল থেকে যাত্রাটা শুরু করেছিলাম ট্রলারে। দ্বিতীয় দিন কক্সবাজার আর সেন্টমার্টিনের মাঝামাঝি আসতেই স্পটেড ডলফিনের ঝাঁকটার দেখা পেলাম।

বিশাল দলটা আবার কয়েকটা ছোট দলে ভাগ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সাগর তলে। এরকম একটা দলে আছে ত্রিশটা-পঞ্চাশটা কিংবা আরো বেশি ডলফিন। উপর থেকে সাগরের নীচে ঘুরে বেড়ানো ঝাঁকগুলোকে দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার। এদিকে ব্রায়ান ট্রলারের উপর বসে আমাদের পাগলামি দেখে হাসছিল। তবে আমাদের এই উচ্ছ্বাসে বাধ না সেধে পানির লবণক্ততা, গভীরতা মাপাসহ গবেষণার সব কাজ করতে লাগল একাই।

আমাদের এই সমুদ্র ভ্রমণের কারণটি একটু খোলাসা করা যাক। পরিকল্পনাকারী, আয়োজক প্রাণীবিদ ব্রায়ান. ডি. স্মিথ। ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি, সিএমএস আর হোয়েল অ্যান্ড ডলফিন কনজার্ভেশন সোসাইটি থেকে অর্থ জোগাড়ের কাজটিও করেছেন তিনি । বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার_এই যে চারটি দেশ বঙ্গোপসাগরের সীমানা পড়েছে একে একে তার সবগুলোর উপকূলীয় এলাকার ডলফিনদের নিয়ে সার্ভে করার পরিকল্পনা তাঁর। আর সে জন্যই এই চারটি দেশের কিছু গবেষককে জড়ো করেছেন। ভ্রমণটা যেহেতু বাংলাদেশের সীমানায়, তাই দলে ভিড়িয়ে নিয়েছেন আমাদের বনবিভাগ আর ফিশারিজের কয়েকজনকে।

আগেই ঠিক করা ছিল কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন যাব। তারপর ভোলা, সন্দীপ প্রভৃতি উপকূলীয় এলাকা পাড়ি দিয়ে চলে যাব একেবারে সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডে। সেখানে অন্তত একটা আস্ত দিন কাটাব।
সুন্দরবনের দুবলার চরের ঠিক দক্ষিণে সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের অবস্থান। এ এক আশ্চর্য এলাকা। হঠাৎ করেই যেন দু’পাশের সাগর তল খাড়া হয়ে নেমে গেছে, জন্ম দিয়েছে গভীর এক গিারখাদের, কোথাও কোথাও যার গভীরতা ৯০০ মিটারেরও বেশি। পটুয়াখালি আসার পর থেকেই কখন সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডে পেঁৗছব ভেবে উত্তেজিত হয়ে উঠলাম সবাই।

যত কাছে আসছিলাম উত্তেজনা যেন ততই বাড়ছিল। সোয়াচে পেঁৗছার আগেই ডিউটিতে থাকার জন্য ব্রায়ানের কাছে ধরণা দিতে শুরু করলাম। কারণ যে দুজন ডিউটিতে থাকবে তাদের হাতেই থাকবে বাইনোকুলার। ফলে অনেক আগ থেকেই সোয়াচের দেখা পাবে সে। ডিউটিতে যারা থাকে তাদের কাজ হলো তিমি বা ডলফিনের ছোড়া পানি দেখলে সংকেত দেয়া।

হঠাৎই একটা জায়গায় এসে মনে হল যেন দুভাগ হয়ে গেছে সাগর। এক পাশে পলিসহ ঘোলা পানি, ঠিক তার পাশ থেকেই শরু হয়ে গেছে স্বচ্ছ নীল জলরাশি। সাগরের পানিতে এই আশ্চর্য রঙের খেলা দেখেই বুঝলাম সোয়াচে পেঁৗছে গেছি। এ যেন অন্য এক জগত। টলটলে পরিষ্কার পানি। তলে দেখা যাচ্ছে গাছের পাতা, ডালপালা। ব্রায়ান বলল, এখানে তিমির দেখা পেতে পারি। কিন্তু সোয়াচের সৌন্দর্যে এতটাই মজে গেছি যে তিমি দেখা না দেখা নিয়ে খুব একটা মাথা ব্যাথা দেখা গেল না কারো মধ্যে।

অল্প পরে অবশ্য সত্যি তিমির দেখাও পেলাম। আমাদের অবজারভার প্রথম পানি থেকে উপরে ফোয়ারার মত জল ছিটকাতে দেখে এঁকে সনাক্ত করল। তারপর ট্রলার নিয়ে চলে এলাম যেখানে ফোয়ারা দেখা গেছে সেখানে। দেখা পেলাম দুটো তিমির। এক একটা চলি্লশ-পঞ্চাশ ফুট লম্বা। বাংলাদেশের সাগরের সীমানায় তিমি – দেখেও যেন বিশ্বাস করতে মন চাইল না। দিনের বাকী সময়টা তিমি দুটোর পিছনে ঘুরেই কাটালাম।”

পরের দিনটাও সোয়াচেই কাটালাম। দেখলাম তিমিদের নানা কান্ডকারখানা। ফেরার সময় মনটা বড্ড খারাপ হয়ে গেল। আবার কবে ব্রায়ান ফান্ড যোগাড় করতে পারবে, আবার গভীর সমুদ্রে যেতে পারব। দূর সাগরে সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড নামে খুব সুন্দর একটি জায়গা আছে, সেখানে তিমি আছে আর সেখানের পানি আশ্চর্য নীল আর অনেক গভীর।

তথ্যসূত্র এবং ভিডিও