ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

একটা সময় ছিল যখন ঠাকুরগাঁও এর মানুষ স্বপরিবারে হলে যেত সিনেমা দেখতে। হলে আসন না পেলেও হলের দরজায় দাঁড়িয়ে সিনেমা দেখতো। দিনে যে ক’টি শো চলতো এবং যতদিন চলতো প্রতিটিতে একইরকম চিত্র দৃশ্যমান ছিল। উপরন্তু দর্শকের অনুরোধে একই সিনেমা আরো অনেকদিন চালানো হতো। দর্শকেরাও একই সিনেমা বারবার দেখতো। কিন্তু বর্তমানে হলগুলোর চিত্র পাল্টে গিয়েছে। আগের মত দর্শক সমাগম নেই। তরুণ প্রজন্মের কেউ কেউ হলে গেলেও স্বপরিবারে হলে যেতে এখন আর দেখা যায় না। বন্ধ হয়ে গিয়েছে ঠাকুরগাঁও এর ছয়টি উপজেলার আলেয়া, মৌসুমি, নাজ, মুন, সুরভী, মুনা টকিজসহ প্রায় ১০টি সিনেমা হল।

20170913_152122

 

20170913_152125

দেখা গেছে  এসব সিনেমা হল ভেঙ্গে তৈরী হয়েছে বিভিন্ন দোকানসহ নাটক ক্লাব। কোনোমতে টিকে রয়েছে হরিপুরের রিনা টকিজসহ জেলা সদরের বলাকা হল। জেলা সদরের ননএসি এ হলটি ডিজিটাল সাউন্ড সিসটেম ও স্ক্রিনে চলছে। প্রায় ৫০০ আসনের হলটির ব্যবসা লাভজনক নয় বলে হল মালিক দর্শক ধরে রাখতে টিকেট মূল্য রেখেছেন- প্রথম শ্রেণী ৫০ টাকা আর দ্বিতীয় শ্রেণী ৩৫ টাকা। তবে সিনেমা ভেদে টিকেট মূল্য কম-বেশি হয়।

একটা সময়ে রাজ্জাক-শাবানার সিনেমা দেখতে দর্শক হলে যেত। তখন মানুষের বিনোদনের কেন্দ্র ছিল হলগুলো। বর্তমানে ঘরে ঘরে টিভি, হাতে হাতে মোবাইল, ইন্টারনেট আসাতে দর্শকেরা হল বিমুখ হয়ে পড়েছে। ঘরে বসেই যদি বিনোদন পাওয়া যায় তবে সিনেমা হলে  কেন কষ্ট করে যাওয়া? নতুনত্বের প্রতি সকলের আকর্ষণ থাকে। দেখা যায় সিনেমা মুক্তির পর পরই সেই সিনেমা ইন্টারনেটে ভাইরাল। উপরন্তু স্থানীয় টিভি চ্যানেলে সেই সিনেমা প্রচার করা হয় এলাকার সিনেমা হলে আসার আগেই। তবে কেন দর্শক টাকা দিয়ে সিনেমা হলে যাবে?

20170911_123819

তাছাড়া বর্তমানে নির্মিত সিনেমাগুলোর মধ্যে কিছু কিছু সিনেমা স্বপরিবারে দেখার মত নয়। সিনেমার কাহিনীও দর্শকদের টানছে না  একেবারেই। সিনেমার কাহিনীতে নেই নতুনত্ব। নেই চমক। অসংগতিপূর্ণ সিনেমাগুলো আসলে কাদের জন্য নির্মাণ করছেন পরিচালকেরা তা অস্পষ্ট। আগে হিন্দি সিনেমার নকল করা বাংলা সিনেমা দেখতেও দর্শকেরা হলে যেত। যদিও তারা ইতিমধ্যে হিন্দি সিনেমাটিও দেখেছিল। কিন্তু বর্তমানে পাইরেসি ও সিনেমা ভাল কাহিনীনির্ভর না হওয়াতে দর্শক বাংলা সিনেমা দেখায় আগ্রহ হারিয়েছে।

২০১৬ সালের হিট সিনেমা আয়নাবাজি দেখতে দর্শকেরা ঢাকার হলগুলোতে উপচে পড়েছিল। দীর্ঘ সারি ছিল টিকেট কাউন্টারগুলোতে। আয়নাবাজি যে কেবল ঢাকার দর্শকদের মাঝেই সাড়া জাগিয়েছিল তা নয়। ঠাকুরগাঁও এর মত প্রান্তের একটি ছোট জেলাতেও  আয়নাবাজি ব্যবসাসফল সিনেমা ছিল। অর্থ্যাৎ ঠাকুরগাঁও এও ভাল সিনেমা দেখার মত দর্শক রয়েছে।

জেলা সদরের বলাকা হলে সোনা বন্ধু সিনেমাটি লেগেছিল ঈদুল আযহার সময়। কিন্তু হল মালিক সুবিধাজনক ব্যবসা করতে পারেননি। স্থানীয় অনেকের মতে সিনেমাটির ভাল ব্যবসা না করার কারণ- ভাল কাহিনীর অভাব। এমনকি সিনেমার কুশলীদের অভিনয়ও জেলার রুচিশীল দর্শকদের টানতে পারেনি।

ঠাকুরগাঁও ছোট একটি জেলা হলেও এগিয়ে রয়েছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে। জেলায় রয়েছে একটি সাধারণ পাঠাগার, শিল্পকলা একাডেমি, নাট্যচর্চা বিষয়ক বিভিন্ন সংগঠন, ব্যক্তিগত উদ্যোগে নির্মিত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অঙ্গন। ভাল সিনেমা হলে এলে ঠাকুরগাঁও এর সামাজিক বিনোদন চর্চায় হলে গিয়ে সিনেমা দেখতে যায় আগ্রহী দর্শকেরা। সারা দেশের মত এ জেলারও তরুণ প্রজন্ম আজ নানা খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়ছে। ধর্ষণ, খুন এবং সন্ত্রাসের মত ঘটনাও চোখে পড়ে এদিকে। একটি সুস্থ সমাজ ও দেশ কেবল তরুণ প্রজন্মই জাতিকে উপহার দিতে পারে। ইন্টারনেটের অপব্যবহারের সাথে জড়িয়ে পরে এবং প্রয়োজনীয় ও সুস্থ বিনোদনের অভাবে আজ তরুণ প্রজন্ম বিপথগামী। চলচ্চিত্র কেবল বিনোদনই দেয় না। কিছু বার্তাও পৌঁছে দেয় দর্শকের কাছে যা হতে পারে শিক্ষনীয়।  চলচ্চিত্রে যখন রাজ্জাক-শাবানা-ববিতা-কবরী এসেছিলেন, তখনকার তরুণ প্রজন্ম সেইসব চলচ্চিত্র শিল্পীদের আইকন আকারে গ্রহণ করে তাদের মত সাজ-পোশাকে ফ্যাশান করতেন। তারপর বহুসময় দেশীয় শিল্পীদের আইকন না হয়ে ওঠায় সেই শূন্যতায় জায়গা করে নেয় ভারতীয় সিনেমা সেলিব্রিটিরা। এখন ঈদের কিংবা পূজায় পোশাক কিনতে গেলে কিরণমালা, পাখি, ঝিলিক এমন সব ভারতীয় সিরিয়ালের নামে মেয়েদের পোশাক পাওয়া যায়। ফ্যাশনেবল চুলের কাট দিতেও পাশের দেশের সেলিব্রিটিদের অনুকরণ করছে আমাদের বর্তমান প্রজন্ম। এমনকি ফ্যাশনের ক্ষেত্রে আমাদের চলচ্চিত্র সেলিব্রিটিরা নতুন কোনো ফ্যাশন ট্রেন্ড গড়ার চেয়ে বরং নিজেরাই বলিউড তারকাদের অনুকরণ করে থাকেন।

সিনেমাকে জনপ্রিয় করতে চলচ্চিত্র তারকাদেরও নিজেদের নানাভাবে ঘষামাজা করা প্রয়োজন। সিনেমা দর্শককে আনন্দ দেয়, অশ্রু আনে, হাসির খোরাক জোগায়, একই সাথে সিনেমা দর্শকের মাঝে ফ্যাশন ক্রেজও জাগিয়ে তোলে। দেশের তারকাদের প্রতি যত আগ্রহ বাড়বে দর্শকদের, তাদের সিনেমার প্রতিও বাড়বে আগ্রহ। এভাবেও সিনেমা উঠে আসবে নিয়মিত আলোচনায় – চায়ের কাপে, বিকেলের আড্ডায়, ছুটির অবসরে।

সিনেমাকে নিত্য জীবনের স্টাইলে যুক্ত করতে সিনেমায় অবশ্যই বিনিয়োগ করতে হবে। বিনিয়োগ করতে হবে তারকায়, কাহিনীতে, প্রযুক্তিতে, পরিবেশনায়, প্রচারণায় এবং অবশ্যই সিনেমা হলে।  ভাল কাহিনীর অভাব আমাদের আজকের সিনেমায় অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু কেবল ভাল কাহিনী নির্ভর সিনেমা হলেও হবে না, প্রয়োজন সেই সিনেমা প্রচারের জন্য অধিক সংখ্যক হলের। একটি নতুন সিনেমা যদি একাধিক হলে মুক্তি পায় তবে বলিউড যেমন একটি সিনেমাতে বাজিমাৎ করে ঢালিউডের সিনেমাও কম কিছু করবে না। ভারতের বক্স অফিসে হিট করা বাহুবলি সিনেমার দ্বিতীয় পর্বে “কাটাপ্পা বাহুবলিকে কেন মারল?” এই গল্প জানতে হলগুলিতে ছিল দর্শকের আছড়ে পড়া ভিড়। প্রথম দিনেই ১০০ কোটি রুপি আয়ের এই সিনেমা ভারতসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে বিভিন্ন ভার্সনে মুক্তি পায়। এর প্রথম পর্ব আয় করেছিল ৬৫০ কোটি রুপির বেশি অর্থ। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস মতে, নানা কারণে আলোচিত ভারতের শীর্ষ নারী সন্ত্রাসী হাসিনা পার্কারের আত্ত্বজীবনী নিয়ে নির্মিত ‘হাসিনা পার্কার’ ২২সেপ্টেম্বর প্রায় ১১০০ হলে মুক্তি পায়। টুইট পোস্টে বক্সঅফিস বিশ্লেষক গিরিশ জোহর বলেন, “মুক্তির প্রথম দিনেই কমপক্ষে ২ কোটি আয় করবে ‘ হাসিনা পার্কার’।”

ভারতে সিনেমা যখন বক্সঅফিস হিট তখন আমাদের দেশে নির্মিত সিনেমাগুলো পর্যাপ্ত পরিমান হলে মুক্তির  অভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। গেল ঈদুল আযহায় মুক্তিপ্রাপ্ত তিনটি চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘অহংকার’ চলচ্চিত্রটি ১১৯ টি হলে, ‘রংবাজ’ ১৬২ হলে ও ‘সোনাবন্ধু ‘ মাত্র ৪০ টি হলে মুক্তি পায়।  পাইরেসির ভয়ে অক্টোবরে মুক্তিপ্রাপ্ত ঢাকা এ্যাটাক মুক্তি দেয়া হয়েছে সারাদেশের মাত্র ১২৩টি হলে। এত কম সংখ্যক হলে সিনেমা মুক্তি পেলে লগ্নিকৃত অর্থ উঠে আসে কতটুকু? আর কত দিনে?

20170911_121111

মানুষের পেটের ক্ষুধা নিবারণের জন্য যেমন আহারের প্রয়োজন, চিত্তের ক্ষুধা নিবারণেও বিনোদনের প্রয়োজন হয়। এই বিনোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে সিনেমা।মানুষ সাধারণত বিনোদনের সেই মাধ্যমটিই পছন্দ করে যেখানে তার জীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে এবং তা দৃশ্যমান। সিনেমার মাধ্যমে মানুষের এই প্রত্যাশা চিত্রায়িত হয়। সিনেমা হল কেবল বিনোদন মাধ্যমই নয়,এক ঘিরে গড়ে উঠে সাধারণ মানুষের রুজির পথ-বিভিন্ন শপিং মল,খাবারের দোকান ও অন্যান্য।

চলচ্চিত্র ব্যবসা সম্ভাবনাময় জেলা ঠাকুরগাঁও এর বিনোদন প্রেমী দর্শকদের হলে ফিরিয়ে আনতে কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে যথাযথ উদ্দোগ। সরকার ইতোমধ্যে প্রস্তাব করেছেন দেশের ৬৪ জেলায় আধুনিক তথ্যকমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। এই কমপ্লেক্সে একটি অডিটোরিয়াম, আধুনিক তথ্যভাণ্ডার এবং সাংবাদিকদের জন্য ওয়াইফাই জোনসহ কম্পিউটার ল্যাব থাকবে (http://dailysylhet.com/details/251443)।আশার কথা হচ্ছে একটি অত্যাধুনিক সিনেপ্লেক্সও থাকছে এই তথ্যকমপ্লেক্সে। ঠাকুরগাঁও এর মানুষ যদি এরকম অত্যাধুনিক সিনেপ্লেক্স পায় তবে এককালে সিনেমা হলে যাওয়ার অভ্যাসটি পুনরুজ্জীবিত হবে। সুতরাং ঠাকুরগাঁও এ হল সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি  ছয়টি উপজেলাতেই সিনেপ্লেক্স নির্মাণে সরকারি উদ্যোগ ও বেসরকারি ভাবে ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসতে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া উচিৎ বাংলাদেশের সিনেমা শিল্পের স্বার্থেই।