ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

মানুষজনকে নেমন্তন্ন খাওয়াতে আমার খুব ভালো লাগে, তার চেয়েও বেশী ভালো লাগে কারো কাছ থেকে নেমন্তন্ন পেলে। আমাকে কেউ নেমন্তন্ন করলে আমি সেটা আনন্দের সাথে গ্রহন করি এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার আপ্রান চেষ্টা করি। প্রবাস জীবনের নিঃসঙ্গতা কাটাতে বাঙ্গালীরা প্রায়ই নানা উছিলায় একটা গেট টুগেদারের আয়োজন করে। ঐ সকল গেট টুগেদারগুলোতে, তা যতই সাধারন হোক না কেনো, সকলেই সেজেগুজে যায়। মেয়ে বা মহিলারা তো সাজেই, সাথে স্বামীটিকেও বাঙ্গালী সাজে সাজিয়ে আনে। তবে সকলেই সাজগোজ নিজের ঘরেই নিজ হাতেই করে। বিউটি পার্লারে যায়না। প্রবাসের গেট টুগেদারগুলোর প্রধান উপলক্ষ হচ্ছে কারো বিবাহ বার্ষিকী নয়তো বাচ্চার বার্থডে. প্রবাসে ছেলেমেয়েরা ক্যারিয়ার নিয়েই বেশী ব্যস্ত থাকে, বিয়ের ব্যাপারে কারোর মধ্যেই তেমন উৎসাহ দেখা যায়না। ফলে আমাদেরও আর বিয়ের নেমন্তন্ন খাওয়া হয়না। অথচ দেশে সকলেই দেদারসে বিয়ের নেমন্তন্ন খেয়ে চলেছে! ফেসবুকে প্রতিদিনই কারো না কারো ওয়ালে সুন্দর সুন্দর বিয়ের ছবি আপলোড হতে দেখি। নিজের বিয়ের ছবি ছাড়াও অনেকেই ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধবীর বিয়ের ছবিও পোস্ট করে। আমার খুব ভালো লাগে ছবিগুলো দেখতে। বিয়ের অনুষ্ঠানে সকলেই ঝলমলে সাজে সেজে আসে, নতুন ডিজাইনের শাড়ীতে, গোল্ড প্লেটেড গয়নাতে, বিউটি পার্লারের মেকাপে প্রতিটি মেয়েকে যেমন ভালো লাগে, তেমনি বলিউডের নায়কদের মত জমকালো ডিজাইনের চুড়িদার, গলায় জয়পুরী কাজের উড়নী, পায়ে আধুনিক ডিজাইনের নাগরাতে প্রতিটি ছেলেকে দেখতেও দারুন ভালো লাগে। ভালো লাগার বড় একটি কারন হচ্ছে বিয়েবাড়ীতে আসা অতিথিদের হাস্যোজ্জ্বল, প্রানবন্ত মুখশ্রী দেখা যায়। আরেকটি ব্যাপার খুব লক্ষ্যণীয়, ছবিতে দেখে মনে হয়না আজকাল কেউ নিজ ঘরে নিজ হাতে সাজে। ছবিতেও মুখে চড়া মেকাপের ছাপ স্পষ্ট বুঝা যায়। যে মেয়েকে আমি কৃষ্ণবর্ণ দেখেছি, তাকেও যখন ঐশ্বরিয়ার মতই ফর্সা মসৃন সাজে দেখি, মন ভালো না হয়ে উপায় আছে! আফসোসও হয়, আহারে! আমাদের তরুন বয়সটাতে ‘বিউটি পার্লারের’ নামই জানতে পারিনি। তখন তো আর এমন ব্যাঙের ছাতার মত অলিতে গলিতে বিউটি পার্লার গজায়নি। পার্লার গজালে মন্দ হতোনা, আমিও নিজেকে একবারের জন্য হলেও ‘ সুচিত্রা সেন’ সাজিয়ে নিতে পারতাম! তবে আমি নিজে নিজেই সাজতে ভালোবাসি, দামী না হলেও সুন্দর কাপড়-চোপর পড়তে ভালোবাসি। কিছু সময়ের জন্য মনটা ভালো থাকে। কোন রকম মালিণ্য মনকে স্পর্শ করতে পারেনা। ইদানিং শুনি ছেলেদের জন্যও আলাদা পার্লার আছে। সেখানে ছেলেরা যায় স্পা তে, মেয়েদের মতো ছেলেরাও ফেসিয়াল করায়। খুবই আশাব্যঞ্জক কথা। ছেলেরাও রূপ সচেতন হয়েছে। সত্যি কথা বলতে গেলে, রূপচর্চ্চা শুধু মেয়েদের জন্যই নয়, সকলেরই উচিৎ নিজেকে আরেকটু ভালোভাবে, সুন্দরভাবে যত্নে রাখা।

এবার দেশে এসে বেশ কয়েকখানা বিয়ের নেমন্তন্ন পেয়েছি। দুই একটা অনুষ্ঠানে যেতে পারিনি নানা কারনে। সময়ের সাথে মিলছিলনা অথবা অন্য প্রোগ্রামের সাথে ম্যাচ করছিলোনা। তবে বেশীর ভাগ অনুষ্ঠানেই উপস্থিত হয়েছি।আমার নিজের মেয়ের বিয়েও দেশে আয়োজন করেছি। তবে নিজের মেয়ের বিয়েতে খুব টেনশানেই কেটে গেছে পুরোটা সময়। অনুষ্ঠান ঠিকমত সম্পন্ন হবে কিনা সে চিন্তাতেই মগ্ন ছিলাম। অনুষ্ঠানে আগত অতিথিদের প্রতি ‘কনের মা’ সুলভ আচরন করতে যেয়ে কারো সাজগোজ, বিউটি পার্লারের মেকাপ, নতুন ডিজাইনের শাড়ী, পাজামা-পাঞ্জাবী, বাচ্চাদের

পোষাকের ঔজ্জ্বল্য খেয়াল করতে পারিনি। আর আমি নিজেতো টেনশানে এতটাই অস্থির ছিলাম যে নিজে সাজ করার সুযোগ পাইনি অথবা ‘কনের মায়ের সাজতে নেই’ ভয়ে সাজিনি। তারপরেও অবিন্যস্ত ছোট চুলেই ক্লিপ দিয়ে বেলী ফুলের মালা জড়াতে ভুলিনি। চুলে বেলী বা রজনীগন্ধার মালা প্যাঁচানোর স্টাইল কলকাতাতে প্রথম দেখেছিলাম। ছোটবেলায় বাবা মায়ের সাথে দুই বছর পর পর কলকাতা বেড়াতে যেতাম। ট্রেনে আসা যাওয়ার পথে বিয়েবাড়ীর যাত্রী অথবা বিয়েবাড়ী ফেরৎ সুন্দরীদের চুলে জড়ানো বেলী বা রজনীগন্ধার মিষ্টি গন্ধে চারপাশ ম ম করতো, সেই স্টাইল এখনও ধরে রেখেছি।

বলতে চাইছিলাম বিউটি পার্লারের গুনবন্দনা। কিভাবে কালোকে সাদা বানায়, শেফালীকে মাধুরী বানায়, ধানমন্ডির ‘রেখা’কে বলিউডের ‘রেখা’ বানিয়ে ফেলে। দুই বছর আগেই আমার এক আত্মীয় বিয়ে করেছে। বিয়েতে আমি উপস্থিত ছিলাম। বিয়ের কনের ছবি দেখেছিলাম অনেক আগে, মিষ্টি মেয়ে। কিনতু বিয়ের আসরে গিয়ে সেই ছবিতে দেখা মেয়েকে চিনতেই পারছিলামনা। একেবারে বলিউডের নায়িকা, ঢাকার নায়িকা নয়। দু’দিন পরে বৌভাতের অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখি বৌকে আরেকরকম লাগছে। পরে জেনেছি দুই অনুষ্ঠানে ভিন্ন পার্লারে সাজানো হয়েছে কনেকে। ১৪ হাজার টাকা অথবা ২০ হাজার টাকা খরচ পড়েছে একেকদিন। পার্লারে সাজার খরচেও রকমফের আছে। ‘ম্যাডাম’ এসে চোখে কাজলের টান দিলে অতিরিক্ত পয়সা আর ম্যাডামের এসিস্ট্যান্ট সাজালে অনেক কম খরচ। যে কনে, সে স্বপ্ন দেখে বিয়েতো একবারই হয়, নাহয় একদিন অমুক ম্যাডামের টাচ পড়লো তার সাজে।ভবিষ্যতে গাল ভরিয়ে গল্প করা যাবে বন্ধুদের সাথে।

বিয়ে বাড়ীতে সকলের সাজই কাছাকাছি ধরনের হয়ে থাকে। আগে মুখের মেকাপ আর চুলের স্টাইলই করতে যেত সবাই পার্লারে। কিনতু ইদানিং দেখি শাড়ী পড়তেও যায় বিউটি পার্লারে। আমিতো জানতাম সাধারনতঃ চুলের স্টাইল করতেই মেয়েরা পার্লারে যায়। আমার ধারনা যে কী পরিমান ভুল, সেটা খুব ভালো টের পাচ্ছি। বিয়ে ছাড়াও বাচ্চার জন্মদিন, বিবাহ বার্ষিকী, বান্ধবীর গায়ে হলুদ, এমনকি কনে দেখার সময়ও মেয়েরা বিউটি পার্লারে চলে যায়। সেদিন গিয়েছিলাম এক বিউটি পার্লারে। বাংলাদেশ থেকেই একটা হেয়ার স্টাইল করে নেওয়ার জন্য। পার্লারে ঢুকেই দেখি ছোট পরিসরের কক্ষটিতে বিয়ের কনে গায়েহলুদের সাজ করে বসে আছে, আর সখীবৃন্দ ক্যাঁচোড় ম্যাচোড় করে চলেছে। সখীদের সাজ দেখে আমার মনটাই খারাপ হয়ে গেছে। সাজ এত বাজে হয়েছে যে ঘরে বসে সাজলে এর চেয়েও ভালো সাজ ওরা নিজেরাই করতে পারতো। পাশে থাকা কাজিনকে জিজ্ঞেস করলাম যে মেয়েগুলোকে অমন যাত্রার ঢঙে সাজালো কেনো? কাজিনের উত্তর, ‘ যে যেমন প্যাকেজ নিবে তার সাজও তেমনই হবে। ওরা হয়তো একেবারে সস্তা প্যাকেজ নিয়েছে”! তাই বলে এমন! হেয়ার স্টাইল ওখান থেকে করাইনি। বেরিয়ে অন্য দোকানে চলে গেছিলাম। অন্য দোকানে যাওয়ার কিছুক্ষন পরেই দরজা ঠেলে ঢুকলো নাক মুখসহ আগাগোড়া কালো বোরকায় আবৃত দুই জন। বোরকার ঢাকা না খুলেই একজন হেয়ার ড্রেসারকে বলছে, ” ইনি আমার মামী, এনার ভুরু ঠিক করি দ্যান”। ভাগ্নীর কথা শেষ না হতেই মামী বোরকার মুখ খুলে ফেলেছে। মামীটা খুব সুন্দর দেখতে। আমি দারুন চমৎকৃত হলাম।পারিবারিক চাপে হয়তোবা মামী নাক মুখ ঢেকেই চলাফেরা করে, কিনতু সাজগোজের প্রতি নারীর দূর্বলতাই নারীকে এখানে এনেছে।

বিয়েতে গিয়েছি, মেয়ে বা মহিলাদের দিকে তাকিয়েও থেকেছি, সকলের আনন্দ উচ্ছ্বাস দেখে মনটা ভরে গেছে। কারো কারো সাজ খুবই পরিমিত আবার কারো মুখে প্রয়োজনের অতিরিক্ত মেকাপ। এক সুন্দরী মেয়েকে দেখলাম, নীল জর্জেট শাড়ীর রঙ যতটা নীল, তার চেয়েও বেশী নীল মেয়ের চোখের পাতার মেকাপের রঙ। মেয়েটির দিকে তাকানো যাচ্ছিলনা। কিন্তু সবাই খুব আনন্দ করছে দেখে এইসব ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাইনি। ছেলেদের অনেককেই দেখি আমির খান স্টাইলে দাড়ি রাখে, দারুন স্মার্ট পাঞ্জাবী গায়ে সকলকেই ভালো লাগছিলো। আমি নিজেও মনের আনন্দে সেজেগুজে বিয়ে খেয়ে এসেছি। তবে আমি কোন বিউটি পার্লারে যাইনি, নিজের মত করেই সেজেছি। কালো চামড়া সাদা করিনি, মাথার চুলে কলপ দেইনি, তারপরেও মহানন্দে কাটিয়েছি। একবার ভেবেছি বিউটি পার্লারে গেলে মন্দ হতোনা । ইদানিং বিউটি পার্লারের খুব রমরমা, ভীড় লেগেই থাকে, যখন ইচ্ছে গেলেই সব পাওয়া যায়না। লাইন ধরে বসে থাকতে হয়। বিয়ের কনেকে সাজাতে হলে ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট পাওয়ার মত করে বিউটিশিয়ানের এপয়েন্টমেন্টও নিতে হয়। আমার মেয়ের খুব শখ ছিল একেবারে রবীন্দ্রযুগীয় মেকাপ নেয়া। পনের দিন আগে এপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়েছে। বিয়ের দিন আমার মেয়ে পার্লারে গেছিল চার ঘন্টা সময় হাতে নিয়ে। চার ঘন্টা পর পার্লার থেকে বের হয়েছে রবীন্দ্র নায়িকা হয়ে।