ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

অনিন্দ্য অন্তু রায় সম্পর্কে আমার মাসতুতো ভাই। নটরডেম কলেজে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ২০০১ সালে সে ছিল খুবই ছোট। ছয় বছরের দারুন বুদ্ধিমান এক বাচ্চা। সে বছর আমরা বেড়াতে গিয়েছিলাম ভারতের ভিসাখাপট্টনামের ভাইজাগ শহরে। আমার বড়মামা ওখানে জাহাজ কোম্পাণীতে চাকুরী করতেন। এই জীবনে যত জায়গা বেড়িয়েছি, ভাইজাগ হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ দর্শনীয় স্থাণ। ভাইজাগে পাহাড় এবং সমুদ্র আপন দুই বোনের মতই মিলেমিশে আছে।

ভিসাখাপট্টম হচ্ছে দক্ষিন ভারতের অংশ। দক্ষিন ভারতের আবহাওয়া মানেই প্রচন্ড গরম। আমরা জানুয়ারী মাসে গেছিলাম, তখন প্রচন্ড গরম না হলেও গরমই ছিল। তার উপর খাওয়া দাওয়ায় সমস্যা হচ্ছিল। বিশেষ করে আমার আর অন্তুর। আমি এর আগে বাঙ্গালী খাবারের বাইরে একমাত্র নেপালী খাবারই খেয়েছিলাম। অভিজ্ঞতা ভাল হয়নি। আমি আর আমার এই ছোট্ট ভাই একেবারেই কাঠ বাঙ্গাল। অন্তুকে শুধু কাঠ বাঙ্গাল বললে ভুল হবে, সে হচ্ছে ‘সিলেটি’ বাঙ্গাল। ‘সাতকড়া’ ছাড়া কিছুই চিনেনা। অথচ তার মা, মানে আমার ছোটমাসী খাবার দাবারের ব্যাপারে খুবই নমনীয়। সব ধরনের খাবার সে পছন্দ করে। আমার মাসী তার বিয়ের বেশ কয় বছর আগেই ভাইজাগ বেড়িয়ে এসেছে। আমাদের কাছে ধোসা, ইডলি, সাম্বার, লেমন রাইস, টেমারিন (তেঁতুল) রাইস, রসম, বাটার মিল্কের গল্প করেছে। মাসী আমাদের বন্ধু, কাছাকাছি বয়সী। তার মুখে এসব গল্প শুনতাম আর গোগ্রাসে গিলতাম। তার কাছেই শুনেছি, প্রচন্ড গরমের কারনেই মানুষ টক খাবারে তৃপ্তি পায়। বিকেলে বেড়াতে বের হয়ে রাস্তার পারের দোকান থেকে গ্লাসভর্তি বাটারমিল্ক খেয়ে সবাই বাড়ী ফিরে। আমরা তখন জানতাম না টক দইয়ের পাতলা ঘোলকেই বাটার মিল্ক বলে।

মাসীর কাছে গল্প শুনেছি আমাদের কিশোরবেলায়, আর ২০০১ সালে আমাদের শিশুদেরকে নিয়ে গেছি সেই টক খাবারের দেশে। ওখানে মামার বাড়ীতে আদরের শেষ নেই। মামী কত যত্ন করে এবেলা ধোসা খাওয়ান তো ওবেলা খাওয়ান লেমন রাইস। আজকে লেমন রাইস খাইয়েছেন তো পরেরদিন টেমারিন রাইস খাওয়ান। বাইরে বেড়াতে নিয়ে যান, সাথে নিয়ে যান জিরা রাইস, সাম্বার, রসম, সাওয়ার চিকেন। কখনও বিকেলে হাঁটতে গিয়ে ফেরার পথে বাটার মিল্ক ( টক দইয়ের পাতলা ঘোল) খাওয়ান। এভাবে পাঁচদিন কেটে গেছে। আমি এমনিতেই টক খাবার খেতে পারিনা, আমার একটু কষ্টই হচ্ছিল। কিন্তু মাসী আর আমার মেয়ে শুরুতেই ঘোষণা দিয়ে বলেছে তারা টিপিক্যাল সাউথ ইন্ডিয়ান খাবার খেতে চায়। ফলে আমি চুপ করে খেয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ করেই এক সন্ধ্যায় পানিপুরী (ফুচকা) খেতে গিয়ে প্রথম প্রতিবাদ করলো ছয় বছরের অন্তু। সে আধা সিলেটি আধা নারায়নগঞ্জি ভাষা মিলিয়ে বলতে লাগলো, ” এইতা খানি আর খাইতামনা। কেমুন দ্যাশে আইলাম, দ্যাকলায়নি তুমরা, এইহানের সবই চুক্কা। ভাত চুক্কা (লেমন এন্ড টেমারিন রাইস), ডাইল চুক্কা (সাম্বার), দুধ চুক্কা ( বাটার মিল্ক), পানিও দেহি চুক্কা ( লিমকা)। এই চুক্কা দ্যাশে আর থাইক্কা কাম নাই, বাংলাদেশেই চলো “। এই কথা বলে আর জোরে জোরে কাঁদে। ওর প্রতিবাদের সাথে একমাত্র আমি একাত্মতা ঘোষণা করেছিলাম।

এই ঘটনা এতদিন পরে আবার মনে পড়লো। আমার মেয়ের বিয়ে হয়েছে নেপালের ছেলে মনীশের সাথে। নেপালের কালচার আমাদের থেকে একটু আলাদা হবে, সেটাই স্বাভাবিক। খাবার দাবারও আলাদা হবে, সেটাও স্বাভাবিক। ”৯২ সালে আমরা নেপাল বেড়াতে গেছিলাম। ওটাই ছিল আমার প্রথম বিদেশ সফর। ভিনদেশী খাবার সম্পর্কে কোন ধারনা ছিলনা বলেই সেযাত্রা নেপালে খেয়ে সুখ পাইনি। সব কিছুতেই টম্যাটো আর অতিরিক্ত লবনের স্বাদ পেয়েছি। আমি টক যেমন পছন্দ করিনা, লবনও কম খাই। অবশ্য পরবর্তীতে নানা দেশ ঘুরে ঘুরে নানা দেশের খাবারের সাথে পরিচিত হয়েছি। তারপরেও টক আমি পছন্দ করিনা।

দুইমাস আগেই দেশে গিয়ে মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। মেয়ে শ্বশুরবাড়ী চলে যাওয়ার পর ওর সাথে দেখা হয়নি। গত সপ্তাহেই দেশ থেকে ফিরে দু’দিন হলো ডালাসে মেয়ের বাড়ীতে বেড়াতে এসেছি। আজ মনীশের ছুটি ছিল বলে ও রান্না করেছে। আমরা আসব জেনে ও নিজের হাতে প্রচুর বাজার সদাই করে এনেছে। মাত্র দেড় ঘন্টায় স্বামী স্ত্রী দুজনে মিলে পাঁচ ছয় রকমের আইটেম রান্না করেছে। সবই নেপালী স্টাইলে। আমি আগেও আমাদের নেপালী বন্ধুর বাড়ীতে অনেকবার খেয়েছি। ঐতো টক আর নোনতা হয় ওদের খাবার। আজকেও প্রতিটি আইটেমেই টম্যাটো বা লেমন জুসের ব্যবহার ছিল, যদিও রান্নায় বেশ বৈচিত্র্য ছিল। মেয়ে জামাই এত যত্ন করে রেঁধেছে বলেই টক হলেও খুবই প্রফুল্ল চিত্তে সব খেয়ে নিয়েছি।

বিকেলে আমাদেরকে শহর ঘুরিয়ে দেখিয়ে বাইরে ডিনার করাবে বলে আগেই ওরা জানিয়ে দিয়েছিল। আমাদের কোথায় খাওয়ার ইচ্ছা সেটা জিজ্ঞেস করতেই ছোট মেয়ে মিথীলা বলে দিল, ” বাংলাদেশী, ইন্ডিয়ান, নেপালী, পাকিস্তানী রেস্টুরেন্ট ছাড়া যে কোন জায়গায় যেতে রাজী আছি”। আরেক মেয়ে মিশা বলল, ‘জাপানীজ খেলে কেমন হয়”? মনীশ বলল, ” মাসী (আমাকে মাসী ডাকতে বলেছি) কোথায় খাবে’? আমাকে নিয়ে কেউ মাথা ঘামালোনা। কারন মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। বাংলাদেশী বা ইন্ডিয়ান কোন ক্যুজিনই ওদের পছন্দ নয়। মিথীলাকে একটু কাত করার চেষ্টায় বললাম, ” মিথীলা তুই এভাবে বাঙ্গালী খাবার না করে দিলি”? মিথীলার জবাব, ” বাঙ্গালী খাবার তো ঘরেই প্রতিদিন খাচ্ছি, বাইরেই যদি খাব তবে অন্যরকম খাই’। ভোটে মিথীলা জিতে গেল।

মৌটুসী প্রস্তাব দিল, “ইথিওপিয়ান খাবে নাকি মিডল ইস্টের খাবার খাবে”?
মেয়ের বাবা বললো, ” ইথিওপিয়ান খাবনা। ইথিওপিয়া নাম শুনলেই চোখের সামনে যে দৃশ্য ভেসে উঠে তাদের খাবার কেমন হবে কে জানে”!

মৌটুসী, মিশা তাদের বাবার এমন উত্তরে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে আর কি! গেলাম মিডলইস্টের এক রেস্টুরেন্টে। আমার বড় মেয়ে সব সময় রেস্টুরেন্টে খেতে ভালোবাসে এবং খায়। এর পরিনাম নিয়ে মোটেও চিন্তিত না। কাজেই শহরের সমস্ত রেস্টুরেন্টের ঠিকানা তার নখদর্পনে থাকে।

মিডলইস্টের রেস্টুরেন্টে ঢুকে আমার মাথাটা গরম হয়ে গেছে। দূর থেকেই দেখছিলাম ট্রে হাতে করে একেকজন লাইনে দাঁড়াচ্ছে আর ভেতর থেকে সার্ভাররা সার্ভ করছে। আমি মাথামুন্ডু কিছুই বুঝছিলামনা। এটা কি বুফে নাকি অর্ডার কিছুই না বুঝে ট্রে হাতে আমিও লাইনে দাঁড়িয়েছি। কাঁচের আড়ালের ওইপাশ থেকে একেকজন জিজ্ঞেস করে ,” এটা দিবো, ওটা দেবো”? বলে। আমি আমার মেয়েকে জিজ্ঞেস করি, এগুলো কি খাবার তাওতো বুঝিনা, আন্দাজে কি নেবো। মেয়ে বলে তোমার ইচ্ছেমত তুমি নাও। মাথাটা গরম হয়েছে এই কারনেই। আমিও সবই নিলাম। একটা খাবার শুধু চিনতে পারলাম, ভাত। বাকী সব ভেজিটেরিয়ান খাবার, তারপরেও খাবারের চেহারা সুরত দেখে আমার মেয়ের উপর রাগ উঠতেছিল। তারা আবার মুরগীর রোস্ট নিয়েছে। আমাকে নিতে বলেছে, আমি কোন জবাব না দিয়ে ট্রে হাতে টেবিলে চলে এসেছি। এরপর খাবার একটু করে মুখে দেই আর চোখ মুখ কুঁচকে ফেলি। সবকিছু টক।

হামাস নামে যে আইটেম দিয়ে খেতে শুরু করেছি, সেটা টক লেগেছে বলে বেগুনের একটা আইটেম মুখে দিতেই আমার জিভটা যেন অসাড় হয়ে গেছে। কী ভীষন টক খেতে! একমাত্র এসিডই এমন টক হতে পারে। এত পয়সা খরচ করে এমন টক খাবার খেতে গিয়ে অন্তুর কথা মনে পড়ে গেছে। আমিতো আর অন্তুর মত ছোট নই, তাই কাঁদতেও পারছিলামনা। তবে রাগের চোটে ট্রে সরিয়ে দিয়ে বললাম, আমার খাওয়া শেষ। তোমরা খাও আমি দেখি। মৌটুসী আর মনীশ দুজনেই অপ্রস্তুত হয়ে গেছে। মৌটুসী জিজ্ঞেস করে, “খাবার তোমার ভালো লাগেনি”? বললাম, “না, একটুওনা”। ওরা বলল, ‘এটা অনেক দামী একটা রেস্টুরেন্ট, এখানকার খাবার সবাই পছন্দ করে”। বললাম, “দামী রেস্টুরেন্ট তো আমার কি হইছে? এর চাইতে ভাল রান্না তো আমার দেশের বুয়ারাও করতে পারে। কোন কথা নাই বার্তা নাই সব কিছুতেই টম্যাটো নাহয় টক দই দিয়ে রাখে। আমার দিনটাই আজকে টক ছিল। ইশ! অন্তুটা কাছে থাকলে হইতো। টক খাওয়ার মজা বের করে দিত”।

[ পরিশেষেঃ আসলে দেশ থেকে ফিরে এসে প্রথম একমাস মেজাজ খিটমিটে থাকে। সবকিছুতেই দেশী ছোঁয়া খুঁজি, না পেয়ে হাতের কাছে আসামী তিন মেয়েকে পাই, সব ঝাল এদের উপর দিয়ে ঝাড়ি]।