ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

১) দারোগা স্ত্রীঃ

দুই তিনদিন আগের কথা। আমি আমার কাজের ফাঁকে ওয়ালমার্টের সেলস ফ্লোরে হাঁটাহাঁটি করছিলাম। ওয়ালমার্টের চাকুরীর শর্তই এমন। একমাত্র টি ব্রেক অথবা লাঞ্ছ ব্রেক ছাড়া কেউই সেলস ফ্লোর ছেড়ে কোথাও যেতে পারেনা। আমি হাঁটতে হাঁটতে ল্যান্ডফোন ডিসপ্লে গ্রাউন্ডের পাশ দিয়ে যেতেই মাঝারী বয়সের এক দম্পতীকে দেখলাম, হন্যে হয়ে কী যেনো খুঁজছে। একটু এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ মে আই হেল্প ইউ”? আফ্রিকান আমেরিকান ওরা। ভদ্রলোক বিশাল লম্বা চওড়া দেখতে, আর ভদ্রমহিলা গড়পড়তা দৈহিক গড়নের। যদিও ব্ল্যাক পিপলদের কথা বুঝতে একটু কষ্ট হয় (ওরা সাউদার্ণ একসেন্টে কথা বলে। ঠিক যেমনটি আমাদের দেশেও অনেকেই আঞ্চলিক টানে কথা বলে, তেমনি), কিনতু তাদের কথা বুঝতে আমার কোন সমস্যা হচ্ছিলনা। ওদের সাথে কথা বলে বুঝলাম ওদের বাড়ীর টেলিফোন কাজ করছেনা, তার জন্য ব্যাটারী চাই। জানতে চাইলাম, ওদের সাথে টেলিফোন অথবা পুরানো ব্যাটারী আছে কিনা। জবাবে এক টুকরো কাগজ বের করে তাতে ব্যাটারীর নাম্বার দেখালো। দেখলাম ঐ নাম্বারের ব্যাটারী আমাদের স্টকে নেই। কাছাকাছি নাম্বারের আছে, তবে হুবহু নেই। এ ধরনের পরিস্থিতিতে পুরানো ব্যাটারী সাথে থাকলে ভাল হয়, দেখে ম্যাচ করানো যায়।

স্বামী তার স্ত্রীকে বললো, ” এখানে আসার আগে ফোনটা নিয়ে আসার কথা মনে ছিলনা”?
বউয়ের উত্তর, ” তখনতো বুঝিনি, ব্যাটারীর নাম্বার লিখে নিয়ে চলে এসেছি”।

স্বামী,” কিছুই আগে থাকতে বুঝনা। ফোনের ডিজাইনটা কেমন সেটা মনে করতে পার, না-কি তাও পারোনা”?
এবার স্ত্রী শরীর ঘুরিয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়েই এক ঝামটা, ” এই বেটা (ম্যান), ফোনটা কি একা আমি ব্যবহার করি? তুমি করোনা? ফোন হাতে তো তুমিই বসে থাক। তুমিই বলোনা ফোনের ডিজাইন কেমন? নিজেতো কিছু পারোনা, আবার আমার উপর মাতব্বরী করতে আসছো”!

স্বামী আমতা আমতা করে, ” মধুময়ী (হানি), মানে বলছিলাম ফোনের ডিজাইনটা যদি মনে থাকতো তোমার, তাহলে ভালো হতো”।
স্ত্রী আমার দিকে চোখ টিপে আস্তে করে বললো, ” বেটাচ্ছেলে শক্তের ভক্ত। একটা ধমকীতেই দেখো কেমন মিঁউ মিঁউ করছে”।
আমি হাসি আর মনে মনে বলি, স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক পৃথিবীর সব দেশেই এক রকম।

২) জাঁদরেল স্বামীঃ

আমাদের ফোন সার্ভিস ডিপার্টমেন্টে এসে গ্রাহকরা দুই বছরের ফোন সার্ভিস কনট্র্যাক্ট নেয়, আবার প্রিপেইড ফোন সার্ভিসও নিতে আসে। আজকেই একটি পরিবার এসেছে আমাদের কাছে। তবে এরা ফোন কিনতে আসেনি, ফোন ফেরত দিতে এসেছে। আমাদের পলিসিতেই আছে, ফোন কেনার ১৫ দিনের মধ্যে রিসিট, ফোন বক্স, চার্জারসহ যদি নিয়ে আসে, আমরা তা ফেরত নিয়ে নেই। আজকের দম্পতী সাদা আমেরিকান। সাথে তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে এসেছে। ভদ্রমহিলা রিসিট খুঁজে পাচ্ছিলনা। তার হাতব্যাগ আতিপাতি করে খুঁজছে, কিনতু রিসিট নেই। পাশে দাঁড়ানো স্বামী হঠাৎ করেই এক হুংকার দিয়ে উঠলো, ” রিসিট ফিসিট সাথে না নিয়ে কোন আক্কেলে তুমি আসছো”?

বউ একটু ঢোঁক গিলে বললো, ” মধু (হানি), এত উত্তেজিত হচ্ছো কেনো? এখুনি পেয়ে যাবো”।
স্বামী,” রাখো তোমার হানি, আমার মান ইজ্জত চলে যাচ্ছে”

আমি বললাম, ” অত তাড়াহুড়োর কিছু নেই। তুমি ব্যাগ খুলে একটা একটা করে জিনিস বের করে এখানে রাখো। পেয়ে যাবে”। ভদ্রলোকের দিকে তাকাতে সাহস পাচ্ছিলামনা। তার সারা হাতে ড্রাগন ট্যাটু করা দেখে আমিই ভয় পাচ্ছিলাম।

কিনতু মহিলার কপাল খারাপ, রিসিটটা পাচ্ছিলনা, সস্তা দামের জিনিস ‘কাস্টমার কার্টেসি’ দেখিয়ে আমরা রিসিট ছাড়াই ফেরত নেই। কিনতু ২৫০ ডলার দামের ফোন রিসিট ছাড়া আমরাও নিতে পারবোনা। এবার স্বামীটা কাছে এসে বউয়ের হাতে এক হ্যাঁচকা টান মেরে বললো, ” এই ফোন এইখানেই রেখে যাবে। রিসিট নাইতো নাই, ফোনটা আমি কিনে দিছিলাম তোমারে, তোমার গায়ে লাগে নাই, তাইনা? বদলাইয়া আরেক কিসিমের ফোন নিতে আসছো”।

বাচ্চা তিনটি ভয় পেয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। আমিও কিংকর্তব্যবিমূঢ়। মহিলাটার লজ্জা ও ভয় পাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে আমার খুব খারাপ লাগছিল। আমিই ভদ্রলোককে বললাম, ” আপনি শান্ত হোন। দেখি আমি কিছু করতে পারি কিনা”, বলেই ম্যানেজারকে ফোন করে আসতে বললাম।

ভদ্রলোক ততক্ষণে বাচ্চাদের হাত ধরে অন্যদিকে হাঁটা ধরেছে। বাচ্চা তিনটি পেছন ফিরে মায়ের দিকে তাকাচ্ছিল বারবার। এটা দেখে বাপ বলল, ” তোমাদের মা হারিয়ে যাবেনা। তার একটা শিক্ষা হওয়া দরকার। জিনিস কিনেই দুই দিন পরেই ফেরৎ নিয়ে আসা আমি কখনও পছন্দ করিনা। তার উপর রিসিট হারিয়ে বসে আছে। তোমাদের মায়ের তো এভাবে আসা উচিৎ হয়নি। তাকে থাকতে দাও একা একা, বুঝুক ঠ্যালা”।

মহিলার এমন চুড়ান্ত অপমান দেখে আমার চোখে ভেসে উঠেছিল আমাদের দেশের অসহায় মেয়েদের মুখ। আমি ম্যানেজারকে বুঝিয়ে বললাম, ” আমি জানি সে ফোনটা গত সপ্তাহে কিনেছে। ১৫ দিন পার হতে দেরী আছে। তার রিসিটটা হয়তো সে বাড়ী গিয়ে খুঁজে পাবে, আমরা কি এটা ফেরত নিতে পারি”? ম্যানেজার শেষ পর্যন্ত স্টোর ম্যানেজারের অনুমতি নিয়ে ‘কাস্টমার কার্টেসি’ হিসেবেই মহিলাকে টাকা ফেরৎ দিয়ে দিল।

মহিলা যাবার সময় আমাকে জড়িয়ে ধরে ‘ আমার বোন, আমার বোন’ করতে লাগলো। আমি তাকে হাসিমুখে বিদায় করতে পেরে নিজেও খুশী হলাম।