ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

আজ আমার মনটা বেশী ভালো ছিলনা। দুপুরে অফিস যাওয়ার ঠিক আধঘণ্টা আগেই দেশ থেকে ফোন আসে মায়ের অসুস্থতার খবর নিয়ে। মাত্র চারদিন আগেই আমার মায়ের হিস্টেরেক্টোমি হয়েছে (ইউটেরাস অপারেশান)। অপারেশনের পরে প্রথামত ফেলে দেয়া ইউটেরাস থেকে টিস্যু নিয়ে বায়োপসি করতে পাঠানো হয়েছিল। যার রিপোর্ট এসেছে আজকে এবং তা পজিটিভ। মানে ইউটেরাসে ক্যান্সার সেল পাওয়া গেছে। আমি আমার মায়ের একটা মাত্র মেয়ে, মাত্রই দুই সপ্তাহ আগে দেশ থেকে ফিরলাম। মন চাইছে এক ছুটে দেশে চলে যাই। ভাইগুলো একা একা কতটুকু সামলাবে? কিনতু কিভাবে পারবো? ছুটির মেয়াদ শেষ, চাকুরীর বাজার মন্দা। একটা গেলে আরেকটা পেতে ঘাম বের হয়ে যাবে। তাছাড়া সংসার ছেড়ে কতদিনের জন্য দূরে থাকবো? আমিও যে তিনটি মেয়ের মা। আমি আর ওদের বাবা ছাড়া এখানে ওদের আপন বলতে যে আর কেউ নেই!

আমাদের পরিবারে নিজেদের মধ্যে বন্ধন খুব দৃঢ়। প্রাথমিকভাবে আমরা তিন ভাই, এক বোন হলেও আমাদের ‘তুতো’ ভাই বোনের (কাজিন) সংখ্যা অনেক। বিশেষ করে আমাদের আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে পুত্র সন্তানের আধিক্য বেশী। (একমাত্র ব্যতিক্রম আমি। আমার কোন পুত্র সন্তান নেই, তিনটি কন্যা আমার।) ‘তুতো’ ভাই বোনেরা সম্পর্কে ‘তুতো’ হলেও এরা মায়ের পেটের ভাইবোনের মতই। এমনই এক দৃঢ় পারিবারিক বন্ধনে আমরা সকলেই বাঁধা। বাংলাদেশে আমাদের পরিবারের মূল শেকড় থাকলেও পাশের দেশ ভারতের নানা প্রদেশে আমাদের পরিবারের ডালপালা ছড়ানো আছে। কেনো ভারতে আমাদের ডালপালা ছড়িয়েছে তা ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলেই জানা যাবে। তবে ইতিহাসের পাতা ঘাঁটাওলে যা জানা যাবেনা, তা হচ্ছে শুধু ভারত নয়, পৃথিবীর যে কোন প্রান্তেই আমাদের শেকড় বিস্তৃত হয়েছে, সর্বত্রই আমাদের নেট ওয়ার্ক মজবুত।

এই যে আমার মায়ের অসুখটা হলো, আমার আগেই ওখানে দৌড়ে যাবে আমার ‘তুতো’ ভাই-বোনেরা। তারা সকলেই মনপ্রাণ ঢেলে মায়ের সেবা করবে। এতো গেলো ‘তুতো’ দের কথা। এবার আসি নিজ ভাইদের কথায়। আমার তিন ভাই। সবার বড় ভাই আর আমি থাকি বৈদেশে। আমার মেজভাই আর ছোট ভাই থাকে দেশে।

আমার প্রথম সন্তান যখন জন্মালো, সকলেই খুশী ফুটফুটে মেয়ে বাচ্চা দেখে। কিনতু বাচ্চা জন্মের আগে পাড়া প্রতিবেশী, বন্ধু বান্ধবেরা বলতো, প্রথম সন্তান ‘ছেলে’ হলেই ভালো। একদিক থেকে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। বংশ রক্ষার দুশ্চিন্তা করতে হয়না। এগুলো শুনে শুনে আমার তরুণী মনেও একধরনের আশা তৈরী হয়েছিল যে ছেলে হলেই ভালো। কিনতু আমার প্রথম বাচ্চা সুস্থ হবে কিনা এই নিয়ে ডাক্তারদের মনে আশংকা ছিল (আমার আরেক লেখায় তা বলেছি)। সে কারনেই ছেলে বা মেয়ে নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে সুস্থ বাচ্চার জন্য দিন গুনেছি। সুস্থ মৌটুসীকে পেয়ে আমি খুশী, আমরা খুশী। দ্বিতীয় মেয়ে মিশার জন্মের আগে আমার দিদিমা বাদে আর সকলেই বলেছিল ‘এবার তোর ছেলে হবে’। আমি কিনতু এবার সত্যি সত্যি বিশ্বাস করেছিলাম যে আমার ছেলেই হবে। কিনতু মিশার জন্মের সাথে সাথে আমার মাথা থেকে ছেলে বা মেয়ের পার্থক্য দূর হয়ে যায় পরিবারের সকলের আধুনিক ও পজিটিভ মন মানসিকতার কারনে।

তৃতীয় মেয়ে মিথীলা হওয়ার আগে অনেকের মনেই সন্দেহ ছিল একটি ছেলে বাচ্চার আশায় আমরা তৃতীয় সন্তান চাইছি। কিনতু আমি সকলকেই বলতাম, এই বাচ্চাটা পৃথিবীতে আসতে চেয়েছে এবং আমাদেরকে বাবা মা হিসেবে বেছে নিয়েছে। তাই ওর আগমন। সে মেয়ে হবে নাকি ছেলে হবে তা নিয়ে চিন্তা করিনা। মুখে এই কথা বললেও মনের কোথাও কিনতু ঠিকই একটা ছোট্ট ছেলে উঁকী দিচ্ছিল । সেজন্যই মনে হয় মিথীলার জন্মের সাথে সাথেই আমি ও টি থেকেই কী যে কান্না শুরু করেছিলাম, সেই কান্না দুই দিন ব্যাপী ছিল। আমার মায়ের বকা খেয়ে কান্না থামিয়েছি। কিনতু এখনও মনে পড়ে, কাঁদতে কাঁদতে মা’কে বলেছিলাম, ” তুমিতো ভাগ্যবতী। তিনটি পুত্ররত্ন পেয়েছো। তুমি কী করে বুঝবে আমার কষ্ট। আমার এই মেয়েগুলি কী আমার থাকবে? তিন মেয়ে বিয়ে হয়ে চলে গেলে আমি একা হয়ে যাবনা”?

অন্যসব মায়েদের মত আমার মা বলেছিল, ” তোর তিন মেয়েই রত্ন হবে। এরা ছেলের চেয়ে কোন অংশে কম হবেনা। ছেলেদের চেয়ে মেয়েরাই অনেক বেশী আপন হয়”। আমি বলেছি, ” তুমি অন্ততঃ এমন কথা বলোনা। আমি তোমাদের কন্যা হয়ে যেটুকু করি আমার ভাইয়েরা তার চেয়ে অনেক বেশী যত্ন করে তোমাদেরকে। আমিতো নিজের সংসার নিয়েই ব্যস্ত থাকি। তোমাদের আপদে বিপদে সব সময় তিন ছেলে মাথার কাছে , পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। তুমি অনেক ভাগ্যবতী মা, তোমার মুখে এমন কথা মানায় না”।

আমার সেদিনের কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হয়েছে। ইদানিং অনেকের মুখেই একটা কথা উচ্চারিত হয়, ‘মায়েরা ছেলে ছেলে করলেও বিপদের সময় মেয়েরাই আগে দৌড়ে আসে’। ছেলে মেয়ে তুলনা করে কথা উঠলে আমি মেয়েদের পক্ষেই কথা বলি সাধারনতঃ। কিনতু এই একটা জায়গায় এসে চুপ করে থাকি। আমার দুই ভাই আর আমার মামাত ভাই, এই তিনজন মিলে আমার মা, বাবাকে আগলে রেখেছে। আমাদের বাবা, মা বয়স হয়ে গেলেও কারো উপর নির্ভরশীল নন। সারাজীবন আমাদের উপর ছড়ি ঘুরিয়েছেন, এখনও ছড়ি ঘুরান। তাঁদের যে কোন কথা অগ্রাহ্য করার শক্তি আমাদের কারোর নেই। দুজনেরই নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনের কারনে অনেককাল উনারা সুস্থ থেকেছেন। এখন এই জীবন সায়াহ্নে এসে আর বোধ হয় মেরুদন্ড সটান রাখা সম্ভব হচ্ছেনা। ছেলেদের উপর নির্ভর করতেই হচ্ছে। আর আমার ভাইগুলোও যেনো এই প্রথম বাবা মায়ের জন্য কিছু করার সুযোগ পেয়ে সাধ্যের বাইরে গিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। গত বছর আমার বাবা প্রায় মৃত্যুর দুয়ার থেকে ঘুরে এলেন। আমার মেজভাই, ছোটভাই আর তুতো ভাই যে কোন ব্যাপারে প্রথমে ঘাবড়ে যায়, পরে এখান থেকে আমি আর আমার স্বামী, কানাডা থেকে বড় ভাই ওদেরকে সাহস যোগাই, বুদ্ধি বাতলে দেই, ওরা জানপ্রাণ দিয়ে তা মেনে চলার চেষ্টা করে। শুধু আমার বাবা মা কেনো, আমাদের মামা, কাকা, মাসী, পিসী যখন যার প্রয়োজন আসে, সবাই মিলে তা উৎরে দেয়ার চেষ্টা করে।

এই জন্যই আমি অন্য দশজনের থেকে দূরে থাকি, কখনও বলিনা মেয়ে সন্তানের চেয়ে ছেলে সন্তান ভালো অথবা ছেলের চেয়ে মেয়ে ভালো। আমাদের পরিবারে সব সমান। ছেলেও ভালো, মেয়েও ভালো। আমার কাছে মেয়ে বাচ্চা থাকার একটাই সমস্যা, এরা বাবা-মা কে ছেড়ে অজানা রাজপুত্রের হাত ধরে চলে যায়। বাবা মায়ের কাছে আসতে হলে রাজপুত্রের অনুমতি লাগে, রাজার অনুমতি লাগে, রানী, ননদিনীর মন খুশী করা লাগে। ঘরে বাচ্চাদের সুখ সুবিধা দেখতে হয় বাবা মাকে দেখতে যাওয়ার আগে। এতে কি মেয়েদের মন ভরে?

যারাই বলে যে আজকাল ছেলেরা কিছু হেল্প করেনা, মেয়েরা হেল্প করে, তাদের অভিজ্ঞতাকে ছোট করিনা কোনভাবেই। তবে বাস্তবকেও অস্বীকার করতে পারিনা। যাদের মেয়েরা বিয়ের পরে অনায়াসে বাবা মায়ের কাছে চলে আসতে পারে, তারা সত্যিই ভাগ্যবতী। তবে এতে করে মেয়ের বাবা খুশী হলেও মেয়ের শ্বশুর শাশুড়ীর তো খুশী হওয়ার কথা নয়। এই শশুর শাশুড়িই একদিন সবার কাছে বলবে, ” ছেলে ছেলে করে লাভ নেই। ছেলেতো নতুন বাবা মা (বৌয়ের বাবা মা) পেয়েছে, এখন আর আমাদের দিকে ফিরেও দেখেনা” । আর মেয়ের মা হয়তো বলে, “আমার ছেলে নেই বলে কী হয়েছে আমার মেয়ে জামাইরাই আমার একেকটি রত্ন”।

কিনতু আমার মায়ের ভাগ্য আসলেই ভালো। আমিতো কিছুই করতে পারিনা এতদূর থেকে, আমার ভাইগুলিই মনপ্রাণ দিয়ে মা বাবার সেবা করে। মায়ের হঠাৎ করেই মনে হয়, অমুককে সাহায্য করা দরকার, তমুকের বিয়েতে ঠিক ‘এত হাজার টাকা’ দামের গিফট দেয়া উচিৎ। আমার ভাইয়েরা সব শিরোধার্য্য করে নেয়। তারা কি বৌদের অবহেলা করে বাবা মায়ের দেখভাল করে? অবশ্যই না, বৌদেরকে পাশে নিয়ে ওরা সব কিছু করে। আর কানাডা থেকে আমার বড় ভাই সার্বিক তত্ত্বাবধান করে। ‘তুতো’ ভাইদের কথা না বললেই নয়। এরা আমাদের নয়নের মনি। আমি কী পারি, নিজের তিনটি মেয়ে হয়েছে বলেই ছেলেদের বদনাম করতে!

তবে আমার মেয়েগুলো যে বিয়ে হয়ে নতুন ঘর আলোকিত করতে চলে যাবে, তার কি হবে শুনি? আমি কি শেষ জীবন একা কাটাবো নাকি? এটা কেমন বিচার হলো?????