ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

আগস্ট মাস আসলেই আমার মধ্যে মিশ্র এক অনুভূতি কাজ করে। অনুভূতিটুকু আনন্দের ও শোকের। আনন্দটুকু আমার একান্ত ব্যক্তিগত বলে নিজের মধ্যেই রাখি, আর শোক সমষ্টিগত বলে সকলের সাথে শেয়ার করি। ১৯৭৫ এর পর থেকে ‘শোকের মাস’ বললেই প্রাইমারী স্কুলে পড়ুয়া ছাত্রও বুঝে যায়, আগস্টের কথা বলা হচ্ছে। সমস্ত বাঙ্গালীর জন্যই এ মাসটি শোকের, চরম বেদনার। ১৯৯০ সালের আগে পর্যন্ত আগস্ট মাসে আমার অনুভূতি আর দশটি বাঙ্গালীর মতই ছিল। ‘৯০ সালের ১৪ই আগস্ট আমার দ্বিতীয় সন্তান জন্মের পর থেকেই আমার ব্যক্তিগত অনুভূতিতে কিছু পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তন বলতে এখন ১লা আগস্ট থেকেই আমি এখন আর শুধু ১৫ই আগস্টের জন্য অপেক্ষা করিনা, সাথে ১৪ই আগস্টের জন্যও অপেক্ষায় থাকি।

মাঝে মাঝেই মেয়েকে বলি, “তুই এমন এক মাসে জন্ম নিলি যে আনন্দ করতেও দ্বিধা। তোর জন্মদিনে আনন্দ করবো ভাবলেই শেখ রাসেলের কথা মনে পড়ে। আনন্দ নিরানন্দ হয়ে যেতে চায়”। আমার মনের ভাষা হয়তো মেয়ে বুঝতে পারে, বলে “তবুও তো আমার ভাগ্য ভাল যে ১৪ তারিখে জন্মেছি, ১৫ তারিখে জন্মালে তো তুমি আমার দিকে ফিরেও তাকাতে না”। আসলে তা ঠিক নয়, নিজের সন্তানের দিকে ফিরেও তাকাবোনা, তা কি হয়? তবে ঘটা করে জন্মদিন পালন করতামনা ( এখনও আমরা সেটা করিনা)। ১৫ ই আগস্টে জন্মদিন মনে হয় একমাত্র বেগম জিয়ার বাড়ীতেই মহা ধুমধামে পালিত হয়। আমার এক বন্ধু বলেছে, তার কলেজ জীবনের প্রেমিকার জন্মদিন ছিল ১৫ই আগস্ট। আমার বন্ধুটি একসময় ছাত্রলীগের রাজনীতি করলেও প্রেমিকার জন্মদিন উদযাপন করেনি কখনও।

আমার এখন পর্যন্ত ‘১৫ই আগস্ট বেবী’ চোখে পড়েনি। এতদিন শুধু বেগম জিয়ার জন্মদিন ১৫ই আগস্ট জেনে এসেছি। একসময় বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গেছিল যে ‘৭৫ এর ১৫ই আগস্টে আর কেউ কোনদিন জন্মাবে না। একদিন আগে বা একদিন পরে জন্মাবে, কিনতু কোনভাবেই ১৫ই আগস্টে নয়। এইজন্যই ১৫ই আগস্ট বেবী দেখা হয়নি আমার। যাই হোক এগুলো সবই আবেগী, অর্থহীন কথাবার্তা। আজকেই একজন সত্যিকারের ‘১৫ই আগস্ট ১৯৭৫’ বেবীর দেখা পেলাম।

অফিসে কাজের এক পর্যায়ে এক গ্রাহক নতুন ফোন সার্ভিস নিতে এসেছে। নতুন গ্রাহকদের সমস্ত ইনফরমেশান কমপিউটারে এন্ট্রি করার আগে গ্রাহককে স্টেট আইডি দেখাতে হয়। নতুন গ্রাহকের আইডি তে জন্ম তারিখের দিকে তাকাতেই কেমন যেনো অস্বস্তি লাগছিল বেশ ক’বার। হঠাৎ খেয়াল করে দেখি জন্ম তারিখ ১৫ই আগস্ট, ১৯৭৫। আমি এই প্রথম ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টে জন্ম নেয়া কাউকে দেখলাম। আমি কল্পনাপ্রবণ মানুষ বলেই কাজের ফাঁকেই কল্পনা করতে শুরু করে দিলাম। এই ছেলেটা যখন জন্মায় সেই মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর লাশ কি দাফন হয়ে গেছে? কারন আমেরিকায় ১৫ই আগস্টের সকাল মানেই ঢাকাতে ১৫ আগস্টের সন্ধ্যা। ঐ সন্ধ্যায় কী বঙ্গবন্ধুর লাশ দাফন হয়ে গেছিলো? আমার মনে পড়েনা, মনে পড়ার কথাও না। বালিকার স্মৃতিতে সেদিনের ঘটনার মুল অংশ ধরা আছে, খুঁটিনাটি কিছু মনে নেই। ছেলেটি চলে যেতেই মন চলে গেলো ‘৭৫ এর ১৫ই আগস্ট সকালে।

‘৭৫ এর ১৫ই আগস্ট আমি ছিলাম বালিকা। আমাদের ছোটবেলা থেকেই ছকে বাঁধা কিছু নিয়ম চালু ছিল। যেমন সকাল সাতটা বাজলে ‘বাংলাদেশ বেতার ঢাকা’ স্টেশান অন হয়ে যেত, সকালের খবর শোনার জন্য। সকাল সাতটার খবর আরম্ভ হলেই আমি ঘুম থেকে উঠতাম।

নারায়নগঞ্জের শহর এলাকায় আমরা থাকতাম। ঐ এলাকাগুলো একসময় হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। আমরা যে বাড়ীতে ভাড়া থাকতাম, সে বাড়ীর মালিক ছিলেন হাজী সাহেব। হাজী সাহেবের ১৮ ঘর ভাড়াটিয়ার মধ্যে একঘর মাত্র মুসলিম পরিবার ছিল। বাকী সবাই হিন্দু। তবে হিন্দু অধ্যুষিত পাড়া হলেও আমাদের পাড়ায় হিন্দু মুসলমানের সম্পর্ক ছিল পরম আত্মীয়ের মত। আমাদের বাড়ীওয়ালা ও সেই একঘর মুসলিম ভাড়াটের সাথে আমাদের নিত্যদিন একসাথে উঠাবসা সম্পর্ক ছিল। মুসলিম ভাড়াটে চাচা ছিলেন পেশায় ডাক্তার। উনার বাড়ীতে উনারই দূর সম্পর্কের আত্মীয় থাকতো, যাকে আমরা সবাই ‘জামাল ভাই’ বলে ডাকতাম।

আমাদের ঐ বাড়ীর ভাড়াটিয়াদের রুটিনমাফিক একটি কাজ ছিল, তা হলো সকাল সাড়ে ছয়টা বাজলে সব মহিলারা সাপ্লাইয়ের জল নেওয়ার জন্য কলতলায় হাজির হতো। সেই কলতলা থেকে রাস্তা দেখা যেত। ১৫ই আগস্টের সকালে সব মাসীমারা কলতলায় বসে পালা করে কলসী, বালতিতে সাপ্লাইয়ের জল ভরছিল। হঠাৎ করেই রাস্তা থেকে আমার মেজদা চীৎকার করে ‘ সবাই শোন, বঙ্গবন্ধুকে মাইরা ফেলছে’ বলতে বলতে দৌড়ে আসছিল। মেজদার বয়স ১৪ পূর্ণ হয়নি, সতীশ স্যারের কাছে গ্রুপে পড়তে গিয়ে এমন খবর শুনে পড়া ফেলে দৌড়ে বাড়ী চলে এসেছে।

মেজদা খুবই হাঁফাচ্ছিল। মেজদার মুখ থেকে এমন খবর শুনে কেউ বিশ্বাস করেনি। মহিলাদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হতেই পাশের ঘরে রেডিও অন করে “আমি মেজর ডালিম বলছি” শোনা গেল। আমি তখন বেশ ছোট। ঘোষণার অনেক কথাই মনে নেই শুধু ‘আমি মেজর ডালিম বলছি, শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে’ ছাড়া। ততক্ষণে সবার বাড়ীতে রেডিও অন হলো, ভাবখানা এমন যেনো একেক রেডিওতে একেক রকম ঘোষণা আসবে। এক ঘন্টার মধ্যে সমস্ত পাড়া স্তব্ধ হয়ে গেলো। এমনকি কাকের কা কা পর্যন্ত শোনা গেলো না।

ঘরে আমার বাবা শুধু একটা কথাই বলছিলেন, “ এইটা কী হইল, কী সব্বনাশ হইয়া গেলো। এইটা কয় কি, পুরা পরিবাররে মাইরা ফালাইছে! মানুষ কেমনে এমুন জালিম হইতে পারে”! আমার কেবলই দুই তিন মাস আগের কথা মনে পড়ছিল। পাগলার ঘাটে বংগবন্ধুকে অতিথিসহ সংবর্ধণা দেওয়ার জন্য সকলেই দাঁড়িয়েছিলো, হঠাৎ করেই বঙ্গবন্ধু আমাদের কাছাকাছি এসে আমার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, ‘ কি রে! কিছু খাইছস”?

বংগবন্ধুর মৃত্যুর পরেও অনেকদিন, অনেক বছর, এমনকি এখনও অনেককেই বলতে শুনি, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে দেশের কেউ কাঁদেনি। এমন কথা শুনলে সব সময়ই আমি আসর ছেড়ে উঠে যাই। অরুচীকর কোন কখা্র মধ্যে আমি থাকিনা। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে কেউ কাঁদেনি শুনলেই আমার মনে পড়ে যায় সেদিনের সকালের কথা।

বঙ্গবন্ধুকে যেদিন হত্যা করা হলো, বাংলাদেশ বেতারে সকাল সাতটার খবর প্রচারের বদলে “ আমি মেজর ডালিম বলছি—–শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে” প্রচারিত হতে থাকে। ঘটনার আকস্মিকতায় আমার বাবা বেশ কিছুক্ষন হতভম্ব হয়েছিলেন। ঘরে আমার বাবা শুধু একটা কথাই বলছিলেন, “ এইটা কী হইল, কী সব্বনাশ হইয়া গেলো। এইটা কয় কি, পুরা পরিবাররে মাইরা ফালাইছে! মানুষ কেমনে এমুন জালিম হইতে পারে”! এইবার আমার মা কথা বললেন। মা হাই স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। মানুষের চরিত্র ভালো বুঝতেন। আমাদের সবাইকে মা আস্তে কথা বলতে বললেন। উনি আঁচ করতে পেরেছিলেন, এতো বড় ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর, এর জের যে কারো উপর আসতে পারে। বিশেষ করে আমার বাবা নীচু স্বরে কখনও কথা বলতে পারেননা, উনি অনেক রাগী এবং ডিসিপ্লিন্ড স্বভাবের মানুষ। উলটা পালটা কিছু দেখলে পাড়ার ছেলে ছোকরাদেরও শাসন করতে ছাড়তেন না। মায়ের ভয় ধরে গেল, এখন এমনই একটা অরাজকতা শুরু হতে পারে, যার সুযোগ নিতে পারে অন্য যে কেউ। মায়ের কথায় আমরা সবাই মুখে তালা আঁটলাম, আর বাবা শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলতে লাগলো।

সেদিন বিকেলবেলাতেই ঐ ডাক্তার চাচার আত্মীয় ‘জামাল ভাই’ দুই হাতে করে চারটা মুরগী নিয়ে এসেছিল বাজার থেকে। আমাদের সকলের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলছিল, “ আজকে মুরগী জবাই হবে”। জামাল ভাই জানতেও পারেনি, তার দিকে সকলে কেমন ঘৃণার দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়েছিল।

আমাদের ঘরে রেডিও বন্ধ হয়ে গেলেও পাশের বাড়ীতে রেডিও চলতো। খান আতাউর রহমান তখন অতি উচ্ছ্বাসে একটি গান রচনা করে নিজেই তাতে সুর বসিয়ে কোরাসে গাইয়েছিলেন। গানটির কথা আমার মনে নেই, শুধু “নিপীড়িত জনতা, কোথায় সে নিপীড়িত জনতা” কথাটুকু মনে আছে। গানটির মূল বাণী ছিল, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে দেশ এক মহাবিপদের থেকে মুক্ত হলো, জনগনের জয় হলো। যেই ঘরে রেডিও বাজতো, সেই ঘরের মেসো ছিলেন খুবই অমায়িক, কথা বলতেন শুদ্ধ বাংলায়। উনাকে কখনও মুখ খারাপ করতে শুনিনি। একদিন ঐ মেসো “কোথায় সে নিপীড়িত জনতা’ বলার সাথে সাথে জোরে জোরে বলে উঠেছিল, “নিপীড়িত জনতা আমার বগলের তলে”। সারা বাড়ীর মানুষ সেদিন শুনেছিল মেসোর কথা। কী যে রাগে ফাটছিলেন উনি, সেই ছবি এখনও আমার মনে ভাসে। এই একটি উক্তির মধ্য দিয়েই উনি সারা দেশের প্রায় ৯০ ভাগ বাঙ্গালীর মনের ঘৃণা উগরে দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমানের ‘সূর্য সৈনিকদের’ প্রতি।

আর আমার বাবার প্রতিবাদ ছিল অন্যরকম। আমাদের বলা হয়েছিল, ‘বাংলাদেশ বেতার পালটে রেডিও বাংলাদেশ করা হইছে। যতদিন রেডিও বাংলাদেশ থাকবো, ততদিন আমার ঘরে ঢাকা স্টেশন কেউ চালাইতে পারবা না”। ঐ জামাল ভাইয়ের সাথে আমাদের কথা বলতে মানা করে দিছিলেন। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরেই আমাদের পাড়ার পরিবেশ আস্তে আস্তে পাল্টাতে শুরু করে। চেনা মানুষকেও অচেনা লাগতো। পারস্পরিক বন্ধুত্ব, ভ্রাতৃত্ববোধেও যেনো টান ধরতে থাকে। এতকিছুর পরেও আমার বাবার গলার জোর কমেনি। অমন দুঃসহ সময়ের মধ্যেও বাবা ঠিকই বঙ্গবন্ধুর খুনীদের উদ্দেশ্যে বাতাসে হুঙ্কার ছুঁড়ে দিতেন। খুনীরা না শুনুক এই খুনকে যারা সমর্থণ করেছে তারা শুনেছে আমার বাবার হুঙ্কার। বাবার ধারনা, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে যারা খুশী হয়েছে, তারা তো জানবে নারায়ণগঞ্জের একটি ঘরে নির্ভয় প্রতিবাদী কন্ঠ এখনও গর্জে উঠে। পরবর্তীতে নির্বাচনের সময় প্রহসনমূলক নির্বাচনেও উনার ভোট বাতিল হবে জেনেও বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির অনুসারী প্রার্থীকে ভোটটা দিয়ে আসতেন। আমরা হাসাহাসি করলে বলতেন, “আমার এই একটা ভোট গণতন্ত্রের পক্ষে একটা চীৎকার”।

আমার বাবার বয়স এখন পঁচাশি বছর। গলার জোর থাকলেও সেই জোরে আর কথা বলেননা। বর্তমান সময়ের হালচাল দেখে হয়তো মনে মনে বিভ্রান্ত হন এই ভেবে যে এমন দেশ তো চাইনি। হয়তো ভাবেন, ইশ! কেউ যদি সেই সকালে ডালিম ফারুকদের ঠেকাতে পারতো, আজ তাহলে সব কিছু অন্যরকম হতো। কিনতু এটাই আমাদের নিয়তি। আমাদের সব ভালো, সব আলো, সকল আশার প্রদীপ সেই ১৫ আগস্টের সকালে নিভে গেছে। তখন এতো মানুষের মধ্যে একজন ‘জামাল ভাই’ ছিল, আর আজ চারিদিকে শুধুই জামাল ভাই, আর জামাল ভাই।