ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

আমি যখনই সুযোগ পাই, দিনে একবার হলেও ইউটিউবে গিয়ে গান শুনি। পুরনো দিনের বাংলা গান। নতুন দিনের গুলোও শুনি তবে পুরনো দিনের মান্না দে, হেমন্ত, কিশোর, লতা, আরতি, সাবিনা, রুনা, আব্দুল জব্বার, বশীর আহমেদসহ অনেকের গান শুনি। মাঝে মাঝে আমার পছন্দের গানগুলো থেকে ফেসবুকে দুই একটা গান শেয়ার করি। পরে অবসরে নানা কাজের ফাঁকে ফাঁকে পছন্দের গানগুলো শুনি। আমার নিজের জন্যই আমি এই কাজটা করে থাকি। পরে লক্ষ্য করেছি, গানগুলো আরোও কেউ কেউ শোনে, কখনও কখনও শেয়ার করে। ফেসবুক বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ আমার শেয়ার করা লিঙ্কে ‘লাইক’ দেয়। আমি জানি, ফেসবুকে ‘লাইক’ দেয়াটা এক ধরনের কর্তব্যের পর্যায়ে চলে গেছে। আমিও দেই। ‘লাইক’ দেয়ার মাধ্যমে বন্ধুকে জানান দেয়া, আমি তোমার পাশে আছি।

আজ শুনছিলাম মান্না দে’র গাওয়া যত প্রেমের গান। শুনতে শুনতেই দুই তিনটা গান আমার ফেসবুকে শেয়ার করে ফেলতেই এক মিনিটের মধ্যেই স্ক্রীনের উপরে দেখতে পাচ্ছিলাম নোটিফিকেশানে ব্লিঙ্ক করছে। আমি তখনও ইউটিউবেই আছি, কৌতুহল থেকেই একবার ফেসবুকে গিয়ে দেখি যে তিনটি গান শেয়ার করেছি তার মধ্যে একটি গানেই আটটি ‘লাইক’ পড়েছে। আট জনের মধ্যে ছয়জন ছেলে, দু’জন মেয়ে। গানের কথা, “তুমি নিজের মুখে বললে যেদিন সবই তোমার অভিনয়, সত্যি কিছু নয়—-আমি দুঃখ পেলেও খুশী হলাম জেনে”।

আমার ফেসবুক বন্ধুদের সিংহভাগই হচ্ছে এই প্রজন্মের ছেলেমেয়ে। এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা আমার মত আধবয়সী এক মানুষের প্রতি তাদের বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বলে আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। ওরা আমাকে ওদের দলে নিয়েছে বলেই আমি এই সময়ের ছেলেমেয়েদের চিন্তা ভাবনা, বিচার বুদ্ধি, অনুভূতি, আবেগ, ভালোবাসার ধরন সম্পর্কে কিছুটা আন্দাজ পাই। খুব ভালো করেই বুঝতে পারি, প্রেম-ভালোবাসার ব্যাপারে ওরা খুবই আবেগপ্রবন, অনেকেই খুবই সৎ। এদের অনেকেই ভুল করে, আবার ভুল স্বীকার করার মত সৎ সাহসও আছে। ওরাও আমার মতই মন খারাপ হলে গান শোনে, গান শুনে কাঁদে আবার কেউ কেউ অতি আনন্দ প্রকাশ করতে গিয়েও ঝিং চাক ঝিং চাক গান বাজিয়ে আশেপাশের সকলকে জানান দেয় মনের অনুভূতি।

আমি মান্না’দে র যে গানটির কথা এখানে উল্লেখ করেছি, তা অনেক পুরানো দিনের একটি গান, যে গান আমার মা-বাবা শুনতেন, আমি শুনেছি, এবং আমার মেয়েরাও শুনে। গান মানুষ কেনো শোনে, নিশচয়ই গানের কথাগুলোকে নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে দেখে, হিসেব নিকেশ করে। আমাদের সময়টাতে মেলোডিয়াস গানের কদর অনেক বেশী ছিল বলে আমরা দাবী করি, বিশেষ করে দুঃখ মেশানো গানের জনপ্রিয়তা ছিল আকাশছোঁয়া। আমাদের ধারনা, এ যুগের শ্রোতাদের মধ্যে বুঝিবা আগের দিনের গানগুলোর তেমন কদর নেই। তারা দ্রুত জীবনে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে যে দুই মিনিট সময় ব্যয় করে ঐসব দুঃখ সঙ্গীত শোনার সুযোগ পায়না। আমাদের ধারনাতে মনে হয় কিছু গন্ডগোল আছে, এটা আমি টের পাই আমার তরুন বন্ধুদের সাথে কথা বলে। ওদের সাথে যখনই গল্প করি তা সামনাসামনিই হোক অথবা অনলাইনেই হোক, ওদের আবেগ অনুভূতি গুলো আমাদের আবেগ অনুভূতি থেকে ভিন্ন মনে হয়না। ওদের অনুভূতিগুলো খুব ছোট্ট করে শুরুতেই লিখেছি। আমাদের সাথে ওদের অনুভূতিতে একটু পার্থক্য আছে, তা হলো চিন্তার গতিময়তায় পার্থক্য। গানের রিদমের মত। অনেকটাই ধীর গতির গান আর দ্রুত গতির গানে যেমন তফাৎ। গানের কথা এক, শুধু তাল আর লয়ের পার্থক্য।

এবার প্রসংগ শেষ করি। মান্না দে’র কন্ঠে গাওয়া , “তুমি নিজের মুখে বললে যেদিন সবই তোমার অভিনয়” গানটি আমার ফেসবুক ওয়ালে ‘লাইক’ করেছে আটজন। তাদের মধ্যে তিন জন মাত্র পুরানো দিনের শ্রোতা, বাকী পাঁচজন এ যুগের শ্রোতা। গানটির কথা নিশচয়ই সব যুগের শ্রোতাদের মনেই একই ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করে। আরেকটি ব্যাপার খেয়াল করে দেখলাম, আটজনের মধ্যে দু’জন মাত্র মেয়ে। তার মানে ৬ ঃ ২ অনুপাতে ‘লাইক’ পড়েছে, যার সরল অর্থ দাঁড়ায় প্রেমের অভিনয়ে মেয়েরা বেশী ওস্তাদ (!!!)। অবশ্য শুধু গান কেনো, সিনেমা নাটকেও দেখায় বহুদিনের প্রেম ভেঙ্গে যাওয়ার পেছনে ‘মেয়েদের’ ভূমিকা প্রধান। কী জানি, যারা নাটক লেখে বা গান লেখে তাদের অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই অনেক বেশী। অভিজ্ঞতার আলোকেই হয়তো তারা এটা করেন। নাহলে গানটি মাত্র দুইটি মেয়ে লাইক করলো!

ভালোবাসা এমনই এক অনুভূতি, যা দিয়ে কাউকে বাঁচিয়ে তোলা যায়, কাউকে মেরেও ফেলা যায়। ভালোবাসায় তাজমহলও তৈরী হয়েছে, ভালোবাসতে গিয়ে ত্রিশ বছরের সংসারও ভেঙ্গেছে। আর প্রতারণা তো সব যুগেই চলে এসেছে। এত কিছুর পরেও যখন তখন মানুষ প্রেমে পড়ে, প্রেমের জোয়ারে গা ভাসিয়ে উড়ে বেড়ায় নানা কল্পলোকে, আবার যখন তখন সেই কল্পনার আকাশ থেকে ধুপ করে একদিন মাটি্তেও পড়ে যায়। তবুও প্রেমে পড়া চাই। প্রেমে পড়ার হিড়িক এই যুগের ছেলেমেয়েদের মধ্যে খুবই বেশী। গতিময়তার যুগে মানুষের দৈনন্দিন জীবনটাই এত বেশী গতিময় যে গতিময় যুগের ছেলেমেয়েরা প্রেমেও প্রতিদিন একবার করে পড়ে। এত দ্রুত গতিতে প্রেম হয়, ভালো করে পরস্পরকে বুঝে উঠার আগেই আরেকজনকে হয়তো ভালো লেগে যায়! ব্যস, পুরানো জনকে ফেলে মনের গতি নতুনের দিকে মোড় নেয়। এই ভাংগা-গড়ার খেলা আগেও ছিল, এখনও চলছে, তফাৎ শুধুই গতিতে। তাই মনে হয় গানটিতে পুরোনো শ্রোতারা ‘লাইক’ দেয়ার আগেই অতি দ্রুততার সাথে এ যুগের শ্রোতারা ‘লাইক’ দিয়ে ফেলেছে।