ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

মিসিসিপি নামের রাজ্যটিতে বাঙ্গালীর সংখ্যা খুবই কম। আমি কলম্বাস নামের যে শহরে আছি, সেখানে আমরাই একমাত্র বাংগালী। আমাদের শহর থেকে পঁচিশ বা ত্রিশ মাইল দূরে স্টার্কভিল নামে আরেকটি শহর, ঐ শহরটিতে মিসিসিপি স্টেট ইউনিভারসিটি অবস্থিত বলে এপার বাংলা ওপার বাংলা মিলিয়ে বাঙ্গালী স্টুডেন্ট আছে, সব মিলিয়ে সতের আঠারো জনের মত। আর বাঙ্গালী পরিবার আছে তিনটি, তারা আবার ওপার বাংলার।

মিসিসিপির রাজধানী শহর হচ্ছে জ্যাকসান। জ্যাকসানে এপার বাংলা ওপার বাংলা মিলিয়ে বেশ কিছু বাঙ্গালী পরিবার আছে। কিছু স্টুডেন্টও আছে। স্টার্কভিল ও জ্যাকসানে বিবাহিত স্টুডেন্টের সংখ্যাই বেশী। অনেক ছেলে মেয়ে উচ্চশিক্ষার্থে আমেরিকা আসার আগ মুহূর্তে তাদের বাবা মা ছেলে মেয়েদের নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করে বিয়ে দিয়ে দেন। কিছুদিনের ব্যবধানে প্রত্যেকেই তার জীবন সঙ্গীকে আমেরিকা নিয়ে আসে এবং পড়ালেখার পাশাপাশি সংসার ধর্মও পালন করে।

বাঙ্গালীর সংখ্যা কম বলে মিসিসিপিতে স্টুডেন্টদের সাথে পরিবারগুলোর বেশ সহজ মেলামেশা হয়ে থাকে। পারিবারিক আড্ডায় স্টুডেন্টদেরকে নিমন্ত্রণ করা হয়, আবার স্টুডেন্টরাও নিজেদের ছোট্ট এপার্টমেন্টে বাঙ্গালী পরিবারের আঙ্কেল আন্টিদেরকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ায়। যে কোন তরফ থেকেই নিমন্ত্রণ হোক না কেনো, খাওয়া দাওয়ার পাশাপাশি ‘আড্ডা’ টাই মুখ্য হয়ে উঠে। মাসে বা দুই মাসে কারো না কারো জন্মদিন থাকে, অথবা বিবাহবার্ষিকী, নাহলে কোন একটা উপলক্ষ্য বানিয়ে নিলেই চলে। আড্ডা চলে একটানা তিন চার ঘন্টা। আড্ডা দুই ভাগে হয়। মহিলারা চলে যায় ভেতরের ঘরে, আর পুরুষেরা থাকে বসার ঘরে। আলোচনার বিষয়বস্তু শ্রেণীমতে নির্ধারিত হয়ে থাকে। মহিলাদের আসরে সাধারণতঃ মেয়েলী গল্প বেশী প্রাধান্য পায়। ছেলেদের আসরে আমেরিকার রাজনীতি, শেয়ার মার্কেট, আমেরিকান ফুটবল, সকার আলোচনা শেষে বাংলাদেশের রাজনীতি প্রসংগ আসে।

আমি দুই আড্ডাতেই থাকি। একবার মেয়েলী আড্ডায়, আরেকবার ‘ছেলেলী’ আড্ডায়। মেয়েলী আড্ডায় যখন শাড়ী গয়না নিয়ে কথা উঠে, আমি তখন আস্তে করে কেটে পড়ি। শাড়ী গয়নার ব্যাপারে আমি খুবই অজ্ঞ। সিল্কের শাড়ী আমার কাছে সবই একরকম মনে হয়। কিনতু এই সিল্কের শাড়ীরও কতরকম নাম আছে তা আমার ধারনার অতীত। তাই কোন মন্তব্য করতে পারিনা। আর গয়না? ছোটবেলা থেকেই সোনা গয়নার প্রতি এক ধরনের বিকর্ষণ বোধ করি। কেন এমন হয়, তা অবশ্য আমি জানিনা। হয়তো সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে মায়ের হাতে বা গলায় শাঁখা পলা, ব্রোঞ্জের চুড়ি ছাড়া আর কিছু দেখিনি বলেই সোনাদানার প্রতি ইন্টারেস্ট জন্মেনি। মেয়েদের আড্ডায় যখন ‘ভরি’ ভরি’ সোনার বিস্কুট কেনার গল্প শুনি তখন নিজেকে বোকা বোকা মনে হয়। তখনই চলে যাই ছেলেলী আড্ডায়। ওখানে আমেরিকান রাজনীতি নিয়ে নতুন কিছু শুনি। ওবামা ছেড়ে যখন আমেরিকান ফুটবল, সকার নিয়ে কথা উঠে, আবার ওখান থেকে কেটে এসে যোগ দেই মেয়েলী আড্ডায়। শাড়ী গয়নার গল্প যদি তখনও চলতে থাকে আমিই হয়তো শাড়ী প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে গল্প রান্নার দিকে নিয়ে যাই। রান্নাবান্নাও মেয়েদের কাছে খুব প্রিয় একটা বিষয়। আমি নিজে খুব পছন্দ করি নতুন নতুন রান্না শিখতে।

অস্ট্রেলিয়া , আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যে ঘুরে একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি, আড্ডায় বেশীর ভাগ মহিলাই কাউকে ‘রান্নার রেসিপি’ দিতে চায়না। কোন একটা খাবার কারো কাছে খুব ভালো লাগলে স্বাভাবিকভাবেই রাঁধুনীকে জিজ্ঞেস করে কিভাবে রান্না করেছে। সেই ‘অতি চমৎকার রাঁধুনী’ টি এইবেলাতে খুবই অচমৎকার আচরণ করে থাকেন। প্রশ্নের জবাবে বেশীর ভাগ সময় উত্তর পাওয়া যায়, ” এইতো সোজা আছে, পরে বলবো নে। ফোন কইরেন” নাহলে বলবে, ” ইশ! এত কষ্ট কইরা রাঁধছি, এত সহজ না, অনেক কারিগরি আছে, সব কথা বললেও বুঝবেন না” নাহলে বলবে, ” এইতো চিকেনটারে ভালো কইরা কাটাকুটি কইরা মশল্লা মাখাবেন, তারপর আন্দাজমত তেল দিয়া চুলায় চড়াইয়া দিবেন”। কোন কোন মশলা দিয়েছেন প্রশ্নের উত্তরে বলবে, ” সবই দিছি। নিজের আন্দাজমত দিবেন”। বুঝা যায় তাঁদের রেসিপি বলার ইচ্ছে নেই, তারপরেই কিছু নাছোড়বান্দা প্রশ্নকারীনিকে বাধ্য হয়েই বলতে হয়, ‘ ফোন কইরেন, তখন ভাল কইরা বলে দেব”। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, বিদেশে অনেক ছেলেরাও ভালো রান্না করে। রেসিপি বলার ব্যাপারে মেয়েরা কঞ্জুস হলেও ছেলেরা খুব নিখুঁতভাবে রেসিপি বলে দেয়। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ণে যখন ছিলাম, এক দাদার (ডঃ সজল পালিত) কাছ থেকে ‘চমচম’ বানানোর কায়দা শিখে এসেছিলাম। উনি এত পরিষ্কারভাবে আমাকে পদ্ধতি বলে দিয়েছিলেলেন যে অনেক বছর পরে আমেরিকা এসেও চমচম বানাতে এতটুকুও অসুবিধা হয়না। অবশ্য আমেরিকাতে এসে আরেক বড় ভাই শ্রেণীর রাঁধুনীকে পেয়েছি, উনার রান্না খুবই ভালো। কিনতু রেসিপি দেয়ার ব্যাপারে উনি মেয়েদের চেয়েও বড় কঞ্জুস। মেয়েরা তবুও রেসিপির অনেকটাই বলে দেয়, বুদ্ধিমতীরা বাকীটুকু নিজেদের বুদ্ধি খাটিয়ে চালিয়ে নেয়, কিনতু এই বড় ভাই রেঁধে রেঁধে সবাইকে খাওয়াবেন, রেসিপির এক অক্ষরও বলবেননা।

ছেলেদের আড্ডাতে অবশ্য উলটো। গোপন করার চেষ্টা করেনা। হাসিনা বা খালেদাকে বকতে শুরু করলো তো আর কথা নেই। চোখ বন্ধ করে এক নিঃশ্বাসে বলতে থাকবে। আসরে কে হাসিনা পন্থী আর কে খালেদা পন্থী তা খুব সহজেই বলে দেয়া যায়। ছেলেদের মধ্যে কে কত বেশী জানে তা জাহির করার একটা প্রবনতা থাকে। আড্ডায় এই জানা অজানার এক অলিখিত প্রতিযোগীতা চলে। দেশের কথা উঠলেই ‘ অলরেডী দেশের বারোটা বেজে গেছে’ অথবা ‘এই দুই মহিলারে না সরাইলে দেশের উন্নতি হবেনা’ অথবা ‘দেশটা একজনের বাবার আরেকজনের স্বামীর, আমরা কেউনা’ ধারনার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে দেশীয় আলোচনার সমাপ্তি টেনে দেয়। আবার ফিরে যায় ওবামার কাছে নয়তো শেয়ার মার্কেটের দালালদের কাছে।

ঘড়িতে যখন তাকানো যায়, তখনই একমাত্র হুঁশ ফিরে আসে আড্ডায় মশগুল আড্ডাবাজদের। রাত বারোটার পরে সকলেরই ঘুমে চোখ টানে। গৃহস্বামীর একটা সুবিধা আছে, তাকে ড্রাইভ করে ফিরে যেতে হয়না, অতিথি চলে গেলেই সরাসরি বিছানা। কিনতু গৃহকর্ত্রীর অবশ্য তারপরেও কাজ বাকী থেকে যায়। অতিথি বান্ধবীরা ফিরে যাওয়ার আগে যতটুকু সম্ভব গৃহিনীর কিচেন গুছিয়ে দিয়ে যাওয়ার পরেও অনেক কাজ বাকী থেকে যায়। সেগুলো সারতে সারতে আরও একটি ঘন্টা পার হয়ে যায়। অতিথিদেরও জ্বালা কম নয়। রাত বারোটায় চোখে ঘুম নিয়ে গাড়ীতে উঠতে হয়। বেশীরভাগ সময় ড্রাইভিং সীটে গৃহকর্তা বসেন, পাশের সীটে গিন্নী বসেন ঠিকই, তবে আমার মত গিন্নীরা গাড়ীতে বসেই ঘুমিয়ে পড়েন। ড্রাইভারের জন্য এ এক দূর্বিসহ অবস্থা। দুই তিন ঘন্টার ড্রাইভে পাশের সঙ্গী যদি ঘুমিয়ে থাকে তা ড্রাইভারের জন্য তিন নাম্বার বিপদ সংকেতের মত। ড্রাইভারকে খুব সজাগ হয়ে গাড়ী চালাতে হয় যা কিনা বিনাদোষে শাস্তি পাওয়ার মত মনে হয়।