ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

 

আমেরিকায় ‘লেবার ডে’ বা শ্রমিক দিবসঃ

আজ আমেরিকায় ‘লেবার ডে’ বা শ্রমিক দিবস। প্রতি বছর সেপ্টেম্বার মাসের প্রথম সোমবার লেবার ডে উদযাপিত হয়। আজ সরকারী ছুটি্র দিন। আমেরিকার রাস্তাঘাটে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে সেই সমস্ত লক্ষ লক্ষ শ্রমিকদের সম্মান দেখানো হয়, যাদের নিরলস আন্দোলনের পথ বেয়ে শ্রমের মর্য্যাদা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এদেশে শ্রমিক বলতে আলাদা কোন শ্রেণী নেই, প্রত্যেকটি নাগরিকই যার যার অবস্থানে থেকে কাজ করে চলেছে, সেই হিসেবে প্রত্যেকেই একেকজন শ্রমিক। সকলের মিলিত শ্রম আমেরিকাকে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে কফি শপের সবচেয়ে তরুন কর্মীর শ্রমের বিনিময়েই আমেরিকা আজ বিশ্বে ‘সুপার পাওয়ার’ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এই আদর্শের ভিত্তিতেই ‘লেবার ডে’ বা শ্রমিক দিবস অত্যন্ত আনন্দ-উৎসবের ভেতর দিয়ে পালিত হয়।

লেবার ডে উদযাপনঃ
বেশীর ভাগ আমেরিকান (সাধারণ জনগন) লেবার ডে’র তাৎপর্য্য নিয়ে মাথা ঘামায়না। লেবার ডে বলতে কী বুঝায়, লেবার ডে প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, এই দিনটির স্বপ্নদ্রষ্টা কে ছিলেন, এগুলো জানার ব্যাপারে কারো তেমন একটা উৎসাহ নেই। বরং সারা সপ্তাহ পরিশ্রম করার পর দুই তিন দিন হাতে পাওয়া গেলে ঐ সময়টা আনন্দ করে কাটাতেই এরা বেশী আগ্রহী। সরকারী ক্যালেন্ডারে সেপ্টেম্বারের প্রথম সোমবার ( ‘লেবার ডে’ ) সরকারী ছুটির দিন হিসেবে চিহ্নিত থাকে। ক্যালেন্ডার দেখে বছরের শুরুতেই সকলে প্ল্যান করে, লেবার ডে উইকএন্ড কিভাবে কাটাবে।

সেপ্টেম্বারের প্রথম সপ্তাহ থেকেই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন সেমেস্টার শুরু হয়। আস্তে আস্তে শীতের আগমন টের পাওয়া যায়। এখানে শীতকালে প্রচন্ড ঠান্ডা পড়ে বলেই শীতকালে কেউ বেড়াতে যায়না। এই জন্যই সামার শেষের লং উইকএন্ডটির জন্য সবার অমন অধীর অপেক্ষা। অনেকেই পরিবার পরিজন নিয়ে দূরে কোথাও বেড়াতে চলে যায়, কেউবা দলবেঁধে মাছ ধরতে যায়, বন্ধুবান্ধব মিলে পিকনিক করে, ক্যাম্পিং করে, অথবা চলে যায় কাছাকাছি কোন সমুদ্র সৈকতে। যেহেতু সামারের শেষ, সকলেই উৎসবমুখর মেজাজে থাকে, বছরের শেষ সামারের পোষাক পড়ে, যদিও সমাজের উঁচুতলার বাসিন্দারা লেবার ডে তে সাদা পোষাক পড়াকেই ফ্যাশান মনে করে। আর তরুণ-তরুণীরা মনে করে, উইকএন্ডটি হবে বন্ধুদের সাথে সামারের শেষ ‘হ্যাং আউট’ (চরম আড্ডা)।

অবশ্য আমেরিকায় কিছু কিছু কল কারখানা, দোকান-পাট, মার্কেট (ওয়াল-মার্ট), ওষুধের দোকান (ওয়াল গ্রীন) দিবা রাত্রি চব্বিশ ঘন্টা চালু থাকে, ঐ সকল প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কর্মচারী এক দিনের বেতন বোনাস হিসেবে পেয়ে থাকে।

ক্রীড়াজগতেও লেবার ডে’র সপ্তাহকে লীগ শুরুর সীজন হিসেবে নির্বাচন করা হয়। ন্যাশনাল ফুটবল লীগ ( এন এফ এল) এবং কলেজ ফুটবল সীজন সেপ্টেম্বারের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হয়। ফুটবল লীগও লেবার ডে’র সপ্তাহ বা তার আগের সপ্তাহ থেকে শুরু হয়।

শ্রমিক আন্দোলনের গোড়ার দিকের কথাঃ

বছরের নির্দিষ্ট একটি দিন শ্রমিকদের নামে উৎসর্গীকৃত হওয়ার পেছনের ইতিহাসে, বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ধরে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামগাঁথা লেখা আছে।
অসহায় দরিদ্র মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদে দিনরাত অমানুষিক পরিশ্রম করে মজুরী যা পেত, তাতে নুন আনতে পান্তা ফুরাতো। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেই মানুষ প্রতিবাদ করতে শেখে। দুই তিন শতক আগের দরিদ্র জনগনের মধ্যেও নিজের প্রাপ্য আদায়ের চেতনা জাগ্রত হয়েছিল। সেই চেতনা থেকেই ন্যায্য পাওনা আদায়ের দাবী উঠে। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেই ছিল একই চিত্র। ন্যায্য অধিকার আদায়ে লক্ষ শ্রমিকের দেহের ঘাম ঝরেছে, কত শত শ্রমিক জীবন দিয়েছে, লাগাতার হাঙ্গার স্ট্রাইক, ধর্মঘট, মিছিল, মিটিং এর পথ ধরেই এই সাফল্য এসেছে।

শত বছর ব্যাপী ধারাবাহিক আন্দোলন শেষে তারা তাদের দাবী অনুযায়ী বেতনের নির্দিষ্ট স্কেল পেয়েছে, দিনরাতব্যাপী কাজ করার পরবর্তে নির্দিষ্ট আট ঘন্টা কাজ করার অধিকার, নির্দিষ্ট সময়ের অতিরিক্ত কাজের জন্য অতিরিক্ত পারিশ্রমিক, সন্তোষজনক মজুরী, সাপ্তাহিক ছুটি, অসুস্থ হলে সিক লীভ, বাৎসরিক ছুটি, পরবের ছুটি পেয়েছে, এ সবই আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে।

‘লেবার ডে’র স্বপ্নদ্রষ্টা ম্যাকগায়ার ও ম্যাগায়ারঃ

প্রথম ‘লেবার ডে’ উদযাপিত হয় ১৮৮২ সালে। ১০,০০০ শ্রমিকের এক বিরাট দল নিউ ইয়র্কের সিটি হল থেকে মার্চ পাস্ট করে ইউনিয়ন স্কোয়ারে যায়। প্যারেড শেষে সকলে মিলে রিজার্ভার পার্কে পিকনিক, গান বাজনা করে পুরো দিনটি মাতিয়ে তোলে। লেবার ডে’র প্যারেডসহ দিনটির সমস্ত আয়োজনে ছিলেন পিটার জে ম্যাকগায়ার, আমেরিকান ইউনিয়ন মুভমেন্টের বিশিষ্ট নেতা, যিনি পেশায় ছিলেন একজন কাঠমিস্ত্রী।

একই বছর নিউইয়র্ক সেন্ট্রাল লেবার ইউনিয়নের সেক্রেটারী, ম্যাথিউ ম্যাগায়ার, যিনি পেশায় ছিলেন কারখানার মেশিনচালক, সর্বপ্রথম সরকারের কাছে ‘শ্রমিক দিবস’কে সরকারী ছুটির দিন হিসেবে ঘোষনা করার প্রস্তাব করেন। ফলে, শ্রমিক দিবস বা লেবার ডে’র স্বপ্নদ্রষ্টা প্রকৃতপক্ষে কোনজন তা নিয়ে আজও বিতর্ক আছে। তবে ম্যাকগায়ার অথবা ম্যাগায়ার, দুজনের নামই লেবার ডে’র সাফল্যের সাথে জড়িত, এ ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নেই।

‘লেবার ডে’ সরকারী ঘোষণাঃ

১৮৮৭ সালে ওরিগন স্টেটে ‘লেবার ডে’ সর্বপ্রথম ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। তবে ওটা সরকারীভাবে স্বীকৃত ছিলনা। তখনও আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবী আদায়ের লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবেই আন্দোলন চলছিল। সেই ধারাবাহিকতার পথ ধরে ১৮৯৪ সালে ইলিনয় রাজ্যের পুলম্যান শহরের শ্রমিকদের কম মজুরীর প্রতিবাদে ‘শ্রমিক ইউনিয়ন’ লাগাতার ধর্মঘট ডাকে। সেই ধর্মঘটের রেশ আমেরিকার নানা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, চারিদিকে বিক্ষোভ দানা বাঁধে। বিক্ষোভ ভয়ংকর আকার ধারন করলে তৎকালীণ প্রেসিডেন্ট ক্লীভল্যান্ডের নির্দেশে পুলম্যান শহরে সেনাবাহিনী নামানো হয়। শ্রমিক-সেনাবাহিণী সংঘর্ষে কমপক্ষে ১৩ জন শ্রমিক নিহত হয়, ৫৭ জন মারাত্মকভাবে আহত হয়। তিন লক্ষ ডলার মূল্যের সম্পদ বিনষ্ট হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রেসিডেন্ট ক্লীভল্যান্ড দ্রুত শ্রমিক আন্দোলনের প্রধান নেতা রেস এর সাথে আলোচনায় বসেন এবং আলোচনা শেষে শ্রমিকদের দাবী মেনে নিয়ে ‘লেবার ডে’ সরকারী স্বীকৃতি প্রদান করেন। ‘নিউ ইয়র্কের শ্রমিক ইউনিয়নের’ প্রস্তাব অনুযায়ীই সেপ্টেম্বারের প্রথম সোমবার ‘লেবার ডে’ নির্বাচিত হয়। তবে প্রতি বছর দিনটি ‘সোমবার’ হলেও তারিখটি বদলে যায়। যেমন ২০১২ সালের লেবার ডে’ ৩রা সেপ্টেম্বার (সরকারীভাবে স্বীকৃত) হলেও ১৮৮২ সালের প্রথম ‘লেবার ডে’ ছিল সেপ্টেম্বারের ৫ তারিখ (বেসরকারী)।

জাতীয় ছুটিঃ

আগে লেবার ডে উপলক্ষ্যে বিশাল প্যারেড বা শোভাযাত্রা বের হতো। সফল আন্দোলনের প্রতীকী মিছিলগুলো ছিল আনন্দ উল্লাসপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে লেবার ডে’ উদযাপনে কিছু পরিবর্তন এসেছে। কিছু কিছু রাজ্যে আনন্দ মিছিল বের হলেও অধিকাংশ রাজ্যগুলোতে আগের মত আর বিশাল বিশাল প্যারেড হয়না। তার পরিবর্তে পত্র পত্রিকা, টিভি, রেডিওসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় বড় বড় নেতা নেত্রীদের বক্তব্য, বিবৃতি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে প্রচারিত হয়। তাদের বক্তব্যে আমেরিকার অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে লেবার ডে’র গুরুত্ব স্বীকৃতি পায়। বক্তব্যের ভেতর আমেরিকার প্রতিটি নাগরিককেই শ্রমিকের মর্য্যাদায় ভূষিত করা হয়। এই শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে কারখানার সাধারণ শ্রমিক যেমন আছে, তেমনি আছে বড় বড় শিল্পপতি, ইউনিয়ন এর নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবি, শিক্ষক, সরকারী কর্মকর্তা থেকে শুরু করে স্বল্প আয়ের কেরাণী।

রাষ্ট্রিয়ভাবেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে আমেরিকার প্রতিটি নাগরিকের শ্রমকে, যেই শ্রমের বিনিময়ে আমেরিকার প্রতিটি নাগরিক পেয়েছে সুন্দর, সুস্থ, উচ্চমানের জীবন। প্রতিটি নাগরিকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শ্রমের বিনিময়ে আমেরিকা পৃথিবীর বুকে শক্তিশালী, গনতান্ত্রিক এবং নেতৃত্বদানকারী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, সেজন্যই লেবার ডে’তে আমেরিকান জাতি সকল শ্রমিকদের প্রতি ফ্ল্যাগ উড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করে।