ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

পেনী ডানকানের সাথে প্রায়ই আমার দেখা হয়। আমি ওয়ালমার্ট নামের যে সুপার সেন্টারের ফোন সার্ভিস ডিপার্টমেন্টে চাকুরী করি, পেনী তার আশেপাশেই অন্য ডিপার্টমেন্টে কাজ করে। পেনী হোয়াইট আমেরিকান হলেও দেখতে গড় আমেরিকান মেয়েদের মত সুন্দরী না। তার উপর ওর হিয়ারিং প্রবলেম আছে বলে কারো সাথেই সে সাবলীলভাবে গল্প করতে পারেনা। ওর বয়স আটাশ ঊনত্রিশের বেশী হবেনা। ওর সাথে বেশীর ভাগ সময় দেখা হয় টী-রুমে। ফেস টু ফেস কথা বললে তবেই ও কথা বুঝতে পারে। তবে মেয়েটি খুব ভালো। টী ব্রেকে মাঝে মাঝেই ওকে হাই হেলো দেই।

দিন পনেরো আগের কথা বলছি। আমি ফ্রেশ রুমে ঢুকতেই পেনীকে দেখলাম চোখ মুছছে। কাউকে কাঁদতে দেখলে আশেপাশের সকলে উতলা হয়ে ক্রন্দনরতকে জিজ্ঞেস করে, ‘ ইজ এনিথিং রং? আর ইউ ওকে”? এটা আমেরিকায় একটি সামাজিক রীতি, আমিও রপ্ত করেছি আমেরিকান এই সুন্দর রীতি। পেনীর কাছে গিয়ে ওর পিঠে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলাম, ” আর ইউ ওকে? ইজ এনিথিং রং”? আমার কথা শুনে পেনীর কান্না বেড়ে গেল। সে শুধু বলতে পারলো, ওর খুব খারাপ সময় যাচ্ছে। দিনটা খুবই খারাপ ওর জন্য। আমি ভেবেছি, চাকুরী নিয়ে কোন সমস্যা হলো কি না! জিজ্ঞেস করলাম যে ম্যানেজার কিছু বলেছে কিনা। ও বললো, ” না ম্যানেজার কিছু বলেনি, আমার বেবীর অবস্থা খুব খারাপ। ওকে হসপিটালে পাঠাতে হয়েছে”।
-কী হয়েছে তোমার বেবীর? বেবীকে হসপিটালে পাঠিয়ে তুমি এখানে কেনো? ছুটি নিয়ে চলে যাও!
-না, ওকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে।
-চিন্তা করোনা, ঠিক হয়ে যাবে। ওর বয়স কত?
-সাত বছর। কালকেই ওর শরীর বেশী খারাপ করেছে, ভেটেরেনারী হাসপাতালেই ছিল, অপারেশান শেষে বাড়িতে পাঠিয়েছিল, কিনতু কাল থেকে ওর কিডনি ফাংশান একেবারেই বন্ধ।
-ওয়েইট ওয়েইট, তুমি কার কথা বলছো এতক্ষন ধরে?
-আমার বেবী, আমার স্পার্কি ,আমার প্রিয় ডগি’র কথা বলছি।
আমি ওকে বুঝতে দিলামনা যে আমি এতক্ষন ওর বাচ্চার কথা ভেবেছিলাম। এদেশে কুকুর-বেড়ালকেও ওরা ‘বেবী’ মনে করে, মানুষের বাচ্চার মতই আদর যত্ন করে। জানতে চাইলাম ওর ‘স্পার্কী’র কি হয়েছে।
-স্পার্কির কিডনীতে স্টোন হয়েছিল। অপারেশান করে স্টোন বের করা হয়েছে, গত সপ্তাহেই ওকে বাড়ী নিয়ে এসেছি। কিনতু গতকাল থেকেই ও আর পি পি করছেনা দেখে আবার ওকে পশু হসপিটালে এডমিশান করিয়েছি। ডাক্তার কোন হোপ দেখছেনা, ইনজেকশান দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে।
-তুমি কেঁদোনা, তোমার স্পার্কী ভাল হয়ে যাবে।
-জানিনা, ডাক্তার বলেছে ওর কিডনী একেবারেই ফেইলড। কিডনী ফাংশান না করলে কি যে হবে!
-তোমার কি মনে হয়, কিডনী ফাংশান না করলে ডায়ালিসিস করা হবে?
-হতে পারে!
এ পর্যন্ত শুনে আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। গেল বছর আমার কাজিনের হাজব্যান্ড মারা গেল কিডনী ফেইল করে, ডায়ালিসিস করা অনেক ব্যয় সাপেক্ষ ব্যাপার হওয়া সত্বেও তা করানো হয়েছিল। কিনতু শেষ রক্ষা হয়নি। আমরা মানুষের কিডনী ফেইলিওরের কথা শুনে অভ্যস্ত, কুকুরের কিডনী আদৌ আছে কিনা, থাকলেও মানুষের কিডনীর মতই তা অতি জরুরী কিনা সেটা নিয়ে ভাবার অবকাশ পাইনি কোনদিন।
আমাদের দেশেও শহরের কিছু বাড়িতে দুই একটি বেড়াল বা কুকুর পুষতে দেখা যায়। কিনতু তারা কী কুকুরের জন্য ঠিক পেনীর মত করেই কাঁদে? জানিনা, তেমন অভিজ্ঞতা আমার হয়নি। তবে ছোটবেলায় আমরা কেঁদেছিলাম ‘টমি’র জন্য। আমার দাদুর বাড়ীতে দারুন সুন্দর এক কুকুর ছিল, নাম ‘টমি’। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা সবাই চলে গেছিলাম শহর ছেড়ে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বাড়ী ফিরে দেখি ‘টমি’ শুয়ে আছে বাড়ীর উঠোনে। এই কয়মাস কে ওকে খেতে দিয়েছে, কে জানে! তবে খাওয়া দাওয়ার খুব কষ্ট হয়েছিল, তা ওর শরীরের দিকে তাকিয়েই বোঝা গেছিল। আমরা বাড়ী ছেড়ে পালিয়েছিলাম নিজেদের জীবন বাঁচানোর জন্য। এত আদরের ‘টমি’র কথা মনেও পড়েনি, অবশ্য টমি যদি মানুষ হতো, অবশ্যই সাথে করে নিয়ে যেতাম। কুকুর তো কুকুরই। ওকে ফেলেই চলে গেছিলাম। তবে টমি এই বাড়ী ছেড়ে কোথাও যায়নি। আমরা ফিরে আসার কয়েক মাসের মধ্যেই টমি মারা যায়। মৃত্যুর আগে টমি বোবা চোখে তাকিয়েছিল আমাদের দিকে। চোখ দিয়ে জল পড়ছিল ওর, আমরাও কেঁদে ফেলেছিলাম। ওর মৃত্যুর পরে ওকে অনেক যত্ন করেই মাটিচাপা দেয়া হয়েছিল। ব্যস! ঐ পর্যন্তই। পাড়া গাঁয়ের প্রায় সব বাড়ীতেই এক আধটা কুকুর দেখা যায়। দুপুরে সকলের খাওয়া দাওয়া শেষ হলে উচ্ছিষ্ট খেতে দেয়া হয় ওদেরকে, সেটাই ওরা সোনামুখ করে খায়। ঘরে-দুয়ারে ঢুকতে পারেনা, ফেলে দেয়া কাঁটা, মাংসের হাড্ডি খেয়ে দেয়ে বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করতে থাকে। এই তো, আমাদের দেশে কুকুর বেড়ালের জীবন চিত্র।

মুক্তিযুদ্ধের আগে দেখতাম, ভাদ্রমাস এলেই মিউনিসিপ্যালিটি থেকে ট্রাক নিয়ে ডোমেরা বের হয়ে আসতো, রাস্তায় কোন কুকুর দেখলেই হাতের সাঁরাসি দিয়ে সেই বেওয়ারিশ কুকুরের গলা চিপে ধরে মেরে ফেলতো। সেই মরা কুকুরকে ট্রাকের ভেতরে থাকা আরও অসংখ্য মৃত কুকুরের উপর ফেলে দিত। আমরা তখন ব্যস্ত হয়ে পড়তাম যার যার নিজেদের বাড়ীর পোষা কুকুরের গলায় বেল্ট পরিয়ে রাখতে। তবে ট্রাকের ভেতর নিথর দেহের কুকুরগুলো দেখে আমার সেই ছোট্ট শিশু শরীর ভয়ে কুঁকড়ে যেত।

স্পার্কির কথায় ফিরে আসি। তিনদিন পরেই পেনীর সাথে আবার দেখা হতেই স্পার্কীর শরীর কেমন আছে জানতে চেয়েছিলাম। ও খুব খুশী মুখে বলেছে স্পার্কী ভাল হয়ে যাচ্ছে। এটা শুনে কৃত্রিম ভদ্রতা দেখিয়ে বললাম, ” দেখেছো, সেদিন বলেছিলাম স্পার্কী ভাল হয়ে যাবে”। পেনী আমাকে অনেক ধন্যবাদ দিতে লাগলো, ওর স্পার্কীর জন্য প্রে করেছি বলে, বারবার স্পার্কীর খোঁজ নিয়েছি বলে। শুকনো হাসি দিয়ে আমি চলে এসেছি। নিজের মনে একটু অপরাধ বোধ হলো, আমি তো ওর স্পার্কীর জন্য প্রে করিনি, স্পার্কীর কথা ভুলেই গেছিলাম। অথচ ও জানে যে আমি খুব প্রে করেছি। আমি কিভাবে পেনীর কুকুরের জন্য প্রে করবো? আমি তো নিজের দেশের ভাই বোন, মা বাবার রোগ শোক নিয়েই জর্জরিত। আমার কাছে পেনীর কুকুরতো আর কোনভাবেই মানুষের চেয়েও জরুরী হতে পারেনা!

তিনদিন আগেই পেনীর সাথে আবার দেখা টী রুমে। জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কেমন আছো? তোমার বেবী কেমন আছে”?
-আমার স্পার্কীকে ডাক্তার ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে।
-কেন ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে কেন?
-কারন ওর কিডনী আর কাজ করছেনা।
-ঘুম পাড়িয়ে কতদিন রাখবে?
-ঘুম পাড়িয়েই দিয়েছে।
আমি কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না, ঘুম পাড়িয়ে দেয়ার ব্যাপারটা। সরাসরি জিজ্ঞেস করতেও পারছিলাম না, কুকুরটা মারা গেছে কি না। অলরেডী আমি অনেক অন্যায় করে ফেলেছি ওর সাথে অভিনয় করে। তবুও জিজ্ঞেস করলাম, পেনী তোমার স্পার্কীকে কি চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে? ও বললো, হ্যাঁ। বলেই সাথে সাথে বললো, ” এখন আমাদের আরেকটা ডগি’ চলে এসেছে”। এত তাড়াতাড়ি আরেকটা ‘ডগি’ চলে এসেছে? তোমরা কী এখন স্পার্কীকে ভুলে যাবে আস্তে আস্তে?
“না না , স্পার্কীকে ভুলবো কেনো? তবে আমরা এখন নতুন ডগি’ কে নিয়ে সবাই ব্যস্ত সময় পার করছি”। বলে তার ‘আই ফোন’ থেকে নতুন ডগি’র ছবি দেখাতে লাগলো। কী সুন্দর একটা কুকুরের ছবি। দেখলে আদর করতে ইচ্ছে করে।

-আচ্ছা, তোমার স্পার্কীর ছবি আছে তোমার কাছে?
-হ্যাঁ আছে।
বলেই অনেক খুঁজে পেতে সবচেয়ে সুন্দর ছবিটা আমাকে দেখাতেই আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। কী সুন্দর একটা কুকুর, বেড়ার লাঠি ধরে দুই পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানো। আমার বুঝতে দেরী হলোনা। ওরা শূণ্যতা রাখেনা, এক কুকুরের মৃত্যু হতেই আরেকটিকে নিয়ে এসেছে। ওরা কারো শূণ্যতা নিয়ে হাহাকারও করেনা। ‘আই ফোনের’ ফটো গ্যালারী এখন নতুন কুকুরের ছবিতে ভর্তি, স্পার্কীর ছবি এখন অনেক খুঁজে বের করতে হয়। এরাই পারে কুকুরকে মানুষের সমান মর্যাদায় ভালোবাসতে। আমরাও হয়তো পারতাম, হয়তো আরও অনেক বেশীই পারতাম। কিনতু আমরা নিজের সন্তানের মুখেই দুই বেলা দুই মুঠো খাবার দিতে পারিনা, কুকুরকে খাওয়াবো কি?