ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

হুমায়ুন আহমেদের’ কোথাও কেউ নেই’ নাটকের ‘মজনু’কে মনে আছে? যার মুখে সব সময় ছোট্ট একটি কাঠি থাকত। কথা বলার সময় কাঠিটি সে নিপুন দক্ষতায় ঠোঁটে চেপে রাখতো। মজনু ছিল বখে যাওয়া এক যুবক, যে আরেক বখে যাওয়া যুবক ‘বাকের ভাই’ এর চেলা ছিল। বখে যাওয়া যুবকদের নিজস্ব কিছু স্টাইল থাকে। বাকের ভাইয়ের হাতে থাকতো একখানা চেইন, যা সে সারাক্ষন বনবন করে ঘুরাতো এবং মজনুর ছিল ঠোঁটে চেপে রাখা কাঠি। বদি’র কোন নিজস্ব স্টাইল ছিলনা বলেই বদিকে ঠিক বখে যাওয়া যুবক মনে হতো না। সমাজের বখে যাওয়া যুবকদের কেউ ভালোওবাসেনা, মনেও রাখেনা। একমাত্র ‘কোথাও কেউ নেই’ র বাকের, বদি, মজনু ব্যতিক্রম। সেইজন্যই মজনুর মুখে কাঠি ধরে রাখার ছোট্ট কৌশল থেকে শুরু করে প্রতিটি ডায়ালগ এখনও সবার মনে আছে।

‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকে মজনুকে দেখার প্রায় আঠারো বছর পরে আবার আরেক মজনুকে দেখছি গত দুই বছর ধরে, একই ভঙ্গীতে খুবই নিপুনভাবে একখানা টুথপিক দুই ঠোঁটে চেপে রাখতে। তবে ইনি কোন বখা যুবক নন, যথেষ্ট বয়স্ক একজন ভদ্রলোক, আমাদের ফোন সার্ভিস ডিপার্টমেন্টের সম্মানিত গ্রাহক। গত দুই বছর ধরে ফোন সম্পর্কিত যে কোন প্রয়োজনে বৃদ্ধ মজনু সরাসরি আমার ডেস্কে চলে আসেন, তাঁর ধারনা আমি ছাড়া আর কেউ তাঁকে সাহায্য করতে পারবেনা। কিছু কিছু গ্রাহকের আমার প্রতি এই ধরনের মনোভাবকে আমি খুবই পজিটিভলি দেখি। এমনও হয়, কেউ কেউ এসেই আমার খোঁজ করে, আমি যদি অনুপস্থিত থাকি, ওরা জেনে নেয় পরবর্তী কোনদিন আমি থাকবো। নির্দিষ্ট দিনে যখন অফিসে যাই, সহকর্মীরা জানিয়ে দেয়, আজকে তোমার ‘কাজিন’ অথবা ‘আঙ্কল-আন্টি’ আসবে। আমি ওদের কথা শুনে হেসে ফেলি। আসল কথা, আমি বাঙ্গালী কায়দায় ‘আসেন, বসেন’ স্টাইলে গ্রাহকদের সাথে কথা বলি, এতেই বয়স্করা খুব খুশী হয় এমন আন্তরিকতা দেখে। আমার আলোচিত ‘মজনু’ হচ্ছে ঐ গুটি কয় আঙ্কলদের একজন।

ভদ্রলোককে প্রথম দিন দেখেই আমার ‘মজনু’র কথা মনে পড়েছিল। কারন, কথা বলার সময় তাঁর মুখের কাঠি একবারও এদিক সেদিক হয়না, এবং খুবই আশ্চর্য্যজনকভাবে তাঁর গলায়ও মজনুর স্টাইলে শীত গ্রীষ্ম বারোমাস একখানা মাফলার জড়ানো থাকে। আমি গ্রাহকদের সাথে অনেক রকমের গল্প করি নিজের প্রয়োজনে, আমার খুবই ভাল লাগে মানুষকে জানতে। কত ধরনের নতুন নতুন গল্প শুনি তাদের কাছ থেকে। দুই বছরের বাচ্চা থেকে শুরু করে আশি বছরের বৃদ্ধের সাথে গল্প করে আমি আনন্দ পাই, অবশ্যই তারাও যদি আমার সাথে গল্প করে মজা পায়। আমেরিকান মজনুকে অবশ্য গত দুই বছরে একবারও জিজ্ঞেস করিনি মুখে কাঠি রাখার কারন কি। আজ তাঁকে দেখামাত্রই মনে মনে ঠিক করে নিয়েছি, মুখে কাঠি রাখার মাহাত্ম্য জানতে চাইব। যথারীতি উনার ফোন রিলোড করে দিলাম এবং জানতে চাইলাম,

-আচ্ছা, তোমাকে তো সব সময় মুখে একখানা কাঠি নিয়ে ঘুরতে দেখি, ঘুমের মধ্যেও কি কাঠিটি তোমার মুখে থাকে?

-না না না, বিছানায় যাওয়ার আগেই কাঠি ফেলে দেই (আমার প্রশ্ন শুনে বেশ অপ্রস্তুত দেখায় তাঁকে)

-যদি কিছু মনে না করো, আমি কী জানতে পারি কাঠিটি মুখে রাখার কারন কি? এটা কি তোমার ছেলেবেলার অভ্যাস?

– না, ছেলেবেলার অভ্যাস না, দশ বছরের অভ্যাস। আমি ছিলাম চেইন স্মোকার, কিনতু আরও অনেক বছর বাঁচার আশায় দশ বছর আগে স্মোকিং ছেড়ে দেই। আসলে স্মোকিং আমার অনেক ক্ষতি করেছে, তাই ডাক্তারের কঠিন নিষেধ ছিল। কিশোর বয়সে সিগারেট ধরেছি, এত বছরের নেশা কী এক কথায় ছাড়া যায়? অথচ ছাড়তেই হবে, কাঠিটি তখন থেকে মুখে রাখতে শুরু করি, সিগারেটের বিকল্প হিসেবে।

-সিগারেটের বিকল্প এই কাঠি? সিগারেটের বিকল্প তো আরও কতকিছুই পাওয়া যায় এদেশে। কাউকে আমি কাঠি মুখে নিয়ে ঘুরতে দেখিনি এর আগে।

-সিগারেটের বিকল্প অনেক কিছুই পাওয়া যায় খুবই সত্যি, তবে সেগুলোও পয়সা দিয়ে কিনতে হয়। সিগারেটের পেছনে যা খরচ, সিগারেটের বিকল্প কিনতে গেলে খরচ বেশী ছাড়া কম না।

– তা অবশ্য ঠিক। তা বিনা খরচে সিগারেটের নেশা ভুলে থাকার এই পদ্ধতিটি কে বলেছে , তোমার স্ত্রী?

উপরের দিকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ঈশ্বর দিয়েছেন এই বুদ্ধি। স্মোকিং ছেড়ে আমার তখন খুব কষ্ট হতো, রাতের পর রাত ঘুম আসতো না, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থণা করতাম। উনিই আমাকে বুদ্ধিটা মগজে ঢুকিয়ে দেন।

– ছোট্ট একখানা কাঠি, তোমাকে নানা রকম কঠিন ব্যাধির আক্রমণ থেকে দূরে রেখেছে! এই কাঠির অনেক শক্তি দেখছি!

-হুম, একটা দেশলাই কাঠির মতই ক্ষমতা!

ভদ্রলোক দেশলাই কাঠির কথা বলতেই আমি বললাম, আমাদের দেশের এক কবি অনেক আগে দেশলাই কাঠির ক্ষমতা নিয়ে একখানা কবিতা লিখেছিলেন।

ধূমপান যে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তা পৃথিবীর সকলেই জানে। প্রতিটি দেশেই ধূমপানের বিরূদ্ধে প্রচারণা আছে কিনা তা আমি সঠিক জানিনা, তবে আমাদের দেশে সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে লেখা থাকে, ‘ ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’। ডাক্তারের কাছে গেলে সেখানেও রুগীকে সিগারেট না খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়া হয়। কিনতু ধূমপান যাদের নেশা, সেই নেশা কাটাতে গেলে বিকল্প কিছুর ব্যবস্থা না থাকলে রুগীকে মহা সমস্যায় পড়তে হয়। ডাক্তারের ভয়ে প্রথম দুই একদিন সিগারেট খাওয়া বন্ধ রাখলেও পাঁচ দিনের মাথায় তা আবার পূর্ণ উদ্যমে শুরু হয়। যুক্তি হিসেবে সকলেই প্রায় একটি কথাই বলে, মনের উপর নানাদিক থেকে আসা চাপ কমাতে নিকোটিনের ধোঁয়ার বিকল্প আর নেই। সিগারেটের ধোঁয়ার মধ্যেই থাকে ‘মনভুলানী’ গান। ‘সিগারেট স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’ শ্লোগান বার বার শুনতে শুনতেই বোধ হয় অনেকে ভাবে, ভাল ব্র্যান্ডের সিগারেট খেলে ক্ষতি কম! ব্র্যান্ড নেম এর সিগারেটে নিশ্চিন্ত মনে টান দিয়ে যায়, সব বুঝেও মানতে চায় না, যা ক্ষতিকর, তা সব নামেই ক্ষতিকর। বিড়ি যা ক্ষতি করবে, ফিল্টার দেয়া তামাকও একই ক্ষতিই করে। তাছাড়া অর্থদন্ডীর দিকটাও কম ইম্পর্ট্যান্ট নয়! খুব ভাল ব্র্যান্ডের সিগারেটের প্যাকেট এত বেশী দামী হয় যে ধনী ব্যতীত কিনতে গেলে অন্য যে কারো পকেটে টান পড়ে। এই কারনেই নেশ ধরে রাখতে ফিরে যেতে হয় সেই চিরপরিচিত সস্তা দামের সিগারেট অথবা বিড়ির অভ্যাসে।

এদেশে অবশ্য সিগারেট কিনতে গেলে আই,ডি দেখাতে হয়। যে কোন তামাক জাতীয় দ্রব্য কিনতে গেলেই ক্রেতাকে কমপক্ষে ২১ বছর বয়সী হতে হবে। এর নীচে কারো কাছে টোব্যাকো বিক্রী করা আইনতঃ দন্ডনীয় অপরাধ। তামাক বা সিগারেটের স্টলেই থাকে সিগারেটের বিকল্প নানা জিনিস। তামাক ছাড়া সিগারেট, তামাকের ফ্লেভারে নানা রকমের লজেন্স বিক্রী হয়। আরেকটি জিনিস বিক্রী হয়, তা হচ্ছে ‘প্যাচ’। প্যাচ হচ্ছে একটা ছোট ডিভাইস যা হাতের পাতলা চামড়ার নীচে লাগিয়ে দেয়া হয়। প্যাচ থেকে যে কেমিক্যাল নির্গত হবে, সেই কেমিক্যালই ধূমপায়ীর দেহে বা মস্তিষ্কে ধূমপানের আকাংক্ষা মেটানোর কাজ করে। তবে এ সবই ডলার খরচ করে কিনতে হয়। টোব্যাকো প্রোডাক্ট যেমন চড়া মূল্যে কিনতে হয়, টোব্যাকো নেশা থেকে পরিত্রাণের রসদও চড়া মূল্যেই কিনতে হয়।

এখানে পুরুষ ও নারী, উভয়েই ধূমপান করে সমানতালে। কেউ কারো চেয়ে কম যায় না। তাদের সংসার খরচের বিরাট এক অংশ জুড়ে আছে সিগারেট। নিজেরা স্বীকার করে সিগারেটের ক্ষতির কথা, অর্থনৈতিক এবং স্বাস্থ্য, দুই দিক থেকেই যে সিগারেট ক্ষতি করে চলেছে তা স্বীকার করে নিয়েও তারা রেগুলার সিগারেট টানে। কারো কারো নেশা এমনই বেশী যে কাজ চলাকালীন সময়ের মধ্যেই টুক করে বাইরে বেরিয়ে পড়ে। সিগারেট টেনে আবার কাজে ফিরে। কে কৈফিয়ত চাইবে? মাথার উপর ‘ম্যানেজার’ নামের বস যিনি থাকেন, তিনি নিজেও এই একই দোষে দুষ্ট। সহকর্মীদের দেখি, পকেটে টান পড়লে দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়, কিভাবে পরবর্তী দিনগুলো চলবে তা ভেবে মাথা এলোমেলো হয়। অথচ একবারও ভাবেনা, সিগারেটের নেশা কাটাতে পারলেই বিরাট বড় মুশকিল আশান হয়ে যায়। মুখে স্বীকার করে, সিগারেটের পেছনেই তাদের অর্ধেক খরচ, তারপরেও পারেনা এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে।

নানা রকম বিধি নিষেধ, সিগারেটের বিকল্প এত কিছু থাকার পরেও, উন্নত দেশগুলোতে ধূমপায়ীদের সংখ্যা বাড়ছে ছাড়া কমছেনা, আর আমাদের দেশের কথা ভাবলেই চোখে সর্ষে ফুল দেখি। নুন আনতে পান্তা ফুরায় যাদের, তারা কোথায় পাবে দামী ফিল্টার লাগানো সিগারেট? তাদের কাছে বিড়িই সম্বল। তাছাড়া ফিল্টার লাগানো সিগারেটই কি খুব ভাল? লেখক হুমায়ূন আহমেদ তো নিশ্চয়ই ভালো সিগারেটই খেতেন, তবুও কি পেরেছেন নিজের লাংস দুটোকে সুস্থ রাখতে! আমার এক বন্ধু, যার দুইবার হার্ট এটাক অলরেডী হয়ে গেছে, তার দুই আঙ্গুলের মাঝে দামী সিগারেটের শলা একটার পর একটা পুড়তে থাকে। ডাক্তারের কড়া নিষেধ থাকা সত্বেও নেশা কাটাতে পারছেনা বন্ধুটি, অথচ সে স্বপ্ন দেখে আরও অনেক বছর বেঁচে থাকার, মেয়ে বিয়ে দেয়ার স্বপ্ন দেখে, নাতি-নাতণীদের সাথে খেলা করার স্বপ্ন দেখে। মাঝে মাঝে মনে হয়, দেহের জন্য, জীবনের জন্য ক্ষতিকর নেশা গুলোর প্রতিই মানুষের এত ঝোঁক কেন! যে মানুষটি জীবনের নানা কঠিন যুদ্ধে জয়লাভ করে সাফল্যের চূড়ায় উঠতে পেরেছে, সে-ই কিনা সিগারেটের মত তুচ্ছ একটি জিনিসের বিরূদ্ধে লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে! জীবনের অর্জিত সাফল্য ভোগ করতে হলেও তো সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকতে হবে! কে জানে, হয়তো তামাকের গন্ধের ভেতরই তারা বেঁচে থাকার সার্থকতা খুঁজে পায়! আমার বন্ধুটিও হয়তো এজন্যই সব জেনে বুঝেও একটার পর একটা সিগারেট টেনে চলে।

সিগারেটের ক্ষতিকর দিক নিয়ে যুগ যুগ ধরেই গবেষণা হয়েছে, নতুন করে লেখার কিছু নেই। হঠাৎ করেই লিখে ফেললাম, লিখেই মনে হচ্ছে, জানা জিনিস নিয়ে কচকচানি করার কোন অর্থই হয় না। এই লেখাটি লেখারও কথা ছিল না, কেনো যে আমেরিকান মজনু’কে দেখামাত্র কোথাও কেউ নেই’ নাটকের মজনুকে মনে পড়ে গেলো! সেই মজনুকেও নাটকের কোন এপিসোডে সিগারেটে টানতে দেখিনি! বৃদ্ধ মজনুও গত দশ বছর ধরে সিগারেট ছেড়েছেন। নাটকের মজনু মুখে কাঠি কেনো রাখতো তা অবশ্য জানা নেই, তবে আমেরিকান ‘মজনু’ সাহেব মুখে কাঠি চেপে রেখে সিগারেটের ভয়াল নেশা থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। বলতেই হয়, আমেরিকান মজনুর মনের জোর আছে, বেঁচে থাকার আকুলতা আছে। তাঁর এই মনের জোরটাই আমাকে লেখাটি লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছে। লেখাটির ঊদ্দেশ্য হচ্ছে, মুখে চেপে রাখা ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি অথবা ছোট্ট টুথপিক কাঠির আইডিয়া ছড়িয়ে পড়ুক সকল ধূমপায়ীদের মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, বেঁচে থাকুক সকলেই আরও কিছু বছর সুস্থ দেহে।