ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

ছুটির দিনে কম্পিউটারে বসে লেখালেখি করছি, এমন সময় বাইরে থেকে কেউ আমাদের কলিংবেল টিপে তার আগমণ বার্তা জানাতেই ঝট করে নীচে নেমে এলাম, জানালার পর্দা সরিয়ে দেখি একজন কালো ভদ্রমহিলা দরজায় দাঁড়ানো। অচেনা কাউকে দেখে দরজা খুলে দিতে আমার সব সময় ভয় করে, কিনতু তবুও দরজা খুলি। আজকেও দরজা খুলে ‘হাই’ বলতেই ভদ্রমহিলা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ওগুলো কি গাছ? প্রথমটায় বুঝতে পারিনি, কোন গাছের কথা জানতে চাইছে! একফাঁকে দেখে নিলাম তাঁর গাড়ি আমাদের পার্কিং স্পেসে পার্ক করা। মনে মনে প্রমাদ গুনলাম, আমাদের বাড়ির প্রবেশমুখে বিশাল জায়গা জুড়ে ‘জ্যাকারান্ডা’ গাছ আছে। ভাবলাম এর কোন একটা শাখায় উনার গাড়ি ধাক্কা খেয়েছে কি না কে জানে! এখনই হয়তো পুলিশ ডাকবে। ভয় গোপন করেই হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলাম, ঠিক কোন গাছের কথা উনি জানতে চাইছেন। উনি আঙুল তুলে স্থলপদ্ম গাছের দিকে দেখালেন। স্থলপদ্ম গাছ উনি চেনেন না? এটা তো হতে পারেনা, আমি বলি স্থল পদ্ম, কিনতু এর আমেরিকান নাম আছে, আমার অবশ্য আমেরিকান নামটা মনে নেই। আমার ভাষাতেই বললাম, ‘আমাদের দেশে এই গাছের নাম হচ্ছে স্থল পদ্ম, মানে স্যান্ড লোটাস অথবা ল্যান্ড লোটাস”। আমাকে আশ্বস্ত করে এবং তার চেয়েও বেশী খুশী করে উনি বললেন, ” তোমার বাড়ির চারপাশে এমন সুন্দর গাছ দেখেই আমি গাড়ি থামালাম, খুব জানতে ইচ্ছে করছে, এগুলো কি গাছ? এমন সুন্দর পাতা আর এমন মিষ্টি গোলাপী রঙের এত বড় বড় ফুল, আগে দেখিনি”! আমি ভাবি, বলে কি! খুশী হয়ে উনাকে সবিস্তারে বললাম গাছগুলোর জন্মবৃত্তান্ত এবং আনন্দের আতিশয্যে কথা দিয়ে ফেললাম, ” ডিসেম্বারের দিকে তুমি এসো, গাছগুলো কেটে খন্ড খন্ড ডালা বের করে তোমাকে দেবো। জলে ভিজিয়ে রেখো, শেকড় গজালেই মাটিতে পুঁতে দিবে। গাছ হবে”। ভদ্রমহিলা ভিনদেশী এক মহিলার আন্তরিকতায় খুশী হয়ে ‘আবার আসবো’ কথা দিয়ে চলে গেলো। আর আমি অসম্ভব খুশী মনে ঘরে ঢুকে গেলাম। দরজা বন্ধ করে দিয়ে আবার কম্পিউটার টেবিলে বসেই লেখার টপিক বদলে ফেললাম।

আমাদের বাড়ীতে স্থল পদ্মের গাছ আছে প্রচুর। অবশ্য চার বছর আগে বাড়ী যখন কিনেছিলাম, তখন বাড়ীর ব্যাক ইয়ার্ডে স্থলপদ্মের একটা মাত্র গাছ ছিল। সেপ্টেম্বারে গৃহপ্রবেশ করেছিলাম, তখনও ফুল ফোটার সময় হয়নি বলেই ফুল ফোটেনি। আমি গাছ-গাছালি ভালোবাসি, গাছের নাম না জেনেও ভালোবাসি। এখানে বেশীর ভাগ গাছেরই নাম জানিনা, কিনতু চারদিকের সবুজ দেখে মুগ্ধ হই। সব গাছের নাম না জানলেও বাড়ীর ব্যাক ইয়ার্ডের গাছটির পাতার দিকে তাকিয়েই চিনে ফেলেছি, খুবই খুশী হয়েছি নিজ বাড়ীর আঙিনায় স্থল পদ্মের গাছ দেখে। ‘নিজ বাড়ি’ বলাটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত জানিনা, যদিও অভ্যাসবশতঃ সকলের কাছে ‘আমাদের বাড়ি’ টার্মটি ব্যবহার করে থাকি, তারপরেও মনে মনে জানি এটা ‘নিজের বাড়ী’ না। কারন ব্যাঙ্ক লোন নিয়ে বাড়ী কিনেছি, ব্যাঙ্কের কাছে ঋণী হয়ে আছি ১৫ বছরের চুক্তিতে। মাসে মাসে সুদ সমেত ঋণ শোধ করে যাই। এটাকে কি ‘নিজ বাড়ি’ বলা যায়! ১৫ বছরে বা ৩০ বছরে যখন সুদসহ সমস্ত ঋণ পরিশোধ হয়ে যাবে, তখনই শুধু বলতে পারবো, নিজের বাড়ী। তারপরেও অবচেতন মনেই ঋণের বাড়িকেই ‘নিজ বাড়ী’ বলতে ভাল লাগে, এক ধরনের অধিকারবোধ জন্মায়, মনের মত করে সাজাতে ইচ্ছে করে।

প্রবাসে সকলেই যার যার সুবিধামত, পছন্দমত বাড়ী কিনে নিজের রুচী অনুযায়ী বাড়ীকে ঢেলে সাজায়। আগ জীবনে আমারতো বাড়ী-ঘর বলতে কিছু ছিলনা, এমনকি লোনের বাড়ীও না, হঠাৎ করেই জীবনের মাঝপথে এসে আমরাও ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে চার বছর আগে ছোট্ট একটা বাড়ী কিনে ফেললাম। ছোট বলতে ছোটই, আমেরিকার অন্যান্য বিশাল বাড়ীর তুলনায়। বাড়ীটির মালিক ছিলেন অবিবাহিতা এক বৃদ্ধা। বৃদ্ধার মধ্যযৌবনে তাঁর বাবা মেয়ের জন্য বাড়িটি তৈরী করে দেন, যেন শেষ বয়সে মেয়েকে কষ্ট করতে না হয়। একজনের বাসযোগ্য বাড়ী বলেই সবকিছু মাপমত করা হয়েছে। কোথাও বাড়তি কিছু নেই। বাড়তি কোন গাছপালাও না। এমন কি বাড়ির কোথাও সাজানো বাগানও ছিলনা। স্থায়ীবৃক্ষ কয়েকখানা লাগানো ছিল, কে লাগিয়েছিল জানিনা, জানার সুযোগ হয়নি, কারন বৃদ্ধার মৃত্যুর পরে তার আত্মীয়-স্বজনেরা বাড়ীটি বিক্রী করে দেয়। আত্মীয়-স্বজনদের সাথে দেখা হয়নি, তাই বাড়ীর ইতিহাস সম্পর্কে কিছুই জানিনা। বাড়ি বিক্রী করে টাকা হাতে পেয়েই সবাই লাপাত্তা।

সেই ছোট বাড়ির পেছন দিকের বাগানে পেয়েছি একখানা স্থল পদ্ম, আর একখানা ডুমুর গাছ। হ্যাঁ, বাড়ির জানালা লাগোয়া এক খন্ড অতি সুন্দর স্পেস ছিল, আমার ঘরের জানালার ধার ঘেঁষে, ফার্ণ দিয়ে সাজানো এক চিলতে জমি। চোখ জুড়িয়ে যায়, কিনতু চোখ জুড়ানো ফার্ণের ঝোপ আমি লোক দিয়ে কাটিয়ে ফেলেছি। ফার্ণ খুবই দামী, ফার্ণের ঝোপ দেখতেও ভারী সুন্দর, তা সত্বেও ঝোপটি কাটিয়েছি কারন বাড়ির দালাল বলেছে, ফার্ণের ঝোপে সাপ থাকে। এই কথা শোনা মাত্র আমার শরীরে ইলেকট্রিক শকের মত জোর ধাক্কা লাগতেই আমার স্বামী সাথে সাথে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন, ফার্ণের ঝোপের মূলোৎপাটনের। বাড়ীতে উঠে চারপাশে তাকাই, কেমন ম্যাড়মেড়ে লাগে, কোথাও কোন ফুলের গাছ নেই, পদ্মফুল গাছ ভেবে যে গাছটিকে চিহ্নিত করেছি, সেটাতেও কোন ফুল নেই। বাড়ির মালকিন অসুস্থ অবস্থায় এক বছর ক্লিনিকে ছিলেন বলেই বাড়ীঘরের কোন যত্ন হয়নি। চারদিকে আগাছা জন্মেছে, বাড়িটি বিক্রী করতে দেয়ার আগে যতটুকু সম্ভব পরিষ্কার করে তবেই ওরা ‘সেল লিস্টে’ দিয়েছে। বাড়ীটি কোন ভাবেই আহামরি কিছু নয়। তবে বাড়ির লোকেশান আমাদের অনুকূলে হওয়াতেই বাড়ীটি কেনার সিদ্ধান্ত নেই (অবশ্যই ব্যাঙ্ক লোনে)। ‘নিজের বাড়িতে’ উঠার মাস খানেকের মধ্যেই স্থল পদ্ম গাছে ঝেঁপে ফুল ফুটতে শুরু করে। সে যে কী সুখ, কী সুন্দর, কী দারুণ অনুভূতি তা বলে বুঝাতে পারবো না। ঠিক ঐ মুহূর্তে একবারের জন্যও মনে হয় নি, এ আমার নিজের বাড়ী না।

বাড়ীর মালকিনের এক ভাইপো একদিন এসে আমাদের দেখিয়ে দিয়ে যায়, শীতে কিভাবে স্থল পদ্মের ডালগুলোকে গোড়া পর্যন্ত কেটে দিতে হয়। গোড়া পর্যন্ত কেটে দিয়ে খড়-বিচালী দিয়ে গাছের গোড়া ঢেকে রাখতে হয় সমস্ত শীতকাল, আর কাটা ডালগুলোকে টুকরো টুকরো করে খন্ড গুলো বালতির জলে বা যে কোন ফ্লাওয়ার ভাসে অর্ধেক ডুবিয়ে রাখলে ডালগুলোতে শেকড় গজায়। শেকড় সমেত ঐ ডালগুলো শীতের শেষে মাটিতে লাগিয়ে দিলেই নতুন গাছ বের হয়। এভাবেই ইচ্ছে করলে গাছের সংখ্যা বাড়ানো যায়। ভদ্রলোক নিজে হাতেই গাছের ডাল-পালা একেবারে গোড়া পর্যন্ত কেটে দিয়ে আমাদের দেখিয়ে দিল কিভাবে ছোট ছোট টুকরোগুলোর অর্ধেক অংশ জলে ভিজিয়ে রাখতে হয়। উনাকে অনেক ধন্যবাদ দিলাম, এরপর প্রতিদিন একবার করে দেখি ডাল থেকে শেকড় বের হয় কিনা। একসময় আমার অপেক্ষার পালা শেষ হয়, ডাল থেকে শেকড় গজায়, শেকড়সহ ডালাটি মাটিতে পুঁতে দিতেই নির্দিষ্ট সময়ে একটি ডাল থেকে আরো অসংখ্য ডালপালা বের হয়ে সবুজ পাতায় ভরে যায়।

আমি আশেপাশের বাড়িগুলোর দিকে তাকাই, সকল বাড়ির সামনের সুন্দর সাজানো বাগানের দিকে তাকাই। নয়ন জুড়ানো বাগান দেখে দৃষ্টি সার্থক হয়, মনের গভীরে একটু সূক্ষ্ম বেদনা টের পাই। খুব মাঝে মাঝে আমারও ইচ্ছে করে, অমন সুন্দর করে বাগান তৈরী করতে। ইচ্ছেগুলোকে বেশীক্ষন লালন করিনা, খুব দ্রুত বাস্তবে ফিরে আসি। অমন সুন্দর বাগান করতে প্রচুর খরচ, এবং রেগুলার সেই খরচ বহন করার মত সক্ষমতা আমাদের কোনকালেই ছিলনা। কিনতু ইচ্ছেগুলোকে তো আর অবহেলা করতে পারি না। কাজের ফাঁকে ফাঁকে নানা রকম চিন্তা করি, কিভাবে বাড়িকে সবুজে ঘিরে ফেলা যায়। বাঙ্গালের বুদ্ধি, কিভাবে স্বল্প খরচে বেশী ফল পাওয়া যায়, সেই চিন্তাতেই বিভোর থেকেছি, এরপরেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বাড়িটাকে স্থলপদ্মের সবুজে ঘিরে ফেললে কেমন হয়! পদ্মফুল গাছে ঘেরা বাড়ির নাম দেবো, ‘পদ্মবাড়ি’। যেমন ভেবেছি, তেমনই শুরু করেছি। একটা কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতেই হয়, আমার যে কোন ইচ্ছেতে আমার স্বামী বাধা দেন না।

এদেশে বাড়িঘর নিয়ে বাংলাদেশী বা ভারতীয়দের মাঝে একধরনের আবেগ কাজ করে, যে আবেগের বশবর্তী হয়ে অনেকে বাড়িঘরে কাউকে নেমন্তন্ন করেও খাওয়ায় না। পাছে অতিথিদের আগমনে ঘরে-দুয়ারে এতটুকু দাগ পড়ে যায় অথবা দামী কার্পেটে কোকের গ্লাস উলটে পড়ে যায়! এমনি অনেক ধরনের বাতিক নিয়েই তারা বাড়িঘরকে ‘ইন্দ্রপুরী’ বানিয়ে রাখে এবং একধরনের ‘সুখতৃপ্তিতে’ আচ্ছন্ন থাকে। সেই দিক থেকে চিন্তা করলে আমরা এখনও ‘গাঁইয়া’ রয়ে গেছি। গাঁইয়া বলেই বাড়ি কেনার প্রথম বছরেই পেছনের আঙিনা জুড়ে মাটি কুপিয়ে লাউ-কুমড়া, আলু, বেগুনের চাষ শুরু করে দিয়েছিলাম। প্রথম বছর সব্জীর ফলন ভালো হয়েছে। এর রেশ ধরেই ‘পদ্মবাড়ি’ বানানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দ্বিতীয় বছরে স্থল পদ্মের প্রচুর ডালা তৈরী করলাম। নিজে নিজেই মাটি খুঁড়ে বাড়ির সামনের রাস্তার দুই পাশে পদ্মডালা লাগিয়ে দিয়েছি। এরপর বাড়ির চারপাশেও লাগিয়েছি আরও কতগুলো ডালা। প্রথম দিকে কী যে বিচ্ছিরী লাগতো দেখতে, ইঁট বিছানো রাস্তার দুই পাশে কাঠি বসানো, এখন হাসি পায় সে দৃশ্য মনে পড়লে। আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসে দুই একজন দামী অতিথি (বাঙ্গালী) মুখ টিপে হেসেও গেছে আমার পাগলামী দেখে। ত্যাছড়া মন্তব্য করতেও ছাড়েনি। ওদের বাড়ি-ঘর ইন্দ্রপুরীর মতই সাজানো-গোছানো, আমার এমন বেহাল অবস্থা দেখে বাঁকা হাসি দেয়ার অধিকার ওদের আছে, আমি শুধু আগামীর অপেক্ষায় থেকেছি। কল্পনায় দেখতাম, বিনা খরচেই আমার বাড়িকে সবুজ সুন্দর করে ফেলেছি।

তৃতীয় বছরে কিছু গাছ বেড়েছে, কতগুলো একেবারেই বাড়েনি। কতগুলোতে ফুল ফোটার সীজনে ১০/১২টার বেশী ফুলও ফোটেনি। এদিকে বাড়ির পেছনের মূল গাছটিতে অসুখ হয়ে কেমন যেনো জবুথবু অবস্থা হয়ে গেছে দেখে আমার মনটা খারাপ হয়ে গেছে। স্টোর থেকে ‘সেলে’ স্থায়ী জাতের কিছু ফুলের ‘বালব’ এবং বীজ কিনে এনে কিছু কিছু জায়গায় ছড়িয়ে দিলাম। সময়মত গাছও হলো, সেগুলোতে ফুলও ফুটলো। জিনিয়া ফুল এমনভাবে ফুটেছে যে অনেক দূর থেকেও এর উজ্জ্বল বেগুণী ও কমলা রঙ সকলকে হাতছানি দিয়ে কাছে ডেকে আনে। বাড়ির পুরনো গাছগুলোর মধ্যে দুই তিনখানা খুব ভালো জাতের গোলাপ ফুলগাছ ছিল। সেগুলই মাঝে মাঝে ফুটে আমাকে সান্ত্বণা দিয়েছে। বছরের শেষে এবার আর গাছের ডালপালা কাটা হয়নি। শীতের তীব্রতায় সমস্ত পাতা ঝড়ে গিয়ে দূর্বল শরীরে ন্যাড়ামুন্ডি ডালপালা নিয়েই আমার স্থলপদ্মের গাছগুলো দাঁড়িয়েছিল। আমার মনটা খারাপ হয়ে গেছিল, পরিকল্পণা সার্থকতা না পাওয়ায়।

কিনতু চতুর্থ বছরে এসেই আমার স্বপ্ন সার্থকতা পেতে শুরু করেছে। বাড়ির চারদিক সবুজ স্থলপদ্মের ছায়ায় ঢেকে যেতে শুরু করে। স্বাভাবিক হিসেবে গাছগুলোতে ফুল ফোটে সেপ্টেম্বারের শেষে। ‘বেবী পিঙ্ক’ বা হালকা গোলাপী রঙের বড় বড় ফুলে ছেয়ে থাকে সমস্ত গাছ। ভ্রমর আর প্রজাপতি, মৌমাছিদের আনাগোনা শুরু হয়। আগে রাস্তা থেকে আমাদের বাড়িটি খোলামেলা দেখা যেত। এখন ঘন সবুজ, কচি সবুজের ফাঁক দিয়ে বাড়িটিকে উঁকি মারতে দেখা যায়। আমাদের প্রয়াত মালকিন বাড়ির প্রবেশ পথে আকাশ ছোঁয়া জ্যাকারেন্ডা গাছ লাগিয়েছিলেন, সেখানেও গ্রীষ্মের শেষে হালকা ম্যাজেন্টা রঙের ফুল ফুটে। এই গাছ দুটো খুবই সুন্দর, এই গাছের গোড়াতেই ধাক্কা লাগিয়ে চ্যাপ্টা করে ফেলেছিলাম আমাদের বিশাল টয়োটা ভ্যানের পেছন অংশ। তারপরেও গাছের উপর রাগ করিনি। গাছগুলোকে যত্ন করার সুযোগ পাইনা, শুধুই ভালোবাসি। গাছের প্রান আছে বলেই ওরা আমাদের ভালোবাসা বুঝতে পারে, আমাদের অপারগতায় কষ্ট নেয়না, বিনা যত্নেই ওরা আমাদের ফুল-লতা-পাতায় ঘিরে রেখেছে।

আলসেমী করেই গত বছরের শেষে স্থলপদ্মের গাছগুলোকে কাটা হয়নি, ভেবে ভয় পেয়েছিলাম বুঝিবা শীতের শেষে ওরা আর সবুজ হবে না। আমাদের অবাক করে দিয়ে শীত শেষ না হতেই সারা গাছে পাতা আসতে শুরু করে। একসময় দেখি ওরাও বড় হয়ে আমাদের বাড়ির উচ্চতা ছাড়িয়ে আকাশ ছুঁতে চাইছে। প্রবেশ পথের দুই ধারে যে পদ্মের যে ডালা লাগিয়েছিলাম, সেগুলো বড় হয়ে দুই পাশ থেকে তোরণের মত অবয়ব সৃষ্টি করেছে। ফুল ছাড়াই দেখতে ভাল লাগে। মাঝে মাঝে আমার স্বামী ভাবেন, গাছগুলোকে কেটে ফেলতে হবে। খুব বেশী বড় হয়ে গেছে। ভেবেছেন, এখনও কাটেন নি। ভালোবাসেন তো, এই জন্যই কাটতে পারছেন না। এ বছরের ২৯শে সেপ্টেম্বার আমাদের গৃহপ্রবেশের চার বছর পূর্ণ হবে। আমাদের অবাক করে দিয়ে অক্টোবারের বদলে জুলাই মাস থেকেই প্রতিটি গাছে একটা দুটা করে ফুল ফুটতে শুরু করেছে। গাছের চারপাশে রঙ বেরঙের প্রজাপতির পাখায় আন্দোলন দেখি আর কানে আসে ভ্রমরের গুঞ্জন! এই তো চেয়েছিলাম, চাওয়া পূর্ণ হতে তিনটি বছর লেগে গেলো! এজন্যই কি উৎপলা সেন গেয়েছিলেন, ” বহুদিন পরে ভ্রমর এসেছে পদ্মবনে”!