ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

আমার মা মাত্র চার দিন আগেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। উনি ঢাকা শহরের নামী-দামী এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে উনাকে আইসিইউ তে রাখা হয়েছিল শেষ ছয় দিন। আমি মা’কে শেষবারের মত দেখতে আমেরিকা থেকে এসে সরাসরি হাসপাতালে চলে যাই। সেখানেই পর পর পাঁচ দিন আই সি ইউ ইউনিটের ওয়েইটিং রুমে অন্য সকলের সাথে বসে থেকেছি। এই চারদিনে আমার কত রকমের অভিজ্ঞতা হয়েছে, কত নতুন মানুষ দেখা হয়েছে। হাসপাতাল মানেই যেমন অসুস্থতা, বিষাদ, মন খারাপ, কান্না, হতাশা, জলের মত টাকা খরচ , আবার হাসপাতালে যাওয়ার সাথে সুস্থ হয়ে ফিরে আসার আনন্দও আছে। পাঁচ দিনে হাসি-কান্নার দুই অভিজ্ঞতার পাশাপাশি অন্য এক অভিজ্ঞতা হয়েছে, যা ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রতিটি মানুষকে মুহূর্তের জন্য হলেও কৌতুক মিশ্রিত আনন্দ দিয়েছে।

ঘটনাটি এ রকমঃ

হাসপাতাল বিল্ডিং এর পঞ্চম তলায় আই সি ইউ বিভাগ। আমি আর আমার কাজিন পঞ্চম তলা থেকে তৃতীয় তলায় যাওয়ার জন্য লিফটের অপেক্ষায় ছিলাম। লিফট এর দরজা খুলতেই দুই তিনজন লিফটের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো আর আমি ভাইকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলাম। লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে খুব অমায়িক কন্ঠে (পুরুষ) কাউকে বলতে শুনলাম, ‘আমাকে একটু মাফ করুন”! প্রথমে খেয়াল করিনি, দ্বিতীয়বার ‘আমাকে মাফ করুন’ শুনতেই আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটিকে একটু নড়েচড়ে উঠতে দেখলাম। দরজা বন্ধ হবার উপক্রম হতেই সেই পুরুষ কন্ঠ একটু অসহিষ্ণু কন্ঠেই আবার বলে উঠলো, “আমাকে মাফ করুন, কথাটি কতবার বললাম। একটা কথা বললে সেটা ভাল করে বুঝার চেষ্টা করতে হয়”। কথাকটি দ্রুত বলেই উল্লেখিত যুবককে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়েই ভদ্রলোক লিফট থেকে আই সি ইউ ইউনিটে নেমে যেতেই লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। মাঝবয়সী ভদ্রলোকটিকে দেখতে বেশ বিনয়ী এবং ভদ্র লাগছিল।

ঘটনার আকস্মিকতায় সকলেই হতভম্ব, আমিও। ” এক্সকিউজ মি” না বলে ভদ্রলোক মাতৃভাষায় “আমাকে মাফ করুন’ বলেই চলেছিলেন, কিনতু ‘এক্সকিউজ মি’ বলে এবং শুনে অভ্যস্ত বাঙ্গালী ‘আমাকে মাফ করুন’ কথাটি অনুধাবন করতে না পারাতেই তো এমন বিপত্তি! এরপর শুরু হয়ে গেলো খুক খুক হাসি, নানা রকম টীকা টিপ্পনী। আমি নিজেও একটু সময়ের জন্য মায়ের অসুখের কথা ভুলে গেলাম। আমি খুক খুক করে না হেসে বেশ শব্দ করেই হেসে ফেললাম। আমিও অনেকটাই স্বগতোক্তি করে ফেললাম, ” আমাকে কেউ এভাবে বললে তো আমিও বুঝতে পারতাম না”। আমার কথা শুনে যুবকটি বলল, ‘ আমিও বুঝতে পারিনি উনি কার কাছে ক্ষমা চাইছিল”। লিফটের ভেতরে থাকা রুগী দেখতে আসা বিষন্ন স্বজনদের একজন মন্তব্য করল, ” হাসপাতালে আসছে নাটক করতে। শুদ্ধ ভাষা ফুটাইতে আসছে লিফটের ভিতরে”। আরেকজন বললো, ” এক্সকিউজ মি’ বললেই চলতো, তা না করেই ভদ্রলোক আবার বিরক্তি দেখিয়ে গেল”।

দারুণ মন্তব্যটি করে ফেললো এক মহিলা, “মাফ করেন, মাফ করেন কওনের কি আছে, আমরা কি ভিক্ষুক নাকি? ভিক্ষুকরে মাইনষে মাফ করতে কয়। ব্যাডা এইখানে আসছে নক্সা দেখাইতে”।

লিফটটি প্রথমে উপরের দিকে যাচ্ছিল, তাই সরাসরি নীচে না নেমে প্রথমে উপরের দিকেই গিয়েছিল, চৌদ্দ তলা পর্যন্ত গিয়ে তারপর গ্রাউন্ড ফ্লোরে যায়। আমি আমার কাজিনকে নিয়ে তৃতীয় তলায় নেমে যাই। জানিনা সেই ভদ্রলোকের ‘আমাকে মাফ করুন’ ডায়ালগটি নিয়ে আরও কিছুক্ষণ সকলের মাঝে হাসি ঠাট্টা হয়েছিল কিনা।