ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

আগামী ২০শে অক্টোবার থেকেই শুরু হচ্ছে আবহমান বাংলার প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। দুর্গাদেবী মুলতঃ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আরাধ্য দেবী হলেও দুর্গাপূজা হচ্ছে সার্বজনীন। বাংলার হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টানসহ দেশের সকল সম্প্রদায়ের মাঝে দুর্গাপূজা বাংলার শারদোৎসব হিসেবে পরিচিত। সার্বজনীন শারদোৎসবে বাংলার প্রতিটি মানুষের অংশগ্রহণ মানুষে মানুষে মহামিলনের বাণীকে উদ্দীপিত করে।

মনে পড়ে, প্রবাসী জীবন শুরুর আগের দিনগুলোর কথা, আরও পেছনে তাকালে শৈশব-কৈশোরের কথা। বাল্যকালে দূর্গাপূজা মানেই ছিল একটানা দশ দিনের আনন্দ। দুর্গাপূজা শুরুর দিন পাঁচেক আগেই দেবীকে পৃথিবীতে আবাহন করা হয় ‘মহালয়া’ পূজার মাধ্যমে। এই ধরিত্রী হচ্ছে দেবীর পিত্রালয়। বিনা নিমন্ত্রনে বিবাহিতা কন্যাকে বাপের বাড়ীতে আসতে নেই, তাই ‘মহালয়া’ তিথিতে দেবীর স্তুতি বন্দনা করে মহা সাড়ম্বরে স্বামী, পুত্র-কন্যাসহ দেবীকে পিত্রালয়ে আবাহন করা হয়। স্তুতি বন্দনায় দেবী আকুল হয়, স্বামী-সন্তান নিয়ে পাঁচ দিনের জন্য পিত্রালয়ে আসেন। কখনও আসেন ঘোড়ায় চড়ে, কখনও নৌকায়, কখনওবা আসেন পালকী চড়ে। তবুও দেবী আসেন বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে, দেবী আসেন আশ্বিনের শারদ প্রভাতে। দেবী আবাহনের দিন থেকেই শুরু হয় আমাদের অপেক্ষার প্রহর গোনা।

ছোটবেলায় মহালয়া দিয়ে শুরু হতো আমাদের আনন্দপর্ব, দেবী বিসর্জনে হতো সমাপ্তি। আনন্দ নয়, মহালয়ার আগের রাতে মনে থাকত দারুন উত্তেজনা। ভোর রাতে রেডিওতে প্রচারিত হবে মহালয়া, মনে উত্তেজনা নিয়ে ঘুমাতে যেতাম। রাত তিনটে বাজতেই ঘুম ভেঙ্গে যেত, মা-বাবার সাথে সাথে ভাইবোনেরা অপেক্ষা করতাম কখন বেতারে ভেসে আসবে ‘আকাশবাণী কলকাতা’ থেকে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের সুরেলা কন্ঠে দেবী বন্দনা। দেড় থেকে দুই ঘন্টাব্যাপী প্রচারিত মহালয়ার সুরেলা জালে আটকে যেত দেহ তনু মন। রাতের অন্ধকার কেটে গিয়ে ঊষার আলো ফুটতে শুরু করলেই প্রতিটি বাড়ী থেকে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বাড়ীর বাইরে বেরিয়ে আসতাম। দল বেঁধে পাড়ার আখড়ায় চলে যেতাম, প্রায় সমাপ্ত দেবী মূর্তির দিকে তাকিয়ে থাকতাম, মনে মনে প্রার্থণা করতাম, “ মা, মাগো, তুমি তাড়াতাড়ি চলে আসো, আমরা অপেক্ষা করছি”। আখড়া থেকে বের হয়ে দল বেঁধে পাড়ার রাস্তা ধরে হেঁটে বেড়াতাম। আশেপাশের প্রতিটি বাড়ী থেকে ভেসে আসতো মহালয়ার অপূর্ব সব সঙ্গীত, সাথে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের কম্পিত কন্ঠে

“ ইয়া দেবী সর্বভুতেষু, মাতৃরূপেন সংস্থিতা, নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ”। হে দেবী, তুমি এই ভুবনের সর্বত্র মাতৃরূপে বিরাজিত, তোমাকে প্রণাম’। এক সময় ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’ গানটি শুরু হলেই আমার ছোট্টমনে অনাবিল শান্তির ছোঁয়া লাগত। ঐ মুহূর্ত থেকেই আনন্দ যেন ছুঁয়ে যেত আমার আশপাশ, আমার চারধারের পৃথিবী। এভাবেই বড় হয়েছি, সংসারী হয়েছি, জীবনের প্রতিটি দিনে নানা রকম পরিবর্তন এসেছে। ছোটবেলার অনুভূতির সাথে বড়বেলার অনুভূতিতেও পরিবর্তন এসেছে। রাস্তায় রাস্তায় না হেঁটে বিছানায় বসেই মহালয়ার দেবী বন্দনা শুনেছি। একইভাবে শিহরিত হয়েছি। জীবনের পরবর্তি ধাপগুলো পেরিয়ে আরও পরিনতির দিকে এগিয়েছি, জীবিকার তাগিদে, জীবনের প্রয়োজনে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছি।

প্রবাস জীবন শুরু হতেই শারদ প্রভাতে ভাটার টান টের পেতে শুরু করেছি। বেশীর ভাগ সময়ই দেশের নিয়মে, পঞ্জিকার তিথি অনুযায়ী বিদেশে পূজা উদযাপন করা সম্ভব হয় না। এমনও হয়, দেশে পূজা শুরু হওয়ার আগেই আমাদের এখানে কোন এক শনি-রবিবার ধরে দূর্গাপূজা আয়োজন করতে হয়, অথবা দেশের পূজা শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ পরে হয়তো বা আমাদের এখানে পূজা আয়োজন করা হয়। ফলে দিন ও রাতের তারতম্যে দেশের ভোররাতের মহালয়া শুরু হয় আমেরিকার পড়ন্ত বিকেলে, যখন আমরা থাকি অফিসে, না-হয় অফিস ফেরত গাড়ীতে। ফলে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র মহাশয়ের সুরেলা কন্ঠের দেবী আবাহন আর শোনা হয়না। ছোটবেলার মত করে আখড়ায় গিয়ে প্রায় সমাপ্ত দেবীমূর্তির দিকে তাকিয়ে দেবীকে আর আবাহনও করা হয়না। তাই বলে কি আর মহালয়া শোনা হয় না! মহালয়া শুনি, তবে অসম্পূর্ণভাবে। দেশ থেকে সাথে করে নিয়ে আসা ক্যাসেটে শুনি মহালয়ার সুর, অন্য কোন সময়ে, অন্য কোন বিকেলে। একা একা অথবা পাশে উপস্থিত সংগীকে নিয়ে। দুই ঘন্টার মহালয়া একটানা শোনা হয়না, ব্যস্ত কঠিন জীবনের অতি, জরুরী কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র মহাশয় দেবীকে নানা ভাবে কাকুতি-মিনতি করেই চলেন, সুরেলা কন্ঠ একটু একটু করে অস্পষ্ট হয়ে আসে, ক্যাসেটের ফিতে ঘুরতে ঘুরতে এক সময় থেমে যায়। আমরাও এক সময় ভুলে যাই ক্যাসেট প্লেয়ারের বাটন অফ করে দেয়ার কথা।