ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

দেশে বাবাকে ফোন করেছিলাম। আমার মায়ের ফোনটা এখন বাবা ব্যবহার করেন। প্রথমবার ডায়াল করতে সাত আটটি রিং হয়ে ফোন থেমে গেল। কী ব্যাপার! বাবা কেনো ফোন ধরলেন না, মনে একটু ভয় ধরে গেল। তবে কি বাবা অসুস্থ? সম্প্রতি মা মারা যাওয়ার পর এই ব্যাপারটা খুব বেশী করে মনে হয়। মা বেঁচে থাকতে ফোন করে মায়ের সাথেই কথা বলতাম, বাবার সাথে কথা বলতাম নববর্ষ, পূজা, জন্মদিন, বিবাহ বার্ষিকীতে। বাবার বয়স হয়েছে, মোবাইল ফোনের সাউন্ড খুবই কম মনে হয় উনার কাছে, আমরা কথা বলে যাই, আর উনি শুধু ‘হ্যালো’ হ্যালো’ করতে থাকেন। দু তরফেই বিরক্তির মাত্রা বাড়তে থাকে বলে বাবার সাথে কথা না বলে মায়ের কাছ থেকে সমস্ত সংবাদ জেনে নিতাম। এখনতো আর মা নেই, বাবার খোঁজ বাবার কাছ থেকেই নিতে হবে। সেজন্যই বাবা ফোন না ধরায় মনটা কেমন করে উঠেছে। মাথায় আসেনি, বাবা তো ফোনের রিং শুনতে পান নি। ব্যাকুল হয়ে ভাইয়ের নাম্বারে কল দিতেই জানতে পারলাম, বাবা ভাল আছেন। ভাইয়ের ফোন হাতে নিয়েই বাবা বললেন, ‘হ্যালো’!

আমিও পালটা বললাম, ‘ হ্যালো বাবা, কেমন আছ’

বাবাঃ হ্যালো, হ্যালো, এই যাহ! লাইন কেটে গেছে।

আমিঃ বাবা, লাইন কাটেনি। আমি শুনতে পাচ্ছি, হ্যালো বাবা

বাবাঃ এই কে আছিস! নে ফোন নিয়ে যা, লাইন কেটে গেছে। ও আবার ফোন করবে, তখন দিস।

আমার ভাই ফোন হাতে নিয়েই বললো, কই লাইন তো কাটেনি, এত তাড়াহুড়ো করে কথা বলো কেন, এই জন্যই তো ফুলদি’র কথা শুনতে পাও না। স্পীকার ছেড়ে দিলাম, কথা বলো।

বাবাঃ হ্যালো হ্যালো! মিঠু!! হ্যাঁ এইবার বল, শুনতে পাচ্ছি।

আমিঃ কেমন আছো?

বাবাঃ দূর! এইটা একটা প্রশ্ন হইল? প্রত্যেক দিন একই প্রশ্ন। কালকে যেমন ছিলাম, আজকেও তেমনই আছি। ভাল আছি, অন্য কথা বল।

আমি হেসে ফেললাম এবং অপরপ্রান্তে ছোট ভাইয়ের হাসির আওয়াজ পেলাম। এটা আমাদের ভাই বোনদের মাঝে প্রচলিত একটি খেলা। বাবা অথবা মা যদি আমাদের চার ভাইবোনের মধ্যে যে কোন একজনকে বকা দেন, অন্য তিনজন মহা খুশী হই, কৌতুকের হাসি বের হয়ে আসে চোখে মুখে। উপস্থিত সকলেই হাসি, কেউ যদি অনুপস্থিত থাকে, তাকেও যথাসময়ে সংবাদ পৌঁছে দেই। এমন কি, আমি আমেরিকাতে বসে থেকেও ফোনে সংবাদ পেয়ে যাই, যদি আর কারো কপালে এমন বকা জোটে! আগেই বলেছি, খেলাটি শুধুই আমাদের ভাইবোনের মাঝেই সীমাবদ্ধ।

হাসতে হাসতেই বাবাকে বললাম, বাবা কারো সাথে কথা শুরু করতে গেলে প্রথম বাক্যটি তো এমনই হয়, কুশল সংবাদ জানতে চাইতে হয় সবার আগে। ঠিক আছে, তুমি ভালো আছো জেনে শান্তি পেলাম। এবার তুমিই কথা বলো, আমি শুনি।

বাবাঃ আজকে তো লক্ষ্মী পূজা। তুই লক্ষ্মী পূজা করবি না?

আমিঃ বাবা, আমাদের এখানে তো আর কোন বাঙ্গালী নেই, একা একা উৎসব আয়োজনে কোন সুখ নেই। তবুও আগে যখন মৌটুসী, মিশা ছিল, রান্না বান্না করতে ভাল লাগতো। এখন আর ভাল লাগেনা। আমি এমনিতেই একটু ফল-জল দিয়ে লক্ষ্মী মায়ের ছবি পূজা করবো, সন্ধ্যাবেলা।

বাবাঃ নাড়ু বানাবি না? তোদের ঐখানে আখের গুড় পাওয়া যায় না?

আমিঃ নাহ! আখের গুড় পাওয়া যায় না ( আমার বাবা গ্রামের ছেলে, চিনির বদলে আখের গুড় খেয়েছেন, সেই অভ্যাসেই এখন নারকেলের নাড়ু বলতে আখের গুড়ের পাকে বানানো নাড়ুকে বুঝেন। আমার ভাল লাগে চিনির পাকের নাড়ু।)
বাবাঃ নারিকেল পাওয়া যায়?

-নারিকেল পাওয়া যায়। তবে নারিকেল কুরাবো কিভাবে?

-কেন, তোর নারিকেল কোরানি নাই?

-নাহ! আমার নারিকেল কোরানি নাই।

-কী কস! কতবার দেশে আসলি, স্যুটকেস বোঝাই কইরা জিনিস লইয়া যাস, আর একটা নারিকেল কোরানি নিতে পারলি না?

-বাবা, নারিকেল কোরানি আনলেও লাভ নাই, আমার এত কাজ করতে ভাল লাগেনা। একলা একলা নারিকেলের নাড়ু খেয়ে সুখ নাই।

-একলা একলা আবার কি? মৌটুসী, মিশা না হয় দূরে থাকে, মিথীলা তো আছে, ওর বাবা আছে, পূজা-পরবে যদি দুই একটা ভাল মন্দ কইরা না খাওয়াস, এইটা কেমন কথা! না হয়, চিনি দিয়াই একটু নারিকেল পাক দিয়া নাড়ু বানাইস। তোর মা’রে দেখছস তো, শত ঝামেলার মধ্যেও পূজা পার্বণে এই জিনিসগুলি বানাইতো।

-আচ্ছা ঠিক আছে, দেখা যাক। আমাদের এখানে ইন্ডিয়ান স্টোর নাই, আমেরিকান স্টোরে নারকেলের কুচি পাওয়া যায়, সেগুলি দিয়া নাড়ু হয় না, তবুও চেষ্টা করব।

-কেমন দেশে থাকস? কিছুই পাওয়া যায় না! এর চাইতে আমাদের দেশ ই ভালো, হাজার গুনে ভাল।

-সত্যি কথাই বলছো, আমি নিজেও তো আমেরিকাতে থাকতে চাই না, নিজের দেশেই থাকতে চাই। ভাবো তো, দেশে থাকলে আজকে কি আর ‘নারকেলের নাড়ু’ বানানো নিয়ে তোমার কাছ থেকে এত কথা শুনতে হইতো ( হেসে ফেললাম)। ঠিক আছে বাবা, আজকে রাখি। ভালো থাইকো।

হ্যাঁ, আমেরিকার মিসিসিপিতে থেকে পূজা-পার্বণ, ঈদ, পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা যে কত কঠিন, তা ভুক্তভোগী মাত্রেই জানে। আমেরিকার বড় বড় সিটিতে অবশ্য অন্য রকম চিত্র। নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্ণিয়া, হিউস্টন, ডালাস, ফ্লোরিডাতে উৎসব পালনে কারো কোন অসুবিধা হয় না। আমাদের এখানে বাঙ্গালী খুব কম, তাই উৎসব উদযাপনে উৎসাহও কম। আমি একা একা ঘরে নাড়ু, মোয়া, তিলের তক্তি বানাবো, খাবে কে? উৎসবের মূল আনন্দই তো অতিথি আপ্যায়নে। যাই হোক, আজকে বাবার কাছ থেকে এমন অনুরোধ শুনে মনে একটু খচখচানি টের পেলাম। যে বাবা সব সময় শাসনের উপর রাখতেন, সেই বাবা এখন মায়ের ভূমিকায় নেমেছেন। যে কথা মায়ের বলার ছিল, সেই একই কথা এখন বাবা বলছে।

ঘুম ভাঙ্গতে দেরী হয়েছিল। আমেরিকা, কানাডাতে আগের রাতেই অনেকে লক্ষ্মীপূজা করে ফেলেছে। আমি করিনি। সাধারণতঃ ভরা পূর্ণিমা তিথিতে লক্ষ্মী পূজা হয়। আমরা এখানে এমনিতেই দেশ থেকে বারো ঘন্টা পিছিয়ে আছি। নিয়মানুযায়ী, দেশে যখন পূজা হচ্ছে, তখন তাদের সন্ধ্যা, আমাদের সকাল। তাহলে কিভাবে আমি সকালে পূজা করবো? এক ধরনের আলসেমীতে পেয়ে বসেছে আমাকে। আলসেমীর কারনেই নানা যুক্তি খুঁজে বের করছি। একবার পূজাতে বসলে আমার অনেক দেরী হয়। ঘরে নারকেল বা ব্রাউন সুগার কিছুই নেই। ইচ্ছে করলেই গাড়ি নিয়ে বের হতে পারি, কিনতু বের হতে ইচ্ছে করছেনা। নিয়ম আছে, লক্ষ্মীপূজো শেষে এয়োস্ত্রীকে একটু মাছ স্পর্শ করতে হয়। আমার ফ্রীজে রান্না করা খাবারের কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমি চাইছিলাম, সারাদিনে রান্না করে, সব কিছু রেডী করে পূজায় বসবো। কিনতু ততক্ষনে পূর্ণিমা শেষ হয়ে যাবে! যন্ত্রনা! নিউইয়র্কে ধর্ম বিশেষজ্ঞ বোন টুম্পা’কে কল দিলাম। টুম্পা আমার মামাত বোন, আমার কোলে চড়েই বড় হয়েছে। অথচ আমি ধর্ম সম্পর্কে কিছুই না জানলেও সে অনেক কিছু জানে। ওর সাথে কথা বলে আমি অনেক কিছুই ঠিক করি। ফোন টুম্পা ধরেছেঃ
-হ্যালো, ফুলদিভাই, কী ব্যাপার!

-টুম্পা, তুই কি লক্ষ্মীপূজা করে ফেলছস?

-এখন করতেছি। কেনো এই প্রশ্ন কেনো?

-সবাই পূজা করে ফেলছে, আমার এখন ইচ্ছে করতেছেনা, আচ্ছা, পূর্ণিমাতে পূজা হয়, কি বুঝে তোরা এখন পূজা করতেছস? পৃথিবীটা তো ঘুরতেছে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশে সন্ধ্যা, পূর্ণিমা, আমাদের এখানেতো দিন, বারো ঘন্টা পরে আমরা পূর্ণ চন্দ্রের মুখ দেখবো, তখন হবে আমাদের সন্ধ্যা, আচ্ছা, তুইই বল, আমাদের আজকে সন্ধ্যায় পূজা করা উচিত না?

-মুহূর্ত থেমে টুম্পার জবাব, কথা সত্য। এবার টুম্পা হেসে ফেললো, ফুলদিভাই, আলসেমী কইরা তুমি পূজা দিতেছোনা, কিনতু যুক্তি তো ভালই বাইর কইরা ফেলছো।

– না, বিশ্বাস কর, এইখানে সবাইকেই দেখি, দেশের পঞ্জিকামতে সব করে, পূজা, ঈদ সবকিছুই। আমি একা একা ভাবি, পঞ্জিকার তিথি অনুযায়ী কিছু করতে গেলে, দিন রাতের হিসেবেই করা উচিত। আছি আমেরিকাতে, অথচ কাজ করবো বাংলাদেশের তিথিতে, তাহলে তো চলবেনা।

-হাসতে হাসতে টুম্পার জবাব, না তোমার কথাই ঠিক। তুমি সন্ধ্যাবেলাতে নিষ্ঠান্ডা মনেই পূজা করো। তবে, তোমার তো আবার বাসন কোসনের সমস্যা আছে। নাড়ু মোয়া বানাইবা কেমনে?

-চুপ থাক! আমার বাসন কোসনের সমস্যা আছে, তোরে কে বলছে? আমার সমস্যা হইল, আমার মনে। কেউ নাই, মৌটুসী, মনিশ, মিশা, তুই থাকলে কত আনন্দ কইরা সব করতাম। এই একলা ঘরে কিচ্ছু করতে ভাল লাগেনা।

-মিথীলা আছে, দাদাভাই আছে, এদের জন্যই করো।

-আচ্ছা ফোন রাখি। তুই যখন বললি, আজ সন্ধ্যায় পূজা দিলে ঠিক আছে, তাইলে সব ঠিক। তুই তো আবার হিন্দুধর্ম বিশেষজ্ঞ।

-টুম্পার হাসি, কী করবো, তোমার মত এমন দিদি যার আছে, যে কিনা হাঁটুর বয়সী ছোট বোনের কাছে বিধি-বিধান শুনে নেয়, তার তো নিজে থেকেই কিছু শিখতে হইব। ঐজন্যই আমার বড় পিসী তোমারে না শিখায়া আমারে শিখায়ে গেছে সব কিছু।

-আমিও হেসে ফেললাম, ঠিকই কইছস, ভাগ্যিস, মা তরে অনেক কিছু বলে গেছে।

টুম্পার সাথে কথা শেষ করেই পূর্ণ উদ্যমে শুরু করে দিলাম নিত্যদিনের রান্না-বান্না। আগের দিন আমাদের এক পারিবারিক বন্ধু মিত্রা, তার বাগান থেকে প্রচুর সব্জী দিয়েছিল আমাকে, সেগুলো দিয়েই শুরু করলাম। রান্না-বান্না শেষ করেই চুলা-টুলা ধুয়ে মুছে নিলাম। এবার স্বামীকে পাঠালাম ওয়ালমার্টে, কাঠির মত লম্বা লম্বা কুচানো নারকেলের প্যাকেট, ব্রাউন সুগার ( আখের গুড়ের বদলে) নিয়ে আসার জন্য, সাথে পূজোর জন্য কিছু ফল। বাজার ফেরত ব্যাগ থেকে নারকেলের প্যাকেট আর বাদামী চিনির প্যাকেট বের করেই চূলায় স্টীলের কড়াই চাপিয়ে দিলাম। আমার মা পেতলের মালসাতে নারকেলের পাক দিতেন, উনি কাঁসা-পেতলের আধুনিক সংস্করন ‘স্টীল’ কোনভাবেই মানতে পারতেন না। কিনতু আমি স্টিলের বাসন কোসন অনেক বেশী পছন্দ করি। অনেক হালকা ওজনের বাসন কোসন ব্যবহার করতেও সহজ।

নারকেলের পাক আর উঠেনা, একটু পর পর নেড়ে দেই, আবার দোতলায় উঠে পূজার আয়োজন করি। এক সময় নারকেল পাক শেষ করে কড়াইসহ পূজার ওখানে নিয়ে গেলাম। একবার ভাবি, নারকেলের মন্ডটাই পূজার নৈবেদ্যতে নিবেদন করি। আবার মনের ভেতর বাঙ্গালী নারী কথা বলে উঠে, নাড়ুর মত গোল গোল করে গড়ে না দিলে যদি লক্ষ্মী মা অসন্তুষ্ট হন। কী আর করা, ধোঁয়া উঠা গরম মন্ড থেকেই নারকোল নিয়ে হাতে চেপে চেপে গোল করার ব্যর্থ চেষ্টা করে গেলাম। আমি ছোটবেলায় মা’কে নাড়ু বানাতে সাহায্য করতাম। মা কোনভাবেই হাতের তালুতে গরম সহ্য করতে পারতেন না। অথচ আমি অবলীলায় গরম নারকেলের দলা হাতে নিয়ে মসৃন নাড়ু বানিয়ে দিতাম। আমার মা’কে এই নিয়ে একটুও চিন্তিত হতে দেখিনি। মেয়ের হাত পুড়ে যেতে পারে, এমন চিন্তা মাথায় ছিল না তাঁর, বরং একটু গর্বিত ছিলেন, তাঁর মেয়ে এমন গরম জিনিস হাতের তালুতে অবলীলায় ঘুরিয়ে যাচ্ছে।

আসলে আমরা থাকতাম বিশাল বড় এক বাড়ীতে। অনেক ভাড়াটিয়া ছিল একই বাড়িতে। লক্ষ্মীপূজার জন্য আমাদের ঘর বাদে আর সকলের বাড়িতে সাজ সাজ রব পড়ে যেত। দশ দিন আগে থেকেই প্রত্যেকের বাড়ীতে ঝুড়ি ভর্তি করে নারকেল আসতো, মুড়িওয়ালাদের অবিরাম আসা-যাওয়া, বাজার থেকে তিল এনে ধুয়ে , কুলাতে ছড়িয়ে রোদে শুকানো, হাঁড়ি ভরে রসের গুড়, আখের গুড়, খই, চিড়ার বড় বড় পোঁটলাতে টুকরি ভরে বাজার থেকে ফেরা, এ সবই বারান্দায় বসে বসে দেখতাম। আমারও খুব ইচ্ছে হতো, আমাদের বাড়ীতেও এমন আয়োজন হোক। কিনতু মনে মনে জানতাম, আমার বাবার হিসেবের সংসার, মাপের বাইরে কিচ্ছু হওয়ার জো নেই, ফলে পূজার ঠিক আগের দিন আমাদের ঘরে গুনে গুনে চার-পাঁচটি নারকেল আসতো, কিছু তিল, মুড়ি আর কিছু খই। আমাদের খাওয়ার আয়োজনে থাকতো মুড়ির মোয়া, খইয়ের উপরা, দুই রকমের নারকেলের নাড়ু (চিনি এবং গুড়) আর তিলের তক্তি। আর অন্যদের বাড়িতে হতো সত্যিকারের আয়োজন। আমার মা শুধু নারকেলের গোল গোল নাড়ু বানাতে জানতো, কিনতু অন্য বাড়িতে দেখতাম নারকেল কুচিয়ে ‘চিড়া’ বানাতো, মোয়ার কত রকম আকৃতি, চিড়ার মোয়া, সুজির লাড্ডু, খই দিয়ে কত রকম জিনিস, ভেজা চিঁড়া দিয়ে এক ধরনের মিষ্টি বানাতে দেখতাম। আমার কাজ ছিল, ঘুরে ঘুরে নাড়ু, লাড্ডু বানানো দেখা, আমি শিখে ফেলতাম। এখনও আমি সেই স্মৃতি থেকেই কলা কৌশলগুলো ব্যবহার করে নানারকম খাবার তৈরী করি। বিজয়া দশমীর লাড্ডুও আমি নিজের ধারনা থেকেই বানাই, সকলেই খুব উচ্চ প্রশংসা করে। এখানে দুধ পাওয়া যায় প্রচুর, আমি নিজে নিজেই রসগোল্লা, চমচম, কালোজাম, লালমোহন, সন্দেশ বানাতে শিখেছি, সাথে লাড্ডু আর মিষ্টি দই। মজা করে অনেকে আমাকে ‘মিঠু ময়রা’ ডাকে। মনে মনে আমি সেই মানুষগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করি, যাদের সৃজনশৈলী দেখে আমি বড় হয়েছি।

সেই আমিই যখন এমন আধখেঁচড়া নারকেলের মন্ড থেকে হাত পাকিয়ে নাড়ু বানালাম, নাড়ুর চেহারা দেখে আমি নিজেই আঁতকে উঠেছি। তবে লক্ষ্মী দেবী নিশ্চয়ই আমার আন্তরিক প্রচেষ্টা দেখে প্রীত হয়েছেন। কারন, প্রসাদ বিলোতে গিয়ে দেখি, নাড়ু একেবারে টান টান হয়ে গেছে, হাতে নিয়ে আরেকটু চাপ দিতেই গোল হয়ে গেল। ছোট মেয়ে মিথীলা ঠাকুর প্রনাম করতে এসে ঠাকুরের দিকে না তাকিয়ে প্রসাদী থালার দিকে আগে নজর দিয়েছে। খুশী হয়ে বলে উঠেছেঃ
-উহ! নাড়ু বানিয়েছো? সবগুলি আমাদের খেতে দিবে?

-তুমি ঠাকুর প্রনাম করতে এসে নাড়ুর দিকে নজর দিয়েছো!!

-সরি! নাড়ু খেতে ভালো লাগে!

আমার মনে পড়ে গেলো, সকালে বাবা বলেছিলেন, মেয়ের জন্য হলেও দুটো নাড়ু বানাতে। আমি তো জানতামই না, আমেরিকার জল হাওয়ায় বেড়ে উঠা মিথীলা নাড়ু দেখে এমন খুশী হবে! মিথীলা ঠাকুর প্রনাম শেষে প্রসাদ খেতে চাইলো। ঘরে আমরা মাত্র তিনজন। প্রসাদের থালা থেকে সবকিছু তিনটি প্লেটে মোটামুটি সমানভাবেই ভাগ করে দিলাম। বাপ-মেয়ে প্রসাদ খাচ্ছে আর আমি পূজার স্থান পরিষ্কার করায় ব্যস্ত হয়ে গেছি। সব কাজ শেষে নিজের প্লেট নিয়ে বসতেই মিথীলা এসে উপস্থিত।

-মা, নাড়ু কি সব শেষ?

-হুম! সব দিয়ে দিলাম তো।

-নাহ! আমার প্লেটে কম পড়েছে।

-এমন তো হওয়ার কথা না। আমি সমানভাবে দিয়েছি।

-না, পাপার প্লেটে অনেকগুলো নাড়ু পড়েছে, আমি গুনে দেখেছি।

-অসম্ভব, তা হতেই পারেনা। তাছাড়া, তুমিই তো নিজের হাতে পাপাকে দিয়েছ।

-হ্যাঁ, দেওয়ার সময় দেখিনি, পরে দেখেছি, আমি পেয়েছি মাত্র তিনটা নাড়ু, আর পাপা পেয়েছে পাঁচটা।
আমি হেসে ফেললাম, বললাম, ঠিক আছে, তোমার পাপার ভাগ্যে ছিল, তাই পেয়েছে। আমার প্লেটে দেখো, সব ভাঙ্গা ভাঙ্গা নাড়ু। তুমি ইচ্ছে করলে এখান থেকে নিতে পারো, তবে নাড়ু আমারও খুব প্রিয়। চিন্তা করোনা, এখনও আরও আছে, কাল দেবো।

মিথীলা সামনে থেকে সরে যেতেই আমার খুব হাসি পেল। নাড়ু এমনই এক জিনিস, দেশে থাকতে পূজোর ছুটি শেষে যখন হোস্টেলে ফিরে যেতাম, বন্ধু বান্ধবীরা ঘিরে ধরতো, কিরে! নাড়ু আনছোস? আমি তো তেমন কিছু নিতে পারতাম না, তবে আমার রুমমেট উমা নিয়ে আসতো ওদের বাড়ী থেকে। মানিকগঞ্জে ছিল ওদের বাড়ী, অবস্থাপন্ন পরিবারের মেয়ে উমা, অনেক কিছু আনতো, আমাদের সবাইকে দিত।

সত্যি কথা বলতে কি, আমি নিজেও নারকেলের যে কোন প্রিপারেশান খুব ভালোবাসি। আমার প্লেটে এখনও দুই একটা টুকরো পড়ে আছে, মিথীলাকে ডাকলাম,

-মিথীলা, উপরে উঠে আসো, আমার প্লেট থেকে নাড়ু নিয়ে যাও।

-নাহ! থাক, তুমি খাও।

-আরে! আসো তো। আমি খেয়েছি, তুমি নিয়ে যাও।

-মা, নাড়ুর জন্য আবার উপরে আসতে চাই না। কালকে নাড়ু দিবে বলেছো, তখনই খাব।