ক্যাটেগরিঃ ইতিহাস-ঐতিহ্য

বছর ঘুরে আবার এসেছে ‘হ্যালুইন’ উৎসব, সহজ ভাষায় যাকে বলা হয়, ‘ভুত উৎসব’। এই উৎসবের মূল ভাবনানুযায়ী, এই দিনে সমস্ত মৃত আত্মারা পৃথিবীর বুকে নেমে আসে, নিকটজনের সান্যিধ্য লাভের আশায়। সবার মাঝে থাকার বাসনা নিয়ে এরা আসে, কিনতু পৃথিবীর মানুষ সেটা কোনভাবেই হতে দিতে চায় না। এই দিনে সকলেই যার যার বাড়ী ঘরের সামনে ‘ল্যান্টেন’ জ্বালিয়ে রাখে, ল্যান্টেনের আলোয় যেনো মৃত আত্মারা পথ দেখে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

হ্যালুইন উৎসবের বানিজ্যিক ভাবনানুযায়ী, আমেরিকা- ইউরোপে এই দিনে বাচ্চারা নানা ডিজাইনের ভৌতিক কস্ট্যুম পড়ে বাইরে বের হবে, বাড়ী বাড়ি গিয়ে দরজায় নক করবে, গৃহস্বামী দরজা খোলার সাথে সাথে ‘ ট্রিঁক অঁর ট্রিঁট’ বলে চকোলেট, ক্যান্ডি আদায় করে নিবে। এ সবই ‘হ্যালুইন উৎসব’ এর সাথে সম্পর্কিত। আমেরিকাতে ভুত নিয়ে অনেক বেশী গল্প প্রচলিত আছে। অধিকাংশ আমেরিকান ভুতে বিশ্বাস করে, প্রত্যেকের জীবনেই ভুত দেখার অভিজ্ঞতা আছে বলে তারা দাবী করে। ভুত নিয়ে অনেক গল্পের মধ্যে একটি গল্প হচ্ছে মিসিসিপি রাজ্যের ‘ থ্রী লেগেড লেডী রোড’ নামে এক গা ছমছমে ভুতুরে রাস্তার কাহিণী।

‘থ্রী লেগেড লেডী রোড’, ভুতুড়ে রাস্তা। রাতের অন্ধকারে ও পথে যেতে নেই। গাড়ী চালিয়ে যাওয়া যেতে পারে, তবে গাড়ী না থামানোই ভালো। গাড়ী থামিয়ে হেড লাইট তিনবার অন-অফ করলেই ‘তিনি’ এসে হাজির হতে পারেন। ‘তিনি’ হচ্ছেন ‘তিন পা ওয়ালা মেয়ে ভুত’। গাড়ীচালক যদি হেডলাইট জ্বালায়-নেভায়, ‘তিনি’ বিরক্ত হন। গাড়ীর উপরেই এসে আছড়ে পড়েন, নয়তো গাড়ীর ছাদে আঘাত করতে থাকেন। এমন অবস্থায় গাড়ীচালককে আর কোনদিকে না তাকিয়ে একটানে গাড়ীকে পুরানো ব্রীজ পার হয়ে লোকালয়ে চলে আসতে হবে, নাহলে ভয়ংকর কিছু ঘটে যেতে পারে।

উপরে বর্ণিত ভুতুড়ে গল্পটি সম্পর্কে মিসিসিপি রাজ্যের কলম্বাস নামক ছোট শহরের সকলেই অবহিত আছে। আমেরিকান জনগন এমনিতেই ভুত-প্রেতে বিশ্বাসী। বিশেষ করে দক্ষিনী রাজ্য মিসিসিপি, লুজিয়ানা (নিউ অর্লিন্স), আলাবামা রাজ্যের সর্বত্রই ভুতেরা ঘোরাফেরা করে, এমনকি অনেকের বাড়িতেও নাকি তেনারা বসবাস করেন। হোটেল, থিয়েটার হল, প্রাচীন বাড়ীগুলোতে অনেকেই রীতিমত ভুত দর্শনে আসে। বেশীর ভাগ মানুষের ভাগ্যেই ভুত দর্শন ঘটে (!)। তেমনি একটি ভুতুড়ে এলাকা হচ্ছে ‘থ্রী লেগেড লেডী রোড’।

‘থ্রী লেগেড লেডী রোড’ সম্পর্কে মিসিসিপির যে কাউকে প্রশ্ন করলেই তার কাছ থেকে গা ছমছমে গল্প শোনা যায়। বহুল শ্রুত আঞ্চলিক গল্পটি এরকমঃ

মিসিসিপির কলম্বাস শহরের মধ্যেই হাইওয়ে ৪৫ অবস্থিত। হাইওয়ে ৪৫ ধরে এগিয়ে গিয়ে ‘লক এন্ড ড্যাম’ এর কাছাকাছি রাস্তাটির নাম ন্যাশ রোড। অনেক অনেক কাল আগে, এই এলাকায় একটি পরিবারে তিন পাওয়ালা একটি মেয়ে শিশুর জন্ম হয়। তিন পা নিয়েই মেয়েটি বড় হতে থাকে। মেয়েটির যখন কৈশোর উত্তীর্ণ হয়, গ্রামের মানুষ ‘ডাইনী’ আখ্যা দিয়ে মেয়েটিকে মেরে ফেলতে চায়। মেয়েটি্র মা-বাবা অনেক কান্নাকাটি করেছিল, মেয়েটি নিজেও অনেক কেঁদেছে, বার বার মিনতি করেছে সকলের কাছে, তাকে যেন হত্যা না করা হয়। কিনতু গ্রামের মাতব্বর শ্রেনীর লোকেরা, বিশেষ করে চার্চের কর্তাব্যক্তিরা মেয়েটিকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়। নির্দেশ পেয়ে গ্রামের মানুষ মেয়েটিকে পিটিয়ে আধমরা করে গাড়ির পেছনে বেঁধে গাড়ি ছুটিয়ে দেয়, চলন্ত গাড়ির টানে মেয়েটির দেহ রাস্তার ইঁট পাথরের ঘষটানিতে ছিঁড়ে খুঁড়ে যায়। মেয়েটির মৃত্যু হয়, মৃত্যু নিশ্চিত হতেই চার্চের পাশের গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। মেয়েটির দেহ দাফন করার পর থেকেই ঐ এলাকার লোকজন যখন তখন তিন পাওয়ালা মেয়েটিকে দেখতে পেত। মেয়েটির অতৃপ্ত আত্মা নানাভাবে মানুষকে ভয় দেখানো শুরু করতেই ধীরে ধীরে ঐ এলাকার মানুষজন ওখান থেকে তাদের বাস উঠিয়ে অন্যত্র চলে যেতে শুরু করে। গ্রামখানি জনমানব শূণ্য হয়ে যায়। যে চার্চের কর্তাব্যক্তিরা মেয়েটিকে হত্যা করার হুকুম দিয়েছিল, কবে কখন যেন সেই চার্চটিও বিলীন হয়ে যায়। শুধু থেকে যায় ‘থ্রী লেগেড লেডী’র অতৃপ্ত আত্মা। রাতের আঁধারে সে এখনও খুঁজে ফিরে সেই হত্যাকারীদের। মানুষের মুখে মুখে ন্যাশ রোডের নাম বদলে নতুন নাম হয় ‘থ্রী লেগেড লেডী রোড’।

প্রচলিত আছে, যেহেতু মেয়েটিকে গাড়ির পেছনে বেঁধে রাস্তা দিয়ে টেনে নেয়া হয়েছিল, সেহেতু ঐ পথ দিয়ে কোন গাড়ী যাতায়াত করলেই মেয়েটি এখনও সজাগ হয়ে উঠে। তবে গাড়ি যদি নিঃশব্দে চলে যায়, সে বিরক্ত হয় না। আর কারো মনে যদি কোনরকম দুরভীসন্ধি থাকে, যদি ভুত দেখার খায়েশ থাকে, তাহলে সে সত্যিই দেখা দেয়। তার দেখা পেতে হলে কয়েকটি কৌশল মেনে চলতে হয়। গাড়ী হাইওয়ে ৪৫ ধরে এগিয়ে গিয়ে ‘লক এন্ড ড্যামের’ কাছাকাছি এসে বাঁক নিয়ে ্নির্জন পুরাতন ন্যাশ রোডের উপর এসে পৌঁছে। সেখানে কল্পিত চার্চের কাছে পৌঁছেই গাড়ীর স্টার্ট বন্ধ করে হেডলাইট তিনবার জ্বালাতে নেভাতে হয়। কিছুক্ষন চুপ করে বসে থাকলেই ‘উনি’ এসে হাজির হন। তেনাকে কেউ দেখেছে গাড়ীর উপর হামলে পড়তে, কেউ বা কিছুই দেখেনি, তবে গাড়ির ছাদে ঠক ঠক আওয়াজ শুনেছে। ঐ অবস্থায় গাড়ী নিয়ে দ্রুত চলে না আসলে প্রানহানির সম্ভাবনা থাকে। এ সবই বহুল শ্রুত গল্প। তবে এখন পর্যন্ত ‘থ্রী লেগেড লেডী’র হাতে কেউ মারা পড়েছে বলে শোনা যায়নি।

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনাঃ প্রত্যক্ষদর্শীর কথা উঠলেই প্রথমে আমার কথা বলতেই হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে ভুত-প্রেতে বিশ্বাস করি। আমি বরাবর ভীতু মানুষ। অন্ধকারে বাইরে যাওয়ার প্রশ্নই আসেনা। চার বছর আগে আলো ঝলমলে এক বিকেলে ‘ফর সেল’ বাড়ি দেখতে বের হয়েছিলাম। তখনও মিসিসিপির ভুত সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না, থ্রী লেগেড লেডী নামে কোন রাস্তা আছে, সেটাও জানতাম না। সেই বিকেলে আমরা বের হয়ে রাস্তা ভুল করে লোকালয়ের বাইরের এক নীরব রাস্তায় চলে আসি। রাস্তাটির চারপাশে কোথাও কোন জনবসতির চিহ্ন নেই, আমাদের গাড়ী ছাড়া দ্বিতীয় কোন গাড়ীও ছিল না। আমেরিকার সবখানেই এমন নিরিবিলি রাস্তা আছে, এটা কোন নতুন কিছু নয়। নতুন ব্যাপার হচ্ছে, ঐ রাস্তা থেকে আমরা আর বের হতে পারছিলাম না। ঘুরে ঘুরে বার বার একই জায়গায় এসে থামছিলাম। প্রত্যেকের গা ছম ছম করছিল, কিনতু কেউ কাউকে সেটা বলছিলাম না। রোডের নাম দেখলাম ‘ন্যাশ রোড’। শেষ পর্যন্ত কিভাবে যেনো সেই রাস্তা ঠেকে বের হয়ে মূল রাস্তায় এসেছিলাম, তা আজও মনে পড়ে না। দ্বিতীয়বার আর আমাদের ঐ পথে যাওয়া হয়নি।

প্রত্যক্ষদর্শী শখের ভুত শিকারী রয় শেফার্ড ও ক্রিস্টোফার ওয়াটসনের কাছে প্রথম ‘থ্রী লেগেড লেডী রোড’ বা ন্যাশ রোডের গল্প শুনতে পাই। এই দু’জন শখের বশেই ভুতের সন্ধানে বের হয়। ওদের ভাষ্যমতে, ভুত আছে এবং আমাদের মাঝেই তারা বাস করে। ভুত শিকারে গিয়ে অধিকাংশ সময় তারা হতাশ হয়ে ফিরে, তবে খুব মাঝে মধ্যে তারা অনেক কিছুই দেখেছে। ‘থ্রী লেগেড লেডী রোডে’ কয়েকবার তারা গিয়েছে, এতবারের মধ্যে একবার তারা গাড়ীতে ঠক ঠক আওয়াজ শুনতে পেয়েছে। কাউকে দেখেনি, টর্চের আলো ফেলেও দেখা যায় নি, কিনতু তিন চার বার গাড়ির দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ শুনতে পেয়ে দুজনেই চুপচাপ চলে এসেছে। বাড়ী পৌঁছে গাড়ীর দরজায় দেখতে পেয়েছে হাতের ছাপ এবং দরজা বেশ খানিকটা ডেন্ট হয়ে গেছে।

রয় বা ক্রিসের কথা বিশ্বাস না করলেও চলে, ওরা নিজেরাও কাউকে জোর করে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করে না। তবে গত বছর হ্যালুইন উৎসব উপলক্ষ্যে একখানি ফীচার লিখতে গিয়েই ওদের সাথে গল্প জুড়ে দিয়েছিলাম। অনেক গল্পই ওরা বলেছে, যেহেতু ‘থ্রী লেগেড লেডী রোড’ সম্পর্কে আমার নিজেরও অভিজ্ঞতা হয়েছে ( সেই ন্যাশ রোডে গিয়ে গাড়ির দিকভুল হওয়া যা চলতি ভাষায় বলে ‘কানাওলা’য় পাওয়া), সেই জন্যই ওদের কথা বিশ্বাস হয়েছে। তাছাড়া গুগল সার্চ করলেও আরও থ্রী লেগেড লেডী সম্পর্কে বেশ কিছু ইতিবাচক-নেতিবাচক অভিজ্ঞতার গল্প জানা যায়।