ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

অনেক খুঁজে খুঁজে তবেই গানটি পেয়েছি। রাহুল দেব বর্মণের গাওয়া, ” স্বপ্ন আমার হারিয়ে গেছে, তারই স্মৃতিটুকু মনে আছে”। ১৯৭১ সালে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে গানটি গেয়েছিলেন আর ডি বর্মণ। মাথা খারাপ করে দেয়ার মতো গানই বটে, বুকের পাঁজর ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে যায় সুরের ব্যঞ্জণায়। কোন ছোটবেলায় শুনেছিলাম গানটি, মনের গভীরে স্থায়ী হয়ে গেছে গানের বাণী ও সুর।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ছয় কি সাড়ে ছয়। নিতান্তই অবোধ বালিকা, পুতুল খেলার সময়। অথবা কোমরে লাল ডুরে শাড়ীর আঁচল পেঁচিয়ে হাঁড়ি-কুড়ি নিয়ে রান্না -বান্না খেলার কথা। কিনতু যে বালিকাকে শত্রুসেনাদের আক্রমণের ভয়ে ভীত -সন্ত্রস্ত বাবা মায়ের পিছু পিছু দৌড়ে গ্রাম থেকে গ্রামে পালাতে হয়, যে বালিকার নিজের দেশ ছেড়ে বাবা মায়ের সাথে অন্যদেশে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়, সে বালিকার জীবনে শৈশব থাকেনা। সুন্দর, নির্মল শৈশব ছাড়াই সে বেড়ে উঠে, বাড়তে বাড়তে একসময় মাঝ বয়সে এসে পৌঁছায়, ইচ্ছে করে পেছনে তাকাতে, ইচ্ছে করে পেরিয়ে আসা সোনালী অতীতকে আরেকবার দেখতে। কিনতু মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা বালিকা ছিল, তারা পেছনে তাকিয়ে শৈশবকে স্পষ্টভাবে দেখতে পায় না, ঐ অধ্যায়টি কালো ধোঁয়ায় ঢাকা থাকে। গোলা বারুদের গন্ধ ভেসে আসে নাকে, এখনও, এই মাঝ বয়সে এসেও। আমারও নাকে আসে বারুদের গন্ধ, চোখে ভাসে ছেড়ে আসা কোয়ার্টারগুলো পাকসেনাদের গোলার আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলছে। চোখে ভাসে, কাউকে না পেয়ে গুলীতে ঝাঁঝরা করে দেয়া ‘অবোধ লালুর ( পোষা কুকুর) নির্জীব দেহ।

ইউ টিউবে গিয়ে গান শোনা আমার এক ধরনের নেশার মত হয়ে গেছে। খুঁজে খুঁজে পুরানো দিনের গান বের করি আর শুনি। তিন দিন আগেই আমি পাগলের মত খুঁজছিলাম রাহুল দেব বর্মণের গাওয়া গান , ” স্বপ্ন আমার হারিয়ে গেছে, তারই স্মৃতিটুকু মনে আছে”। গানটি হণ্যে হয়ে খোঁজার কারন আছে, অতি সম্প্রতি ‘আমার ব্লগে’ সুশান্তের লেখা একটি পোস্ট দেখেছি, যেখানে সারে সারে প্রতিবাদী ছেলেমেয়ের প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে দাঁড়ানো ছবিও আছে। লন্ডনে সম্প্রতি জামায়াত ও বিএনপির একটি সমাবেশ চলাকালীন সময়ে প্রায় পঞ্চাশ জনের এক দল এসেছিল, সমাবেশের ভেতরে ওদের প্রবেশাধিকার ছিলনা, ওরা বিল্ডিং এর বাইরে থেকেই সাইদী বিরোধী শ্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত করেছে, প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড নিয়ে শীতের ঠান্ডা উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থেকেছে ঘন্টাব্যাপী। লন্ডনের মানুষ দেখেছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে উঠা বাঙ্গালী তরুণ-তরুণীর বিক্ষোভে ফেটে পড়া চেহারা। ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে সাথে সাথে খবর ছাপা হয়ে গেছে, সুদূর আমেরিকায় বসে এক মুহূর্তেই আমিও সেই খবর পড়ে নিয়েছি এক নিঃশ্বাসে। কাকতালীয়ভাবে গত দুইদিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জামায়াত-শিবিরের তান্ডবের সংবাদও দেশের প্রতিটি সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে।

গত দু’দিনের ঘটে যাওয়া বাদ-প্রতিবাদের সংবাদ পড়েই মন চলে গেলো সেই ‘৭১ এ। ইউ টিউবে গিয়ে টাইপ করে ফেললাম, ‘ স্বপ্ন আমার হারিয়ে গেছে’, পেয়ে গেলাম সেই হারানো দিনের গানটি। ‘চঞ্চল’ নামের এক সঙ্গীত পাগলের কল্যাণে অনেক হারিয়ে যাওয়া গান ইউ টিউবে পেতে শুরু করেছি। সেই ভরসাতেই এই গানটিও খুঁজেছিলাম।

রাহুল দেব বর্মণের নাম শুনলেই ‘মনে পড়ে রুবী রায়’ গানটির কথাই মনে আসে। প্রেমে প্রত্যাখ্যাত যুবকের জন্য গাওয়া অপূর্ব সুন্দর একখানি গান। অনেকেই জানেনা, যুবকের রক্তে আগুন জ্বলে উঠার মত একখানি গানও করেছেন রাহুল দেব বর্মণ। “স্বপ্ন আমার হারিয়ে গেছে” এক অন্তরার একটি গান, কিনতু এই এক অন্তরার গানেই উঠে এসেছে ‘৭১ এর ছবি, এক যুবকের সোনার সংসার লন্ডভন্ড হওয়ার করুণ বর্ণনার ভেতরেই ফুটে উঠেছে লক্ষ কোটি মানুষের সংসার ভেঙ্গে যাওয়ার আর্তনাদ, লুট হয়ে যাওয়া নারীর বুকফাটা কান্না, স্ত্রী-পুত্র হারানো যুবকের হাহাকার! মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে কলকাতার রাস্তা-ঘাটে , চায়ের দোকানে, পাড়ায় মহল্লায় দুইটি গান খুব বাজতো। রাহুল দেব বর্মণের গাওয়া ” স্বপ্ন আমার হারিয়ে গেছে” এবং ভুপেন হাজারিকার গাওয়া “গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা’। আমি ছোট্ট হলেও গানের কথা মন দিয়ে শুনতাম। গান শোনার সময় গানের বাণী ও সুর, দুটোই শুনতে হয়, এটা ছোট বয়সেই ধরতে পেরেছিলাম।

আলোচ্য গানটিতে যখন বলে,

” ও— আমি যখন রাঁনতে বসি, তুমি তখন বাজাও বাঁশী, ধোঁয়ার ছলে কাঁনতে বসি, মন তো মানে না”

আমি তখন কল্পনায় দেখতাম, আমাদের কোয়ার্টারের রান্নাঘরে মা’ রান্না করছে, বাবা আমাকে মাথায় শ্যাম্পু করিয়ে দিচ্ছে, হঠাৎ করেই যেনো পাক মিলিটারীরা এসে আমাদের বাড়ীগুলোতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে, সব দাউ দাউ করে জ্বলছে, আমরা সব ছুটে পালাচ্ছি, পালাচ্ছি, ছুটছি আর ছুটছি। এর মাঝেই কারা যেন আমার মা’কে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, ব্যস! এই পর্যন্ত ভেবেই থেমে যেতাম। মা’কে ছুঁয়ে দেখতাম, নাহ! আমার মা আমার সাথেই আছে। তখন গানের মায়ের কথা ভেবে কাঁদতাম। গানের বাবাটার জন্য কাঁদতাম। গানের ছেলেটি মারা গেছে ভেবেও কাঁদতাম, বাবাটি আর কোনদিন তার ছেলেকে পাবেনা, এটা ভেবেও কাঁদতাম। তবে ঐ বয়সে আমি একটি জিনিসই বুঝিনি, দস্যুরা কেন ছেলেটির মা’কে ধরে নিয়ে গেল??????????? মা;কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সঠিক জবাব পাইনি, বড় হয়ে নিজেই বুঝে নিয়েছি , গানের ঐ মা’কে কেন নিয়ে গেছিল দস্যুরা। [ এটা সত্যি, আমাদের কোয়ার্টারের বাড়ীগুলো মিলিটারীরা এসে আগুন দিয়ে পুড়ে ফেলেছে। কারন ঐ কোয়ার্টারগুলোতে শুধুই ‘হিন্দু কাফির’রা থাকতো।]

কলকাতায় আত্মীয় বাড়িতে থাকতাম, সকলেই আমাদেরকে আদর করতো, কিনতু পরাধীন জীবন কিছুতেই ভাল লাগতো না। শুধু কান্না পেতো, যখনই ভাবতাম, আমরা আর কোনদিন দেশে ফিরতে পারবো না। একবেলা ভাত খেতাম, দুই বেলা আটার রুটি আর ঝোলা গুড়। কান্না পেলেও মুখ ফুটে কিছুই বলতাম না, ঐ শিশু বয়সেই বুঝতে পারতাম, সময়টা খারাপ, পাঁচজনের সংসারে আমরা অতিরিক্ত ছয়জন ঢুকেছি, বাবার আয় রোজগার বন্ধ, সাথে কোন টাকা পয়সা নেই, আমাদেরকে এভাবেই থাকতে হবে। কবে দেশ স্বাধীন হবে, সেই অপেক্ষায় দিন গুনতাম। মনে পড়ে, সামনের চওড়া জি টি রোড ধরে ইন্ডিয়ান আর্মির ভারী ভারী ট্রাক যেত, ট্রাকে বসানো থাকতো মেশিন গান, ট্যাঙ্কের চেন লাগানো চাকা ঘর ঘর আওয়াজ তুলে গেলেই ঘর থেকে দৌড়ে বের হয়ে আসতাম, সৈন্যদের দিকে হাত উঁচিয়ে বলতাম,

“টা টা বাই বাই” । মা শিখিয়ে দিয়েছিল, বাই বাই বলতে নাই, বলবে, আবার যেনো দেখা পাই। সাথে সাথে আমাদের বোল পালটে যেতো, ” টা টা বাই বাই, আবার যেনো দেখা পাই”।

অবাঙালী সৈনিকেরা শিশুদের বাংলা শ্লোগান বুঝতোনা, কিনতু আমাদের অন্তর নিংড়ানো ভালোবাসার ভাষা ঠিকই বুঝতে পারতো। মাঝে মাঝে গাড়ী থেকে চকলেট ছুঁড়ে দিত , হাত উঁচিয়ে তারাও আমাদের ভালোবাসার জবাব দিত। ওরা চলে গেলেই স্বপ্ন দেখা শুরু করতাম, এইবার পাকিস্তানী মিলিটারীদের শেষ করে ফেলবে। মুক্তিযোদ্ধারাই জিতবে, আমরা আবার দেশে ফিরে যাব, তিনবেলা ভাত খাব, মাছ দিয়ে, আর রুটি খেতে হবেনা। মা বাবা আমাদের কথায় সায় দিত, হয়তো অবুঝ সন্তানদেরকে বুঝ দেয়ার চেষ্টা করতো, সাথে সাথে এটাও বলতো, ” আমরা তো তবুও তিনবেলা খাবার পাই, মুক্তিযোদ্ধারা তো কিছুই খাইতে পায়না। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেগুলি কিভাবে বনে-বাদাড়ে ঘুরে ঘুরে জীবনপাত করতেছে”। এই কথা শুনলেই না দেখা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বুকের ভেতরটা টন টন করে উঠতো। সেই টনটনে ব্যথা আমি এখনও টের পাই। এখনও যে কোন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই পড়তে গেলে চোখের জলে বালিশ ভিজে যায়। আমি জানি, আমি খুবই ইমোশনাল, তারপরেও মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি ঘটনা সত্যি, প্রত্যেকের কষ্ট-দুঃখ গুলো সত্যি, কিছুই ভুলে যাওয়ার নয়, আমিও কিছুই ভুলিনি, তাই কেঁদে ফেলি।

যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি অথবা আমার মত শৈশব হারায়নি, তারা কিভাবে জানবে মুক্তিযুদ্ধের বেদনা, যুদ্ধ জয়ের আনন্দ। মুক্তিযুদ্ধের অনেক পরে যাদের জন্ম, তারা তো শুধু ভারত বিরোধী কথা শুনে বড় হয়েছে, তাদের জানার কথাও না, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় মিত্র দেশ হিসেবে ভারত কতভাবেই সহযোগীতা করেছিল, নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা জানবেই বা কেমন করে, মুক্তিযুদ্ধের সারাটা সময় জুড়েই শরণার্থীদের সাথে সাথে কলকাতার বাঙ্গালীরাও অনেক কষ্ট করেছে, বিলাস-ব্যসন ত্যাগ করেছে, নিজেদের ভাগের অন্ন আমাদের সাথে শেয়ার করেছে, ওরা কি করে জানবে, অন্নদা শঙ্কর রায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের জন্য গান লিখেছিলেন, ভুপেন হাজারিকা গান গেয়েছিলেন, রাহুল দেব বর্মণ গান করেছিলেন! আরও কতভাবেই যে ঐ মানুষগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের মনে সাহসের আলো জ্বালিয়ে রাখতেন। আমরা কখনও বলিনি বলেই আমাদের সন্তানেরা জানতেও পা্রেনি, জি টি রোড ধরে ভারতীয় সেনাবাহিণীর ভারী ভারী ট্রাক প্রতিদিন বাংলাদেশ সীমান্তে যেতো, মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করতো। আমাদের সামনে দিয়ে হাসি মুখে চলে যাওয়া সৈনিকদের অনেকেই হয়তো আর নিজগৃহে ফিরে আসেনি, হয়তো পাক বাহিণীর ছুঁড়ে দেয়া গুলিতে বুক ঝাঁঝরা হয়ে গেছে।

এ তো আমাদেরই অক্ষমতা, আমরা আমাদের সন্তানদের কাছে ইতিহাস ঠিকমত তুলে ধরিনি। আমাদের এই দূর্বলতার সুযোগ নিয়েছে অশুভ শক্তি। দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথাতেই জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে দেশবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। মাঝে মাঝে এও ভাবি, আমাদের দোষই বা কতটুকু! ব্যথা বেদনার কথা কে-ইবা মনে রাখতে চায়! আমরাও চাই নি। চেয়েছিলাম নতুন করে বাঁচতে, স্বাধীন দেশে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে। বিভেদ ভুলে গিয়ে সকলের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে চেয়েছিলাম। কিনতু সর্ষের মাঝে যেমন ভুত লুকিয়ে থাকে, তেমনি আমাদের মাঝেও অশুভ শক্তি ঘাপটি মেরে লুকিয়ে ছিল। বহুরুপী মানুষ, বিচিত্র তার স্বভাব। যে সৈনিক কাঁধে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল শত্রুসেনা নিধন করতে, সময়ের আবর্তে সেই সৈনিকই কিনা শত্রুকে এনে দেশের মন্ত্রী বানিয়ে দিল, গাড়ীতে জাতীয় পতাকা উড়ানোর সুযোগ করে দিল! নাহলে স্বাধীনতার ৪১ বছর পরে লন্ডনের রাস্তায় ৪০-৫০ জনকে এখনও প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়! স্বাধীনতার ৪১ বছর পরে জামায়াত শিবিরের হাতে সরকারী পুলিশ বাহিণীর দাঙ্গা -হাঙ্গামা হয়!! এমন স্বপ্নই কি দেখেছিলাম আমি, অথবা আমরা? মাত্র দুই দিন আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা দুটিই আমাকে রাহুল দেব বর্মণের গানটির কথা মনে করিয়ে দিল, স্বপ্ন আমার হারিয়ে গেছে!!!!!

কী স্বপ্ন দেখেছিলাম, আর কী পেলাম!!!!!!!