ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

বাঙ্গালীর বারো মাসে তেরো পার্বণের কথা কে না জানে! ভাইফোঁটা কি সেই তেরো পার্বণের একটি কিনা, তা জানা নেই। কারণ, ভাইফোঁটা কোন প্রচলিত পূজা-পার্বণ নয়, বাঙ্গালীর ঘরে ‘ভাইফোঁটা’ হচ্ছে সবচেয়ে আনন্দময়, নির্মল, একটি পরব। ভাই-বোনের মধ্যেকার অনিন্দ্যসুন্দর সম্পর্ক ঘিরেই প্রচলিত হয়েছে এই উৎসবটি। ভাইয়ের মঙ্গল কামনায় ঈশ্বরের কাছে বোনের আকুতি, ভাইয়ের সাফল্য, দীর্ঘায়ু লাভের জন্য বোনের প্রার্থণাই ‘ভাইফোঁটা’ কে মহিমান্বিত করেছে। প্রথা অনুযায়ী শুক্লাতিথির দ্বিতীয়াতে ভাইফোঁটা উদযাপিত হয়। প্রয়োজনে পরবর্তী সাতদিন ভাইফোঁটা উদযাপণ করা যায়। পঞ্জিকার হিসেবমতে কালীপূজার দুই দিন পরে ভাইফোঁটা অনুষ্ঠিত হয়। ভাইফোঁটার ধর্মীয় গুরুত্ব অপেক্ষা সামাজিক ও পারিবারিক গুরুত্ব অনেক বেশী, যেখানে ভাই-বোনের মধ্যেকার প্রীতি ও ভালোবাসার স্বর্গীয় সম্পর্কটিই মূখ্য। ভাই বোন দুজনেই বছরের এই একটি দিনের অপেক্ষায় থাকে।

ভাইফোঁটা এমনই এক উৎসব যা ভাই-বোনের মধ্যেকার ভালোবাসা এবং স্নেহের সম্পর্ক খুব দৃঢ় করে। ভাই-বোনে সারা বছর ঝগড়া-ঝাঁটি থাকলেও, ভাই বোন দুজনেই বছরের এই একটি দিনের অপেক্ষায় থাকে। বোনের কাছ থেকে ভাইফোঁটার নেমন্তন্ন পেলে, দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে, যত প্রয়োজণীয় কাজ ঠেলে সরিয়ে রেখে ভাই আসবেই বোনের কাছ থেকে ফোঁটা নিতে।

ভাইফোঁটা যেভাবে উদযাপিত হয়ঃ

সাধারণতঃ শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়াতে ভাইফোঁটা্র লগ্ন ঠিক হয়। এই হিসেব ধরেই বোন তার ভাইদেরকে নিমন্ত্রণ জানায় তার বাড়ীতে। কাছে-দূরে যেখানেই থাকুক, বোনের নিমত্রণ রক্ষা করতে ভাইয়েরা ছুটে আসে। ঠিক সন্ধ্যাবেলা ভাইকে আদর সমাদর করে সূতির আসনে বসতে দেয়া হয়। বোনের হাতে থাকে ঝকঝকে পেতলের রেকাবী। রেকাবী সাজানো হয়, ঘরে তৈরী কাজল, চন্দন বাটা, ধান-দূর্বা, শুকনো পাটপাতা এবং মিষ্টি দিয়ে। পাশেই রাখা হয় ঘিয়ের প্রদীপ। বোন তার কড়ে আঙুলে কাজল ছুঁইয়ে ভাইয়ের দুই ভুরুতে এঁকে দেয়। এরপর চন্দনের ফোঁটায় কপাল অংকিত করে, কপালের ঠিক মাঝখানে কড়ে আঙুলকে স্পর্শ করে প্রচলিত ছড়া কাটেঃ

ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা
যম দুয়ারে পড়লো কাঁটা
যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা
আমি দেই আমার ভাইকে ফোঁটা
আজ থেকে আমার ভাই.
যম দুয়ারে তিতা।

ছড়া শেষে বোন ভাইয়ের মাথায় ধান-দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করে, পাশ থেকে বেজে উঠে উলুধ্বনি আর শংখধ্বনি। শংখধ্বনিতে ভাইয়ের জীবন থেকে সকল বালা –মুসিবত দূর হয়ে যায়, ভাইয়ের মুখে একটু তেতো নিমপাতা বা পাটপাতা তুলে দিতে হয়। ভাইকে তেতো মুখে বেশীক্ষণ থাকতে হয়না, সাথে সাথে থালা ভর্তি মিষ্টি খেতে দেয়া হয়। শুধু কী মিষ্টি? মিষ্টির সাথে ভাইকে বোনের পক্ষ থেকে উপহার দেয়া হয়। অবশ্য কোন কিছুই একতরফা হয়না। বোন যেমন ভাইকে দেয়, ভাইও বড় বোনকে প্রনাম শেষে দিদির হাতে উপহার তুলে দেয়। আর বোন যদি বয়সে ছোট হয়, তাহলে বড় ভাইকে প্রনাম করে, ছোট বোনের হাতে উপহার তুলে দিতে ভাইয়ের আনন্দের সীমা থাকেনা। এভাবেই ভাই-বোনের মধ্যে ভালোবাসা ও প্রীতির সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। এই ছোট্ট আনুষ্ঠানিকতা শেষে পরিবারের সকলে মিলে আরও বড় পরিসরের আনন্দ-উৎসবে মিলিত হয়। বছরের অন্য দিনগুলোতে খাবারের মান যতই সাধারণ হোক না কেনো, ভাইফোঁটা অনুষ্ঠানে ভাইয়ের পছন্দের খাবার রান্না করা হয়। বোনের যতটুকু সাধ্য, ভাইকে তা উজার করে দিয়ে সুখী হয়। বোনের কাছ থেকে এই পরম মমতামাখানো ভালোবাসা পাওয়ার টানেই ভাইয়েরা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকে এই দিনটির জন্য।

ঠাকুমা-দিদিমাদের মুখ থেকেই শোনা, ঋকবেদে আছে, মৃত্যুদন্ডদাতা যম ও তাঁর বোন যমুনা হচ্ছে সূর্য্যের যমজ সন্তান, অর্থাৎ তারা যমজ ভাই বোন। বড় হয়ে তারা পরস্পর থেকে অনেক দূরে থাকতেন। দীর্ঘকাল অদর্শনে থেকে বোন যমুনার খুব ইচ্ছে হলো ভাই যমকে একটু দেখার। ভাইকে নিমন্ত্রণ করতেই ভাই যমরাজ বোনের বাড়ীতে এসে উপস্থিত। ভাইকে যথাসাধ্য আপ্যায়ন শেষে ভাইয়ের জন্য মন ব্যাকুল হতেই বোন যমুনা ভাইয়ের সর্বাঙ্গীন কুশল কামনা করে প্রার্থনা করেন, ভাই যমরাজ খুব প্রীত হন বোনের এই আকুলতা দেখে। বোনকে নিশ্চিন্ত করতে বোনের ডাক পেলেই আবার আসার প্রতিশ্রুতি দেন। যমুনা তার ভাইয়ের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়ে খুশীতে আনন্দাশ্রু ফেলেন। সেই থেকেই ভাইয়ের মঙ্গল কামনা উৎসবের প্রচলন। সেই থেকেই ভাইয়ের কল্যানে অনুষ্ঠিত পরবটি বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন বাঙ্গালীদের মাঝে ভাইফোঁটা, নেপালে ‘ভাই টীকা’ অথবা ভারতের নানা প্রদেশে ‘ভাইদুজ’ নামে পালিত হয়। রাখীবন্দনও ভাইফোঁটার আরেক সংস্করণ।

মানুষ সামাজিক জীব। আমাদের সমাজ তৈরী হয় প্রথমে ঘর থেকে। বাবা-মা, ভাই বোন দিয়ে যে পরিবার শুরু হয়, সেই ছোট পরিবারটিই সময়ের সাথে সাথে আত্মীয়তার বন্ধন বিস্তৃত করে, ঘর থেকে বেরিয়ে প্রতিবেশী, প্রতিবেশী পেরিয়ে পাড়া, গ্রাম ছাড়িয়ে একদিন সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়ে। যে ভাইয়ের একটি মাত্র বোন ছিল, চলার পথে সে আরও কত বোন, দিদি, আপুর দেখা পায়। যে মেয়েটি শুরুতে একটি ভাইয়ের আদর পেয়ে বড় হচ্ছিল, সেই মেয়েটিই জীবন চলার বাঁকে বাঁকে কত নতুন ভাই, দাদার দেখা পায়। এভাবেই সম্পর্ক বাড়তে থাকে, এবং একসময় অচেনা যে কারো সাথেই ‘ভাই’ বা ‘বোন’ সম্পর্ক তৈরী হয়ে যায়। ভাই-বোন সম্পর্কে জাত, ধর্ম, গোষ্ঠীর বিভিন্নতা কোন বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। এই সম্পর্কে কোন স্বার্থ-দ্বন্দ্ব থাকেনা, ভাই-বোন সম্পর্কে কোন বিরোধ থাকেনা। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় সারা বাংলায় ‘রাখী বন্ধন’ উৎসব হয়েছিল। কবিগুরু কোন আন্দোলনে সরাসরি যোগ না দিলেও ‘রাখীবন্ধন’ উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন। সেদিন হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, শিখ, মারাঠির মধ্যে কোন ভেদাভেদ ছিল না। সকলেই ভাই, প্রতিটি ঘরে ঘরে ছিল স্নেহময়ী বোন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়, কত অচেনা মায়ের ছেলেকে ‘ভাইয়ের স্নেহে’ শত্রুর আড়ালে রাখার চেষ্টা করেছে বাংলার বোনেরা। এভাবেই যুগে যুগে ভাই-বোনের সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়েছে। ভাই বাইরে যতই প্রভাবশালী হোক, বোনের কাছে এলেই শিশু হয়ে যায়, বোন বয়সে বড়ই হোক অথবা ছোট হোক, মায়ের পরেই স্নেহময়ীর পদটি তার দখলে চলে যায়। ভাইয়ের কল্যান কামনায় বোন সবসময় ঈশ্বরের কাছে তার দুই হাত তুলে রাখে।