ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

থ্যাঙ্কস গিভিং উপলক্ষে ওয়ালমার্টে নানা ধরণের প্রমোশনাল সেল চলছে। আমাদের ফোন ডিপার্টমেন্টে চলছে আকর্ষণীয় ডীল। কেউ যদি দুই বছরের চুক্তিতে ফোন সার্ভিস নেয়, তাহলে তাকে ৫৫০ ডলার দামের গ্যালাক্সী এস ২ ফোন দেওয়া হবে ১ ডলার মূল্যে, সাথে ১০০ ডলারের ওয়ালমার্ট গিফট কার্ড। ৬০০ ডলার দামের গ্যালাক্সী এস ৩ পাওয়া যাচ্ছে ১৪৮ ডলার দামে। একমাত্র আই ফোন বাদে যে কোন স্মার্ট ফোনের সাথে বোনাস হিসেবে গ্রাহককে ১০০ ডলার দেয়া হচ্ছে। প্রতি বছর থ্যাঙ্কস গিভিং উপলক্ষে এই ধরণের ডীল থাকে। আগামী ১লা ডিসেম্বার পর্যন্ত এই প্রমোশন চলবে।

এমন আকর্ষণীয় প্রমোশনাল ডীল পাওয়ার জন্য অনেক গ্রাহক থ্যাঙ্কস গিভিং পর্যন্ত অপেক্ষা করে। যাদের ফোন কন্ট্র্যাক্ট রিনিউ করার সময় হয়ে গেছে, তারাও এই সীজনে চুক্তি নবায়ন করে এবং ১০০ ডলারের গিফট কার্ড পেয়ে যায়। আমি নিজে একবার তিনটি ফোন নবায়ন করে ৩০০ ডলার পেয়েছিলাম, আরেকবার পেয়েছিলাম ১৫০ ডলার।
অনেকেই ফোন সার্ভিস নবায়ন করে গেছে। আজ আমার কাছে এক ভদ্রমহিলা এসেছিল, সাথে তার কিশোরী মেয়েকে নিয়ে। ভদ্রমহিলা আমার সাথে চুক্তি নবায়ন নিয়ে যখন কথা বলছিল, কিশোরী তার মায়ের সাথে চুপ করে দাঁড়িয়ে সব কথা শুনছিল। ভদ্র মহিলার সাথে কথা বললেও আমার চোখ আটকে যাচ্ছিল কিশোরীটির দিকে। এই বয়সের মেয়েরা সব সময় মেকাপ করে থাকতে ভালোবাসে। এই মেয়েটিও মেকাপ করে এসেছে। মেকাপের কারণেই কিনা জানিনা, মেয়েটির চোখ দুটি এমন সুন্দর লাগছিল যে বার বার আমার নজর ওর চোখে আটকে যাচ্ছিল। পূর্বে আমার ধারণা ছিল, টিন এজ ছেলেমেয়েদের সাথে কথা বলা অনেক কঠিন। কিনতু দিনে দিনে আমার সে ধারণা পাল্টেছে। টিন এজ ছেলেমেয়ের সাথে সুন্দর করে কথা বললে ওরা দারুণভাবে সাড়া দেয়।

মেয়েটিকে খুশী করার জন্য প্রথমেই বললাম,
-তোমার চোখ দুটি কী সুন্দর! চোখের মেকাপও দারুণ সুন্দর হয়েছে! কে করে দিয়েছে মেকাপ?
-দারুণ মিষ্টি হাসি ছড়িয়ে ও বলল, আমি নিজেই করেছি।
-কতক্ষণ লেগেছে আই মেকাপ করতে?
-পাঁচ মিনিট।
পাঁচ মিনিটে তুমি অমন সুন্দর মেকাপ করেছো! আসলে তোমার চোখ দুটিই সুন্দর, মেকাপ না করলেও সুন্দর, মেকাপ করলেও সুন্দর–বলে এবার আমি হেসেছি।
পাশ থেকে মেয়েটির মা ( তাই হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু মায়ের সাথে মেয়ের চেহারায় কোনই মিল নেই) বললো, –দেখতে হবে না, বয়সটা চিন্তা করো, টিন এজ, পাঁচ মিনিটেই মেকাপ শেষ হয়ে যায় এদের।
ভদ্রমহিলা দেখতে আকর্ষণীয়া নয়, কিন্তু তার মেয়ে এমন সুন্দর, চোখ দুটো নিশচয়ই ওর বাবার কাছ থেকে পেয়েছে। জিজ্ঞেস করলাম, উনি তোমার কে হন?
মেয়েটি বললো, মা’ এর মত।
মা’ এর মত মানে কি? উনি তোমার মা নন, কিন্তু তোমাকে মায়ের মত ভালোবাসেন, তাই তো? তোমাকে দেখে আমারও তো দেখছি ‘মায়ের মত’ হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে!
এবার ভদ্রমহিলা বললেন, আমি হচ্ছি, আদার মাদার।
-আদার মাদার?
-হ্যাঁ, আমি ওকে এডপ্ট করেছি।

এখানে অনেক পরিবার আছে, যারা বিভিন্ন দেশ থেকে, চার্চ থেকে, হসপিটাল থেকে অসহায় শিশুদের দত্তক নেয়। অনেক ধনী পরিবার আছে, যারা নিজেদের সম্পত্তি বিভিন্ন স্কুল, কলেজ , বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃতী স্টুডেন্টদের জন্য স্কলারশীপ হিসেবে দেওয়ার জন্য দান করে দেয়। তবে বাচ্চা দত্তক নেয়ার ব্যাপারটা ধনী-দরিদ্র ম্যাটার করে না। অনেককেই দেখি, নিজের বাচ্চাদের সাথে আরও দুই একজন বাচ্চাকে লালন পালন করে। কিছু কিছু পরিবার হয়তো বা সরকারী অনুদান পায় এই বাবদ, তবে অধিকাংশ পরিবার মানবিক দৃষ্টিতে এই কাজটি করে থাকেন। অথচ, আমাদের দেশে কত নিঃসন্তান বাবা-মা কে দেখেছি, নিঃসন্তান থাকতে রাজী আছে, কিন্তু অন্যের সন্তান দত্তক নেয়াকে খুবই হীন কাজ মনে করে।

তবে, অনেক বছর আগে, আমরা তখন ভুতের গলিতে থাকতাম, কোন এক পরিচয়ের সুবাদে এক ভদ্রমহিলা আমাদের বাড়ীতে এসেছিল। মহিলার সাথে কয়েকবারই দেখা হয়েছে, উনার তিন ছেলে, একমেয়ে। ৯৫ সালের কথা বলছি, পরিবার পরিকল্পনা অফিসে বড় অফিসার পদে উনি কর্মরত ছিলেন। নামগোত্রহীন বাচ্চাদের কথা উঠতেই উনি নিজের মেয়ের কথা বললেন। তখনই জানলাম, উনার তিন ছেলে, মেয়েটিকে উনি দত্তক নিয়েছেন। আট নয় বছর আগে, একদিন পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিকেই নাম গোত্রহীন এক মেয়ে শিশুকে পাওয়া যায়, কেউ ফেলে রেখে চলে গেছে, কয়েক মাস বয়সী শিশুটিকে নিয়ে সকলেই যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়, উনি তখন এগিয়ে আসেন, শিশুটিকে আইনসম্মতভাবে দত্তক নেন। শিশুটিকে বাড়ীতে নিয়ে উনার ছেলেদের কাছে তুলে দেন, ছোট বোন হিসেবে। উনার স্বামী বোধ হয় একটু আপত্তি করেছিলেন, কিন্তু উনার সাহসী সিদ্ধান্তের কাছে চুপ করে থাকেন। উনার ছেলে তিনটি নাকি নতুন শিশুটিকে অনেক যত্ন করতো। কখনও বুঝতে দেয়নি ও অন্য কোথাও থেকে এসেছে। তিন ছেলেই বাইরে গেলে, বাড়ী ফেরার সময় বোনের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসতো। বন্ধুদের কাছে পরিচয় দিত, ‘আমাদের ছোট্ট বোন’ বলে।

আমার সাথে যখন ভদ্রমহিলার পরিচয় হয়েছিল, তখন উনার বড় ছেলে আমেরিকাতে থাকে, বাকী দুই ছেলে কলেজে পড়ে, মেয়েটির বয়স নয় বছর, আমেরিকা থেকে ছেলে সবার জন্য গিফট পাঠায়, সবচেয়ে দামী গিফটটি পাঠায় তাদের কুড়িয়ে পাওয়া বোনটির জন্য। উনি বলেছিলেন, বাচ্চাটি দেখতে রোগা প্যাকাটি ছিল, ধীরে ধীরে নাকি গোলাপের পাপড়ির মত রঙ হয়েছে, মাথাভর্তি কালো কোঁকড়া চুল, এমন বর্ণনা শুনে আমি মেয়েটির ছবি দেখার আগ্রহ প্রকাশ করি। পরের বার যখন উনার সাথে দেখা হয়, উনি সাথে করে নিয়ে আসা বাচ্চাটির ছবি দেখান। সাত আট বছরের এক বালিকা, সুন্দর জামাকাপড় পড়ে তার আম্মুর গলা জড়িয়ে আছে। সুন্দর ফুটফুটে এক বাচ্চা। ভদ্রমহিলা কিন্তু দেখতে খুবই সাধারণ, আটপৌরে চেহারা, অথচ হৃদয়টা কী বড়! আমাকে জানালেন, মেয়েটিকে উনি সর্বোচ্চ ডিগ্রী নেওয়াবেন, সম্ভব হলে ডাক্তারী পড়াবেন, বিয়ের বয়স হলে মেয়েটির জন্ম বৃত্তান্ত প্রকাশ করেই বিয়ে দিবেন। জন্মের ইতিহাস শুনে কেউ বিয়ে করতে চাইলে, সেই ছেলেকে উনি রাজা বানিয়ে দিবেন! এমন চমৎকার আম্মুটাকে আমারও জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছিল। কী চমৎকার হৃদয়ের এক মহিলার সাথে আমার দেখা হয়েছে, ভাবলেই নিজেকে গর্বিত মনে হয়। এই গল্প আমি মনের কোঠায় ধরে রেখেছিলাম, আজ তা প্রকাশ করলাম।

কতকাল পরে, সেদিনের সেই মহিলাটিকে যেনো আবার আমার চোখের সামনে দেখতে পেলাম, অন্যরূপে। এই ‘আদার মাদার’ টিও দেখতে খুবই সাধারণ, কিনতু মেয়েটি দেখতে গোলাপের মত সুন্দর! এমন ফুটফুটে বাচ্চা কে কোন মায়ের প্রাণে ধরে ছেড়ে দিতে মন চাইল! আমি ভদ্রমহিলার ফোন সার্ভিস চুক্তি নবায়ন করতে করতেই মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম,

-তোমার নাম কী গো ?
-আলিশা
-আলিশা, তোমার বয়স কত? কোন গ্রেডে পড়ো তুমি?
-১৭ বছর বয়স, সিনিয়ার ক্লাসে পড়ি।
-তুমি টুয়েলভথ গ্রেডে পড়ো! আমি ভেবেছিলাম, তুমি হয়তো নাইনথ গ্রেডে পড়ো।

-ভদ্রমহিলা বললেন, ও ডাবল প্রমোশান পেয়েছে, পড়াশুনায় খুব ভালো।

বাহ! ভবিষ্যতে কোন লাইনে পড়তে চাও?
-নার্সিং পড়বো।
-তুমি যদি নার্সিং পড়ো, তুমি হবে অতি চমৎকার একজন নার্স, তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে রোগী অর্ধেক সুস্থ হয়ে যাবে!
ভদ্রমহিলা বললো, আমার বড় মেয়েও নার্সিং পড়ে।

তোমার আরেকটি মেয়ে আছে? এই মেয়েকেও এডপ্ট করেছো?
-নাহ, বড় মেয়েকে ঈশ্বর দিয়েছে। আমার এই মেয়েটার জন্য প্রার্থণা করো, ও যেন নার্সিং পড়তে পারে। পড়াশোনায় মেয়েটা খুব ভালো।

আমি ভদ্রমহিলাকে আন্তরিকভাবেই বললাম, তোমার ইচ্ছে পূরণ হবেই। এমন মমতাময়ী মায়ের ইচ্ছে পূরণ না হয়ে পারে! তবে তোমার ‘ আদার মাদার’ টার্মটা আমার কাছে অদ্ভুত লেগেছে! তোমাদের দুজনকে একসাথে দেখে একবারও মনে হয় না, মাদার কখনও ‘আদার’ হতে পারে! মাদার ইজ অলওয়েজ মাদার।

এবার আলিশা মুখ খুললো, তুমিও নিশ্চয়ই খুব ভালো মা। এইজন্যই তুমি আমাকে এত বেশীবার সুন্দর বলছো, এমন মজা করে কথা বলছো।

বললাম, ভাল মা কিনা জানি না, তবে আমারও তিনটি মেয়ে আছে। ওরাও তোমার মতই লক্ষ্মী। লক্ষ্মী মেয়েদের দিকে আমার নজর অটোমেটিকভাবে চলে যায়! তুমি ভালোভাবে পড়াশোনা করো, নার্সিং খুব ভাল প্রফেশান, অনেক নার্স খ্যাটর খ্যাটর মার্কা হয়, কিন্তু তুমি হবে অন্যরকম। অনেক মায়াবতী, অনেক শান্ত। ভালো থেকো।

[ ** আলিশা যদি শেষ পর্যন্ত নার্সিং পড়তে পারে, মেয়েটি আসলেই খুব চমৎকার একজন নার্স হবে, ওর চেহারার মধ্যে সে সম্ভাবনা আছে। আমার মা যখন আইসিইউ তে ছিলেন, একদিন দেখি, মায়ের মাথার বালিশ ভিজে একশা হয়ে আছে। ডিউটিরত নার্সকে বলতেই সে জবাব দিল, ‘ এইটা ঘামে ভিজা। সাকশান পাম্প চললে রুগী অস্থির হইয়া যায়, তখন ঘামে। বললাম, তা তো হবেই, কিন্তু বালিশের ওয়্যারটা পালটিয়ে দিন। মেয়েটি কোন কথা না বলে দরজার কাছে দাঁড়িয়েছিল। আমি থাকা পর্যন্ত নার্স মেয়েটি বালিশের ওয়্যার পালটায় নি। আমি নিজেই কয়েকটি টিস্যু পেপার নিয়ে মায়ের ঘাড়ের নীচে দিয়ে রেখেছিলাম। আমার আর বলার ইচ্ছে হয় নি, তোমাকে এখানে রাখা হয়েছে রুগীর সেবা করার জন্য, বিছানায় শয্যাশায়ী বলেই কী একজন মানুষকে এমন অবহেলা করতে হবে? আমি ঠিক জানিনা, বাংলাদেশে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে কী ধরনের ইনটেনসিভ কেয়ার নেওয়া হয়!

পরের দিন মায়ের মুখ থেকে লালা বের হয়ে বালিশ ভিজে যাচ্ছিল, ডিউটিরত নার্স মেয়েটিকে ডেকে দেখালাম, এই মেয়েটি কিন্তু গতদিনের নার্সের মত ‘অমানবিক’ ব্যবহার করেনি, সে আরেকটি শুকনো বালিশ এনে মায়ের ভেজা বালিশটি পালটিয়ে দিয়েছিল। তবে বালিশ পাল্টানোর সময় মায়ের মাথা উঁচু করার সময় খুব বিরক্তি নিয়ে বলেছিল, ” আপনের মা শরীরটারে শক্ত কইরা রাখে, সহজে নড়ানো যায় না”। বলেছিলাম, মায়ের শরীর শক্ত হয়ে গেছে, ইচ্ছে করে শক্ত করে রাখেনা বোন”।

সেদিন দুই নার্সের রুগীর প্রতি দুই রকম ব্যবহার দেখে আমার খুব কষ্ট লেগেছিল মনে, খুব আফসোস হয়েছিল, প্রফেসারের উপর রাগ করে আমি প্রায় সমাপ্ত নার্সিং পড়া ছেড়ে দিয়েছিলাম। যখনই ক্লিনিক্যাল ক্লাসে হসপিটালে যেতাম, আমি নিজের অস্ত্বিত্ব ভুলে যেতাম, রুগীদের রোগ যন্ত্রণায় যতটুকু সম্ভব আরাম দেয়ার চেষ্টা করতাম। পড়া ছেড়ে চলে আসার অনেক পরেও কিছু কিছু রোগী ওয়ালমার্টে এসে আমাকে চিনতে পেরে জিজ্ঞেস করতো, আমি কোন হসপিটালে আছি। জবাবে বলতাম, আমি ভলান্টিয়ার নার্স ছিলাম। আমি যদি নার্সিং পড়া শেষ করতাম, আমিও নাকি খুব চমৎকার নার্স হতাম, এই কথা কয়টি বলেছিল নার্সিং কলেজের দুই প্রফেসার। বাস্তবতা হচ্ছে, সারা জীবনে আমি কিছুই হইনি।]