ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

ভারতীয় চেহারার কয়েকটি ছেলেকে মাঝে মাঝেই আমাদের ইলেকট্রনিক ডিপার্টমেন্টের আশেপাশে দেখা যায়। প্রথম প্রথম, যে কোন জায়গায় ভারতীয় চেহারার কাউকে দেখলেই আগ বাড়িয়ে কথা বলার চেষ্টা করতাম। চারদিকে সাদা আর কালোদের মাঝে ভারতীয় চেহারার কাউকে দেখলে মনে হতো, খুব আপন কাউকে দেখছি। সময়ের সাথে সাথে আমার সেই আদিখ্যেতা কমে আসে। এখন আমি অনেক বেশী প্রফেশন্যাল হয়ে গেছি। আমাদের ওয়ালমার্ট সুপার সেন্টারের সকলেই আমেরিকান, ব্যতিক্রম আমি (একমাত্র বাংলাদেশী), দুই জন ফিলিপিনো এবং একজন জাপানী এসোসিয়েট, ভারতীয় একজন মেয়ে ছিল, সে চলে গেছে কয়েক বছর আগেই। অবশ্য আরও বিশদভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, এই শহরে আমরা একমাত্র বাঙ্গালী পরিবার, যে কয়েকজন ফিলিপিনো, জাপানী মহিলার কথা বললাম, তাদের স্বামীরা আফ্রিকান আমেরিকান। স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় চেহারার লোকজন দেখলে অনেক আপন মনে হয়।

এ বছর থ্যাঙ্কস গিভিং সেল ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’র আগের দিন দুইজন ভারতীয় আমাকে ফোন সেন্টারে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসে হিন্দীতে ‘নমস্তে’ জানায়। প্রতি উত্তরে আমিও ‘নমস্তে’ বলেই ইংলিশে কথাবার্তা বলা শুরু করলাম। কথাবার্তা বলতে যা বুঝায়, তোমাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি’ জাতীয় মামুলী কথা। দুই জনের মধ্যে একজন বয়সে বড়, আরেকজন পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়সী যুবক। ধরে নেই, যুবকের নাম অমিত। অমিতের বেশভূষা খুবই সাধারণ, একটু ভারী শরীর, মিষ্টি, বিনয়ী চেহারা, আর সাথের ব্যক্তিটিকে প্রায়ই দেখি ওয়ালমার্টে, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে ঘোরে, পরণের পোশাকেও চাকচিক্য নেই, পান খেয়ে মুখ লাল হয়ে থাকে। অমিত আমার কাছে জানতে চাইল, আমি হিন্দী বলতে পারি কিনা। বললাম, আমি তো বাংলাদেশের মেয়ে, হিন্দী বুঝি, কিনতু বলতে পারিনা। তুমি হিন্দীতে প্রশ্ন করো, আমি ইংলিশে উত্তর দেবো। খুব সোজা প্রশ্নে সে জানতে চাইলো, ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেল থেকে একটা ‘আই ফোন’ একটা ‘স্যামসাং গ্যালাক্সী এস ৩ ফোন’ আর একটা ল্যাপটপ কিনতে হলে ঠিক কী করতে হবে! বললাম, তোমাকে লাইনে দাঁড়াতে হবে। তবে তিন আইটেম তিন জায়গা থেকে বিক্রী হবে, কাজেই তিন আইটেম পেতে হলে সাথে আরও তিনজনকে নিয়ে আসতে হবে লাইনে দাঁড়ানোর জন্য। রাত দশটায় যে সেল শুরু হবে, তার জন্য কখন এসে লাইনে দাঁড়াতে হবে! বললাম, দেখো, তুমি এখানে নতুন, আমি এখানে আছি আট বছর হয়ে গেলো, আজ পর্যন্ত ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেল থেকে আমি কিছুই কিনতে পারিনি। দশটার সেল থেকে জিনিস পেতে গেলে বিকেল পাঁচটায় যদি লাইনে দাঁড়াতে পারো, সম্ভাবনা শতকরা আশিভাগ। তবে পাঁচ ঘন্টা লাইনে দাঁড়াতে পারবে কিনা, সেটা ভেবে দেখো।

অমিত জানালো, সে একজন ব্যান্ড শিল্পী। ছয় মাস আগে আমেরিকায় এসেছে ব্যান্ড দলে কী-বোর্ড বাদক হিসেবে, কন্ট্র্যাক্ট শেষ, এবার দেশে ফেরার পালা। তাই পরিবারের জন্য এই জিনিসগুলো উপহার হিসেবে নিতে চাইছে। বললাম, তাহলে একবার চেষ্টা করেই দেখো। কিছুই হয়তো পাবে না, কিন্তু একটা অভিজ্ঞতা তো হবে, দেখে যাও, এখানেও মানুষ কত ক্রেজী! হুড়োহুড়ি, ধাক্কাধাক্কি দেখে তোমার মজাই লাগবে। চলে এসো বিকেল পাঁচটায়। কাজের কথা বলা শেষ। এবার শুরু করলাম ‘আজাইরা প্যাচাল’। এ ধরণের ‘আজাইরা প্যাচাল’ আমি অনেকের সাথেই করি, এটা আমার অনেককালের অভ্যাস।

আজাইরা প্যাচালের চৌম্বক অংশঃ

অমিত তুমি কবে এসেছ এই দেশে, কোন ভিসায় এসেছ?

-আমি ছয় মাস আগে এসেছি ‘মুম্বাই মাশালা’ ব্যান্ড দলের সাথে। ব্যান্ড দলে আমি কী-বোর্ড বাজাই। আমরা এসেছি ট্যুরিস্ট ভিসায়। টেক্সাসে ভীরু ভাই আছেন, উনি আমাদের এনেছেন। সারা আমেরিকায় আমরা যাই, বলিউডের গান করি। ছয় মাস থেকে দেশে ফিরে যাই, আবার চলে আসি।

-তোমাদের একটা গ্রুপকে মাঝে মাঝেই ওয়ালমার্টে আসতে দেখি, এরা সকলেই কি মুম্বাই মাশালার সদস্য?
জী হাঁ, আমরা সদস্য, আর উনি ( সাথের ব্যক্তি) আমাদের ম্যানেজার। (এতক্ষনে বুঝলাম উনার মুখে কেন খোঁচা খোঁচা দাড়ি দেখা যায়। ম্যানেজারদের খোঁচা দাড়িতেই মানায় ভাল)।

-আচ্ছা অমিত, এতদূর থেকে তোমরা এদেশে আসো, তোমাদের আসা-যাওয়ার খরচ কে বহন করে? তোমরা ফাংশান করে অনেক টাকা পাও?

-ভীরু ভাই আমাদের যাতায়াত খরচ দেয়। এই যে আমরা এক স্টেট থেকে আরেক স্টেটে যাই, আমরা কানাডাতেও গেছি, ভীরু ভাইয়ের সাথে সব স্টেটের নেতাদের কথা ঠিক করা থাকে, আমরা যাই, কয়েকটা স্টেজ শো করি, তারপর আবার আরেক জায়গায় ডাক পড়ে যায়, তখন চলে যাই।

-যদি কিছু মনে না করো, ব্যক্তিগতভাবে নিও না, একটা কথা জানতে চাইছি, এই ধরণের স্টেজ শো-তে সাধারণত কীরকম পয়সা দেয়া হয়?

এবার ম্যানেজার সাহেব উত্তর দিলেন, আমাদেরকে একেক স্টেজ শোতে ৩,০০০ ডলার দেয়া হয়। ছয় মাসে আমরা কমপক্ষে পঞ্চাশ থেকে সত্তরটা স্টেজ শো করি।

-মাই গড! মাত্র ছয় মাসে তোমরা দুই লক্ষ ডলার উপার্জন করো?? বেশী শো হলে আরও বেশী? তোমরা নিশ্চয়ই অনেক নামকরা ব্যান্ড দল!

ম্যানেজার খুব বিনয়ের সাথে বললো, কোথায় আর বেশী? এতো খুবই অল্প!

-অমিত অবশ্য টাকার গল্পে গেলো না, বললো, মুম্বাইয়ে আমাদের ব্যান্ড দল অনেক নামী। ভীরু ভাই বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। অনেক ব্যান্ড দল এপ্লাই করেছিল, আমাদের সবার ইন্টারভিউ হয়েছে, অডিশান হয়েছে, ভীরু ভাই নিজে গিয়ে সব করেছেন। আমাদেরকে উনি সিলেক্ট করেছেন।

-অমিত, তোমার কাছ থেকে এত সুন্দর গল্প শুনে আমার খুব ইচ্ছে করছে, একদিন তোমাদের স্টেজ পারফরম্যান্স দেখার। আমি খুব গান পাগল, সারারাত বসে গান শুনতে পারি।

-এবার আমাদের প্রোগ্রাম শেষ, দেশে গিয়ে আবার ভিসা নিয়ে আসতে হবে। পরেরবার যখন আসবো, তখন তোমার জন্য পাস দিয়ে যাব। ফুল ফ্যামিলি নিয়ে আসবে আমাদের প্রোগ্রাম দেখতে।

-ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে আমি হেসে দিলাম, বললাম, ম্যানেজার সাহেব কী আমাদেরকে ফ্রী গান শুনতে দিবেন?

খুবই সহজ, সরল সঙ্গীত প্রিয় ম্যানেজার সাহেব পান খাওয়া মুখে হাসি ছড়িয়ে বললো, অবশ্যই দেবো। আপনি আমাদের বোন, বোনের জন্য সব কিছু ফ্রী।
এবার আমার কথার পালা শেষ, অমিতকে আবার মনে করিয়ে দিলাম, বিকেল পাঁচটায় যেনো চলে আসে ওয়ালমার্টে, ল্যাপটপের সেল শুরু হবে রাত দশটায়, কাজেই শুভস্য শীঘ্রম! সঙ্গীতশিল্পী, বাদ্যযন্ত্রী অমিত কুমার সারা মুখে শিশু সুলভ হাসি ছড়িয়ে আবার আসবে বলে তখনকার মত বিদায় নিল।