ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

সময়টা ছিল খুব সম্ভব মে মাসের মাঝামাঝি। ঊনিশ’শ একাত্তর সালের কথা বলছি। ২৫শে মার্চের কালো রাতের পর, নারায়ণগঞ্জ শহর ছেড়ে অনেকেই পালাতে শুরু করে। ২৭ শে মার্চ আমরাও শহর থেকে পালিয়ে উদ্ধবগঞ্জ নামের একটি গ্রামে পৌঁছেছিলাম দাদু দিদিমার সাথে। উদ্ধবগঞ্জে দাদুর মুহুরীর বাড়ী। প্রাণভয়ে প্রচুর মানুষ ঐ গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। আমার মা বাবা তখনও নারায়ণগঞ্জ শহরেই থেকে গেছিলেন, পরিস্থিতি আঁচ করার জন্য। আমাদের বয়স কম ছিল, একেবারেই শিশু, যুদ্ধের ভয়াবহতা বুঝবার মত বোধ তৈরী হয়নি। শুধু বুঝতাম, পাকিস্তানী মিলিটারীদের সামনে পড়ে গেলেই গুলী করে মেরে ফেলবে। পাকিস্তানী মিলিটারীর ভয়েই সবাই পালিয়ে যাচ্ছে। চারদিকে গোলাগুলির সংবাদ, পাড়া ছেড়ে সবাইকে পালাতে দেখে, ভয়ের বদলে ছোটদের মনে ছিল ‘যুদ্ধ-যুদ্ধ’ খেলার সাময়িক উত্তেজনা। শহর ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যেতে পারছি, সেই ভেবে আনন্দ।

উদ্ধবগঞ্জের পাশের গ্রাম সোনারগাঁও। সেখানে দাদুর আরেক মক্কেল ননীবাবুর বাড়ী। মুহুরীবাবুর বাড়ীতে গাদা গাদা অসহায় মানুষের পাশে উকিল বাবুকে উনি থাকতে দিতে চান নি। দশ বারো দিনের ব্যাপার, সব ঝামেলা চুকে গেলে উকিলবাবু আবার নারায়ণগঞ্জে উনার নিজের বাড়ীতে ফিরে যাবেন, এই কয়টা দিন নিজের বাড়ীতে এনে আদর সমাদর করা উনার বিরাট দায়িত্ব হিসেবে মেনে নিলেন। লাল ইঁটের দোতালা দালানে উনি আমাদেরকে নিয়ে তুললেন। দশ বারোদিনের মধ্যে সব ঝামেলা চুকে যাবে, ননীবাবুর ধারণাটি সঠিক ছিল না। দশ বারোদিনের পরিবর্তে আমরা দুই মাস থেকে গেলাম। এই দুই মাস ছোটদের জন্য ছিল বেশ সুখের সময়। আমাদের দালান থেকে সোনারগাঁও জমিদার বাড়ী দেখা যেত, দালানের পেছনদিকে যে বিশাল বড় মাঠ দেখা যেত, সেই মাঠ পেরোলেই ছিল ‘পানাম’ জমিদার বাড়ি ।

দুইদিকে জমিদার বাড়ী দেখে নিজেদেরকেও জমিদার জমিদার মনে হতো। বাড়ীর সামনেই বিশাল চওড়া দীঘি ছিল, দীঘির জলে প্রচুর মাছ, চারদিকে চার ঘাটলা, রাতের বেলা খাওয়া দাওয়া শেষে বাসন ধুতে গেলে দেখা যেত, ঘাটের উপরে চিংড়ি মাছ, বড় বড় পুঁটি মাছেরা এসে ভীড় করেছে। আমার দাদুর বাজার করার ব্যাপারে ছিল দারুণ খ্যাতি। প্রতিদিন সকালে বাজারে গিয়ে তিন চার সের দুধ কিনতো, মাছ কিনতো। আসলে তখন সব কিছুই সস্তা দেখে দাদুর যুদ্ধের কথা মাথায় থাকতো না। অনেক বড় হয়ে বুঝেছি, দাদুর মাথায় আইনের ধারা ছাড়া আর কিছু খেলা করতো না। রাজনীতি নিয়ে কখনও মাথা ঘামাতেন না। রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাতেন আমার বাবা। সেজন্যই বাবার কাছে খুব অস্বস্তিকর মনে হতো যখন দাদু বাজার থেকে দুধের কারিয়া হাতে বাসায় ফিরতো।

দাদু সাথে করে যা কিছু টাকা নিয়ে এসেছিল, সেগুলিই দেদারসে খরচ করে যাচ্ছিল। উনার ধারণা ছিল, আগামী সপ্তাহেই সব ঠিক হয়ে যাবে। এমন ধারণা করার কারণও ছিল, উনার মক্কেলরাই উনার কাছে সংবাদ এনে দিত, সামনের সপ্তাহেই সব ঠিক হয়ে যাবে! বাবা মানা করতেন, বাজার করার বহর দেখলে মানুষ ভুল বুঝতেও পারে। ঠিকই মিলেছে বাবার কথা, দাদুর বাজার করার বহর দেখে ‘বাজারে’ কেউ কেউ কুমতলব আঁটতে শুরু করে। দুই দিন পর পর দূরের গ্রামে ডাকাত পরার সংবাদ পাওয়া যায়। হঠাৎ এক রাতে খুব কাছে থেকে কান্নাকাটির আওয়াজ শোনা যায়। আরেকদিন, সকালের দিকে কেউ এসে বলে, ‘বাজারে মিলিটারী আইছে’, ব্যস, মা আর দিদিমা সাবান, জল নিয়ে মাথার সিঁথিতে থাকা সিঁদুর ঘষে ঘষে তুলে ফেলে। এরপর আমাদের নিয়ে পাশের মুসলমান বাড়ীতে গিয়ে পালিয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পরে আবার সব ঠিকঠাক হয়ে যায়।

পরের দিন ননীবাবু এসে দাদুকে বলতে বাধ্য হয়, ” বাবু, অবস্থা ভাল ঠেকতেছে না। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জের অবস্থা খুব খারাপ। মিলিটারী বাইছা বাইছা হিন্দু ধইরা ধইরা মারতে আছে। হিন্দু মাইয়াগোরে ধইরা লইয়া যাইতাছে। কী করুম! আপনে আমার অতিথি। আপনেরে এইভাবে রাইখা আমি কোথাও যাইতে পারুম না। ছোট ছোট পোলাপান লইয়া আগরতলা চলে গেলে কেমন হয়!”।

আমার দাদু খুব ভীরু প্রকৃতির ছিলেন। ননীবাবুর কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, সোনারগাঁও আর থাকা যাবে না। আগরতলা দিয়ে কলকাতা চলে যাবেন। ননীবাবু নিজেও চলে যাবেন। নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে এখানে আমাদের সুখেই দিন কাটছিল। এর মধ্যে দাদু সোনারগাঁও ছেড়ে যেতে চাইছেন শুনে ছোটদের মনে আবার কিছুটা উত্তেজনা দেখা দিল। নতুন কিছু ঘটার অপেক্ষা, নতুন কিছু শোনার অপেক্ষায় আমাদের প্রহর গোনা শুরু হলো। দুই দিন পরেই বাজারে একদল ডাকাত ধরা পড়ে। পরে জানা যায়, আমাদের অস্থায়ী নিবাসে ডাকাতি করার জন্যই ওরা আসছিল। এই সংবাদ শোনার পরে বড়দের সকলেই একমত হলো, সবকিছু গোছগাছ করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই গ্রাম ছেড়ে পালাতে হবে।

আমরা নারায়ণগঞ্জ থেকে হাতব্যাগে যে কয়টা জামাকাপড় আঁটে, তাই নিয়েই চলে এসেছিলাম। এখনতো আর নারায়ণগঞ্জে ফিরে যাওয়া যাবেনা, তাছাড়া আগরতলা যাওয়া ছাড়া আর কোন গতিও ছিল না। হাতে কিছু টাকা পয়সা না নিয়ে এতগুলো বাচ্চা নিয়ে কোথাও বের হওয়াও মুশকিল। মায়ের সোনা গয়নার ছোট পোঁটলা, দিদিমার কিছু গয়না নারায়ণগঞ্জের বাসাতেই ট্রাঙ্কে রয়ে গেছিল। কোন অজানার ঊদ্দেশ্যে রওণা হচ্ছি সবাই, আর কখনও ফিরে আসা হবে কিনা, সেই ভয়ে মা আর দিদিমা নিজেদের গয়নাগুলো নারায়ণগঞ্জের বাসায় ফেলে যাওয়া সমীচীন মনে করেনি। সিদ্ধান্ত হয়, দাদুর মুহুরী হামিদ মিয়ার সাথে মা যাবে শহরে, ঘরবাড়ি তালা মেরে আসতে হবে, কিছু টাকা তুলতে হবে ব্যাঙ্ক থেকে, সাথে গয়নাগুলো নিয়ে আসবে। এভাবে এক কাপড়ে কোথাও যাওয়া যায় না, কিছু কাপড়-চোপর নিয়ে আসতে হবে। ঘরে যখন এগুলো নিয়ে আলাপ হচ্ছিল, আমি চুপচাপ সব শুনে যাচ্ছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম, সোনা গয়না মাটির নীচে গর্ত করে রেখে দিলেই তো কেউ জানতে পারবে না। নিজের মতামত জানাতেই এক ধমক খেলাম, বড়দের গোপন পরামর্শ শুনে ফেলেছি বলে।

পরের দিন খুব সকালে হামিদ নানা আসবে। মা’কে মুসলমান বৌ সাজিয়ে নেয়া হবে। মুসলমান সাজার একটাই মাত্র উপায়, বোরকায় নিজেকে ঢেকে ফেলা। দুই মাসে সোনারগাঁও এর আশেপাশের মানুষজনের সাথে আমাদের খাতির হয়ে গেছিল। পাশের বাড়ীর সখিনার মায়ের কালো বোরকা আনা হলো। আমার মা খুব সুন্দরী ছিলেন, বয়স কম ছিল, কিন্তু ব্যক্তিত্ব ছিল খুব প্রখর। তাছাড়া নারায়ণগঞ্জ মায়ের জন্মস্থান, পেশায় শিক্ষক, মনের জোর ছিল আলাদা। তাই মা’কে নিয়ে কেউ দুঃশ্চিন্তা করছিল না। আগের সন্ধ্যায় আমাদের সবার সামনে মা’কে বোরকা পড়িয়ে ট্রেনিং দেয়া হলো। বোরকার মুখের উপর যে পর্দা থাকে, সেই পর্দার ঝিরি ঝিরি ফুটো দিয়ে মা ভাল করে কিছু দেখতে পাচ্ছিল না। তাই এলোমেলোভাবে পা ফেলছিল। তাই দেখে আমরা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছিলাম।

পরের দিন খুব সকালে মা তাদের ‘হামিদ চাচা’র সাথে রওনা হয়ে গেলো। পানামের দিকে যেতে যে বিশাল মাঠ, সেই মাঠ পেরিয়ে কালো বোরকা পড়া মা’কে যেতে দেখে আমার বুকটা মুচড়ে উঠেছিল। কেনো জানি মনে হচ্ছিল, মা আর ফিরে আসবে না। সারাদিন বাড়ীতে সবাই চুপ করে বসেছিল। ছোটরা হই হই করছিল না। দিন পার হয়ে সন্ধ্যা হয়ে আসতেই তিন বছর বয়সী ছোট ভাই কান্না শুরু করে দেয়, মা আসেনা ক্যান, মা আসেনা ক্যান বলে। ঠিক অন্ধকার হওয়ার আগ মুহূর্তে আমার মেজভাইকে দেখা গেল, দূর থেকে দৌড়ে আসছে। মা আইছে, মা আইছে বলে চীৎকার করছিল, মেজদার চীৎকার শোনার সাথে সাথে দিদিমা, ঠাকুমার দেহে প্রাণ ফিরে আসে। দেখা গেল, মায়ের সাথে আমার দুই মামাও চলে আসছে। বলা বাহুল্য,’ দেখা যাক কী হয়’ ধারণা নিয়ে আমার দুই মামা শহরে তাদের মুসলিম বন্ধুদের সাথেই রয়ে গেছিল। মা যখন ঘরে ফিরে বোরকা খুলেছে, মায়ের চেহারা রক্তশূণ্য। আমি তো আর রক্তশূন্য বুঝিনা, দিদিমাকে বলতে শুনেছি, ‘ কী হইছিল? তোর চেহারা এমুন দেখা যায় ক্যান? একেবারে রক্তশূইন্য চেহারা”!

হামিদ নানা বলল, ” কর্তা, আম্মারে লইয়া আইজ বড় বিপদের মইদ্যে পড়ছিলাম। আর দিন পায় নাই, আইজই আজরাইল আইয়া হাজির অইছে নারায়নগঞ্জ শহরে। আম্মারে বাড়ীর ভিতরে পাঠাইয়া দিয়া আমি গেছি কোর্ট বিল্ডিং এ, গিয়া আধ ঘন্টা দাড়াইতে পারি নাই, ট্রাক ভইরা মিলিটারী আইয়া হাজির। মনে মনে দোয়া ইউনুস পড়ি, আমি কলেমা পড়ুম কী, আম্মার কথা মনে অইতেই আমি অস্থির অইয়া গেছি। ক্যামনে ক্যামনে যে আম্মারে আবার আপনের কাছে ফিরাইয়া দিতে পারছি, আমি নিজেই কইতে পারুম না”।

আমরা মায়ের দিকে তাকিয়ে আছি, মা কী বলে! মা হামিদ নানাকে কিছু খেতে দিতে বললো সবার আগে। এরপর মা যা বললেন, তা রীতিমত ভয়াবহ। শহরে আমরা থাকতাম বিরাট বড় এক বাড়ীতে, যেখানে শুধু বাড়ীওয়ালা ছিলেন মুসলমান, ভাড়াটেদের সবাই হিন্দু। কাজেই এই বাড়ী হিন্দু বাড়ী নামেই বাইরে পরিচিত ছিল। দরজার তালা খুলে মা কেবল ঘরে ঢুকেছে, বাড়ীর মালিক, হাজী সাহেবের কাছে সংবাদ চলে এসেছে, নারায়ণগঞ্জে মিলিটারী ভর্তি ট্রাক ঢুকছে। পাড়ায় পাড়ায় বাড়ী বাড়ী সার্চ করতেছে। এই কথা শোনার সাথে সাথেই একটু আগে খুলে রাখা বোরকা পড়ে নিয়ে মা কোনমতে ট্রাঙ্ক খুলে টাকা, গয়না নিয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলে। কাপড় চোপর আলনার মধ্যে যা ছিল, তাই টেনে নিয়ে বোঁচকা বাঁধে। মা ভেবেছিল, আমাদের পাড়ার ভেতর ঢোকার আগেই মা হামিদ চাচার সাথে বের হয়ে যেতে পারবে। কিন্তু তা সম্ভব হয় নি। হামিদ চাচা তখনও কোর্ট থেকে এসে পৌঁছেনি, কিন্তু ততক্ষণে আমাদের পাড়ার ভেতর মিলিটারী ঢুকে গেছে। পাড়াটা হিন্দুপ্রধান ছিল বলে মিলিটারীরা প্রতি বাড়ীতে ঢুকে ঢুকে সার্চ করছিল। এই সুযোগে হাজী সাহেব আমার মা’কে দাদুর বৈঠকখানা ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজায় তালা দিয়ে দেয়।

বেড়ার ঘরের ভেতর বসে মা ঠকঠক করে কাঁপছিল। বাইরে বুটের আওয়াজ শুনে মা’র গলা শুকিয়ে কাঠ। বেড়ার ঘরের দরজায় একটা ছোট লাথি দিলেই দরজা ভেঙ্গে যাবে। মা তো আর ঊর্দু কথা বুঝেনা, তারপরেও হাজী সাহেবের কথা শুনছিল, ” কাফের নেহী হ্যায়, মুসলমান হ্যায়”। এতবড় বাড়ী টহল দিয়ে দেখেছে, লাভ হয় নি, সব বাড়ির দরজা তালাবন্ধ, কেউ কোথাও নেই। মিলিটারীরা চলে গেলো। আমার মামা কোথাও লুকিয়ে ছিল, মিলিটারী সরে যেতেই মামা, হামিদ নানা এসে উপস্থিত। তারা শুনে এসেছে, কাছাকাছি কোথায় নাকি এক বাড়ীতেই দুই জনকে গুলী করে মেরে ফেলেছে। ততক্ষণে আমার মায়ের দেহে প্রাণ ছিল না। ঘরের মজুত খাদ্য বাড়ীওয়ালাকে দিয়ে দিলেন, নিজের সেলাই মেশিন আর ঘরের একটা মাত্র সিলিং ফ্যান মামার বন্ধুর বাড়ীতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ব্যস! কিছু টাকা আর গয়না নিয়ে হামিদ চাচার সাথে রওনা হয়ে গেলেন। পথে গাড়ী-রিকশা বন্ধ ছিল বলেই ঘুরপথে, মিলিটারীর চোখ এড়িয়ে ‘হামিদ নানা উনার ‘আম্মারে’ উকিল বাবুর কাছে এনে পৌঁছে দিয়ে যায়। সেদিন থেকে আমরা যারা ছোট ছিলাম, তারা হঠাৎ করেই বড় হয়ে গেলাম। বুঝে গেলাম, যুদ্ধ কোন খেলা নয়, এর সাথে বাঁচা-মরা জড়িত। মা’ আর একটু হলেই মিলিটারীর কাছে ধরা পড়ে যেতে পারতো, কোনদিন আর ফিরে আসতোনা । এরপর তো সোনারগাঁও থাকার আর কোন যুক্তিই ছিল না। এই ঘটনার সাত দিনের মধ্যেই আমরা ননীবাবুর আশ্রয় ছেড়ে, ননীবাবুর ঠিক করে রাখা দালালের পিছু পিছু রওনা দিয়েছিলাম।