ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

” দিল্লীতে একটি মেয়েকে বাসের সবাই মিলে রেপ করেছে”–অনলাইনে যাওয়ার আগেই ভয়ংকর এই সংবাদটি পেয়েছিলাম মেজো মেয়ের কাছ থেকে। বাইশ বছর বয়সী তরুণীর মুখে তেইশ বছর বয়সী তরুণীর রেপড হওয়ার সংবাদ শোনার মধ্যে স্বস্তি নেই। অস্বস্তি নিয়েই অসহায় এক কান্না বুকের মাঝে চেপে রেখে ধর্ষিতা মেয়েটির আরোগ্য কামনা করেছি। ‘ধর্ষণ’ বা ‘রেপ’ শব্দটি উচ্চারণ করতেই আমার অস্বস্তি লাগে, এই ধরণের সংবাদ পাঠ করতে ভয় লাগে, তাই দিল্লীতে গণধর্ষণের শিকার মেডিক্যাল স্টুডেন্ট ‘দামিনী’ মায়ের উপর ঘটে যাওয়া পাশবিক অত্যাচারের কাহিণী পড়েও দেখিনি। এটা আমার পলায়ণপর মনোবৃত্তি নয়, এই ধরণের সংবাদ পাঠ করার সময় আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। কারণ যে কোন ঘটনা-দূর্ঘটনা আমি আমার নিজের উপর টেনে এনে কল্পনা করি, স্বভাবতঃই মাথা এলোমেলো হয়ে যায়।

ধর্ষকের ভূমিকায় থাকে পুরুষ, এই পুরুষই আমার বাবা, আমার ভাই, আমার স্বামী, আমার চাচা, মামা, খালু, প্রিয় বন্ধু, অতি পরিচিত আরও আরও কতজন। এই সকল পুরুষের সাথে তিলে তিলে গড়ে উঠেছে আমার নিবিড় সম্পর্ক। এরা সকলেই আমার আপন, এরা সকলেই আমার হিতৈষী। এরা তো কখনওই ‘ধর্ষক’ হতে পারে না! তাহলে ‘ধর্ষণ’ করার জন্য আলাদা কিছু পুরুষ থাকে, যারা মায়ের পেটে জন্মায় না, যাদের কোন বোন থাকে না, যেহেতু তারা ‘ধর্ষণেই আনন্দ পায়, তাই তাদের বিয়ে করার প্রয়োজন হয় না, বিয়ে করে না বলে তাদের কোন কন্যা সন্তানও জন্মায় না। এরা পৃথিবীতে আসে ‘ধর্ষক’ হয়ে। এদের সাথে আমার পরিচয় নেই, তাই এদের কৃতিত্বপূর্ণ ধর্ষনের সংবাদ শুনলেই ভয়ে কুঁকড়ে যাই। দিল্লীর মেয়ে দামিণীর সংবাদটি না পড়েও, শুধু পত্রিকার সংবাদের শিরোনাম দেখেই জানতে পেরেছিলাম, মেয়েটিকে ধর্ষন করেও ক্ষান্ত হয়নি সেই ‘এলিয়েন ধর্ষক পুরুষেরা’, তারা মেয়েটিকে পিটিয়েছে, তারপর দেহের ক্ষিদে মিটিয়ে বাস থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। এতগুলো পুরুষের আবেগহীন, রোমান্স বিহীন, কামণার তীব্র কামড়ের জ্বালা, লোহার রডের আঘাতের যন্ত্রণা, চলন্ত বাসের থেকে তীব্র গতিতে ছিটকে কংক্রীটের রাস্তায় পড়ে যাওয়া—তেইশ বছর বয়সী তরুণীর সেখানেই মৃত্যু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দামিণী ‘মেয়ের জাত’, কই মাছের প্রাণ, এত সহজে মরবে কেনো? শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করেছিল। মেয়েটির এমন সাহসী, দৃপ্ত, প্রত্যয়ী আত্মবিশ্বাস দেখে মমতায় গলে গেছি, চোখ দুটো আনন্দে ভিজেছে, বুকে সাহস সঞ্চয় করেছি, আরেকবার আধুনিক প্রজন্মের তারুণ্যকে ‘স্যালুট’ করেছি। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থণা করেছি, মেয়েটির দ্রুত আরোগ্যলাভের জন্য, সংবাদ শিরোনামে দেখেছি, মেয়েটিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেয়া হয়েছে। মনে মনে খুশী হয়েছি, যাক, এ যাত্রা মেয়েটি বেঁচে গেলো।

গত সন্ধ্যায় আমরা সবাই একসাথে গল্প করছিলাম, আমার মেজো মেয়েটিই সংবাদ দিল, ‘ দিল্লীতে রেপড মেয়েটি শেষ পর্যন্ত মারা গেছে’! সংবাদটি শোনার সাথে সাথে চমকে গেছি, চমকে গেছি আমার মেয়ের গলার স্বর শুনে। এমন নিস্পৃহ, অপমানিত গলার স্বর এর আগে আমি শুনিনি। এক ঝটকায় মুখ তুলে ওর মুখটি দেখার চেষ্টা করতেই দেখি, আমার মেয়ে মুখ ঘুরিয়ে সোজা ওর রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। বাকী রাত আমাদের কারো সাথে আর কোন কথা না বলে, না খেয়ে চুপচাপ নিজের আইপ্যাড নিয়ে বসে থেকেছে।

আমার মেয়ের বয়স বাইশ, ‘পাবলিক হেলথ’ এর উপর মাস্টার্স করছে, দামিণীর বয়স তেইশ, মেডিক্যাল কলেজে পড়ছিল। ওরা প্রায় সমবয়সী। আমার মেয়ে থাকে আমেরিকায়, দিল্লী, মুম্বাইয়ের প্রচুর ছেলেমেয়ের সাথে নিত্যদিন উঠাবসা ওর, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে সকলেই ওর সহপাঠী। কাজেই ‘দামিণী’র প্রতিও নিশ্চয়ই এক ধরণের সমবয়সীসুলভ টান অনুভব করেছে। মোটামুটি নিশ্চিন্ত পরিবেশে বড় হতে থাকা একটি মেয়ে ধর্ষণের সংজ্ঞা জানে, কিন্তু ধর্ষণের পর মানসিক ও শারীরিক ভয়ানক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে কতটুকু জানে, তা আমার জানা নেই। তবে আমার মেয়েটির মুখ চোখ শুকিয়ে গেছে। কারণ, ওকেও রাতে-বিরেতে ডিপার্টমেন্ট থেকে গাড়ী ড্রাইভ করে নিজের এপার্টমেন্টে ফিরতে হয়, রাত বারোটা বেজে গেলেই আমি ফোনের পর ফোন করে তাড়া দেই নিজের রুমে ফেরার জন্য। লজ্জায় ও সংকোচে বলতেও পারি না, কেনো আমার এই উদ্বেগ, কিসের দুঃশ্চিন্তা। কী করে বলি, মেয়ে হয়ে জন্ম নেয়ার সাথে সাথেই কপালে সারা জীবনের জন্য অলিখিতভাবে ‘এলিয়েন পুরুষের ভোগের জন্য তুমি’ ছাপ পড়ে যায়!

‘ধর্ষণ’ কাকে বলে? একজন নারী ও পুরুষের মধ্যে জোরপূর্ব্বক, বলপ্রয়োগপূর্ব্বক, একতরফা উৎসাহে যে দৈহিক মিলন ঘটে বা ঘটানো হয়, সেটাকেই তো ‘ধর্ষণ’ বা বলাৎকার বলা হয়ে থাকে! আর সেই ‘ধর্ষণ’ নামক অতি ভয়ংকর কর্মের নায়ক অবশ্যই ‘পুরুষ’ এবং ধর্ষিতা অবশ্যই ‘নারী’। ধর্ষকের কি কোন দেশ থাকে? ধর্ষকের কি কোন জাত থাকে? ধর্ষকের কি মা-বোন থাকে? ধর্ষকের কি কন্যা সন্তান থাকে? ধর্ষকদের চেনা যায় কী করে? এদের চেনার তো কোন উপায় নেই! ভালো করে নাম-ধাম জানার আগেই তো এরা মেয়েদের উপর হামলে পড়ে। এমনকি কখনও কখনও স্বামীও নাকি ধর্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে! স্বামী-স্ত্রীর দৈহিক সম্পর্ক ‘সুস্থ-স্বাভাবিক’ সম্পর্ক হিসেবে চির স্বীকৃত হলেও মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, সুস্থ দৈহিক মিলনের ক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রী, দুজনের সম্মতি থাকতে হবে, নাহলে স্ত্রীর অনিচ্ছায় যে মিলন, সেটাকেও ধর্ষণ বলা হয়ে থাকে।

পৃথিবীর সব দেশেই প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ নারী ধর্ষিত হচ্ছে, সে স্ত্রীই হোক, সৎ কন্যাই হোক, বান্ধবীই হোক, আত্মীয়া বোনই হোক অথবা চলতি পথে হঠাৎ সুযোগে পেয়ে যাওয়া তরুণীটিই হোক। ধর্ষণ হয়ে চলেছে, যুগ যুগ ধরে। ঘরে -দুয়ারে, হাটে-বাজারে, গ্রামে-গঞ্জে, আনাচে-কানাচে, যুদ্ধক্ষেত্রে, এমনকি পতিতালয়েও নারী ধর্ষিত হয়ে চলেছে। শুধুই কি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতেই নারীর এমন অপমান হচ্ছে? কখনওই নয়, আমেরিকার মত পরাক্রমশালী দেশটিতে প্রতিদিন কতভাবেই যে নারীর অপমান হচ্ছে, তার পরিসংখ্যান দেখে ভিরমী খেতে হয়। ‘ স্টেপ ডটার’ রেপ তো প্রতিদিন, প্রতিবেলাতেই ঘটছে! কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেনো মানুষ সেই আদিম যুগের মতই রাস্তা-ঘাটে উলংগ হচ্ছে, উলংগ করে দিচ্ছে নিজেকে, উলঙ্গ করে দিচ্ছে সমাজকে, উলঙ্গ করে দিচ্ছে মানব সভ্যতাকে! মানুষের সভ্যতার ক্রম বিকাশের সাথে সাথে মানুষের এই আদি রিপু প্রকাশের ক্ষেত্রে সংযম আসছে না কেনো।

নারীর অপমান কি শুধুই ধর্ষণেই সীমাবদ্ধ? আমাদের তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো ছাড়াও পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশে শক্তিশালী পুরুষের হাতের চড়-চাপড়, কিল-ঘুষি, লাথি-ঠ্যাঙাণী খেয়েই নারী বিছানা ছাড়ে, আবার এগুলো খেয়েই মাঝরাতে বিছানায় যায়। এই তো নারীর কপাল! নারী শিক্ষিত হলেই কি, আর অশিক্ষিত থাকলেই বা কি! উচ্চশিক্ষিত নারীকে বাইরে থেকে যতই স্মার্ট দেখা যাক না কেনো, অন্দর-মহলে সে শুধুই একজন নারী। তাকে বাইরে বের হওয়ার আগে ঘরের সকলের চাহিদা মেটাতে হয়, কর্মশেষে বাড়ী ফিরেও তার মুক্তি নেই। তাকে একঘেয়ে জীবনের ঘানি ঘুরাতে হয়। এওতো এক ধরণের অত্যাচার! নারীরও একটি দেহ আছে, সেই দেহে নানা রকম চাহিদা আছে, দেহের রোগ-শোক আছে, ক্লান্তি আছে, এসব খবর কেউ নেয় না, এটাওতো নারীর এক ধরণের অতৃপ্তি! নারী বিয়ের আগে থাকে বাবা-ভাইয়ের কঠিন শাসনে, বিয়ের পর স্বামী-শ্বশুরের শাসনে, শাসনে থেকে থেকেই নারীর ভবলীলা সাঙ্গ হয়, ইহজীবনে স্বাধীনতার স্বাদ পায় না, নারীর জন্য এটাওতো এক ধরণের মানসিক অশান্তি! আজকের সংবাদে দেখলাম, দামিণী মায়ের মৃত্যুর পরে সিঙ্গাপুর হাসপাতালের ডাক্তার বলেছেন, মেয়েটির শান্তিতে মৃত্যু হয়েছে! ‘ধর্ষিতার আবার শান্তিতে মৃত্যু!! কাঁদবো না হাসবো!

নারীকে সৌন্দর্য্যের প্রতীক বলা হয়, আবার নারীর পোশাক পরার স্বাধীনতাকে নারীর দুঃসাহসিক অভিলাষ মনে করা হয়। সারাক্ষণ হাজার চোখের ভ্রু কুঞ্চন উপেক্ষা করে নারীকে চলতে হয়। অত্যধিক গরমে পুরুষ খাটো প্যান্ট পড়তে পারে, মেয়েরা পারবে না। পুরুষের পেশীবহুল শরীর ও পা দেখে মেয়েদের মন বা শরীর চুলকায় না, অথচ মেয়েদের স্বল্প বসনে দেখতে পেলেই পুরুষের মনে সুড়সুড়ি লাগে, এটা কেমন কথা! নিজেকে সংযম করার নামই তো ‘আত্মসংযম’! এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও যদি পুরুষ ‘আত্মসংযমী’ হতে না শিখলো, এ লজ্জার ভার বইবে কে? গতকাল সাংবাদিকদের কাছে ইতালীর কোন মূর্খ ধর্মজাযক বলেছেন, মেয়েরা সংক্ষিপ্ত কাপড়-চোপড় পড়ে পুরুষের কামনার উদ্রেক ঘটায়! এমন উক্তি অনেক মোল্লা, ব্রাক্ষ্মণ, সমাজপতিরা অহরহ কানের কাছে জপে যাচ্ছে। এই মন্ত্র জপবার সময় একবারও ভেবে দেখছে না, এতে করে নিজেদের বিকৃত মানসিকতা, অনিয়ন্ত্রিত অভিলাষগুলো প্রকাশিত হয়ে পড়ছে! ওরা একবারও ভেবে দেখছে না, নিজেদের কুকর্মের দ্বারা পৃথিবীর কোটি কোটি সুস্থ পুরুষকে অপমানিত করে চলেছে! মাঝে মাঝেই ছুঁড়ে দেয়া এ সকল ছবক দ্বারা যে কেউ প্রভাবিত হতেই পারে! এভাবেই এই সকল মোল্লা-পুরুত-ফাদাররা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করে চলেছে। এই সব সমাজপতিদের প্রতি একরাশ ঘৃণা ছুঁড়ে দিচ্ছে এই পৃথিবীর কোটি কোটি নারী, হোক তারা শক্তিতে দূর্বল, হোক তারা সমাজে অবহেলিত, তারপরেও ঘৃণার থুতুতে শুধু ঘৃণাই থাকে, রাশি রাশি ঘৃণা!