ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

ডাক্তারের মেয়ে নাপিত, ক্যাশিয়ারের ছেলে ল’ইয়ারঃ

সেদিন ছিল শনিবার। ৫ই জানুয়ারীর সকাল দশটা বাজার সাথে সাথে ওয়ালমার্টের ঊদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি। শনিবার আমাদের ফোন সার্ভিসের অফিস খোলা হয় সকাল ৯টায়। উইকএন্ড এলেই হলো, গ্রাহকের ভীড় ঘন্টায় ঘন্টায় বাড়তেই থাকে। তবে আমার বেশী ভালো লাগে উইকএন্ডে কাজ করতে। উইকডে’তে সব অকাজের ছেলেমেয়েরা এসে ভীড় করে। এদের সাথে গল্প করতে ভালো লাগে না। আমার আবার গ্রাহকদের সাথে গল্প না করতে পারলে পেটের ভাত হজম হয় না। আমার পছন্দের মানুষগুলো আসে উইকএন্ডে। তা শনিবারের সকালে প্রচন্ড ভীড় ছিল। একজন গ্রাহকের সার্ভিস কন্ট্র্যাক্ট যখন সাইন করাচ্ছিলাম, তখনই একটু দূরে এক ভদ্রমহিলাকে অপেক্ষা করতে দেখেছি। আমার আরেক সহযোগী মেয়ে সেই ভদ্রমহিলাকে হেল্প করতে চেয়েছিলো, এত ভীড় বোধ তার ভালো লাগছিল না, সেজন্য বোধ হয় ভীড় পাতলা হওয়ার অপেক্ষায় ছিল সে।

ভীড় কমে যেতেই ভদ্রমহিলা আমার কাউন্টারে এসে দাঁড়াতে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আমি তাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি। কেমন যেনো একটু ভীতু এবং নমনীয় স্বরে সে বললো,

-আমি আমাদের ফোন সার্ভিস রিনিউ করতে চাই।

-বাহ! কোন সমস্যা নেই। আমি করে দিচ্ছি। তোমার আইডি দেখাও প্লীজ!

সে আইডি দিলো, আইডি মিসিসিপি স্টেটের, কিন্তু যে ফোন নাম্বার সে বলেছে, সেটা ছিল ্লুসিয়ানা স্টেটের। বুঝলাম, অন্য স্টেট থেকে মুভ করেছে। আমি মিসিসিপি থেকে পালাতে পারলে বাঁচতাম, এমন নীরস স্টেট বোধ হয় আমেরিকার আর কোথাও নেই। অথচ এই সুন্দরী মহিলা লুসিয়ানা থেকে চলে এসেছে মিসিসিপি। মহিলা হোয়াইট, তার চেহারা এবং বাচনভংগী বলে দিচ্ছে, সে বেশ বড়লোক বাড়ীর গিন্নী। তিনটি ফোন লাইন নবায়ন করতে বেশ কিছুটা সময় লাগে, তার উপর সে তিনটি আই ফোন নিচ্ছে। আরেকটু অতিরিক্ত সময় লাগবে, ফোন টিদারিং এর ব্যাপার আছে। কাজ করতে করতে জুড়ে দিলাম খেজুড়ে আলাপ। ভদ্রমহিলার নাম ডেবোরাহ!

– ডেবোরাহ, তোমরা আগে লুসিয়ানা ছিলে? মিসিসিপিতে এলে কবে? এয়ারফোর্সে চাকুরী করো?
-মিসিসিপিতে এসেছি হ্যারিকেন ক্যাটরিনার পরে। আমি হ্যারিকেন খুব ভয় পাই। এয়ারফোর্সে চাকুরী করি না, আমার স্বামীর বিজনেস আছে।
-এখানেও তো টর্ণেডো হয়, তখন কী করো?
-আসলে ক্যাটরিনার দাপটের কাছে এগুলো কিছুই না। তারপরেও টর্ণেডোও ভয় পাই। হা হা হা !
-কিন্তু তোমার স্বামীর বিজনেস করতে অসুবিধা হচ্ছে না?
-আমার স্বামী পেশায় ডাক্তার, সার্জন। এখানে ব্যাপ্টিস্ট হসপিটালে জয়েন করেছে। সেই যে ক্যাটরিনা হওয়ার পর এখানে চলে এসেছিলাম, এরপর থেকে গত ছয় বছর ধরে মিসিসিপিতেই আছি।
-আমার তো মিসিসিপিতে থাকতে ভালো লাগে না, তোমার কী এখানে ভালো লাগে?
-খারাপ লাগে না, প্লাস-মাইনাস ব্যাপার তো সব জায়গাতেই থাকে।
-তোমার স্বামী তো ডাক্তার, তাই যেখানেই যাও চাকুরী বাধাই থাকে। তুমিও কি ডাক্তার?
-না, আমি এখন হাউজ ওয়াইফ। তবে আগে যখন লুসিয়ানা ছিলাম, তখন আমি পোস্টাল সার্ভিসে চাকুরী করতাম।
-তোমার ছেলেমেয়ে আছে?
-হ্যাঁ, এক ছেলে, এক মেয়ে। বড় হয়ে গেছে। ছেলের বয়স ২৭, মেয়ে ২৩। দুজনেই পড়াশোনা করছে।
-তোমাকে দেখে মনেই হয় না, তোমার ছেলের বয়স ২৭। ওরা কেউ কি তোমাদের সাথে থাকে?

-ছেলে থাকে টেক্সাসে, মেয়ে থাকে আমাদের সাথে।
-ওরা দুজনেই তো পড়াশোনা করছে, তা ওদের মধ্যে কেউ কি বাবার প্রফেশান বেছে নিয়েছে?

ডেবোরাহ মুখটা একটু কালো করলো, বললো, না, ওরা কেউ বাবার প্রফেশান বেছে নেয় নি। মেয়েটা এখানের কমিউনিটি কলেজে বিউটিশিয়ান -এর কোর্স প্রায় কম্পলীট করে ফেলছে। ও এখন ‘জেসি পেনী’তে চুল কাটার চাকুরী করছে। এবং সে খুব ভালো চুল কাটে। আর আমার ছেলে পড়ছে অফিস ম্যানেজমেন্ট এর উপর।

আমি মনে মনে একটুও অবাক হই নি। এখানে এটা খুবই কমন একটা ব্যাপার, ডাক্তারের ছেলে ট্রাক ড্রাইভার, প্রফেসারের মেয়ে ফাস্ট ফুডের দোকানে চাকুরী করে। আমার খুব পরিচিত এক ডাক্তার মহিলার স্বামী পেশায় কাঠমিস্ত্রী। শুনে অবাক না হলেও মনের মধ্যে একটু অস্বস্তি হয় ঠিকই। এবার ডেবোরাহ আমাকে প্রশ্ন করলো,

-তোমার কয় ছেলেমেয়ে? তুমি কোন দেশ থেকে এসেছো?

আমার তিন মেয়ে, আমি এসেছি বাংলাদেশ থেকে। বাংলাদেশের নাম শুনেছো?
-ব্যাংলাডেশ?
-হ্যাঁ বাংলাদেশ, ইন্ডিয়ার পাশেই।
-ইন্ডিয়ার নাম শুনেছি।
-ক্যালকাটার নাম শুনেছো? ক্যালকাটার পাশেই বাংলাদেশ।
-আচ্ছা! আগে জানতাম না, এখন জানলাম। তোমার কথা, তোমার পরিবারের কথা শুনে একটাই প্রশ্ন আছে আমার, তুমি এখানে কেনো?

-আমিও ঠিক জানিনা, আমি এখানে কেনো আছি! যে কারণেই এখানে আটকে থাকি না কেনো, এখানে চাকুরী করার সুবাদে আমার অনেক লাভ হয়েছে। আমেরিকানদের লাইফ স্টাইল, ধনী-দরিদ্রদের কালচারে পার্থক্য থেকে শুরু করে অনেক কিছু শিখছি।

-তাছাড়া, এখান থেকে বাড়ী ফিরে গেলে নিশ্চয়ই মাথায় কাজের কথা থাকে না। আমার স্বামী তো হসপিটাল থেকে ফিরেও রোগী আর ওষুধের কথাই ভাবতে থাকে। আমি যখন পোস্টাল সার্ভিসে চাকুরী করতাম, যতক্ষণ কাজে থাকতাম, ততক্ষণই কাজের কথা মাথায় থাকতো, বাড়ী ফিরতাম মুক্ত মনে।
-আচ্ছা, খুব ব্যক্তিগত প্রশ্ন হয়ে যাচ্ছে, তবুও প্রশ্নটি করছি। তোমার ছেলে বা মেয়ে, দুজনেই অনেক বিত্ত বৈভবের মধ্যে বড় হয়েছে, কিন্তু ওরা নিজেদের ক্যারিয়ারের ব্যাপারে তেমন একটা ——-

-জানিনা, ওদের এমন কর্মকান্ডে আমি আপসেট, তবুও ওদের জীবন ওদের, ওরা যদি মনে করে মানুষের চুল কেটে জীবন পার করবে, আমি কী করতে পারি বলো!

এর মধ্যেই আমার কাজ শেষ, তিনটি আই ফোনই রেডী। ডেবোরাহ কাগজপত্রে সাইন করলো, আমিও সাইন করে তাকে ধন্যবাদসহ বিদায় জানালাম।

এরপরেই আমি টি-ব্রেকে চলে গেলাম। ব্রেকরুমে তখন বেশ কয়েকজন এসোসিয়েট একসাথে বসে কফি খাচ্ছিল। তাদের মধ্যে ফিলিস নামের এক কালো মহিলা ছিল। ফিলিসকে আমি দারুণ পছন্দ করি। কারণ ওর কথা বলার স্টাইল আমার খুব ভালো লাগে। আমি মানুষের সাথে কথা বলতে পছন্দ করি, তবে কারো কারো সাথে কথা বলার চেয়ে তাদের কথা শুনতে আরও অনেক বেশী পছন্দ করি। ফিলিস হচ্ছে দ্বিতীয় দলের। ফিলিসের মুখ থেকে আমি যতখানি শুনেছি, তার প্রতি আমার ভালোবাসা আরও বেড়ে গেছে। আমার মেয়েরা আমাকে প্রায়ই ‘রেসিস্ট’ বলে, কারণ বাড়ী ফিরেই আমি কালোদের বকতে থাকি। আমার মেয়েরা ভাবে, আমি কালোদের সহ্য করতে পারি না। ওরা এখনও বোঝে না, আমি কালোদের কান্ডকীর্তি দেখে বেশী মনঃক্ষুন্ন হই। কালোরা যেনো পণ করেই মাঠে নেমেছে যে ওরা স্কুলের গন্ডীও পেরোবে না, মেয়েরা তের-চৌদ্দ বছর বয়সেই ‘মা’ হয়ে যাবে, কিশোরী মা সরকারের কাছ থেকে এইড পাবে, দুই দিন পর পর বয়ফ্রেন্ড বদলাবে, পড়ালেখার পেছনে এক পয়সাও খরচ না করে জাংক ফুড, মাথার পরচুলা, চুলের জেল, আঙুলের নকল নখ, হাজারো রকমের গয়না বাবদ সমস্ত পয়সা খরচ করবে। আমি এগুলো সহ্যই করতে পারি না। আমার মেয়েরা আমাকে সেই আদ্যিকালের ‘দাসপ্রথা’র কুফল সম্পর্কে জ্ঞানদান করে থাকে। আমি তখনই মিস ফিলিসের গল্প শুনিয়ে দেই।

ফিলিসের পুরো নাম ফিলিস জনসন। ওয়ালমার্ট সুপার সেন্টারের একজন বয়স্ক এসোসিয়েট, ‘ক্যাশিয়ার’ পজিশানে গত চব্বিশ বছর ধরে বহাল তবিয়তে চাকুরী করে যাচ্ছে। আগামী মাসেই তার বয়স ষাট পূর্ণ হবে। তার চেহারার মধ্যে আমেরিকান ইন্ডিয়ান (রেড ইন্ডিয়ান) ছাপ আছে, কারণ তার নানী ছিল আমেরিকান ইন্ডিয়ান। তার নানীর ছিল ১৭টি ছেলেমেয়ে, আর তার মায়ের ছিল ১০টি ছেলেমেয়ে। ফিলিসের চেহারায় আমেরিকান ইন্ডিয়ান ছাপ থাকলেও তার মা ছিলেন অসামান্যা সুন্দরী। মায়ের একখানা ছবি দেখিয়েছে ফিলিস, ‘মেরিলিন মনরো’ বলে ভ্রম হয়! ফিলিসের বয়স যখন ১৭, তার লাং ক্যানসার ধরা পড়ে। বাম দিকের ফুসফুস পুরোটা কেটে বাদ দিতে হয়েছে। ১৭ বছর বয়স থেকে সে একটি ফুসফুসের উপর বেঁচে আছে। ব্র্যান্ডন নামের এক লোকের সাথে ফিলিসের বিয়ে হয়েছিল। ওদের ঘরে তিনটি ছেলেমেয়ে আছে। ছেলে সবার বড়, তারপর দুই মেয়ে। ছেলের বয়স যখন মাত্র ১২ বছর, স্বামীর সাথে ফিলিসের ডিভোর্স হয়ে যায়। সেও ২৫ বছর আগের কথা। ডিভোর্সের পরেই ফিলিস ওয়ালমার্টে চাকুরীটা নেয়। তিনটি ছেলেমেয়ের কাস্টডি ফিলিস পেয়ে যায়।

ছেলে পাবলিক স্কুলে ক্লাস টেনে পড়ে, একদিন স্কুলের টিচার ফিলিসকে ডেকে বলেন, মেধাবী ছেলেকে ম্যাথস এন্ড সায়েন্স স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতে। মিসিসিপিতে ম্যাথস এন্ড সায়েন্স স্কুল নামে সম্পূর্ণ সরকারী অনুদানে পরিচালিত একটি স্কুল আছে, যেখানে মিসিসিপির যে কোন প্রান্ত থেকে শুধুমাত্র ‘গিফটেড চিলড্রেন’ রা অ্যাপ্লাই করতে পারে। চান্স পেলে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণী, এই দু’বছর হোস্টেলে ফ্রী থাকা খাওয়া, ফ্রী স্কুলিংসহ স্পেশ্যাল কেয়ার নেয়া হয়। এবং এই স্কুল থেকে পাশ করা ছেলেমেয়েদেরকে সমীহের চোখে দেখা হয়ে থাকে। ( আমার মেজো মেয়েটি এই স্কুল থেকে আউটস্ট্যান্ডিং রেজাল্ট করেছে)। ফিলিসের ছেলেটি এই স্কুলে ভর্তি হয়ে গেলো। সেই ছেলে ছিল ঐ স্কুলের প্রথম ব্যাচে গ্র্যাজুয়েট। ঐ স্কুলে ভর্তি করে দেয়ার পর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয় নি। শেষ পর্যন্ত ফিলিসের ছেলে ল’স্কুল থেকে পাশ করে ল’ইয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। ছেলের বৌ অ্যালাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করে। একটি মাত্র মেয়ে ওদের, প্রাইভেট স্কুলে পড়ে। একটি সফল ফ্যামিলি।

ফিলিসের দুই মেয়ের মধ্যে এক মেয়ে কর্পোরেট অফিসের সিনিয়র অফিসার, আর আরেক মেয়ে রেজিস্টার্ড নার্স। তাদেরও ভালো ঘরে বরে বিয়ে হয়েছে। এক মেয়ের জামাইকে ফিলিস পছন্দ করে না। কারণ, জামাই নাকি খুব বেশী ডোমিনেটিং। নিজের স্বামীর সাথে ডিভোর্স হয়ে গেছে শুধুমাত্র স্বামীর প্রচন্ড ডোমিনেটিং স্বভাবের কারণে, অথচ মেয়ে কী সুন্দর মানিয়ে চলছে! এই হচ্ছে একজন সফল কালো রমণীর গল্প। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ছেলেমেয়েরা ওয়ালমার্টের চাকুরী ছেড়ে দিতে বলে কিনা। জবাবে সে বলেছে, ” প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে ওরা আমাকে বলছে এই চাকুরী ছেড়ে দিতে। কিন্তু আমি ছাড়ছি না। গত চব্বিশ বছর ধরে আমি ওয়ালমার্টে চাকুরী করছি। আজ আমার ছেলেমেয়েরা সবাই প্রতিষ্ঠিত, সফল। তাই ওরা আমাকে চাকুরী ছেড়ে দিতে বলে। কিন্তু আমার দূর্দিনে এই ওয়ালমার্ট আমাকে চাকুরী দিয়ে প্রাণে বাঁচিয়েছিল। আমার কোন শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল না, তারপরেও ওয়ালমার্ট আমাকে ‘ক্যাশিয়ার’ পজিশনে চাকুরী দিয়েছে, যতদিন আমার দেহে শক্তি থাকবে , আমি ওয়ালমার্টের চাকুরী করে যাব। আমার এক ফুসফুসের উপর ভরসা করে চলতে হয়, সারাজীবন ওষুধের উপর চলতে হয়, ওয়ালমার্টের হেলথ ইনসিওরেন্সের উপর আমার যত ভরসা। আমি চাকুরী ছেড়ে দিয়ে ছেলে বা মেয়ের সংসারে বোঝা হতে চাই না। এই ভালো, আমি নিজের মত করে আছি, দুই চোখ ভরে দেখে গেলাম, ছেলেমেয়েদের সাফল্য, এক ফুসফুস নিয়েও আমি বেঁচে ছিলাম, ওদের সাফল্য দেখার জন্য। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ!