ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

এ বছর আমেরিকায় শীতকালটা কেমন যেনো ম্যাড়ম্যাড়ে লাগছে। কোথাও কোন ঊচ্ছ্বাস দেখছি না। উচ্ছ্বাস মানে, শীতকালে যখন তখন আকাশ থেকে স্নো পড়বে, একটানা কয়েকদিন স্নো পড়ে বরফের পাহাড় তৈরী হবে, বাচ্চারা সেই পাহাড় ভেঙ্গে স্নোম্যান বানাবে, স্নো বল দিয়ে একে অপরের গায়ে ঢিল ছুঁরবে, হাসতে হাসতে লুটিয়ে পরবে, আর পড়বি তো পড় স্নোয়ের পাহাড়ের উপরেই পড়বে। সারা গায়ে তুষারশুভ্র নরম বরফের চিহ্ন নিয়ে দুষ্টু বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে থাকবে কয়েক মুহূর্ত, তারপরেই সিদ্ধান্ত নিবে, একইভাবে কাকে ঘায়েল করা যায়! এই তো হবে আমেরিকার শীতকালের গল্প।

এ বছরের শীতে তুষারপাতের পরিবর্তে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। অবিরাম বৃষ্টি, ‘কুকুর-বেড়াল’ বৃষ্টি, মুষলধারে বৃষ্টি, অসহ্য রকমের বৃষ্টি, আর কিছু বলার নেই। হ্যাঁ, একেবারেই যে তুষারপাত হচ্ছে না কোথাও, সেটা সত্যি নয়। হচ্ছে, এরপরেও তুষারপাত হচ্ছে, তবে অন্যান্য বছরের মত হুলুস্থূল ধরণের তুষারপাতের কথা শুনছি না। তেমন হলে আমার স্বামীর মুখ বন্ধ থাকতো না। আমেরিকায় যে কোন কিছু ঘটলেই উনি খুব ঊচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েন। ফলে আমাকে আর কষ্ট করে সিএনএন, এবিসি নিউজ দেখতে হয় না। আমি দেখি চ্যানেল আই, ইটিভি বা এনটিভি সংবাদ। অবশ্য আমার স্বামীও বাংলা চ্যানেল দেখেন, তবে বাংলাদেশের খবরে মারামারি, কাটাকাটি, হত্যা, গুম, ধর্ষণ, র‍্যাব, পুলিশ, মরিচের গুঁড়ো স্প্রে, হরতাল, বিক্ষোভ, মন্ত্রী, মামলা ছাড়া আর কোন খবর থাকে না। আমার স্বামী এইসব খবরে কোন উৎসাহ পান না। শান্তিপ্রিয় মানুষ উনি, শান্তিতে থাকবেন বলেই তো প্রবাসী জীবন বেছে নিয়েছেন। উনার কাছে মানুষের অবিরাম কান্নার চেয়ে আকাশের কান্না অনেক বেশী স্বস্তিদায়ক মনে হয়। আমার কাছে অবশ্য দুইই সমান। মানুষ কাঁদলেও যা, প্রকৃতি কাঁদলেও তা। মানুষের দুঃখেই তো প্রকৃতি কাঁদে। এ জন্যই বোধ হয়, এবছর শীতকালে তুষারবৃষ্টি না হয়ে আকাশের চোখ থেকে অশ্রুধারা বইছে, শুধু বাংলাদেশেই তো নয়, সারা বিশ্বেই মানুষ হাহাকার করছে, দেশে ধর্ষণের ধুম পড়েছে, আমেরিকাতে শুটিং এর ধুম পড়েছে, প্রায়ই শোনা যাচ্ছে, যেখানে সেখানে বলা নেই কওয়া নেই আততায়ী ঢুকে পড়ছে, দুড়ুম দুড়ুম গুলী চালিয়ে শিশু, নারী, নরকে মেরে ফেলছে। সবাই যখন দিল্লীর দামিনীকে নিয়ে শোকে মুহ্যমান, নিউইয়র্কের টিউব স্টেশানে ট্রেনের জন্য অপেক্ষমান বাঙ্গালী ভদ্রলোককে এক স্প্যানিশ মহিলা ধাক্কা মেরে ট্রেন লাইনের উপর ফেলে দিয়ে ট্রেনের চাকায় পিষ্ট করেছে। তা এত অঘটনের মধ্যে আকাশের কী দায় পড়েছে পৃথিবীর বুকে তুষার ঝরিয়ে দৃষ্টিনন্দন ছবি তৈরী করার, তার চেয়ে এই ভালো, হাঁড়াকাঁপানো শীতের মধ্যে বৃষ্টি ঝরিয়ে শয়তান হয়ে উঠা মানুষের দাঁতে দাঁত কপাটি লাগিয়ে দিচ্ছে। উফ! একেবারে ল্যাজে গোবরে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কাজে বের হতে গিয়ে এক গোছা গরম কাপড় তো পড়তেই হয়, তার উপর ছাতা, বর্ষাতি হাতে বহন করতে হলে, কাহাতক ভালো লাগে। শরীরের ওজন, তিন পরত পোষাকের ওজন, ছাতার ঝামেলা, সব মিলিয়ে রাগ গিয়ে পড়ে বৃষ্টির উপর। এমনতো নয় যে, ঝুম বৃষ্টিতে ঘরে বসে গরম গরম চা আর মুড়িভাজা খাবো, তেমন হলে বৃষ্টিকে স্বাগত জানাতাম। শীতকালের বৃষ্টিকে আর সহ্য করতে পারছিলাম না।

আমার মনের কোমল দিকগুলো যখন অসাড় হয়ে যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে অন্ধকার ভোরে ঘরের টেলিফোন বেজে উঠেছে। আমি রাত জাগতে পারি, কিন্তু ভোরে কখনও ঘুম থেকে উঠতে পারি না। শত হল্লা চীৎকারেও ঘুম ভাঙ্গতে চায় না, এ আমার ছোটবেলার অভ্যেস। তাই ফোন রিং শুনেও গা করিনি, জানি, পরিবারের একমাত্র আর্লি রাইজার মানুষটি উঠেই ফোন ধরবে। উনিই ধরেছিলেন ফোন, কী যেনো আধো আধো কথা কানে আসছিল, ভাবছিলাম, মধ্যিরাতে ফোন এসেছে, কোন দুঃসংবাদ হতে পারে! মায়ের হঠাৎ মৃত্যুর পর আর কোন দুঃসংবাদকেই ভয় পাই না।

জিজ্ঞেস করি, কে ফোন করলো?

জবাব এলো, গুড্ডুর স্কুল থেকে কল এসেছে।

মাঝরাত্তিরে স্কুল থেকে ফোন এসেছে কেনো?

-এখন রাত্তির নেই, সকাল ছয়টা বাজে।

-কী ব্যাপার, স্কুল বন্ধ?

-নাহ! ডীলে স্কুল।

আমি আবার ঘুম দিলাম, স্কুল ডীলে হলেই কী, আর বন্ধ হলেই বা কী, আমাকে তো আর স্কুলে যেতে হচ্ছে না! দুই ঘন্টা বাদেই যথা সময়ে ঘুম ভাঙ্গলো পাশের রুমে খটর খটর শব্দ শুনে। গলা উঁচিয়ে ডাকি,

-মিথীলা, এই মিথীলা!!

-কী হয়েছে!

-তুই স্কুলে যাস নি? ডীলে মানে কয় ঘন্টা ডিলে? কখন শুরু হবে স্কুল?

-গলায় উচ্ছ্বাস তুলে মিথীলা বলে, আজকে স্কুল বন্ধ, গোলাপ ফুলের গন্ধ। ( এই পংক্তি আমার কাছ থেকে শিখেছে)।

-একেবারে বন্ধই করে দিয়েছে! কী ব্যাপার!

-একটু একটু স্নো পড়ছে। তাই স্কুল বন্ধ, পাপার ইউনিভার্সিটিও বন্ধ। আমি এখন আবার ঘুমাতে যাব।

-ঘুমাতে যাবি মানে!

-স্কুল নেই তো কী করবো, একটু আরাম করে ঘুমাই। বারোটার সময় উঠবো।

-মাথা খারাপ! স্নো দ্যাখ, ছবি তুলে রাখ, আমার লেখার জন্য ছবি দরকার। ছবি তোলা শেষ হলে আমাদেরকে চা খাওয়া।

-মা!! তুমি বলার আগেই আমি ছবি তুলে রেখেছি, জানি তো, ঘুম থেকে উঠেই তুমি ছবি তোলার কথা বলবে। হা হা হা হা

-এবার তাহলে চা খাওয়া। ভালো কথা, স্নো পড়ছে, এই রকম একটা শট নিতে পেরেছিস?

-হি হি হি! চেষ্টা করেছি, জানিনা কেমন উঠেছে। এখন আবার তুলে দেই। এই স্নো তো অন্য সময়ের মত না, বাগানে কিছুই জমেনি, স্নোম্যান বানানো যাবে না।

-থাক, তুই এখন বড় হয়ে যাচ্ছিস, স্নোম্যান বানাতে হবে না, আসল ম্যানদের যন্ত্রণায় স্নোম্যান উধাও হয়ে গেছে।

-কী বলছো, কিছুই বুঝি না।

-থাক, এখন বুঝতে হবে না। একটু চা খাওয়া, বিছানায় বসে লেপ মুড়ি দিয়ে চা খাই, তারপরেই তো ছুটতে হবে ওয়ালমার্টে, সুখের পরে দুঃখ।

-আমাদের স্কুল বন্ধ, পাপার ইউনিভার্সিটি বন্ধ, ওয়ালমার্ট বন্ধ হলে অনেক ভালো হতো।

-হা হা হা হা!!! এই ‘ছ্যাপ’ এর মত স্নো পড়ছে, তাতে দুনিয়া বন্ধ করে দিতে হবে?

-ছ্যাপ কি?

-থুতুর আরেক নাম ‘ছ্যাপ’!

-মা!! তুমি কী সব উইয়ার্ড কথা বল!!

-তুই বুঝবি কি! ওয়েস্ট ভার্জিনিয়াতে যখন ছিলাম, তখন দেখেছি সত্যিকারের তুষারপাত। বীরের বেশে আসতো তুষারঝড়! কী সুন্দর দৃশ্য! আহ! আমাদের ঘর, রাস্তার গাড়ী সব ডুবে যেতো হাঁটুর উপর বরফে। রাতের আকাশের দিকে তাকালেই মনে হতো স্টেডিয়ামে ফ্লাড লাইট জ্বলছে, পাতা ঝরা গাছের ডালে বরফের থোকা ঝুলতো, কী যে সুন্দর সেই দৃশ্য! মনে আছে, যেদিন প্রথমবার হেভী স্নো হলো, বিকেলবেলা সব বাচ্চারা রাস্তার উপর হুটোপুটি খাচ্ছিল, আমি এই প্রথম দেখলাম স্নো কী জিনিস! তোর পাপা তো কানাডাতে থাকতেই স্নো দেখেছে, সে থাকতোই স্নো এর দেশে, আমি তো দেখিনি। মিশা তোকে নিয়ে ঘরের বাইরে গিয়ে অন্য বাচ্চাদের সাথে মিশে গেলো। তোকে কানমাথা ঢাকা গোলাপী জ্যাকেট পরিয়েছিল। তোরা যখন বাইরে খেলছিলি, আমার তখন ইচ্ছে করছিল, বাইরে গিয়ে স্নোএর উপর গড়াগড়ি খাই। মিশা ছোট হলেও আমার মনের গোপন ইচ্ছেগুলো টের পেতো। ও ঘরে এসে আমাকে বলেছিল, পাপাকে সাথে নিয়ে বাইরে আসতে। আমি তোর পাপাকে বলেছিলাম, ” চল না, আমরা স্নোএর রাস্তা হেঁটে আসি'”। তোর পাপা আমাকে নিয়ে বের হয়েছিল। তোরা ঘরের সামনে খেলছিলি, আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। মিশা আমাকে ডেকে বলেছিল,

-মা, আমি আর দিদিসোনা ‘কনি’কে দেখে রাখবো, তুমি বাবাকে নিয়ে অনেকদূর চলে যাও।

আমি স্নোয়ের ভেতর ঢুকে যাচ্ছিলাম, এর আগে কখনও হাঁটিনি তো, তোর পাপা বারবার বলছিল, সাবধানে পা ফেলতে, পড়ে যাবার ভয় আছে। আমি তো শুকনো রাস্তাতেই কতবার পড়ে যাই। আমি তোর পাপাকে বললাম,

-আমার হাতটা ধরো, এখানে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই, আমি তোমার বউ, অন্যদের দিকে তাকিয়ে দেখো, এরা অনেকেই স্বামী-স্ত্রী না, কিন্তু কী সুন্দর হাত ধরাধরি করে হাঁটছে! তুমিও আমার হাত ধরো।

-হা হা হা হা! মা তুমি যে কি বলো না, পাপা কী হাত ধরেছে?

-অবশ্যই ধরেছে, আমি যা বলবো, তা মানতেই হবে, হাত ধরে তোর পাপা আমাকে অনেকদূর পর্যন্ত নিয়ে গেছে, কানাডার গল্প করেছে, কত মানুষ স্নোএর মধ্যে হাঁটতে গিয়ে পড়ে কোমড় ভেঙ্গেছে, হা হা হা হা! অমন সুন্দর মুহূর্তে তোর পাপার মাথায় কোমর ভাঙ্গার ভয় ঢুকেছে! হা হা হা হা!

-হি হি হি! আমার সব কথা মনে আছে মা, আমরা স্নোম্যান বানাতাম, মিয়া আমার জন্য স্লেজ গাড়ী বানিয়েছিল, আমাকে সেইটাতে বসিয়ে পাহাড়ের স্লোপ দিয়ে টেনে নামাতো, আমাদের নেইবার সারাহ আসতো আমাদের সাথে খেলতে, কিন্তু সারাহ অনেক মোটা ছিল, মিয়ার অনেক কষ্ট হতো ওকে নামাতে।

-তোর কী মনে আছে, মিশা আর মৌটুসী শাবল দিয়ে রাস্তার স্নো পরিষ্কার করতো! ওরা এত পছন্দ করতো স্নো পরিষ্কারের কাজ যে আমাদের নেইবারদের ঘরের সামনের রাস্তাও পরিষ্কার করে দিত। একদিন পাশের বাড়ীর মোটামোটি মিশাকে দুই ডলার দিতে চেয়েছিল। মিশা তো অবাক হয়ে গেছে, বার বার বলছিল, ” না না, পয়সা দিচ্ছো কেনো, আমার কাছে খুব ভালো লাগে স্নো পরিষ্কার করতে, তাই তোমাদের রাস্তাটাও পরিষ্কার করে দিচ্ছি।” মোটি বলেছিল, ” এখানে সবাই পয়সার বিনিময়ে কাজ করে। তুমি স্নো পরিষ্কার করেছো, এটা তোমার পারিশ্রমিক” বলে জোর করে মিশার হাতে ডলার গুঁজে দিয়েছিল।

-মোটি কার নাম ছিল? সারাহর মায়ের নাম?

-মোটি কারও নাম না, সারাহর মায়ের নাম ক্যারেন। আমি বলছি অন্য লেডীর কথা। তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই পাহাড়ের মত মোটা ছিল।

-হ্যাঁ, মনে পড়েছে, আমাদের পাশের বাড়ীর নেইবার, কিন্তু মা তুমি মীন হচ্ছো কেনো? মোটামোটি বলছো কেনো ওদেরকে?

-হা হা হা ! আমি মীন হচ্ছি না, বাংলাদেশের মানুষ এভাবেই কথা বলে। আমি তো তাও শুদ্ধভাবে বলেছি মোটামোটি, দেশে থাকলে বলতাম, ‘মোটকা মুটকী’! শোন, সব কিছু জেনে রাখা ভালো। আমি চাই তোরা দেশে যাবি, দেশে গেলে ভালো-মন্দ সবই দেখবি, শুধু ভালোটুকু শিখলে এখনকার দুনিয়ায় চলতে পারবি না। তোরা মন্দ হইস না, কিন্তু মন্দকে চিনে রাখা ভালো, তাহলে মন্দকে এভয়েড করতে পারবি।

-মা, এবার থামো, আজকে তোমার মাথাটা একটু গন্ডগোল হয়ে গেছে ( এইসব শব্দ আমার কাছ থেকে শেখা)।

-হুম, বড়ই সুখের দিন ছিল। সেই স্নোয়ের সাথে আজকের এই স্নো কে যদি কমপ্যায়ার করি, তুইই বল, এটাকে কী ‘ছ্যাপ’ বলতে পারি না?

—হাহাহাহাহহা! বলো, তবে আর কোন সুন্দর ওয়ার্ড নেই?

না, আমাদের বাংলা ভাষায় শুধু সুন্দরকেই সুন্দর বলা যায়, অসুন্দর বা কুৎসিতকে ভদ্রতার খাতিরেও সুন্দর ব্লা যায় না, তাহলে সুন্দরের অপমান হয়। যাহ! এবার রেডি হতে হবে আমাকে। তোরা ‘ছ্যাপ’ স্নো এনজয় কর, আমি কাজে বেরিয়ে যাই।