ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

আজ আমাদের মিথীলা ওর বন্ধু জোয়ির বাড়ীতে হ্যাং আউট করতে গেলো। এটাই ওর প্রথম হ্যাং আউট। বাড়ীটা একেবারে ফাঁকা লাগছে, ঘরে দুই বুড়ো বুড়ী। এটাই আমাদের জীবনে প্রথম একা হয়ে যাওয়া। একদিন না একদিন তো ঘর ফাঁকা হবেই। দুই মেয়ে অনেক আগেই ঘরের বাইরে, হোস্টেলে থাকে, বাকী শুধু মিথীলা, আর কয়েক বছর পরে ওকেও হোস্টেল বা ডর্মে চলে যেতে হবে। তখন আমাদের দু’জনের প্রকৃত দাম্পত্যকাল শুরু হবে। হয়তো সারাদিন খুনসুটি করবো এবং অনেক বেশী কাছাকাছি আসবো, নয়তো সারাদিন খিটিমিটি ঝগড়া করবো এবং নিজেদের মাঝে অনেক দূরত্ব তৈরী করবো। কোনটা হবে জানিনা, তবে আজ খুব একা লাগছে।

মিথীলা আমাদের তৃতীয়া কন্যা, আরও শুদ্ধ বাংলায় কনিষ্ঠা কন্যাও বলা যায়। তারচেয়ে বেশী শ্রুতিমধুর লাগে, যখন বলি, ও আমাদের ছোট মেয়ে। ছোট মেয়ে মানে, ছোট মেয়েই। বয়স গুণে বলা যায়, ও বালিকাকাল পার করে কৈশোরে পা দিয়েছে, অর্থাৎ তের বছর বয়স হলো। অথচ মিথীলাকে আমরা কেউই কৈশোরের স্বীকৃতি দিতে নারাজ। ওকে সেই ছোটবেলার গাপুলু গুপুলু মিথীলা করেই রেখেছি। এখনও ওর দিদিরা ওকে হরেক নামে ডাকে। একজন ডাকে ‘ঝনিল’, আরেকজন ডাকে ‘কনি’। মাঝে মাঝে ‘ঝনিল’ থেকে ‘টনি’ হয়ে যায় আর ‘কনি’ থেকে হয়ে যায় ‘কন’ । শুধু কী দিদিরা, মিথীলার পাপা ডাকে আরেক নামে, আমি অবশ্য মিথীলা’ ডাকি। এত কথা বলার একটাই অর্থ, মিথীলা এখনও আমাদের কাছে সেই ছোটটিই আছে।

এই যে মিথীলাকে আমরা ছোটটি করে রেখেছি, এটা কী মিথীলার জন্য সুখকর কিছু? অবশ্যই না। এদেশে জন্মের পর ড্যাডি, মাম্মি শিখেই ‘বয়ফ্রেন্ড’, গার্ল ফ্রেন্ড’ শিখতে শুরু করে বাচ্চারা। এটা সর্বাংশে সত্যি না হলেও মোটামুটি সত্যিই ধরে নেয়া যায়। দেখছি তো আশপাশ, চারিপাশ। তবে এ নিয়ে আমার কোন অভিযোগ নেই, যস্মিন দেশে যদাচার। এটাই এখানের রীতি, এভাবেই ওরা বড় হয়। এই বড় হতে গিয়েই ওরা ‘স্লীপ ওভার’ , হ্যাং আউট’, ‘প্রম’ শিখে এবং খুব এনজয় করে। বড় হয়ে যাওয়ার পর ছেলেবেলার এই আনন্দময় দিনগুলো নিয়ে খুব গৌরব করে। প্রায়ই বাচ্চার মা বাবা কে বলতে শোনা যায়, আজ আমার ছেলে ওর বন্ধুর বাড়ীতে স্লীপ ওভার করছে অথবা বলবে ‘ এই তো আমার মেয়ে বের হয়েছে বন্ধুদের সাথে হ্যাং আউট করতে।

মোটামুটি ছোট অবস্থাতেই তিন মেয়েকে এদেশে এনেছি। বড়মেয়ের বয়স ছিল চৌদ্দ, মেজো দশ এবং ছোট দুই বছর। এর আগে আমরা অস্ট্রেলিয়াতে থেকেছি দুই মেয়েকে নিয়ে। বিদেশে থাকলেও বাচ্চারা ছোট ছিল এবং আমার মধ্যে ‘স্বদেশীভাব’ খুব বেশী ছিল যা মোটেও সুস্থতার লক্ষ্মণ ছিল না। অস্ট্রেলিয়াতে থাকাকালীণ সময়টুকুতে শুধুই বাঙ্গালীদের সাথে মিশেছি, বাচ্চারা নষ্ট হয়ে যাবে ভয়ে বিদেশীদের ধারে কাছেও যেতাম না। মেয়েরা স্কুল থেকে ফিরলেই বাঙ্গালীপনা শুরু করে দিতাম, ভাবখানা এমন ছিল যেনো দিনের সাত ঘন্টা সাহেবের বাচ্চাদের সাথে থেকে নিশ্চয়ই উল্টোপাল্টা শিখে এসেছে। সাথে সাথে বাংলা থেরাপী না দিলে এরা আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে। আসলে ছোটবেলা থেকেই এক ধরণের ভুল শিক্ষা পেয়ে আমরা বড় হয়েছি, একতরফাভাবে শিখেছি, আমাদের দেশের মানুষরাই জগত শ্রেষ্ঠ, আমাদের সংস্কৃতিই জগৎসেরা, বাকী সব ‘নষ্ট মানুষ’, গায়ের চামড়া সাদা হলেই তারা ‘ সাহেব-মেম’ আর সাহেব মেম মানেই ‘ চুমোচুমি’, ‘মেম’ মানেই প্রায় ‘লেংটো’ হয়ে থাকা জাতীয় উদ্ভট সব ধারণা, এবং আমি বাজী রেখে বলতে পারি, এখনও আমাদের দেশের অনেকের মনে এই ধারণাগুলো বদ্ধমূল হয়ে আছে। তাই অস্ট্রেলিয়া থেকে আমি নতুন কিছুই শিখে আসিনি। নতুন পাঠ নিতে শুরু করেছি আমেরিকা আসার পর থেকে।

প্রথম প্রথম আমি হ্যাং আউট আর হ্যাং ওভার কে গুলিয়ে ফেলতাম। ‘প্রম’ ব্যাপারটি সম্পর্কে তো কোন ধারণাই ছিল না। এই শব্দগুলো শিখেছি আমার মেয়েদের কাছ থেকে। আমার মেয়েগুলোকে যেটাই জিজ্ঞেস করি না কেনো, ওরা খুব ভালোভাবে আমাকে তা বুঝিয়ে বলে দেয়। কাজটি ওরা নিজেদের স্বার্থেই করে থাকে, নাহলে আমি হয়তো অনেক মানুষের মাঝে উদ্ভট কথা বলে ওদেরকে বিপদে ফেলে দেবো, এই কাজটি আমি করি, ঐ যে বলেছি, ছোটবেলা থেকে বিদেশী সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে বড় হয়েছি, তার রেশ তো কিছু থেকে গেছে। এই জন্যই আমি ‘হ্যাং আউট’ আর ‘হ্যাং ওভার’ শব্দদুটোকে গুলিয়ে ফেলি। মেজো মেয়েকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছি ‘হ্যাং আউট’ কথার মানে, আর ‘হ্যাং ওভার’ কথার মানে। এই দুটো টার্মই এখানের ছেলেমেয়েদের বেলায় প্রযোজ্য। ‘হ্যাং আউট’ নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যথা নেই, হ্যাং আউট মানে বন্ধুরা সবাই মিলে কোথাও বসে আড্ডা দেয়া, তা কারো ঘরেই হোক অথবা রাস্তায়ই হোক, নাহলে কলেজ ক্যাম্পাসে বা শপিং মলেও হেটা হতে পারে। আর ‘হ্যাং ওভার’ মানে বেশ কাহিল করা শব্দ, প্রচুর ড্রিংক করলে অনেকের শরীর বিদ্রোহ করে মাঝে মাঝে, সেই বিদ্রোহের লক্ষ্মণগুলোই ‘হ্যাং ওভার’। মোটামুটি বুঝে ফেলেছি। আর ‘প্রম’ ও ভয়ানক কিছু নয়, সারাজীবনের বন্ধুদের সাথে মিলে এক ধরণের নাচানাচি আনন্দোল্লাস! ছেলে-মেয়ে জোড়া বেঁধে নাচ করা, এই নাচ কোন ছোটখাটো ব্যাপার নয়। আমরা পূজা-ঈদে নতুন জামাকাপড় কিনি, এখানের ছেলেমেয়েরা ‘প্রম’ এ যাওয়ার জন্য প্রচুর পয়সা খরচ করে স্বপ্নের ড্রেস তৈরী করায়। বাবা মায়েরা প্রচন্ড উৎসাহ নিয়ে ছেলেমেয়ের জন্য প্রম ড্রেস বানিয়ে দেয়। সবাই চায়, আমার মেয়েটি নাচের জন্য যেনো তার পছন্দের পার্টনার খুঁজে পায়, অথবা আমার ছেলেটিকে যেনো একা না থাকতে হয়, তার পছন্দের রাজকন্যা এসে যেনো তার হাত ধরে। ভবিষ্যতে ঘর-সংসার করতে যাওয়ার আগে জুটি বাছাইয়ের একটু প্র্যাকটিস আর কি!

আমার বড় মেয়েটি খুব সীমিত সংখ্যক বন্ধু নিয়ে চলে, ওর বন্ধুরা সবাই ইনটেলেকচুয়্যাল ধরণের। এটা এখনকার কথা নয়, বড় মেয়ে যখন বাংলাদেশে ওয়াইডব্লিউ স্কুল, শাহীন স্কুল, আগা খান স্কুলে পড়তো, তখনও ওর বন্ধুর সংখ্যা ছিল হাতেগোনা, এবং তাদের সকলেই বেশ গুরুগম্ভীর। গুরুগম্ভীর ছেলেমেয়েরা আর দশজন ছেলেমেয়ের মত হ্যাং আউট, স্লীপ ওভার করে না ( আমার ধারণা)। বড় মেয়ে এদেশে এসে ক্লাস টেনে ভর্তি হয়েছিল। স্কুলে যেতো আর বাড়ী ফিরে লেখাপড়া করতো। নানা কমপীটিশানে অংশগ্রহণ করতো, তার চেয়েও বড় কথা, স্যাট, এসিটি নামক মারাত্মক কমপিটিটিভ পরীক্ষার জন্য প্রিপারেশান নিত। আমিও খুব খুশী থাকতাম, মেয়ে আমার অন্য কোন দিকে মন দেয় না। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার যে শহরে থাকতাম, সেখানে আশেপাশে বাঙ্গালী ছিল না, একটি মাত্র বাঙ্গালী পরিবার ছিল, উনারা ত্রিশ বছর ধরে ঐ শহরে একা বাঙ্গালী হিসেবে থাকতে থাকতে অর্ধেকের বেশী আমেরিকান হয়ে গেছিল। তাদের দুই মেয়ের এদেশেই জন্ম, এদেশেই বড় হওয়া, তারা পুরোপুরি আমেরিকান স্টাইলে বড় হয়েছে। ঐ বাড়ীতেই আমি স্লীপ ওভার, হ্যাং আউট, প্রম শব্দগুলো প্রথম শুনি। স্লীপ ওভারের মানে বুঝি, কোন বন্ধুর বাড়ীতে রাত কাটানো, কিন্তু হ্যাং আউট মানে যে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া, সেটাই গুলিয়ে ফেলতাম কাছাকাছি শব্দ হ্যাং ওভারের ( অতিরিক্ত ড্রিংক করার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া) সাথে। ‘আমার পরিবারে কাউকে তো দেখিনি ‘হ্যাং ওভারের’ ঝামেলায় পড়তে, তাই অনভিজ্ঞ আমি কোন একটা আসরেই হয়তো বলে দিতাম, ওরা হ্যাং ওভার করতে গেছে। আমার দুই মেয়ে দুই দিক থেকে আমাকে বকা দিত, উলটা পালটা কথা বলছি বলে। ভুল বুঝতে পেরে আমি সাথে সাথে ‘সরি’ বলে ফেলতাম।

সেই বাড়ীতেই একদিন বড় মেয়েকে বলতে শুনলাম, ওদের স্কুলের বন্ধুরা সবাই মিলে হ্যাং আউট করবে। তখন ওদের টুয়েলভ ক্লাস শেষ হয়ে যাচ্ছে, সবাই কলেজে চলে যাবে, আর কখনও সবার সাথে হয়তো বা দেখা হবে না, তাই একটা রাত হ্যাং আউট করার পরিকল্পনা ছিল ওদের। ঐ বাড়ীর আন্টির কাছে তো এগুলো জলভাত ব্যাপার, কিন্তু আমার কাছে ছিল পচা ভাতের মত ব্যাপার। ওখানে কিছুই না বলে বাড়ী ফিরে মেয়েকে বলেছি, হ্যাং আউট করতে না যেতে। মেয়ে অবাক চোখে তাকিয়েছে আমার দিকে, এমন অনুরোধ আমি করবো, এটা ওর ধারণার বাইরে ছিল। কারণ, আমি আমার মেয়েকে চিনি, ও খুবই ভাল একটা মেয়ে, কখনও এমন করে কিছু চায়নি, কখনও কোন অবাধ্যতা করেনি, অথচ স্কুল জীবনের শেষের দিকের একটা প্রোগ্রাম, এত এত ছেলেমেয়ে থাকবে, আর ওর মামনি কিনা ওকে যেতে মানা করছে! এমনিতেই ওকে ‘প্রমে’ যেতে দেইনি। ওকে বুঝিয়েছি, ” মামনি, প্রমে গিয়ে ছেলে আর মেয়ে পেয়ার পেয়ার করে নাচে, এটা আমার ভালো লাগে না। হোক বন্ধু, বন্ধু হলেই কী এভাবে পেয়ার পেয়ার করে নাচতে হবে? স্কুল তো আমরাও পাশ করেছি, তাই বলে কী কারো সাথে নেচেছি”? মেয়ে আমার সাথে কোন তর্কে যায়নি, প্রমেও যায় নি। কী মনে হতে মেয়েকে বলেছি, ” আচ্ছা, ঠিক আছে, তোমার বাবা যদি হ্যাং আউট করতে যেতে বলে তো যাও”। মেয়ের বাবা হচ্ছে মেয়েদের সব ব্যাপারেই ‘হ্যাঁ’।

কাজেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেলো, মেয়ে হ্যাং আউটে যাচ্ছে। যেদিন প্রোগ্রাম, সেদিন ও বিকেলে স্কুল থেকে ফিরেই ঘুম দিয়েছে। রাত দশটায় ডেকে দিতে বলেছে। রাত বারোটায় সবাই স্কুলে গিয়ে জড়ো হবে। মেয়ে ঘুমায় আর আমি চিন্তা করি, আমেরিকা হচ্ছে একটা ভয়ানক দেশ। এখানে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েরা ‘প্রম’ নাম দিয়ে জোড়ায় জোড়ায় নাচে, ওরা ছোট বেলা থেকেই প্রেম করে, ওরা অনেক ছোট বেলাতেই বাবা মা হয়ে যায়, এমন এক ভয়ানক দেশে থেকে মেয়েগুলোকে কীভাবে মানুষ করবো? আজকে যদি মেয়েটাকে ওখানে পাঠাই, ও তো এসবের কিছু মাথামুন্ডু বুঝবে না। আমার মেয়েটা অনেক শান্ত শিষ্ট, কে বা কারা ভুলিয়ে ভালিয়ে ওয়াইন খাওয়ায় দেবে, নাহলে খুনও করে ফেলতে পারে। ও মাত্র দুই বছরেই ক্লাসের সেরা স্টুডেন্ট হয়ে গেছে, কারও মনে যদি কোন হিংসে থাকে, দিবে ওকে হাপিস করে! এগুলো ভাবতে ভাবতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, না, মেয়েকে হ্যাং আউট করতে যেতে দেয়া যাবে না। যেই ভাবা সেই কাজ, রাত সাড়ে নয়টার সময় মেয়েকে ঘুম থেকে ডেকে তুলেছি, ” মামনি, ও মামনি, আজকে তুমি যেওনা সোনা, আমার অনেক ভয় করছে। মনে হচ্ছে আজ তুমি গেলে অনেক বড় বিপদের মধ্যে পড়বে”! আমার মেয়ে হয়তো জানতো ওর যাওয়া হবে না, তাই কোন কথা না বলে শুধু ‘আচ্ছা’ বলে পাশ ফিরে শুয়েছে।

পরের দিন ও স্কুল থেকে ফেরার পর ওকে জিজ্ঞেস করেছি, ” কী হয়েছিল মামনি কালকে? কারো কোন বিপদ হয় নি?” মেয়ে বলেছে, ” বিপদ হবে কেনো? এখানে স্কুলে বন্ধুরা প্রায়ই নিজেদের মধ্যে হ্যাং আউট করে, কিছুই হয় না। মামনি শোন, হ্যাং আউটের বাংলা মানে হচ্ছে ‘আড্ডা দেওয়া’। তুমি তোমার বন্ধুদের সাথে আড্ডা দাওনি? এটাও তেমনি ব্যাপার। আমাকে করতে দিলে না ঠিক আছে, কিন্তু মিশার সাথে এমন করো না। আমেরিকাতে নিয়ে এসেছো, সবার সাথে পাল্লা দিয়ে চলতে বলো, ভালো রেজাল্ট করতে বলো অথচ আমাদের মনের আনন্দের দিকটা দেখবে না, এটা কেমন কথা। এখানে কেউ জোর করে কাউকে খারাপ করে দেয় না মামনি। আমরা তো জানি, আমাদের কী করতে হবে, আমরা না চাইলে কেউ আমাদের খারাপ করতে চাইবেনা”। বড় মেয়ে খুব মেপে কথা বলে, আমি বুঝেছি, মেয়ে খুব কষ্ট পেয়েছে, নিশ্চয়ই ওর বন্ধুদের কাছে মাথা হেঁট হয়েছে, কে জানে!

মেয়ের কাছ থেকে এক বড় রকমের শিক্ষা গ্রহণ করলাম। মনের ভেতর থেকে ভয় কে্টে গিয়ে লজ্জা এসে ভর করলো। মেয়েকে ‘সরি’ বললাম, মেয়েটা এমন বোকা, আমার উপর কোন রাগ বা অভিমান রাখলো না।

এরপর যখন মেজো মেয়ের স্কুল শেষের পালা এলো, ততদিনে আমি অনেক শক্ত হয়ে গেছি। তাছাড়া আমার মেজোমেয়ে হয়েছে আমার মত বাদাইম্যা টাইপ। বড় মেয়ের উল্টো। সে সব সময় বন্ধুদের সাথে আড্ডা, হৈ হুল্লোড় কতে ভালোবাসতো। এখন সে ইউনিভার্সিটিতে পড়ে, এখনও তার আড্ডায় কোন কমতি নেই। স্কুলের শেষের সকল অনুষ্ঠানে সে অংশগ্রহণ করেছে, সে প্রমেও গেছে, যখন তখন বন্ধুদের সাথে হ্যাং আউটও করেছে এবং রুমমেটের বাড়ীতে স্লীপ ওভারও করেছে। আমি কিছু বলতাম না, কারণ, মেজো মেয়ে পড়েছে স্কুল ফর দ্য গিফটেড স্টুডেন্টস এ। কাজেই এক ধরনের বিশ্বাস ছিল, গিফটেড স্টুডেন্টরা কখনওই খারাপ কিছু করবে না। বড় মেয়ে ততদিনে বেশ গার্জিয়ান হয়ে উঠেছে। দুই বোনে এমনিতে আড়াআড়ি সম্পর্ক হলেই কি, এসব স্বাধীনতার ব্যাপার হলেই বড় বোন দূর থেকে ছোট বোনের হয়ে ওকালতি করতো। তা মেজো মেয়ের কপালেও খারাপ কিছু ঘটেনি। দিব্যি সুন্দর গটগট করে স্কুল কলেজ পাশ করে ফেললো। কলেজে গিয়ে তো আর চিন্তা নেই, একটা ফোন করে বলে দিত, ” মা, আজকে আমরা সবাই স্বাতীদের বাড়ীতে হ্যাং আউট করছি, অথবা এলিজাবেথের বাড়ীতে স্লীপ ওভার করছি। চিন্তা করো না, আর চিন্তা লাগলে আমাকে ফোন করো”।

এবার আসি মিথীলা প্রসঙ্গে। আগেই বলেছি, মিথীলার বয়স তের হলেও ওকে আমরা এখনো আহ্লাদী করে রেখেছি। তের বছর বয়সে এখানে সবাই দুই তিনবার প্রেম করে ফেলে। মিথীলার সাথে আমি এসব নিয়ে অনেক মজা করি। ও অস্বীকার করে না, তবে বলে, ” মা, আমার বন্ধুদের বাবা মা তোমার মত কড়া। ওরা কেউ প্রেম করে না। আমরা সব সময় পড়াশোনা নিয়ে কথা বলি”। মিথীলার কথা বিশ্বাস না করার কোন কারণ নেই। ও এমনই এক মেয়ে, যার মুখের দিকে তাকালে এখনও মনে হয়, কোন ছল চাতুরী ওর মধ্যে নেই। প্রতিটি মানুষ ওকে এইজন্যই খুব বেশী পছন্দ করে। সেই মিথীলা আজকে ওর বন্ধুর বাড়ী গেলো স্লীপ ওভার করতে। ব্যাপারটি হঠাৎ করেই ঘটে গেলো। আজ সন্ধ্যার শো’তে ওরা সাত আট জন বন্ধু মিলে মুভী দেখতে যাওয়ার প্ল্যান অনেক আগে থেকেই ছিল। বাবা বা মা যার যার ছেলে মেয়েকে মুভী থিয়েটারে পৌঁছে দিবে, তারপর রাত নয়টায় আবার থিয়েটার হল থেকে তুলে নিয়ে আসবে। এদিকে হঠাৎ করে এক বড় ভাইয়ের বাড়ীতে আমাদেরকে ডিনারে ডেকেছে। উনার বাড়ী আমাদের বাড়ী থেকে ত্রিশ মাইল দূরে। সেখানে গেলে মিথীলাকে থিয়েটার থেকে তুলবো কী করে? তাছাড়া ওর মুভী শেষ হবে রাত নয়টায়, এরপর ওকে নিয়ে উনার বাড়ীতে পৌঁছাতে বেজে যাবে রাত দশটা! কী বিপদ! বড় মেয়েকে হ্যাং আউট করতে দেইনি, সেই কষ্ট আমার মেয়ের মনে এখনও রয়ে গেছে, এটা জানি বলেই বাকীদেরকে আর কষ্ট দেই না।

আজকে প্রথমবারের মত মিথীলা বলল, ” মা, আমি যদি আঙ্কলের বাড়ীতে না যাই, তুমি কি রাগ করবে? মুভি দেখা হয়ে গেলে আমি জোয়ীদের বাসায় চলে যাই? ওর সাথে স্লীপ ওভার করতে চাইলে ও অনেক খুশী হবে। ওরা সব সময় স্লীপ ওভার করে, ওরা জানে, তুমি আমাকে স্লীপ ওভার করতে দিবে না, তাই ওরা আমাকে কখনও স্লীপ ওভার করতে বলে না। আজকে আমি স্লীপ ওভার করলে ওরা অনেক অনেক খুশী হবে। জোয়ির মা বাবা আমাকে অনেক ভালোবাসে। ওরাও খুশী হবে। আমি কী ওদের বাড়ীতে থাকতে পারি”? ছোট্ট মিথীলা যদি এভাবে অনুরোধ করে, আমি কীভাবে না করি! আমার বাইরেটা যতই কঠিন দেখাক, হৃদয়টা তো একেবারে কোমল। সহজেই নরম হয়ে যাই। বললাম, ‘ ঠিক আছে, যাও, কিন্তু ভালোভাবে থেকো। আমাকে ফোন করো’।

মিথীলা কী পরিমান খুশী হয়েছে তা বুঝানোর জন্য আমাকে বলল, ” মা, তোমাকে একটা হাগ দেই? মিমি সেদিন বলেছে, তোমাকে হাগ করলে তুমি যদি আমাকে পুশ করো, তাহলে আমিও নাকি তোমাকে একটা পুশ করবো। হা হা হা! “। ( আমাকে মেয়েরা কখনও ‘হাগ’ করলে আমি ওদেরকে হালকা করে ঠেলে দিয়ে বলি, আর ঢং দেখাতে হবে না, যা ভাগ!)

মিমি বেশী পাজী, বড় বোনের বিরুদ্ধে কথা বলে। ( আমার মামাতো বোন টুম্পাকে মিথীলা ‘মিমি; ডাকে)। আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই মিথীলা আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। আমি অবশ্য ওকে ঠেলে দেই নি, শুধু বলেছি, ” হয়েছে, আর ঢং করতে হবে না, যা ভাগ”।