ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

আমাদের ফোন সার্ভিস ডিপার্টমেন্টের পাশেই ইলেকট্রনিক ডিপার্টমেন্ট, অনেকটা গায়ে গায়ে লাগানো প্রতিবেশীর বাড়ীর মত। আমার সাইডে আমরা পাঁচজনই মেয়ে। ইলেকট্রনিকস এ মেয়েদের পাশাপাশি দুই জন ছেলেও কাজ করে, মুলতঃ ঐ দু’জন ছেলেই ইলেকট্রনিক্সের নাড়ী নক্ষত্র জানে।

কাজের সময় আমি বেশী কথা বলি না, অবসরে সবার সাথে গল্প গুজব করি। আমি বাদে বাকী চারটি মেয়ের বয়স তিরিশের নীচে, কিন্তু ইলেকট্রনিক ডিপার্টমেন্টে সকলেই ত্রিশের উপরে বয়স, চল্লিশের উপর বয়সীও আছে দুই তিনজন। ওদের মাঝে আমাকে মনে হয় মঙ্গল গ্রহ থেকে এসেছি। চেহারা, স্বভাব, ভাষা, সংস্কৃতি–সব কিছুতেই আমি ওদের থেকে আলাদা। আমার ইংলিশ উচ্চারণে ওরা খুব মজা পায়, আমিও ওদের প্রশ্রয় দেই। ঠিক আছে করো, মজা করো। মিসিসিপির মানুষের আউটলুক খুব কম, ওরা মিসিসিপির বাইরে কিছু জানে না অথবা জানতেও চায় না। ওরা আমার সব কিছুতেই খুব অবাক হয়, এমনকি যখন শোনে, আমাদের দাম্পত্য জীবনের বয়স সাতাশ বছর, একেবারে চোখ গোল করে ফেলে। একজন মাত্র লোকের সাথে একটানা সাতাশ বছর ধরে কী করে সংসার করছি, এটা নিয়ে ওদের অনেক বিস্ময় আছে মনে। কত রকম প্রশ্ন করে আমাকে, ” কখনও আমার স্বামীর সাথে ঝগড়া হয় কিনা” অথবা স্বামীকে লুকিয়ে আর কোন ছেলের সাথে প্রেম করেছি কিনা অথবা একই মানুষের সাথে ঘর করতে একঘেঁয়ে লাগে কিনা! খুব সরল মনে ওরা আমাকে জিজ্ঞেস করে এসকল কথা। আমিও খুব আনন্দের সাথেই ওদের কথার জবাব দেই। ওরা খুব মজা পায়। আমাকে নিয়ে মজা করলেও আমাকে ওরা ভালোবাসে, আর আমিও যখন ওদের মাঝে থাকি, ওদের মত চলি। কখনও ভেতরের আমিকে প্রকাশ করিনা। ওদের সাথে সাথে হাসি, ওদের সব কথা না বুঝলেও মাথা দুলিয়ে ‘হ্যাঁ’ ‘না’ করে যাই। ওদের সবকথা না বুঝার একটাই কারণ, ওরা সাউদার্ণ ইংলিশ বলে, যা শুদ্ধ ইংলিশ থেকে অনেকটাই আলাদা।।

ইলেকট্রনিকস এ জুলিয়া এবং টেরী নামে দুইজন এসোসিয়েটের সাথে আমার মাঝে মাঝেই পারিবারিক ঘটনা নিয়ে গল্প হয়। দুজনের সাথেই আমার বেশ খাতির আছে। ওরা দুজন আবার নিজেরা ঘনিষ্ঠ বন্ধু। টেরী হোয়াইট, চতুর্থ স্বামীর ঘর করছে, জুলিয়া ব্ল্যাক, একটি ছেলের মা, একা থাকে। এই দুজন আজ আমাকে নিয়ে বসেছে। আজ ছিল রবিবার, বেশ স্লো ছিল পুরোটা দিন। তাই কাজের ফাঁকে গল্প করা গেছে। ওরা জানতে চেয়েছে, আমার অফ ডে কবে। বলেছি, আগামীকাল আমার অফ ডে। সাথে সাথে প্রশ্নঃ

-রীটা, তুমি অফ ডে তে কী করো?
-সারাদিন ফেসবুক করি।
-হোয়াট! সারাদিন ফেসবুক করো? তোমার হাজব্যান্ডকে সময় দাও না?
-হাজব্যান্ড তো ইউনিভার্সিটিতে থাকে, সময় দিতে হলে আমাকে গিয়ে তার অফিসে বসে থাকতে হবে ।

দুজনেই হাসে। আবার জিজ্ঞেস করে,
-তুমি যে সারাদিন ফেসবুকে বসে থাকো, তোমার হাজব্যান্ড কিছু বলে না? স্পায়িং করে না?

এবার আমি হাসি। বলি,
-সাতাশ বছর ধরে সংসার করছি, তোমরাই তো বলো, এক মানুষের সাথে এত বছর ঘর করলে নাকি বোরিং লাগার কথা! হা হা হা! তা আমার হাজব্যান্ডেরও নিশ্চয়ই বোরিং লাগে একমুখ দেখে দেখে। হয়তো ভাবে, যাক গিয়ে, বৌ যদি পারে আর কারো সাথে গুজুর গুজুর করতে, তাহলে আমি বেঁচে যাই ক্যাটক্যাটানির হাত থেকে। থাকুক ব্যস্ত ফেসবুক নিয়ে।

-তুমি কী ঝগড়া করো তোমার হাজব্যান্ডের সাথে?

-না, আমি বা আমার হাজব্যান্ড, কেউই খুব ভালো ঝগড়া করতে পারি না। আমার হাজব্যান্ড তাও মাঝে মাঝে উল্টাপাল্টা কথা বলে ফেলে, আমি একেবারেই বলি না। তবে ইদানিং আমরা যার যার জগত নিয়ে থাকি। আমি থাকি ফেসবুক নিয়ে, আমার হাজব্যান্ড থাকে তার ল্যাপটপ নিয়ে। সে অবশ্য খুব টিভি দেখে, আমি টিভি দেখিনা।

-তোমার ছোট মেয়ে তাহলে অনেক একা হয়ে গেছে না?

-জুলিয়া শোন, আমার ছোট মেয়েটা খুব লক্ষ্মী, ও ছোটবেলা থেকেই খুব ইনডিপেন্ডেন্ট। একটাই দোষ, খুব স্লো। সবই করে, তবে সারা দিনমান লাগিয়ে করে। সেদিন আমার বড় মেয়েও আমাকে বলেছে, ” মামনি, মিথীলার প্রতি একটু নজর দাও। বাবির প্রতি একটু নজর দাও। বাবি কেমন যেনো একা হয়ে যাচ্ছে! আমি বলেছি, ” হুম! বাবির প্রতি নজর দেবো, মিথীলার প্রতি নজর দেবো, তা আমার প্রতি নজর কে দিবে?” মেয়ে বলে, ” এতকাল তো তুমিই সবার দিকে নজর রেখেছো, তাই এটাই সকলের কাছে এক্সপেকটেড হয়ে গেছে”। আমি হেসে বলেছি, ” এক্সকিউজ মি, এতকাল করেছি বলে বাকী কালও করে যেতে হবে, এমন কোন চুক্তিনামা সই করি নি। তোমরা কী করো? তোমরা ফোন করবে বাবাকে, বোনকে। আমি এখন আমার লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকি। এক ফাঁকে রান্না বান্না, বাজার সদাই করি, চাকরী করি, বাকী সময় লেখি।

-রীটা, তোমার হাজব্যান্ড কী খেয়াল করেছে, তোমাকে ইদানিং খুব টায়ার্ড দেখায়? চোখের নীচে কালি পড়ছে!

-আমার হাজব্যান্ড জানে, আমি একটা আস্ত বাদাইম্যা। আমার ঘুমের কোন ঠিক নেই তো। সারারাত কম্পিউটারে বসে থাকি, ভোর চারটার দিকে বেডে যাই, আবার আটটায় উঠে পড়ি। প্রথম প্রথম একটু ভ্যানর ভ্যানর করতো, এখন হাল ছেড়ে দিয়েছে।

-কাল তো মার্টিন লুথার কিং ডে, তোমাদের সকলের ছুটি, কালও তুমি ফেসবুকে থাকবে?
-না, কাল আমি আমাদের অতীতের কিছু সময়কে রি-ওয়াইন্ড করবো।
-মানে? বুঝলাম না।

-শোন, কয়েক বছর আগে আমাদের পরিবারটি ছিল পাঁচ সদস্যের। আমরা পাঁচজনে মিলে অনেক মজা করেছি, অনেক ঘুরেছি। আমাদের কোন বন্ধু না হলেও চলে যেতো। এত বেড়িয়েছি পাঁচজনে যে ব্যাপারটি আমাদের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছিল। এরপর বড় দুই মেয়ে দূরে চলে যেতেই আমরা একা হয়ে গেলাম। তাছাড়া মিড এজ ক্রাইসিস বলে একটা কথা আছে। আমরা হয়তো বা ঐ ক্রাইসিস কাল পার করছি। আমাদের সাথে সাথে আমার ছোট মেয়েটা একটু হলেও সাফার করছে। তবে ওকে নিয়ে আমি চিন্তা করি না।

-কেনো, ওকে নিয়ে চিন্তা করো না কেন?

ওকে আমি সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, ” মিথীলা, সেদিন তোমার দুই দিদি আমাকে বলেছে, তোমার পাপার দিকে একটু খেয়াল করতে, পাপা নাকি একা হয়ে যাচ্ছে। সারাদিন একা থাকে। তুমি তো বলতে গেলে আমেরিকান হয়ে গেছো। আমেরিকানদের কালচার তুমি আমার চেয়েও ভালো জানো। তোমার দৃষ্টিতে বলো তো, তোমার মা-বাবা সম্পর্কে তোমার মূল্যায়ণ কি?

সে বলে, ” মা, আমি একেবারেই আমেরিকান হই নি। সব সময় বাংলা কথা বলি, বাংলা খাবার খাই, আমি আমেরিকান না। তোমরা তো ভালোই আছো, অ্যাট লিস্ট মারামারি তো করো না। একা একা থাকা তো খারাপ কিছু না। আমার বন্ধুদের মা-বাবারা তো অনেক বেশী অন্যরকম। আর দিদিরা ঠিক বলে নি। পাপা একা থাকে কারণ পাপা একা থাকা এনজয় করে। তোমার অনেক কষ্ট, তুমি তো একা থাকতে পারো না, তাই তোমার কষ্ট হচ্ছে। আমি বলি, ” তোমার বন্ধুদের মা বাবারা মারামারি করে”? জবাব দিয়েছে, ” আমার বন্ধুদের মা-বাবা করেনা, তবে এখানে মা-বাবারা ফাইট করে। তোমরা তো মারামারি করো না, জাস্ট একটু একা হয়ে যাচ্ছো, এর চেয়েও তো বেশী খারাপ হতে পারতো।

-তোমার এই ছোট মেয়ে এমন কথা বলেছে? মাই গড, হাউ স্মার্ট সী ইজ!

-শোন, ও আরও বলেছে, ” মা, আমাদের আগের লাইফ অনেক বেশী ভালো ছিল। আমরা সবাই মিলে অনেক বেড়াতাম, আনন্দ করতাম, হোটেলে থাকতাম, অনেক মজা হতো। কিন্তু তখন সবাই ছোট ছিলাম, এখন তো দিদিরা বড় হয়ে গেছে, দূরে চলে গেছে। এখন আর সেই আগের মত আনন্দ হয় না বলেই তোমরা একা হয়ে গেছো। আমার বন্ধু লরেলের মা বাবা ওদেরকে নিয়ে মাঝে মাঝে আউটিং এ যায়। লরেলরা দুই বোন। প্রতি উইকএন্ডে ওরা ওদের বাবা মায়ের সাথে রিভার ওয়াকে যায়। আমরা আগে যেমন খাবার নিয়ে যেতাম সাথে করে, পার্কের বেঞ্চে বসে খেতাম, ওরাও তেমনি করে খায়। কিন্তু তুমি তো রিভার ওয়াকে যেতে চাইবে না। ওখানে সাপ আছে।

আমি বলি, ” বাবারে! আমি মরে গেলেও রিভার ওয়াকে যাবো না মিথীলা। আচ্ছা, লরেল যখন গল্প করে, তোমার কী খুব খারাপ লাগে? তুমি কী কখনও কেঁদেছো আগের জীবনের আনন্দের কথা ভেবে?”

ও বলেছে, ” না, আমি কাঁদিনা। ভাবি, আগের মত থাকতে পারলে ভালো হতো। লরেল তো আমার বয়স, ওর মা বাবা অনেক ইয়াং। তোমরাও যখন অনেক ইয়াং ছিলে, তখনতো লাইফ অনেক অন্যরকম ছিল। কিন্তু সেটা তো আর সম্ভব না, আর কোনদিন হবে না। দিদিরা তো দূরে চলে গেছে। সেজন্য মন খারাপ করি না। তবে এটা বুঝি, পাপা এখন একা থাকতেই বেশী ভালোবাসে। সারাক্ষণ লেখালেখি করে, নাহয় টিভি তো চলেই, বন্ধুর সাথে মুভী দেখতে যায়, নাহলে আঙ্কলের বাড়ী যায়। তোমার তো কিছুই হয় না। তোমার জন্য খারাপ লাগে।

-ওহ! হাউ সুইট! তোমার মেয়ে এত কথা শিখলো কখন? এই তো সেদিন বাবার সাথে আসতো, কত ছোট একটা বাচ্চা।

-আমি ঠিক করেছি, কালকে আমরা সারাদিন বাইরে কাটাবো, ঠিক আগের মত। এখানে একটু ঘুরবো, তারপর চলে যাব স্টার্কভিল, ওখানে দুইটা লেক আছে, দু জায়গাতেই যাব, দুপুরে কোন রেস্টুরেন্টে খাব, বিকেলে কোন বন্ধুর বাড়ী গিয়ে চা খাব, সন্ধ্যায় বাড়ী ফিরবো।

-তোমার হাজব্যান্ড রাজী হয়েছে?

-রাজী না হয়ে যাবে কোথায়? আমি সহজে কিছু চাই না, কিন্তু যদি চাই, সেটা হতেই হবে।

-তোমার মেয়েকে রেখে যাবে?

-আমার মেয়েকে রেখে যাবো কেনো? ওর জন্যই তো বাইরে যাওয়া।

টেরী বললো, না, তোমরা দুজন সময় কাটাতে পারো, তার মধ্যে মেয়েকে ঢুকাবে কেনো?

বললাম, তোমরা তো জানো না, আমাদের মধ্যেকার সম্পর্কটা অন্য রকম। আমার মেয়েরা তাদের বাবা-মায়ের মধ্যেকার খুনসুটি, প্রেম, আহ্লাদীপণা দেখে বড় হয়েছে। আমি ওদের সামনেই আমার বরের সাথে ঢং করি। ছোট থেকে ওদেরকে ওভাবেই বড় করেছি, শিখিয়েছি, তোমরা আমারই দেহের অংশ। আমি যা, তোমরাও তাই। তোমরা আমার বাইরে কেউ নও। কাজেই আমার ছোট মেয়ের সামনেই আমরা সুখ দুঃখের কথা বলতে পারি।

-হাউ সুইট, কী সুন্দর কথা শিখিয়েছো ওদের, ” তোমরা আমার দেহের অংশ, আমি যা, তোমরাও তাই”। রীটা , তোমার সাথে কথা বললে কত মজার কথা শুনি। আমার মেয়েরা আমার কাছে আসবেও না, আর আসলে দড়াম করে পাছায় লাথি মেরে দেবো।

-ছি ছি! টেরী, কী যা তা বলো!

-যা-তা বলিনি, ইট’স ট্রু! তাহলে তো তোমার কিউট বেবীকে সাথে নিয়ে যেতেই হয়।

-হ্যাঁ, সেদিন ও বলেছে, অতীতের মত আবার আনন্দ করতে চায়, অতীতের দিনগুলোকে ফিরে পেতে চায়। কাজেই ওকে অতীতের কিছু মুহূর্ত ফিরিয়ে দিতে চেষ্টা করবো। আমার এই মেয়েটা কেমন সুন্দর করে বিশ্লেষন করে বুঝিয়েছে, তাই ওকে পুরানো দিনের টেপ রি-ওয়াইন্ড করে দিতে চাই। এবং ঠিক করেছি মাঝে মাঝেই এমন আউটিং এ চলে যাব। আমার দুই মেয়ে শুনেও খুব খুশী হবে। ওদের খুব খারাপ লাগে, ছোট বোনের জন্য। আমার নিজের জন্যও একটু আউটিং এর দরকার আছে! দিনগুলো রি-ওয়াইন্ড করতে পারলে আমার হাজব্যান্ডেরও ভালো লাগতে পারে, কী বলো!

-গো অ্যাহেড! মনে হচ্ছে, তোমার কথাই ঠিক। ‘জাস্ট রি-ওয়াইন্ড দ্য টেপ’!! উফ! ভাবতেই পারিনা, তোমার সেই ছোট মেয়ে এত বড় হয়ে গেলো কখন! হাউ সুইট বেবী!