ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

আমি কখনওই দিবানিদ্রা দেই না। তাই দিবা স্বপ্নও দেখি না। রাতে যে কয় ঘন্টা ঘুমাই, খুব নির্ভেজাল, নিশ্চিন্তের ঘুম হয় সেটা। বই পুস্তক পড়ে জেনেছি, গভীর ঘুমে মানুষ স্বপ্ন দেখে খুব কম। কিন্তু আমি গভীর ঘুমেই সারারাত স্বপ্ন দেখি। ঘুম ভাঙ্গেনা, কিন্তু একটার পর একটা স্বপ্ন দেখে যাই। ভাল স্বপ্নই বেশী দেখি, মাঝে মাঝে অর্থহীন অদ্ভুত সব স্বপ্নও দেখি, তবে ভয়ের স্বপ্নও কম দেখি না। সবচেয়ে ভয়ের স্বপ্নগুলো হয় পরীক্ষার হল সংক্রান্ত। বলে রাখা ভাল, পড়ালেখায় আমি সারা জীবন ফাঁকি দিয়েছি। এমন কোন পরীক্ষার কথা আমার মনে পড়ে না যে, মনে খুব আনন্দ নিয়ে পরীক্ষাটা দিতে গেছি। এই জন্যই এই মধ্য বয়সে এসেও পরীক্ষার হলে প্রশ্ন কমন না পড়ার স্বপ্ন দেখে ভয় পাই। তবুও ঘুম ভাঙ্গে না। কিছুক্ষণ পরেই অন্য সিকোয়েন্স চলে আসে। ভাল-মন্দ স্বপ্ন দেখে রাত পার করে দেই। ঘুম ভেঙ্গে যে সমস্ত স্বপ্নগুলোর কথা মনে থাকে, সেগুলো নিয়ে মনে মনে বিশ্লেষণ করা শুরু করি। স্বপ্নটা কেন দেখলাম, স্বপ্নে কোন সংকেত পাচ্ছি কিনা, এই ধরণের আয়েসী কল্পনা করে ঘন্টা দুই পার করে দেই। এটা আর কিছুই না, বার্ধক্যের লক্ষ্মণ!

সূচনাতে এত কথা বলার কোন কারণ ছিল না, বয়সের ভারে বেশী কথা বলার লক্ষ্মণ টের পাচ্ছি। এবার মূল কথায় চলে আসি। কাল রাতেও আমার খুব গভীর ঘুম হয়েছে, অনেক স্বপ্নও দেখেছি। যে স্বপ্ন স্মৃতিতে নিয়ে ঘুম ভেঙ্গেছে, সে হচ্ছে একটি তিমি মাছ। কাল স্বপ্নে তিমি মাছ দেখেছি। তিমি মাছ কেন দেখলাম , জানিনা। বিদেশে রুই মাছই খেতে পাই না, তার আবার তিমি মাছ! আমি তো মাছের কথা ভুলেই যাচ্ছি প্রায়। আটলান্টা, ডালাস থেকে মাছ আনাই, জমিয়ে রাখি, মাসে দুই একদিন মাছ খাই। তাই মাছ নিয়ে আর ভাবিনা, স্বপ্ন দেখার তো প্রশ্নই আসে না। তবুও কেনো তিমি মাছ স্বপ্নে দেখলাম ভাবতে ভাবতেই মনে পড়ে গেলো বর্তমান সময়ের আলোচিত ছবি, ‘ দ্য লাইফ অফ পাই’ এর কথা। এই তো পেয়েছি ক্লু, এই মুভীটার গল্প মাথার ভেতর ঘুরছিল, তাই স্বপ্নে তিমি মাছ দেখেছি।

আমি সিনেমা পাগল নই। ছোটবেলাতে মায়ের সাথে সিনেমা হলে গিয়ে কয়েকটা সিনেমা দেখেছি ঠিকই, সিনেমাগুলো আমাকে দেখানোর জন্য মা আমাকে নিয়ে যেত ভাবাটা ভুল। কোন মা তাঁর পাঁচ বছরের মেয়েকে ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘ আবির্ভাব’, ‘ মোমের আলো’ সিনেমা দেখাতে নিয়ে যায় না, আসলে মা আমাকে সঙ্গী হিসেবে নিয়ে যেতেন। আরও অনেক পরে, যখন আমার কৈশোর, তারুণ্যকাল, পায়ে শাসণের অদৃশ্য শেকল টের পেয়েছি। সিনেমা দেখবো কি, স্কুল, কলেজের বাইরে আর কোথাও বেরোনোরই সুযোগ ছিল না। তারও অনেক পরে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বন্ধুদের সাথে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখেছি, সেটাও বলার মত কিছু নয়। সাভার ক্যান্টনমেন্ট ‘গ্যারিসন’ এ মাঝে মাঝেই ভারতীয় বাংলা সিনেমা চলতো, বিশেষ করে উত্তম কুমার অভিনীত সিনেমা, সেগুলো দেখতাম। বেশীদিন অবশ্য এই স্বাধীনতা ভোগ করা হয় নি, এরশাদ ভ্যাকেশানের কবলে পড়ে সব বাতিল হয়ে গেছিল। এরপর যে দুই একটা সিনেমা দেখেছি, তার একটা ছিল গুলিস্তান সিনেমা হলে। জাহাঙ্গীরনগর থেকে এসেছিলাম চার বন্ধু। সিনেমা শেষ হতেই সন্ধ্যেবেলা রাতের শেষ বাস ধরবো বলে হাঁটা শুরু করেছি, সন্ধ্যে সাড়ে সাতটায় ছিল শেষ বাস, গুলিস্তানের ভীড়ে দ্রুত হাঁটছিলাম, এর চেয়েও দ্রুত গতিতে একটি দুঃসংবাদ চারদিকে গুঞ্জরিত হচ্ছিল, ” ইন্দিরা গান্ধীকে গুলী করে মেরে ফেলেছে”! আমার সঙ্গী বন্ধুদের মনে এই সংবাদ কতখানি প্রভাব ফেলেছিল, জানিনা, তবে আমি জোর ধাক্কা খেয়েছিলাম।

ইন্দিরা গান্ধীর সাথে আমার এক ধরণের আত্মিক বন্ধনের ব্যাপার ছিল। আমার বাবা, আমার সেই ছোটবেলাতেই আমাকে ‘ইন্দিরা গান্ধী’ বানানোর প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। বাবা প্রতি রবিবার আমার কালো কোঁকড়াণো ঝাঁকরা চুলে শ্যাম্পু করিয়ে দিতেন, চুল শুকানোর পরে মাথার চুলে ক্রীম মাখাতেন আর বলতেন, ” মেয়েটারে ইন্দিরা গান্ধী বানাবো। ইন্দিরা গান্ধীর মত ঝাঁকড়া চুলেই ওকে মানাবে, সাহসী আর তেজস্বিনী বানাবো ওকে”। সেই থেকে অদেখা তেজস্বিনী আমার হৃদয়ে বসে ছিলেন। বড় হতে হতে তেজস্বিনীর তেজ আর সাহস দেখে অবাক হয়েছি, বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করেছি এমন এক নারীর আদর্শে আমাকে তৈরী করতে চেয়েছেন বলে। সেই তেজস্বিনীকে তাঁর দেহরক্ষী গুলী করে হত্যা করেছে, এমন সংবাদ শুনলাম সিনেমা হল থেকে বের হয়ে, যাহ! আর সিনেমাই দেখবো না। ব্যস! বন্ধুদের সাথে এরপর আর কোন সিনেমা দেখিনি।

বিয়ের পর মেয়েরা স্বামীর সাথে সিনেমা হলে গিয়ে খুব সিনেমা টিনেমা দেখে, আমি দেখিনি। দেখিনি, কারণ আমি সিনেমা পাগল নই বলে। আমেরিকা এসেছি, তাও প্রায় বারো বছর হতে চলেছে। সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখেছি মাত্র দুইটি। হ্যাঁ, সত্যি কথা বলছি। তাও আবার ছোট মেয়ের পীড়াপিড়িতে ২০০৫ সালে দেখেছি ‘চার্লি এন্ড দ্য চকোলেট ফ্যাক্টরী’ আর ২০১২ তে দেখলাম ‘ দ্য লাইফ অফ পাই’। অদ্ভুত সুন্দর ছবি। দুটি ছবিই দারুণ অ্যাডভেঞ্চারে ঠাসা এবং এর ভেতরেই শিক্ষণীয় এবং দার্শণিক তত্ত্বগুলো খুবই মসৃণভাবে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। ‘দ্য লাইফ অফ পাই’ সিনেমার দার্শণিক তত্ত্বে যাচ্ছি না, অ্যাডভেঞ্চার থেকে একটি ছোট টুকরো বেছে নিচ্ছি। কারণ, এই সিনেমাতেই ‘তিমি’ দেখেছি। ছবির নায়ক কিশোর পাই’ যখন মাঝ সমুদ্রে বাঁচার জন্য সংগ্রাম করছিল, এক পর্যায়ে হঠাৎ করেই সে ‘তিমিমাছ’ দেখতে পায়। তিমিমাছের ডিগবাজির প্রতিক্রিয়ায় ‘পাই’এর লাইফ সেভিং বোটটি তখন ওলট-পালট খাচ্ছিল, অথচ কিশোর ঐ অবস্থায় প্রকৃতির এই বিশাল সৃষ্টিকে দু’চোখ ভরে দেখছিল। আরেকবার ‘পাই’ হঠাৎ করে উড়ন্ত মাছের ঝড়ে পড়েছিল। চারদিক থেকে ছুটে আসা উড়ন্ত মাছগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল, অসীম গতিতে ছুটে আসা অসংখ্য তীর, চক্রাকারে ঘুরছে আর আছড়ে আছড়ে পড়ছে। এই ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যে আত্মরক্ষার নিষ্ফল চেষ্টার পাশাপাশি কিশোর ‘পাই’ সৃষ্টির এই অসম্ভব সৌন্দর্য্যটুকু উপভোগ করতে ছাড়ে নি।

কিশোর ‘পাই’ যা কিছু করেছে, তার সবটুকুই সিনেমা, মোটামুটি অবাস্তব ঘটনা মনে হওয়া স্বাভাবিক। তবে অসম্ভব কিছু নয়, মানুষ পারে না, এমন কোন কাজ নেই। দিল্লীর জ্যোতি বা দামিনী নামের সেই মেয়েটি ‘লাইফ অফ পাই’ দেখেই সিনেমা হল থেকে বের হয়েছিল সেদিন। বাকীটুকু কুৎসিত ইতিহাস হয়ে গেছে। এইসব কথাই ভাবছিলাম বসে বসে। সাথে এও ভাবছিলাম, আমি যদি অমন মাঝ সমুদ্রে পড়ি আর দেখি, পাশ দিয়ে তিমি যাচ্ছে, কেমন হবে ব্যাপারটি! সাঁতার জানিনা, এমন ঘটার সম্ভাবণা একেবারেই নেই, সমুদ্রে নেমে কোমড় জলে দাঁড়িয়ে জলকেলি করি, ওপাশ থেকে বিরাট ঢেউ আসতে দেখলেই ‘ বাবাগো, মাগো’ বলে উলটো দিকে দৌড় দেই। পায়ের নীচের ভেজা বালিতে পা ঢুকে দড়াম করে আছাড় খাই, নোনাজলে নাক-মুখ-গলা ডুবে যায়, ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে নাক ঝাড়ি, খক খক করে কাশতে থাকি, মুখের ভেতর ঢুকে যাওয়া নোনাবালি জল থু থু করে বের করতে করতে আরেক ঢেউয়ের ধাক্কায় দ্বিতীয়বার উলটে পড়ি। সেই আমি বসে বসে কল্পনা করি, ‘পাই’ এর মত অবস্থায় পড়লে আমার কী হবে! সেই কল্পনা থেকেই স্বপ্ন দেখেছি। গভীর ঘুমে ‘তিমি’ মাছ দেখি। স্বপ্ন বিশারদরা হয়তো বলতে পারবেন, ‘তিমি মাছ’ স্বপ্নে দেখলে তিমির মত বিশাল সাইজের সম্পত্তি পাওয়া যাবে নাকি তিমির লেজের ঝাপটা কপালে জুটবে! কোনটা ভাগ্যে আছে জানি না। তবে একটা মজার কাহিণী মনে পড়ে গেছে।

‘৯৬ সালের ডিসেম্বারে আমরা অস্ট্রেলিয়ার সিডনীতে বেড়াতে গেছিলাম। আমরা মানে, আমি, আমার স্বামী, দুই মেয়ে মৌটুসী আর মিশা। আমরা তখন মেলবোর্ণে থাকতাম, সিডণিতে আমাদের এক বন্ধুর আমন্ত্রণে গিয়েছিলাম, দিন সাতেকের জন্য। আমরা এবং আমাদের আর দুই বন্ধু গেছি। সকলেই পরিবার নিয়েই গেছিলাম। আমার খুব কাছের বন্ধু ছিল সাথী। খুব প্রাণবন্ত মেয়ে, সব সময় ওর সাথে খুব মজা করতাম। ওর জন্ম কলকাতায় হলেও ওর বাবা-মা দুজনেই পূর্ববঙ্গের লোক ছিলেন। তার উপর ওর বাবা ছিলেন স্বদেশী। ফলে বাঙালদের প্রতি ওর সব সময় দূর্বলতা ছিল। ওর বর ‘সঞ্জয়’দাও বাঙ্গাল। ওদের আড়াই বছর বয়সী একটা মাত্র মেয়ে সঙ্গীতা। ওরা দুজনই আমাদেরকে খুব ভালোবাসতো। আমার স্বামীকে ওরা বড় দাদার মত মান্য করতো। মূল কথায় আসি। সাথী আমার সাথে খুব ঠাট্টা ইয়ার্কী করতো, ওর বাঙাল স্বামীকে ক্ষেপাত বাঙালপণার জন্য। আমরা প্রায় প্রতিদিন একজন আরেকজনের বাড়ীতে হাজিরা দিতাম। একসাথে খাওয়া দাওয়া করতাম। মনের কথা খুলে বলতাম।

তা সেবার সিডণীতে সাথী আর সঞ্জয়’দাও গিয়েছিল। সিডণীতে কত কিছু দেখার আছে! সব কিছু ঘুরে দেখতে গেলে দুই মাস সময় লাগার কথা। সাতদিনে আর কী হয়! তাই সিডণীতে গিয়ে সব কিছু দেখা হয় নি। তবে অনেক কিছুই দেখেছি যা নয়ন সার্থক হয়ে আছে। আমরা উঠেছিলাম কমল’দার বাড়ীতে, আর সাথীরা উঠেছিল ওদের পরিচিত কারো ফ্ল্যাটে। খালিই পড়েছিল ফ্ল্যাট, সেখানে ওরা থেকেছে আর আমাদের সাথে একসাথেই ঘুরেছে।

কমল’দা আর বৌদি খুব আদর যত্ন করেছেন। আমরা আর সাথীরা নিজেদের মত করে ঘুরেছি, কখনও কমলদা’কে সাথে নিয়ে গেছি। কমলদা ব্যস্ত মানুষ, সব সময় আমাদের সাথে যেতে পারেন নি, মাঝে মাঝে গেছেন। একদিন গেছি থ্রী সিস্টারস দেখতে, কমলদা’ও আমাদের সাথে গেছেন। উনার গাড়ীতে চড়েই আমরা গেছিলাম। থ্রী সিস্টারস (তিন পাহাড়ের চূড়া এক সারিতে, সে এক নয়ণাভিরাম দৃশ্য) দেখা শেষ হতে কমল’দা জানতে চাইলেন, ‘আই ম্যাক্স’ মুভী দেখবো কিনা!

‘আই ম্যাক্স’ মুভী কী জিনিস, আমি জানতাম না। টিকিটের দাম ১২ ডলার। আমার মাথা ঘুরে গেছে। স্বামীকে ফিসফিসিয়ে বলি,

” কী দরকার, এইসব আই ম্যাক্স দেখে, চারজনে ১২x ৪ = ৪৮ ডলার খরচ করে এক ঘন্টার সিনেমা দেখার চেয়ে চলো আর কোথাও ঘুরে আসি”!

আমার স্বামী আবার দিলদরিয়া মানুষ, বললেন,

-আই ম্যাক্সও দেখবো, আরও কোথাওও ঘুরবো। চিন্তা নেই, টাকা পয়সা থাকে কিসের জন্য, একজায়গায় বেড়াতে এসেছো, দেখে নাও নতুন নতুন জিনিস। ৫০ ডলার কোন ব্যাপার না। আর শোন, আই ম্যাক্স মানে থ্রি ডি ছবি। যা দেখাবে, মনে হবে তোমার সামনেই সব ঘটছে। আমি অনেকবার দেখেছি, তোমাদের দেখা হয় নি, আজ দেখবে।”

তর্ক করে লাভ নেই জেনে সিনেমা হলে ঢুকে গেলাম। ছবিটা ছিল ‘ দ্য হোয়েইল’ অর্থাৎ ‘তিমিমাছ’। হলে ঢোকার আগেই চোখে পড়তে হয়েছে বিশেষ চশমা। চশমা পড়তে গিয়েই বুঝেছি, ব্যাপার গুরুতর। সাথে ছিল দুই মেয়ে মৌটুসী আর মিশা। সাথীর সাথে ছিল ওর আড়াই বছরের মেয়ে সঙ্গীতা। সিনেমা শুরু হয়ে গেলো। আরে! ট্রেইলারে এসব কী দেখাচ্ছে! সেভেন সিস্টার দেখাচ্ছে। একটু আগেই দূরবীণে চোখ রেখে দেখে এসেছি, এখন দেখি পাহাড়ের চূড়ায় বসে আছি! হ্যাঁ, এমনই দেখাচ্ছিল, হঠাৎ করেই এক চীৎকার দিলাম আমি। ট্রেইলারে ‘সাপ’ দেখিয়েছে, আমার সাপ ফোবিয়া আছে, সেই সাপ দেখি আমার পাশে! আমার এক পাশে বসা আমার স্বামী, আরেক পাশে সাথী। দুজনেই জানে আমার ফোবিয়ার কথা। দুদিক থেকে দুজনে আমাকে জাপটে ধরে সাহস দিচ্ছে,

” এই তো শেষ হয়ে গেছে, আর দেখাচ্ছে না। তাকাও , তাকাও, আমাদের সিনেমাতে সাপ দেখাবে না, ওটা ছিল পরের শো’য়ের ট্রেলার। ”

আমি তখন থরথর করে কাঁপছি, স্বামী বেচারা অপ্রস্তুত। শুরু হয়ে গেছে ‘দ্য হোয়েইল’। সমুদ্রের গর্জন শুনে মুখ তুলেছি, বিশাল এক ধাক্কা খেলাম সমুদ্রের পাগলা ঢেউয়ের। একেবারে আমার উপর এসে আছড়ে পড়েছে ঢেউ! চেয়ারের হাতল শক্ত করে চেপে ধরেছি। চারদিক থেকে বাচ্চাদের চীৎকার, সবাই ভয় পেয়েছে। কয়েক সেকেন্ড পরেই ‘তিমি মহারাজ’ দেখা দিলেন। উফ! সে কী দৃশ্য! ততক্ষণে আমি ধাতস্থ হয়ে গেছি, কিন্তু এবার সাথী ভয় পেয়েছে। মৌটুসী বা মিশা, কেউ ভয় পাচ্ছিল না, শুধু আমি, সাথী আর পিচ্চী সঙ্গীতা ভয় পেয়েছি। মিনিট পাঁচেক তিমির তান্ডব দেখে হাত পায়ের খিল খুলতে শুরু করেছে, এর মধ্যেই তিমির নাক মুখ দিয়ে জল ছোঁড়াছুঁড়ি শুরু হয়েছে। কী ভীষন আওয়াজ! কিছুক্ষণ পরেই টের পেলাম, সাথী খিল খিল করে হাসছে। কী ব্যাপার! তিমি জল ছুঁড়ছে, এতে হাসির কী আছে! প্রশ্ন করার আগেই সাথী আমাকে ডেকে কানে কানে বলছে,

” ও মিঠু, তিমির জল ছোঁড়ার আওয়াজটা শোন, আমার বাঙাল বরটা ঠিক এভাবেই নাক ডাকে।”

আমি সিনেমা দেখবো কি, সাথীর কথা শুনে ওর চাইতেও বেশী জোরে হাসতে শুরু করেছি। আমি হাসি, সাথীও হাসে। আড়চোখে সঞ্জয়’দার দিকে তাকাতেই ‘দাদা’ প্রশ্ন নিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে দেখলাম। সাথী আমাকে হাতে টিপ দিয়ে বলে,

” ওকে কিছু বলোনা, ও মাইন্ড করবে। কিন্তু বিশ্বাস করো, ও যখন ঘুমের মধ্যে নাক ডাকে, ঠিক এমন আওয়াজ হয়, একেবারে তিমি মাছের জল ছোঁড়ার মত আওয়াজ।”

এরপরের অংশটুকু আর ভালোভাবে দেখতেই পারলাম না। দুই সখী মিলে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ি। কী করবো, বারবার তিমিমাছের কান্ডকীর্তি দেখি আর সঞ্জয়’দার নাসিকা গর্জণ শুনি। সিনেমা দেখা শেষ হতেও আমাদের হাসি থামে না। দুইদিন পরেই আমরা সিডনী থেকে রওণা হয়েছি মেলবোর্ণের পথে। মাঝখানে ক্যানবেরা থেমেছি, আরেক বন্ধুর বাড়ীতে। আমরা আর সাথীরা। অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা দিচ্ছিলাম, সঞ্জয়’দা বেশী রাত জাগতে পারেন না, ঘুমাতে চলে গেছেন। আমরা গল্প করছি, হঠাৎ করেই শুনতে পেলাম, হুইসলের মত আওয়াজ। শুরুটা তীব্র হুইসলের মত, এরপরেই ভররররররর ফুস!!!!!!!!!! একেবারে অচেনা, এমন আওয়াজ জীবনে কোনদিন শুনিনি, সকলেই সচকিত হয়ে গেলাম। সাথী হাসতে শুরু করেছে, হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে। প্রথমে বুঝিনি, সাথী নিজেকে সামলে শুধু বলতে পারলো,

-মিঠু, বলছিলাম না, তিমি মাছের গর্জণ! এইবার শোন, ঘরের ভেতর তিমিমাছের ডাক শোন!

আমাদের বন্ধু তো আর কিছুই জানে না, তবে সঞ্জয়’দার নাক ডাকার আওয়াজ শুনে সকলেই আশ্চর্য্য হয়ে গেছে। আমার স্বামী খুবই ভদ্র, সেই ভদ্রমানুষটিও নিজেকে সামলাতে পারলেন না। আমাদের হাসিতে শামিল হলেন, তবে পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলেন। সাথীকে বললেন,

” সাথী, সঞ্জয়ের তো নাকের ভেতর সমস্যা আছে। ডাক্তার দেখাও। নাকের ভেতর হাড় বড় হলে অথবা কোন পলিপ থাকলেও এমন হতে পারে। ব্যাপারটা বেশ গুরুতর মনে হচ্ছে। স্বাভাবিক নাক ডাকার মত আওয়াজ মনে হচ্ছে না।”

-দাদা, আমি তো সিনেমা হলে বসেই টের পেয়েছি, এই আওয়াজটা শুধু মাত্র তিমি মাছেরা করতে পারে, আর পারে আমার বর। হি হি হি হি!!!!

-যাহ! এসব কি কথা! এবার মেলবোর্ণ ফিরেই ডাক্তার দেখাবে।

সাথী এবার আমার হাত ধরে টেনে উঠালো। বললো,

-চলো, তোমারে দেখায়ে আনি।

আমি বলি, ” দূর! সঞ্জয়’দা যদি দেখে ফেলে, তার বউয়ের সাথে সাথে আমিও উনাকে নিয়ে ঠাট্টা করছি, উনি মনে খুব কষ্ট পাবে।

-চল না, পা টিপে টিপে চল, দেখবা কিভাবে শ্বাস টানে।

এবার আমার বর সাথীকে এক বকা দিল, ” সাথী, যাহ! এমন দুষ্টামী করা ঠিক না। তুমি গিয়ে ওকে পাশ ফিরিয়ে দাও, ঠিক হয়ে যাবে।

*** সাথীর কান্ড কারখানা এমনই। খুব প্রাণবন্ত মেয়ে এই সাথী, ওর বর সঞ্জয়’দাও জানে, সাথী ওর বাঙাল বরটাকে কত ভালোবাসে! ইচ্ছে করে ‘বাঙাল’ বলে ক্ষ্যাপায় আর বাঙাল বরকে নিয়ে খুব গর্ব করে বেড়ায়।