ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

আমি সুপারস্টিশানে মোটামুটি বিশ্বাস করি। এর একটাই কারণ, অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি, এবং বেড়ে উঠেছি, ফলে বাস্তবতার কাঠিণ্যকে অতিক্রম করতে গিয়ে মাঝে মধ্যেই অদৃশ্য ভাগ্যের উপর নির্ভর করেছি, ঠিক আর দশটি সাধারণ মধ্যবিত্তের মত। ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি, ঘরের কোনে বেড়াল কাঁদলে অলক্ষণ, কুকুর কাঁদলে অলক্ষণ, রাতের বেলা কাক ডাকলে অলক্ষণ, এমনকি ঝিমোতে ঝিমোতে উপুর হয়ে পড়ে গিয়ে যদি মাথা মেঝেতে ঠুকে যায়, সেটাও নাকি অলক্ষণ। অর্থাৎ এই ধরণের ছোত খাটো ব্যাপারগুলো আগাম বিপদের ইশারা হয়ে আসে। দেবী দুর্গা যখন পৃথিবীতে নেমে আসেন, কীসে চড়ে উনি বাপের বাড়ী আসবেন, সেই বাহনের প্রকৃতির উপরও নাকি নির্ভর করে দেশের ভবিষ্যত। দেবী নৌকায় এলে দেশে বন্যা দেখা দেয়, ঘোড়ায় চড়ে এলে যুদ্ধ বিগ্রহ, নাগরদোলায় এলে এরকমই কিছু একটা ঘটনা ঘটার সম্ভাবণা থাকে। মায়ের মুখে শুনেছি, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েকমাস আগে থেকেই রাতের বেলা কুকুর কাঁদতো, ঘরের কোনে বেড়াল কাঁদতো। এমনকি ‘৭০ সালে যে দুর্গাপূজা হয়েছিল, সে বছর দেবী নাকি ঘোড়ায় চেপে এসেছিলেন ( দেবীর বাহন সংক্রান্ত তথ্যটি একটু এলোমেলো হলেও হতে পারে, কারণ মা বেঁচে নেই, তাই ঠিক এ মুহূর্তেই ভুল শুদ্ধ করার উপায় জানা নেই)। এমন পরিবেশে বড় হয়েছি বলেই আমিও সুপারস্টিশানে বিশ্বাস করতে শিখেছি।

সুপারস্টিশানের প্রসঙ্গটি মনে এলো কাজ থেকে ফিরে আসতে গিয়ে। আমি ওয়ালমার্ট সুপারসেন্টারে চাকুরী করি। আমার আজকের কাজের শিডিউল ছিল বেলা ১টা থেকে রাত ৯টা অবধি। বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যে ৬টা পর্যন্ত ছিল এক ঘন্টার ‘লাঞ্চ ব্রেক'( এই একঘন্টার ব্রেককে ওরা লাঞ্চ ব্রেক বলে)। লাঞ্চ ব্রেকে আমি বাড়ী ফিরেছিলাম, মাত্র দশ মিনিটের ড্রাইভ, ডাউনটাউন দিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। ঘন্টায় ৪০ মাইল বেগে গাড়ী চালাই। আজকেও তাই করেছিলাম, আকাশ ছিল পরিষ্কার, শীতকাল হলেও ঠান্ডার মাত্রা কমই ছিল। বাড়ী ফিরে মনের আনন্দে ঘরের জানালাগুলো খুলে দিয়ে পরিবারের সাথে আধঘন্টা সময় কাটিয়ে আবার কাজে ফিরে গেছি। রাত ৯টা বাজার সাথে সাথে আবার বাড়ীর পথে রওণা হয়েছিলাম।

ওয়ালমার্ট স্টোর থেকে বের হয়ে দেখি হালকা হালকা কুয়াশায় ঢেকে আছে চারদিক। বিশাল পার্কিং লটে গাড়ীও তেমন ছিল না। আমি গাড়ীতে উঠে স্টার্ট দিয়েই লক্ষ্য করলাম, পাঁচ মিনিটের ভেতর কুয়াশা বেশ ঘন হয়ে এসেছে। একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি হলদে ঘোলাটে বর্ণ! আমার সারা শরীর কাঁপিয়ে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো। মনে পড়ে গেলো গত রাতের কথা।

গতকাল রাত বারোটার সময় ছিলাম অনলাইনে। ব্লগে লেখালেখির সুবাদে প্রচুর ব্লগারের লেখা পড়ার সুযোগ পাই। বিভিন্ন ব্লগে প্রচুর তরুণ ব্লগারদের রাজত্ব। আমার খুব ভালো লাগে এদের মাঝখানে থাকতে। ইদানিং কিছু কিছু ব্লগারের সাথে আমার ভাই-দিদি সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। এদের প্রত্যেকে খুবই তুখোড় ও মেধাবী। মুক্তিযুদ্ধের অনেক পরে এদের জন্ম, অথচ মুক্তিযুদ্ধের চেতণায় ওরা ভাস্বর, ওদের দৃঢ়, প্রত্যয়ী মনোভাব দেখে নিজেও শিহরিত হই। গতকাল রাত বারোটার সময় আমি ছিলাম ‘আমারব্লগ’ ওয়েবসাইটে। ‘বাউল’ নামে খ্যাত ব্লগার দুই লাইনে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিল, যার মর্মার্থ হচ্ছে, ” কাদের মোল্লার বিচারের রায় ঘোষণা শুরু হয়েছে। চলেন, আড্ডায় বসি, যে যা আপডেট জানবেন, সাথে সাথে জানাবেন। তবে ফাঁসী ছাড়া আর কোন রায় পরিত্যাজ্য ঘোষণা করা হবে”। এই প্রথম আমি খুব এক্সাইটেড ফিল করছিলাম, ঠিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সামরিক শাসণের বিরূদ্ধে আন্দোলণ করতে গিয়ে যেমনটি বোধ করতাম।

ফেসবুকে ফিরে এসে বাংলাদেশ প্রতিদিনের রাসেলকে নক করলাম। কারণ রাসেল অনলাইন আপডেট দেয়। ও জানালো, এখনও রায় পাঠ করা হচ্ছে, তবে কাজ এগিয়ে রাখার জন্য ও ‘ফাঁসী’র কথা আগেই সেট করে রেখেছে। আমিও নিশ্চিন্ত, তবুও ঘুমাতে যেতে পারছিলাম না। জানা বিষয়, তারপরেও এই তরুণদের সাথে জেগে থাকি, এক ঘন্টা কম ঘুমালে কী আর হবে! কিন্তু ঐতিহাসিক মুহূর্তটির সাক্ষী তো হতে পারবো। আমি তো এমনিতেই বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে আছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় শিশু ছিলাম, তাই কি? মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি তো! আমাদের যৌবনেই এই সকল ‘নরঘাতকদের’ বিচার হওয়ার কথা ছিল, হয়নি, এ তো ভয়ানক লজ্জার কথা। আমরা বর্তমান প্রজন্মের দিকে মাথা উঁচু করে তাকাতে পারিনা, লজ্জায় মাথা নীচু করে রাখি। আজ ওদের উপস্থিতিতে ‘নরঘাতকদের’ বিচার হচ্ছে, দুই ঘন্টা না ঘুমিয়ে ওদের পাশে জেগে থাকাতেই আনন্দ পেয়েছি।

সব উচ্ছ্বাস, সব আনন্দ, সব উত্তেজনা এক ফুৎকারে নিভে গেছে, যখন রাসেল জানালো, ‘যাবজ্জীবন’। সংবাদের সত্যি মিথ্যে যাচাই করতে গিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলাম, কারণ রাসেল আমার সাথে মাঝে মধ্যে ‘কৌতুক’ করে। এবারও রাসেল একই কথা বললো, ” যাবজ্জীবন”। চলে গেলাম ‘আমারব্লগে’। ততক্ষণে ব্লগে প্রতিবাদের বন্যা!!!!!!!!! সবাই একসাথে ফেটে পড়েছে! আমার মনে হলো, আজ রাতে আমার আর ঘুমই হবে না। গভীর হতাশায় বুকটা ভরে গেলো। এক বুক হতাশা নিয়ে বিছানায় গেলাম, ভাবছিলাম, কোখাও কোন আশার আলো দেখা যাওয়ার উপায় আছে কিনা! এত শংখনিনাদ বাজিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলো, পলাতক আসামীর বিরূদ্ধে ফাঁসীর রায় দেয়া হলো, আর শত শত মানুষ হত্যাকারীকে দেয়া হলো ‘যাবজ্জীবন’!! এ কেমন প্রহসন! আমার দাদু ছিলেন উকিল। উকিল-মক্কেলের আলাপ চলাকালীণ সময়ে, ওকালতির কিছু কিছু সংবাদ কান ছুঁয়ে বেরিয়ে যেত। সেই স্মৃতি টেনে বের করলাম, মনে পড়লো, এক কোর্টে রায় হলে, রায় মনোমত না হলে বাদী বা বিবাদী, যে কেউ উচ্চতর আদালতে আপীল করতে পারে। আহ! শান্তি পেলাম, নিশ্চয়ই সরকার পক্ষ থেকে এই জনমত বিরোধী রায়ের বিরূদ্ধে আপীল করা হবে। এটুকু ভাবতেই ঘুম এলো চোখে, গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

সকালে ঘুম ভেঙ্গে আবার অনলাইনে ঢুকে দেখি, চারদিকে শুধু প্রতিবাদ আর প্রতিবাদ। এই রায়ের বিরূদ্ধে প্রতিবাদ। মন নেচে উঠলো, আরও জোরে, আরও জোরে প্রতিবাদ হোক, ঘরের প্রতিটি মানুষ বের হয়ে আসুক, রাস্তায় নেমে আসুক। গত পনেরো টি দিন ধরে সারা দেশের মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে জামায়াতে ইসলামীর অনুসারীরা। কথা নেই বার্তা নেই, তারা ‘গৃহযুদ্ধের’ হুমকী দিচ্ছে, যখন তখন বাসে, গাড়ীতে আগুন দিচ্ছে, পুলিশকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করছে। ভয়ে কেউ ঘর থেকে বের হতে পারে না। কী যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে গত পরশু রাতে উত্তরায় বাসের আগুনে পুড়ে দগ্ধ হয়ে মারা গেলো ত্রিশ বছর বয়সী যুবক, ব্যাংকার, রাসেল। কোন মানে হয়? দেশের মানুষ এসবই সহ্য করে যাচ্ছিল সুবিচারের আশায়। কাদের মোল্লার ‘যাবজ্জীবন কারাদন্ড’ শোনার জন্য কী এই কয়দিন এত অত্যাচার, এত তান্ডব সহ্য করেছে সবাই? অনলাইনে নানা রকম প্রতিক্রিয়া দিচ্ছিল অনলাইন পাঠকবৃন্দ। সব প্রতিক্রিয়া এই রায়ের বিরূদ্ধে। দুই একজন আবার সতর্কতামূলক, আশা জাগানিয়া প্রতিক্রিয়াও দিয়েছে। অনেকের স্ট্যাটাস দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি, আমার মনে আশা জেগেছে, মনে হয়েছে, এটাই তো স্বাভাবিক, প্রাথমিক ধাক্কা কাটাতে তো একটু সময় লাগবেই, ধাক্কা কাটিয়ে উঠে নতুন করে জেগে উঠতে পারলেই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। বাঙ্গালী জাতি হিসেবে আবেগপ্রবণ, বাঙ্গালী সহজেই কাঁদে, আবার সহজেই হাসে। বাঙ্গালী অলস দুপুরে পাটি বিছিয়ে নাক ডেকে ঘুমায়, বাঙ্গালী প্রয়োজনের সময় কাঁধে স্টেনগান নিয়ে বন-বাদাড় ছুটে বেড়ায়। এই আবেগপ্রবণ বাঙ্গালীর হাত থেকে কোন ‘যুদ্ধপরাধী’র মুক্তি নেই। আমার খুব প্রিয় দুইজনের প্রতিক্রিয়া হুবহু তুলে দিচ্ছিঃ

১) Fazlul Bari
“নেগেটিভের মধ্যে আমি আমার মতো করে কিছু পজিটিভও খুঁজি। কসাই কাদের মোল্লার ফাঁসির আদেশ না হওয়ায় দেশজুড়ে যে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তাতে বিএনপি-জামায়াত ঘাবড়ে যাবে! ফাঁসির আদেশ হলে আনন্দ মিছিল-মিষ্টিমুখ করে হয়তো অনেকে সন্তুষ্টিতে ঠান্ডা হয়ে যেত। কিন্তু আদতে দেশের মানুষ যে এই ঘাতক খুনিদের ফাঁসি ছাড়া আর কিছু চায় না, তা এই রায় তা বিপু্লভাবে প্রকাশিত করেছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষজনের এমন বিপুল প্রকাশে-বিকাশে আমি ভীষন খুশি। জয় আমাদের অবশ্যম্ভাবী। জয়বাংলা।”

২) Sushanta Das Gupta
near Cambridge, MA ·

শাহবাগে যারা আন্দোলনে আছেন তারা খেয়াল রাখবেন আপনাদের আন্দোলনের ফসল যেন জামাত-শিবির ঘরে না তুলে । আমাদের সবার একটাই দাবি হতে পারে, রাজাকারদের ফাঁসি চাই । ট্রাইবুনাল এবং সরকারের বিরুদ্ধে যেন আমরা না যাই এ আন্দোলনে । কারণ এ সরকার ছাড়া আর কেউ কোনদিন যুদ্ধাপরাধের বিচারে বাদী হয়নি । ভবিষ্যতেও আর কেউ বাদী হবে না । একটু চিন্তা করুন এই ট্রাইবুনাল ছাড়া আমরা এই যুদ্ধাপরাধীদের গ্রেফতার করতে পারতাম না । আপনারা নিশ্চয়ই ভাবেননি এদেরকে কোনদিন গ্রেফতার করা যাবে এবং বিচারের আওতায় আনা যাবে । আমাদেরকে জামাত-শিবিরকে প্রতিহত করতে হবে এবং তাদের ফাঁসি না হওয়া পর্যন্ত সরকার এবং ট্রাইবুনালকে সমর্থন করতে হবে । এর কোন বিকল্প নেই । জয় বাংলা ।

আবার নিজের কথায় ফিরে আসি। গাড়ী স্টার্ট দিয়ে পার্কিং লট থেকে বের হয়ে হাইওয়ে তে উঠতেই হাত-পা কাঁপতে শুরু করেছে। গাড়ীর সামনে এক হাত দূরের কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমি খুব একটা দক্ষ চালক নই, কিন্তু জাতে বাঙ্গালী, মাঝে মাঝেই ‘ গোঁয়ারে’ সাহস মাথায় এসে ভর করে। সেই গোঁয়ারে সাহসের উপর ভর করেই সামনের দিকে এগোতে লাগলাম। সুপারস্টিশান এসে ভর করলো মনে, বলা নেই কওয়া নেই, পরিষ্কার আকাশ থেকে এমন অলুক্ষুণে কুয়াশা নেমে আসার কারণ কি? এটা কী আমাকে পরীক্ষা করছে ঈশ্বর? আমার মত নার্ভাস টাইপের মানুষ সত্যিকারের বিপদে পড়লে কী করবো, সেটাই দেখতে চাইছে ঈশ্বর! ঠিক আছে, দেখুক ঈশ্বর, আমি তো তাঁরই সৃষ্টি, গোঁইয়ার্তুমী জেদও উনিই আমার চরিত্রের মধ্যে সেঁটে দিয়েছেন। দেখুক ঈশ্বর, এই কুয়াশায় ঢাকা পথ আমি কীভাবে এগিয়ে যাই!

এই মুহূর্তে আমার দেশের মানুষগুলোকেও কী পরীক্ষা করছে ঈশ্বর? ঈশ্বর কী দেখতে চাইছেন বিপদে বাঙ্গালী আবার এক হতে পারে কিনা! একজন ভয়ানক চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর ‘লঘুদন্ডে’ বাঙ্গালীর প্রতিক্রিয়া দেখতে চেয়েছেন ঈশ্বর! এই বাঙ্গালী জাতি তো তাঁরই সৃষ্টি, বাঙ্গালীর রক্তে গোঁয়ারে জেদ তাঁরই দেয়া, এই গোঁয়ারে জেদ খাটিয়েই বাঙ্গালী সামনের দিকে এগোবে, সময় এসেছে আবার একবিন্দুতে মিলিত হওয়ার, সময় এসেছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জ্বলে উঠার। তবে এবার আর কোন ভুল নয়, আর কোন ক্ষমা নয়, যার যা প্রাপ্য, তা তাকে পেতেই হবে। শাহবাগের মোড়ে সকলের হাতে জ্বলছে ‘প্রত্যয়ী শিখা’, এই প্রত্যয়ী শিখার আলোকে সকল অন্ধকার কেটে যাবে, সকল কুয়াশা কেটে আগামী প্রজন্মের জন্য এগিয়ে আসবে অমলিন, বিশুদ্ধ, নির্মল ভোর!