ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

দু’জন মানুষের গল্প

দু’জন ভিন্ন মানুষের গল্প বলি। মানুষ দু’জন সব দিক থেকেই ভিন্ন। তাদের জেন্ডার ভিন্ন, গায়ের চামড়ার রঙ ভিন্ন, আর্থিক ও পারিবারিক অবস্থাও ভিন্ন। এক জায়গাতে শুধু মিল আছে, সকল প্রতিকূলতাকে জয় করে তারা বেঁচে আছে এবং বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্তকে ওরা এনজয় করছে।

দু’জনের একজন নারী, সাদা চামড়ার আমেরিকান, বয়স ৭৭, আর্থিক দিক থেকে সবল, স্বামী নেই, তবে চারছেলেমেয়ে নিয়ে সুখের সংসার।এই নারীকে শেষ বয়সে এসে তথাকথিত ‘ওল্ড হোমে’ যেতে হয়নি। আলোচ্য নারীর নাম ক্যারোলিন ম্যাকডোনাল্ডস।

অপর ব্যক্তিটি একজন পুরুষ, বাকশক্তিহীন, কালো চামড়ার আমেরিকান, বয়স ৩৭, গরীব, মা-বাবা, স্ত্রী-সংসার কিছুই নেই। সরকার থেকে ভাতা পান এবং একটি চায়নিজ রেস্টুরেন্টে কাজ করে কিছু উপার্জণ করেন। আলোচ্য পুরুষটির নাম, ডেমেড্রিক।

ক্যারোলিন ম্যাকডোনাল্ডসঃ

ক্যারোলিন ম্যাকডোনাল্ডসকে প্রথম দেখি আমার কাজের জায়গায়। ছেলে, মেয়ে, মেয়ের জামাইসহ ওয়ালমার্টে এসেছিল শপিং করতে। হাঁটতে হাঁটতে ওরা আমার ডিপার্টমেন্টে আসে, জানতে চায় ওদের দুই বছরের কন্ট্র্যাক্ট রিনিউ করতে হলে কী করতে হবে! যখন জানলো যে গত মাসের বকেয়া বিল পরিশোধ করলেই সার্ভিস রিনিউ করা যায়, মেয়ে সাথে সাথে ‘মানিগ্রাম সেন্টারে’ ছুটে গেলো বিল পরিশোধ করতে। আমার সামনে দাঁড়িয়েছিল মিস ক্যারোলিন আর তাঁর মেয়ে জামাই। প্রায় বিশ মিনিট অপেক্ষা করার পরও যখন তাঁর মেয়ে ফিরে আসছিল না, আমি মিস ক্যারোলিনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোন ধরণের ফোন তার পছন্দ। উনি ‘স্যামসাং রাগবী টু’ এর দিকে অঙ্গুলী ইশারা করে বললেন, উনি সিম্পল ফোন ভালোবাসেন। গতমাসে হসপিটালে থাকার সময় নাকি আগের ফোনটা নষ্ট হয়ে গেছে, তাই এখন নতুন ফোন প্রয়োজন। বুড়ীমাকে দেখেই আমার ভাল লেগেছে, ‘গল্প বলার ঠাকুরমা’ মনে হয়েছে। বুড়ীমা হাসপাতাল থেকে ফিরেছেন বলে মনেই হচ্ছিল না। ধবধবে সাদা চুল সুন্দর করে পেছন দিকে খোঁপায় বাঁধা, গায়ে সুন্দর প্রিন্টের লম্বা ঝুলওয়ালা জামা, হাতে একখানা লাঠি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, ঠিক আমার মুখোমুখি। এই তো সময়, মানুষটির সাথে গল্প করার! শুরু হলো আমার গল্পঃ

-গত মাসে তুমি হসপিটালে ছিলে? আর এই মাসে তুমি কী সুন্দর করে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছো! বাহ! থ্যাঙ্কস গড!

-হ্যাঁ, গত মাসে কোমড় ভেঙ্গে হসপিটালে পড়েছিলাম। ( হাত দিয়ে কোমড়ের বাঁ পাশ থেকে উরু পর্যন্ত দেখালো)। অপারেশান করে মেটাল স্টিক বসিয়ে দিয়েছে। এই জন্যই আমি হেঁটে হেঁটে চলাফেরা করতে পারছি।

-আহারে! কোমড় ভাঙ্গলো কী করে! পড়ে গেছিলে বুঝি!

-হ্যাঁ, গত নভেম্বার মাসে আমার ‘রেকটাম ক্যানসার’ ধরা পড়েছিল। সেই চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে একদিন দেহের ভার সামলাতে না পেরে পড়ে গেছিলাম। সাথে সাথে কোমড়ের হাড় ভেঙ্গে গেছে। প্রায় বাইশটা স্ক্রু লাগিয়েছে ‘হিপ বোনে’।

-কী বলো! নভেম্বার থেকে ফেব্রুয়ারী, তোমার উপর দিয়ে এত ঝড় গেছে!! এরপরেও তুমি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছো, মাগো, তোমার মনের জোর দেখে অবাক হচ্ছি। তোমার মানসিক শক্তি থেকে আমাকে কিছু ধার দাও, মা!

– হা হা হা! দিলাম, তোমাকে দিলাম। মনের শক্তিটাই আসল। ডাক্তাররা সবাই বলেছিল, কেমোথেরাপী নিতে, দ্বিতীয় অপশান ছিল ওর‌্যাল রেডিয়াম থেরাপী। আমি দ্বিতীয় অপশান চুজ করেছি। ছয় সপ্তাহের কোর্স, দুই বেলা খেয়েছি। ডাক্তাররা আগেই বলেছিল, আমার মাথার সব চুল পড়ে যাবে। হা হা হা! কিন্তু দেখো, আমার মাথার চুল একটিও পড়ে নি। ঐ সময়টাতেই আছাড় খেলাম, কোমড়টাও ভাঙ্গলো।

-তোমার ক্যানসারের কী অবস্থা এখন?

-ভালো, একেবারে ভালো আছি। চেক করে দেখেছে, আর কোন গ্রোথ নেই। ওরা বলেছিল, অপারেশান করার কথা। আমি রাজী নই। আর কোথাও কোন গ্রোথ নেই, শুধু শুধু অপারেশান করাবো কেনো, বলো! আমার স্বামীরও ক্যানসার ধরা পড়েছিল, লাং ক্যানসার। অপারেশান করাতে হয়েছিল, বাঁচেনি।

-তোমার স্বামী বেঁচে নেই? তুমি তাহলে একা একা থাকো?

-না, আমার ছোট মেয়ের সাথে থাকি। যে মেয়ে বিল পরিশোধ করতে গেলো, ও আমার ছোট মেয়ে। আর এই যে ফ্লোরে বসে আছে ছেলেটি, ও আমার মেয়ের জামাই। বেচারার লিভার সিরোসিস হয়েছে, লিভারের বেশ খানিকটা কেটে ফেলতে হয়েছে। মনে হয় যন্ত্রণা হচ্ছে, তাই ফ্লোরেই বসে পড়েছে ( আমিও খেয়াল করেছি, বুড়ীমার সাথে আসা ভদ্রলোকটি ফ্লোরের উপর বসে পড়েছে)।

-বাহ! আমাদের দেশের সকলের ধারণা, আমেরিকায় বুড়ো বয়সে সকলের জায়গা হয় ‘ওল্ড হোমে’। কথাটি পুরোপুরি সত্যি নয়। আমি আরও অনেক মা’কে দেখেছি, তাঁদের ছেলে মেয়ের সাথে থাকে। অবশ্য ‘ব্ল্যাক’ পিপলদের মধ্যে পারিবারিক বন্ধন অনেক বেশী জোরালো।

-তুমি ঠিকই বলেছো। এদেশে বুড়োদের স্থাণ ওল্ড হোমেই হয়। তবে এটা কোন খারাপ কিছু না, প্রত্যেকটি বাবা মায়ের উচিত তার ছেলে মেয়েকে নিজের মত করে থাকতে দেয়া। ওল্ড হোমে তো কোন যন্ত্রণা নেই, সমবয়সীদের সাথে থাকা যায়। ছেলেমেয়েরা এসে খোঁজ খবর নেয়, এই তো যথেষ্ট।

-আমিও মনে মনে ঠিক করে রেখেছি, যদি বুড়ো বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকি, ওল্ড হোমে গিয়ে থাকবো।

-হা হা হা! তোমাকে ওল্ডহোমের গল্প বললাম ঠিকই, কিন্তু নিজে থাকি ছেলেমেয়েদের সাথে। আমার তিন মেয়ে, এক ছেলে, বারোটি নাতিনাতণী। আমি সব সময় আনন্দে থাকতে চাই, তাই ওদের কাছাকাছি থাকি। আমার মেয়ে জামাইগুলোও হয়েছে খুব ভালো, আমাকে মাথায় করে রাখে। ছেলেমেয়েদের সকলেই কাছাকাছি থাকে।

-মাগো, তোমার মত এমন প্রাণশক্তিতে ভরপুর মানুষকে সবারই ভালোবাসা উচিত। তোমার পাশাপাশি থাকলে জীবনকে ভালো না বেসে পারা যায়! তুমি ক্যানসারের মত অপশক্তির বিরূদ্ধে লড়াই করে টিকে আছো, তোমার বর্তমান বয়স ৭৭, আমি দুই হাত তুলে প্রার্থণা করি, তুমি আরও বিশ বছর হেসে খেলে বেঁচে থাকো, আশেপাশের সকলকে বাঁচিয়ে রাখো।

বুড়ীমা’র মুখে হাসি ফুটে উঠলো, আমার দিকে তাঁর দুই হাত প্রসারিত করে দিল!

ডেমেড্রিকঃ

ওর নাম ড্রেমেড্রিক, কাগজে যেভাবে বানান করে লিখেছে, সেভাবেই জেনেছি ডেমেড্রিক ওর নাম। কাগজে লিখেছে কারণ ও কথা বলতে পারে না। ৩৭ বছর বয়সী ডেমেড্রিকের সাথে পরিচয় হয়েছে আমার চাকুরীর সূত্রে। বাকশক্তিহীন একজন মানুষেরও ফোন চাই, এবং লেটেস্ট মডেলের ফোন চাই, এই ব্যাপারটিই আমাকে ওর প্রতি কৌতুহলী করে তুলেছে। আমি কোন রকম প্রশিক্ষণ ছাড়াই বাকপ্রতিবন্ধীদের সাথে কথা বলতে পারি, অন্য ভাষাভাষিদের সাথে কথা বলতে পারি। কোন সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ জানিনা, তারপরেও কোন না কোন ভাবে ওদের ভাষা বুঝতে পারি। ঠিক এভাবেই জেনেছি ডেমেড্রিকের জীবন কাহিণী, কিছুটা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, কিছুটা কাগজে লেখা নোটস থেকে।

ডেমেড্রিক জানে না তার মা-বাবার খবর। কোথায় তারা থাকে, কেমন আছে, কিছুই জানে না। কারণ, ওরা কেউ ডেমেড্রিকের সংবাদ নেয় না। তার কোন আত্মীয়-স্বজন নেই, ভাই বোন নেই, সে একা একজন, নিজের জন্যই সে বাঁচে। এরকম একটি অনুভূতির কথাই সে আমাকে বলেছে। বিবাহিত কিনা প্রশ্নের জবাবে মুচকী হেসে জানিয়েছে,

তার একজন গার্ল ফ্রেন্ড ছিল, বেশ কিছুদিন একসাথে তারা থেকেছে, একদিন কিছু না জানিয়ে গার্ল ফ্রেন্ড ওকে ছেড়ে চলে গেছে। এটা নিয়ে অবশ্য তার আফসোস নেই। জানালো, কিছুদিন ধরে সেই গার্ল ফ্রেন্ড তাকে ফোন করে, মেসেজ পাঠায়। তার নাকি কিছু বলার আছে, কী বলার থাকতে পারে, এসব নিয়ে ডেমেড্রিকের কোন আগ্রহ নেই। তার ভেতরে অনেক অভিমান জমেছে, প্রতিবন্ধী বলে বাবা, মা, ভাই বোন, প্রেমিকাসহ অনেকেই তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, প্রয়োজনে ওরা আসবে তার কাছে, সে যাবে না। সে তার নিজের জন্য বাঁচে। জিজ্ঞেস করে জানলাম, ডেমেড্রিক সরকারী ভাতা হিসেবে মাসিক ৭০০ ডলার পায়। এতে তার মাস চলে না, তাই ‘রয়্যাল চায়না’ নামের একখানি চায়নীজ রেস্টুরেন্টে কাজ করে। চায়নীজ রেস্টুরেন্টে কীভাবে কাজ করে? এখানে সাধারণ চায়নীজরা ইংলিশ বলতে পারেনা, রেস্টুরেন্ট চালাতে হলে ‘ইয়েস’ ‘নো’ ‘গুড’ জানলেই চলে নীতিতে ওরা বিশ্বাস করে। পরে বুঝেছি, চায়নীজদের জন্য বোবা ডেমেড্রিকই যোগ্য লোক। কখনওই কথা বলবে না, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারবে না, কম মজুরীতেই সন্তুষ্ট থাকবে, বাইরে গিয়ে কোন অপপ্রচার চালাতে পারবে না। ডেমেড্রিক মোটেও সন্তুষ্ট নয় তার চাকুরী নিয়ে। অন্য কোথাও বেটার কোন সুযোগ পেলে সে আজকেই রেস্টুরেন্টের চাকুরীতে লাথি মারবে। লাথি মারার ভঙ্গী করেই সে তার মানসিক অনুভূতি ব্যক্ত করলো। তার অভিযোগ, চায়নীজ রেস্টুরেন্টের চাকুরীতে কোন নিয়ম নীতি মানা হয় না। তাকে বোবা পেয়ে ওরা ঠকায়! কী রকম অনিয়মের কথা বলছে ডেমেড্রিক!!

চায়নীজ রেস্টুরেন্টে ডেমেড্রিককে অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়, কিচেনে সারাটা দিন ওকে দিয়ে কাজ করানো হয়। রান্না করা, বাসন-কোসন মাজা ধোওয়া করা থেকে শুরু করে কাঁচা মাংস, পেঁয়াজ রসুন কাটা বাছা সব করতে হয় তাকে। বিনিময়ে তাকে দেয়া হয় ঘন্টায় ৫ ডলার (মিসিসিপির মিনিমাম ওয়েজ বোধ হয় ৭ ডলার)। কথাটি বলতে গিয়ে ডেমেড্রিকের মুখে চোখে একই সাথে বিদ্রোহ আর বেদনার ছায়া ফুটে উঠেছিল। সে জানালো, পয়সা কম দিয়েও নিস্তার নেই, ঘাড়ের কাছে সারাদিন ওরা চ্যাং ব্যাং করতে থাকে। ওর নাকি মাথা গরম হয়ে যায়, এত ক্যাটর ক্যাটর শুনতে ভালো লাগে না। সে অনেকবার অনুরোধ করেছে, তাকে যেনো ঘন্টায় ৮ ডলার করে দেয়া হয়, কিন্তু ওরা তা দিবে না। খাওয়া -দাওয়া ফ্রী কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে সে বলেছে, খাওয়া ফ্রী, তবে ও খায় না। কেনো, খাও না কেন? উত্তর পেলাম, ওরা খুব বাজে তেলে রান্না করে। যেহেতু সে নিজেই রান্না করে, তাই কিচেনের সকল প্রকার গোপন রহস্য সে জানে। তার খুব খারাপ লাগে, এমন বাজে তেলের রান্না কাস্টমারদের খেতে দেয়া হয় বলে। কিন্তু, তার তো কিছু করার নেই। তাই সে নিজে খায় না, গাঁটের পয়সা খরচ করে বাইরে গিয়ে আমেরিকান খাবার খেয়ে আসে। আমেরিকান খাবার কী খুব ভালো তেলে রান্না করা হয়? অবশ্যই ভালো তেলে রান্না করা হয়, তাছাড়া একবার ব্যবহার করা তেল আর দ্বিতীয়বার ব্যবহার করা হয় না। কিন্তু চায়নীজ রেস্টুরেন্টে একবার ব্যবহার করা তেল বহুবার ব্যবহার করা হয়। তেল পুড়ে সেগুলো নিশ্চয়ই বিষাক্ত হয়ে যায়! ডেমেড্রিকের মত বাকশক্তিহীন মানুষের এতখানি অনুভূতি আছে? হ্যাঁ, প্রতিবন্ধীদের অনুভূতি খুবই তীব্র হয়, অভিমান খুব তীব্র হয়, কারণ বৈরী প্রকৃতির সাথে লড়াই করে তাদের বেঁচে থাকতে হয়। ডেমেড্রিকের তীব্র অনুভূতি শক্তির কারণেই সে ঘুরে ঘুরে আমার কাছে আসে। আমার হাতে সময় থাকলে আমি তার গল্প শুনি। যতবার ওকে দেখি, বুকের ভেতর যন্ত্রণা টের পাই। ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই, অযথাই মানুষ বিত্ত বৈভব, টাকা পয়সা নিয়ে অহংকার করে, মারামারি করে! আহারে! পূর্ণাঙ্গ সুস্থ জীবন পাওয়াটাই বড় কথা, টাকা পয়সা তো তুচ্ছ জিনিস! এক কোটি টাকা দিয়ে কী হবে, যদি দেহের একটি ইন্দ্রিয় অকেজো থাকে!

আমাকে ডেমেড্রিক খুব আপনার জন ভাবে। কারণ আমি তার মনে সেই বিশ্বাস অর্জন করেছি একটি ছোটখাটো ঘটনার মধ্যে দিয়ে। প্রথম দিন সে এসেছিল তার এক বন্ধুকে নিয়ে। বন্ধুটির চেহারায় ছিল ধূর্ততার ছাপ। ডেমেড্রিককে ভুলিয়ে ভালিয়ে ওর ক্রেডিট হিস্ট্রি ব্যাবহার করে বন্ধুটি খুবই এক্সপেনসিভ ফোন প্ল্যান কিনতে চেয়েছিল। বলেছিল, মাসে মাসে ফোন বিল সে দিয়ে দিবে। ডেমেড্রিক প্রায় রাজী হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু আমার অভিজ্ঞ চোখে ধরা পড়েছিল বন্ধুর চাতুরী। কৌশলে সেদিন ওদেরকে ফোন ছাড়াই বিদায় করেছিলাম। দুই দিন পরেই ডেমেড্রিক এসে হাজির, আমাকে ধন্যবাদ জানাতে এসেছে। সে নিজেও বুঝেছিল, বন্ধু ঠকাতে চাইছে, কিন্তু সে কিছু বলতে পারছিল না। আমি সেদিন তাদেরকে বিদায় করে দিয়ে নাকি তাকে প্রাণে বাঁচিয়েছি। বাড়ী ফিরে সে বুঝতে পেরেছে, আমি ইচ্ছে করেই ট্রিক করেছি তাদের সাথে। সে জানাতে এসেছিল, এর পরেও যদি সেই বন্ধু আবার তাকে নিয়ে আসে, আমি যেন প্রতিবার ‘না’ বলে দেই।

আমি হেসে ফেলেছি ওর কথা শুনে, বলেছি, ঠিক আছে, তুমি যেভাবে চাও, সেভাবেই হবে। আরেকদিন আমার এক সহকর্মী তার কাছে ‘আনলিমিটেড টক অ্যান্ড টেক্সট’ প্ল্যানসহ ফোন সেল করেছে। আমি তখন ফ্লোরে ছিলাম না। যখন ফ্লোরে ফিরেছি, ডেমেড্রিক আমার কাছে নিয়ে এসেছিল তার ফোন। দেখে আমি একটু অবাক হয়েছি। জানতে চেয়েছি, সে কথা বলতে পারে কিনা! জবাবে বলেছে, ‘না’। জানতে চাইলাম, টেক্সট মেসেজ পাঠাতে পারে কিনা! ‘ হ্যাঁ’। এবার আমি তার জন্য শুধু ‘আনলিমিটেড টেক্সট প্ল্যান’ নির্বাচন করে দিলাম। আগের প্ল্যান পালটে নতুন প্ল্যান দিলাম। খরচ অর্ধেক কমে গেলো। ডেমেড্রিক কী খুশী! বার বার বলছিল, ভাগ্যিস, সে আমাকে দেখতে পেয়েছিল। সেই থেকে শুরু। এরপর থেকে ও ওয়ালমার্টে এলে সরাসরি আমার কাছে চলে আসে। আমি না থাকলে ফিরে যায়। আমার সহকর্মীরা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করে, বলে তোমার ‘কাজিন’ লাগে ও।

একদিন ডেমেড্রিক আমার অনামিকার দিকে ইশারা দিয়ে জানতে চায়, আমি বিবাহিত কিনা! বললাম, হ্যাঁ, বিবাহিত। দারুণ ভালো একটি মানুষের সাথে জীবন বাঁধা পড়েছে। সে চোখ কুচকে ধমক দেয়, বিবাহিত হয়ে অনামিকাতে আংটি পড়িনি কেনো? আঙ্গুলে আংটি না দেখলে নাকি ছেলেরা ভুল বুঝবে। বাড়ী ফিরেই যেনো আংটি পড়ি। বললাম, আংটি পড়লে আমার আঙ্গুল ফুলে যায়, তাই আংটি পড়ি না। তাছাড়া, আমাকে এই বয়সে কেউ প্রেম নিবেদন করবে না। জানতে চায় আমার বয়স কত? বলি, তুমি আন্দাজ করো। সাথে সাথে বললো, ঊনচল্লিশ। বললাম, ঊনত্রিশ। ‘না’ বলে এক জোর আওয়াজ তুললো। আমি হাসি, বলি, কেনো, না কেনো? সে বলে, তোমাকে অনেক ইয়াং লাগে, তাই বলে তোমার বয়স ঊনত্রিশ না। তাহলে কত, ঊনষাট? ‘না’ এটাও ঠিক নয়। ঊনপঞ্চাশ? ‘হ্যাঁ’ এটা হতে পারে। এবার আমার চীৎকার করে উঠার পালা। হেসে ফেলেছি, বলেছি, তুমি ঠিক, ঊনপঞ্চাশ না হলেও কাছাকাছি আছি। তোমার আন্দাজ ক্ষমতা দেখে অবাক হয়ে যাই। এবার সে মুখে নির্মল হাসি ছড়ায়! আমি তার অনুমান শক্তির প্রশংসা করেছি।

ডেমেড্রিক কেমন আছে? কেমন লাগে এই ভাষাহীন জীবন! ডেমেড্রিক সারা মুখে নির্মল হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বললো, আমার ভালো লাগে। পৃথিবীটা অনেক সুন্দর। তুমি অনেক সুন্দর। তুমি একজন ‘মা’। সবার মা। তুমি আমাকে অনেক ভালোবাসো, আমি তোমাকে অনেক বিশ্বাস করি। তোমার কাছে আসি একটু মমতা পাওয়ার জন্য। আমার মা কোথায় থাকে জানিনা, তোমাকে দেখলে মায়ের কথা মনে পড়ে।