ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

আজ ১৪ ফেব্রুয়ারী, ভ্যালেন্টাইন’স ডে বা ভালোবাসা দিবস। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেই পারস্পরিক ভালোবাসা এবং সৌহার্দ্য বিনিময়ের জন্য আজকের দিনটি সকলের জন্য উন্মুক্ত। আজই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশীবার বলা কথা, “ আমি তোমাকে ভালোবাসি” বলার দিন। এমনকি শত্রুর প্রতিও ঘৃণার বদলে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেয়ার দিন। দিনটি বছরের অন্যান্য দিনের চেয়ে আলাদা। যদিও ভালোবাসার কথা বা অনুভূতি আমরা প্রতিনিয়তই প্রকাশ করে থাকি, সেই প্রকাশের মধ্যে কোন ঘটা-পটা থাকে না, এ শুধুই একান্ত ব্যক্তিগত অনুভবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু ‘ভালোবাসা দিবসে’ ভালোবাসা প্রকাশ ব্যক্তি গন্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, ‘ভালোবাসি’ অনুভূতিটুকু আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করার মধ্যেই দিবসটি পালনের সার্থকতা নিহিত থাকে।

‘ভালোবাসি’ কথাটি মুখে বলেও প্রকাশ করা যায়, তবে ভালোবাসা নান্দনিক হয়ে উঠে যদি ছোট্ট কোন উপহারের মাধ্যমে তা জানানো যায়! ভালোবাসা মাখানো উপহার দিয়ে প্রিয়জনকে আরেকবার জানান দেয়া, “ আমি তোমাকে ভালোবাসি”। উপহার মহার্ঘ্য হয়ে উঠে ভালোবাসার প্রলেপে। দামী দোকানে কাঁচের শোকেসে সাজিয়ে রাখা মূল্যবান হীরে জহরত থেকে শুরু করে বাগানের সদ্য প্রস্ফুটিত গোলাপটিও হতে পারে ‘ভালোবাসা দিবসের’ উপহার! তবে সবচেয়ে কাব্যিক এবং মর্যাদাপূর্ণ উপহার হচ্ছে রঙীন খামে চিঠি’ অথবা ‘বাগানের সদ্য প্রস্ফুটিত ফুল’। আর সে ফুল যদি হয় বাগানের তাজা গোলাপ, তাহলে তো কথাই নেই।

গোলাপ ঈশ্বরের এক অপরূপ সৃষ্টি, ফুলের রাণী গোলাপ, কত রঙের গোলাপই আছে এই পৃথিবীতে! লাল, হলুদ, গোলাপী, কমলা, বেগুণী, সাদা, কালো, পীচ এবং আরও আরও কত রঙ। কতই না রঙের বাহার! প্রকৃতির এই অনাবিল সৌন্দর্যময় সৃষ্টির প্রতিটি রঙেই থাকে ভালোবাসার কথা! প্রতিটি রঙের আলাদা আলাদা অর্থ থাকলেও মূল সুর হচ্ছে ‘ ভালোবাসি’। এ যেন ‘ভালোবাসার সাত রঙ’।
এজন্যই ভালোবাসার উপহার হিসেবে এক গুচ্ছ গোলাপের গ্রহণযোগ্যতা সব কিছুর ঊর্ধ্বে। এ তো নিছক ফুলই নয়, এ যে প্রেরক এবং প্রাপকের মধ্যে যোগাযোগের মেলবন্ধন, হৃদয়ের গভীরের উষ্ণ বার্তা বহনকারী মাধ্যম! প্রথম ভালোবাসা জানাতে, হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার গৌরব ফিরিয়ে আনতে, গভীর ভালোবাসাকে আরও গভীরে পৌঁছে দিতে, কাউকে ভালোবাসা মিশ্রিত শ্রদ্ধা জানাতে, শত্রুর মন জয় করতে, বন্ধুর আনন্দের অংশীদার হতে, শোকার্তকে সহানুভূতিপূর্ণ ভালোবাসা জানাতে একগুচ্ছ গোলাপই যথেষ্ট। গোলাপের প্রতিটি রঙেই যেনো মিশে আছে ‘ভালোবাসা’র কথা।

সাদা গোলাপ
সাদা গোলাপ বিশুদ্ধতা এবং পবিত্রতার প্রতীক। এক গুচ্ছ সাদা গোলাপ উপহার দেয়ার ভেতর নিহিত থাকে অন্তরের শুভ ইচ্ছার কথা, ভালোবাসার পবিত্রতার কথা। একের প্রতি অপরের একনিষ্ঠতা, অঙ্গীকার এবং নির্ভরতার কথা।

গোলাপী গোলাপ
গোলাপ থেকেই গোলাপী। গোলাপী গোলাপের গ্রহণযোগ্যতা সর্বকালের, সর্বযুগের! আভিজাত্য এবং অন্তরের স্নিগ্ধতা প্রকাশ পেয়ে থাকে গোলাপী গোলাপ উপহারের মাঝে। হালকা গোলাপী রঙের গোলাপ সুখ, রোম্যান্স, আনন্দ প্রকাশের প্রতীক এবং গাঢ় গোলাপী গোলাপ প্রাপকের প্রতি প্রেরকের ভালোবাসার স্বীকৃতি, হৃদয়ের স্নিগ্ধ ভালোবাসার প্রকাশ।

হলুদ গোলাপ
হলুদ গোলাপ অপরকে স্বাগত জানাতে, বন্ধুত্বের প্রতীক, পরম নির্ভরতা, আনন্দ-উচ্ছাস, ভালোবাসার প্রতীক। অপরকে স্বাগত জানাতে, নতুনকে আবাহন করতে, নতুন মা, নতুন গ্র্যাজুয়েট অথবা বাগদান বা বিয়ের আশীর্বাদ হয়ে যাওয়া পাত্র পাত্রীকে শুভেচ্ছা জানাতে হলুদ গোলাপের জুড়ি মেলা ভার! হলুদ গোলাপ নতুন জীবন শুরুর আনন্দ ও ভালোবাসার প্রতীক।

পীচ রঙের গোলাপ
পীচ ফল রঙা (হলদে কমলা) গোলাপ মানুষের মনের সৌন্দর্য্য ও নমনীয় ব্যাক্তিত্ব প্রকাশ করে। অপরের উন্নতিতে প্রশংসা করতে অথবা প্রিয় মানুষটির প্রতি মনের গভীর অনুভূতি বা আকুলতা প্রকাশ করতে পীচ রঙা গোলাপ হচ্ছে একমাত্র উপহার! কারো প্রতি সহানুভূতি প্রকাশেও পীচ গোলাপের জুড়ি নেই।

কমলা রঙ গোলাপ
কমলা গোলাপ নিয়ে আসে অহংকার, উচ্ছ্বাস, আকাংক্ষার বার্তা! উজ্জ্বল কমলা রঙের গোলাপ প্রিয়জনকে জানিয়ে দেয় প্রেরকের মনের উষ্ণ, উদ্দীপনামূলক ভালোবাসার বার্তা, জানিয়ে দেয় প্রিয়জনকে কাছে পেতে চাওয়ার পরম আকাংক্ষার কথা! পূর্ণ প্রস্ফুটিত গোলাপের অর্থ, “ আমি তোমাকে নিয়ে গর্বিত”! কোমল ও বিষন্ন কমলা রঙের গোলাপ গুচ্ছ প্রেরকের স্বভাবের কোমলতা ও নমনীয়তাকে প্রকাশ করে।

ল্যাভেন্ডার গোলাপ
‘প্রথম দর্শণেই প্রেম’ প্রকাশের অন্যতম উপহার হচ্ছে এক গুচ্ছ ল্যাভেন্ডার গোলাপ। ল্যাভেন্ডার বা হালকা বেগুণী রঙ একজনের প্রতি আরেকজনের গভীর ভালোবাসা বর্ণনা করে। প্রিয়জনকে ভালোবাসার গভীরতা বুঝাতে ল্যাভেন্ডার গোলাপের জুড়ি নেই।

কালো গোলাপ
ভালোবাসার মৃত্যু নেই, পারস্পরিক সম্পর্ক ভেঙ্গে গেলেও সম্পর্ক জোড়া দিতে কালো গোলাপ উপহারের জুড়ি নেই। কালচে লাল বা কালচে মেরুন গোলাপকেই ‘কালো গোলাপ’ বলা হয়। কালো গোলাপ মানে হচ্ছে পুণর্জন্ম, অথবা নতুন করে শুরু। অর্থাৎ ভালোবাসায় পরাজয় বলে কিছু নেই, হেরে যাওয়া জীবনে কালো গোলাপ ‘ আবার শুরু করি’ বার্তা বহন করে।

নীল গোলাপ
ভালোবাসার সমপর্কে নীল গোলাপের স্থাণ নেই। তাই পৃথিবীতে নীল গোলাপের অস্তিত্বও নেই। রঙ হিসেবে ‘নীল’ অনেকেরই প্রিয়, কিন্তু ভালোবাসার মানুষটিকে উপহার দেয়ার জন্য, কৃত্রিম ‘নীল গোলাপ’ও দেয়া উচিৎ নয়।

ভালোবাসার ‘লাল গোলাপ’
সব রঙের গোলাপেই ভালোবাসার কথা লেখা আছে, তবে ‘লাল গোলাপ’ ভালোবাসার নিরবচ্ছিন্ন প্রতীক। লাল মানে উষ্ণতা, লাল মানেই রোম্যান্স, লাল মানে সাহস! প্রিয় মানুষটিকে যদি এক গুচ্ছ লাল গোলাপ অথবা বাগান থেকে তুলে নিয়ে আসা একটি তাজা গোলাপ দেয়া যায়, যার অর্থ “ আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ”, স্বর্গীয় ভালোবাসা পৃথিবীতেই মূর্ত হয়ে উঠে!

লাল গোলাপ মানেই ভালোবাসা, লাল গোলাপ মানেই প্রেম, লাল গোলাপের শুভেচ্ছা মানেই পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, আকাংক্ষার বহিঃপ্রকাশ।

লাল গোলাপের উৎপত্তিঃ
ভালোবাসার চলমান লাল গোলাপ প্রথম আবিষ্কৃত হয়েছিল সুদূর চীনদেশে, ১৮০০ শতাব্দীতে। যদিও গবেষণা থেকে জানা যায়, লাল গোলাপের অস্ত্বিত্ব ৩৫ মিলিয়ন বছর আগেও ছিল।

লাল গোলাপের জনপ্রিয়তা সর্ব যুগে, সর্বদেশে। রোমান যুগ থেকেই লাল গোলাপের জনপ্রিয়তা ছিল অবিসংবাদিত। কারণ রোমান্স ছাড়াও লাল গোলাপের ব্যবহার হতো সুগন্ধী ও ভেষজ ওষুধ প্রস্তুতিতে, গোলাপের ব্যবহার হতো ঘর সাজানোর কাজে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে গ্রেট ব্রিটেনে ‘গোলাপ যুদ্ধে’ লাল গোলাপের প্রধান ভূমিকা ছিল, লাল গোলাপকে হাউজ অব ল্যাঙ্কাস্টারের প্রতীক ধরা হতো।

শুধু কী তাই, সাহিত্যেও লাল গোলাপ তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান করেছে। রবার্ট বার্ণের কবিতা ‘দ্য রেড রোজ’ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ের সাড়া জাগানো ছবি ‘আমেরিকান বিউটি’ গোলাপ বন্দনায় কাব্যময় হয়ে উঠেছে।

লাল গোলাপের মহিমাঃ
লাল গোলাপ অনেক জিনিসের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। প্রধান অর্থ হচ্ছে ‘প্রেমময় ভালোবাসা’। লাল গোলাপ উচ্চারণের ভেতর জড়িয়ে থাকে আবেগ আর উষ্ণতা মাখানো রোম্যান্স। হয়তো এ কারণেই লাল গোলাপের আরেক নাম ‘প্রেমিকের গোলাপ”।

লাল গোলাপকে সৌনদর্য্যের প্রতীকও বলা হয়ে থাকে। শতকের পর শতক, দেশের বাইরে আরও দেশ, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী, সর্বত্র লাল গোলাপ তার বর্ণ, রূপ এবং সৌরভ ধরে রেখেছে।
লাল গোলাপ শুধুমাত্র প্রেমিক যুগলের মাঝে দেয়া নেয়া হয়, ভাবা ভুল। বিয়ে, জন্মদিন, বিশেষ কাউকে শুভেচ্ছা বার্তা “শুধু তোমার জন্য” পাঠানো থেকে শুরু করে বিবাহবার্ষিকী, ক্রীসমাস, ভ্যালেন্টাইন’স ডে তেও লাল গোলাপ একচ্ছত্র বিস্তার লাভ করে।

প্রস্ফুটিত গোলাপের ন্যায় অ্প্রস্ফুটিত গোলাপেরও নানারকম অর্থ আছে। যেমন লাল গোলাপ কুঁড়ির মানে হচ্ছে, প্রেমের প্রথম ধাপ। অর্থাৎ দুটি মানুষের মধ্যে প্রণয়ের প্রাথমিক ধাপকে গোলাপের না ফোটা কুঁড়ির সাথে তুলনা করা হয়, আর দল মেলে প্রস্ফুটিত গোলাপকে মনে করা হয় দীর্ঘস্থায়ী ভালোবাসার সম্পর্ক। লাল গোলাপে ক্ষমতা, শক্তি এবং সৃজনশীলতাকে বুঝানো হয়।
ভ্যালেন্টাইন’স ডে মানেই লাল গোলাপ!

লাল গোলাপের সুবিশাল গ্রহণযোগ্যতাই গোলাপকে ভালোবাসা বা রোম্যান্সের প্রতীকি মর্য্যাদা দিয়েছে। আর এ কারণেই ভ্যালেন্টাইন’স ডে তে লাল গোলাপের বিপুল চাহিদা দেখা দেয়। পৃথিবীর প্রতিটি দেশে একই ছবি দেখা যায়। ভালোবাসার রঙ এক বলেই ভালোবাসার উপহারও একই হয়। উপহার নানা আঙ্গিকে দেয়া হয়ে থাকে। কখনও ব্যুকে, কখনও এক গুচ্ছ গোলাপ সুদৃশ্য কাগজে মুড়িয়ে, অথবা কখনও আলাদা একটি গোলাপ শুধু ‘আলাদা একটি মানুষের জন্য’ দেয়া হয়ে থাকে। কখনওবা গোলাপের তাজা পাপড়ি সুদৃশ্য বাটিতে করেও উপহার হিসেবে দেয়া হয়। খোলা পাপড়ি থেকে স্বর্গীয় প্রেমের সৌরভ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। এজন্যই লাল গোলাপ যিনি দিবেন, তিনি তার খুব বিশেষ কাউকেই দিবেন, সবাইকেই ‘লাল গোলাপ’ দেয়া যায় না।

টকটকে লাল যেহেতু ভালোবাসার প্রতীক, তাই জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলের ভাষাতেই ভালোবাসার একটাই রূপ, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’। লালের সাথে যদি সাদা গোলাপ মিশিয়ে দেয়া হয়, তাহলে ভালোবাসার সাথে যোগ হয়ে যায় আত্ম নিবেদন, অর্থাৎ ‘আমি তোমার জন্য নিবেদিত প্রাণ”! ‘ভালোবাসা’ প্রকাশের জন্য আলাদা উপলক্ষ্যের প্রয়োজন হয় না, যে কোন সময় ,যে কোন মুহূর্তে একগুচ্ছ অথবা একখানা লাল গোলাপ নিয়ে প্রিয় মানুষটির সামনে দাঁড়ালেই হলো, হাতের গোলাপই বলে দিবে, মনের কথা।

সর্বকালের ভ্যালেন্টাইন
পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, গোলাপ কেনার ব্যাপারে পুরুষ অনেক এগিয়ে আছে। ভ্যালেন্টাইনস ডে উপলক্ষে যত গোলাপ বিক্রী হয়ে থাকে, শতকরা ৬৫ ভাগ ক্রেতা হচ্ছেন পুরুষ। নারী আর ফুল সমার্থক, নারীর কোমল হাতে ফুল মানায় ভালো, কবি-সাহিত্যিকদের কাব্য সৃষ্টিতে ‘নারী ও কুসুম’ সৌন্দর্য্যের প্রতীক হিসেবে পাশাপাশি অবস্থান করে। তাই বলেই কী বিশেষ দিনে বিশেষ মানুষটি একগুচ্ছ গোলাপ হাতে প্রিয় নারীর সামনে হাজির হয়! বলে, “আমার একদিকে শুধু তুমি, পৃথিবী অন্যদিকে, আমি তোমারই দিকটা নিলাম”।